পরিবেশ বিপর্যয় (Environmental Disasters) রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

পরিবেশ বিপর্যয় (Environmental Disasters) রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

পরিবেশ বিপর্যয় কাকে বলে ? পরিবেশ বিপর্যয়ের শ্রেণীবিভাগ কর।

সেইসকল দুর্ঘটনা যেগুলি প্রাকৃতিক ভাবে ঘটে এবং মানুষ বা সভ্যতার সমূহ ক্ষতি করে তাদেরকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে। এটি এমন মাত্রায় হয় যার ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব নয়। এর ফলে সম্পত্তি, মানুষ ও বিভিন্ন জীবজন্তুর জীবন ধ্বংস হয়। এটি দুপ্রকারের হতে পারে। প্রাকৃতিক যেমন - আগ্নেয়গিরি, ভূমিস্খলন, ভূমিকম্প, সাইক্লোন, বন্যা বা খরা প্রভৃতি এবং মনুষ্যসৃষ্ট যেমন—পারমাণবিক বিস্ফোরণ, কীটনাশক দুর্ঘটনা প্রভৃতি।

নিচে এর শ্রেণীবিভাগ ছকের আকারে দেওয়া হলো -

পরিবেশ বিপর্যয়ের শ্রেণীবিভাগ

ভূমিকম্পের সৃষ্টি কিভাবে হয়? ভারতে ভূমিকম্পের কারণ কি ? ভূমিকম্পে কি কি ক্ষতি হয় ? সম্প্রতি ভারতের দুটি ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ কর।

ভূমিকম্প কি করে হয় সেই সম্পর্কে অনেক তত্ত্ব বর্তমান। এই তত্ত্বগুলির মধ্যে প্লেট টেক্টোনিক তত্ত্ব (Plate tectonic theory) সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য। এই তত্ত্ব অনুযায়ী সারা পৃথিবীর ভূ-নিম্নস্থ অঞ্চল অনেকগুলি স্তরে বিভক্ত। এই স্তরগুলি মোট 6 টি মুখ্য ও 20 টি গৌণ প্লেটে বিভক্ত। ভূ-নিম্নস্থ তাপ ও চাপের পরিবর্তনের ফলে এই প্লেটগুলির মধ্যে চলন হয়। একটি প্লেটের সঙ্গে অন্যপ্লেটের তুলনামূলক স্থান পরিবর্তন ও সংঘর্ষের ফলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

ভারতে ভূমিকম্পের কারণ :

ভারতীয় অঞ্চলের ভূনিম্নস্থ এশিয়াটিক প্লেটের দক্ষিণদিকে চলন হচ্ছে ও ইন্ডিয়ান প্লেটের উত্তর দিকে চলন হচ্ছে। ইন্ডিয়ান প্লেটের উত্তরাংশ এশিয়াটিক প্লেটের দক্ষিণাংশের সঙ্গে সংঘর্ষ হওয়ায় ভূস্তরে বিভিন্ন ভাঁজ ও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়, এর ফলে হিমালয়ের উচ্চতা প্রতিবছর 5 cm বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ভূমিকম্পে ক্ষতির প্রকৃতি :

ভূমিকম্পের ফলে মানুষের বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তির ক্ষতি এবং মানুষ ও গবাদি পশুর জীবননাশ দেখা যায়। ভূমিকম্পের ফলে বিভিন্ন অট্টালিকা, রাস্তাঘাট, রেললাইন, বিভিন্ন শিলা, বাঁধ ও সেতুর প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয়।

ভারতের সম্প্রতিক দুটি বৃহৎ ভূমিকম্প ও তাতে ক্ষতির পরিমাণ
সময় স্থান রিখটার স্কেলে মাপ ক্ষতি
২০ ই অক্টোবর ১৯৯১ উত্তরকাশি (উত্তর প্রদেশ) ৬.৬ ৩,০০০ লোকের মৃত্যু
৩০শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ লাটুর (মহারাষ্ট্র) ৬.৩ ১১,০০০ মানুষের জীবনহানি

মনুষ্যজনিত ভূমিকম্প কিভাবে সৃষ্টি হয় ? মনুষ্যসৃষ্ট ভূমিকম্পের উদাহরণ দাও।

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু ভূনিম্নস্থ জল বা খনিজ তেল উত্তোলন, মাটির বহু গভীরে খনন কাৰ্য, ডিনামাইট দিয়ে পাথর ফাটিয়ে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ী, বাঁধ বা জলাশয় সৃষ্টি করা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বড় জলাশয়ে জল আটকে রাখা, আণবিক বিস্ফোরণ প্রভৃতি মানুষের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বা সেচের কাজের জন্য কৃত্রিমভাবে বিশাল জলাশয় তৈরী করা হয়। জলাশয়ের নীচে বিপুল জলের চাপ অনেকসময় ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। বিভিন্ন তীব্রতার এই ধরণের ভূমিকম্প সৃষ্টির ফলে জনজীবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কয়েকটি ভূমিকম্পের ঘটনাঃ

(i) 1929 সালে গ্রীসে মারাথন বাঁধ (Marathon Dam) তৈরী করা হয়। এই মারাথন বাঁধকে 1931 সালে গ্রীসে ভূমিকম্প হওয়ার কারণ বলে মনে করা হয়। (ii) আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে 1935 সালে হুভার ডাম (Hoover Dam) এর জন্য মিড লেক তৈরীর ফলে ওই অঞ্চলে ভূকম্পন হচ্ছে। (iii) জাপান, ফ্রান্স, কানাডা, পাকিস্তান, চীন প্রভৃতি রাষ্ট্রে বিভিন্ন ভূমিকম্পের জন্য সেই সব দেশে তৈরী বিশাল জলাধারগুলিকে দোষী বলে মনে করা হয়। (vi) ভারতবর্ষে মহারাষ্ট্রে 1962 সালে নির্মিত কয়না (Koyna) জলাধারের জন্য 1967 সালে কয়না ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

আগ্নেয়গিরি কয় ধরনের ও কি কি ? আগ্নেয়গিরির ফলে কিরূপ ক্ষয়ক্ষতি হয় ? আগ্নেয়গিরির উপকারী দিকগুলি উল্লেখ কর।

আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের ধরনের উপর নির্ভর করে একে 2 ভাগে ভাগ করা হয় -

(ক) বিস্ফোরক জাতীয় ভীষণ আগ্নেয়গিরি : এখানে বিস্ফোরণ ভূমির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে কেন্দ্রীয় নল আকারে উর্দ্ধ দিকে ধাবিত হয়। এর ফলে ভূগর্ভে সঞ্চিত বিভিন্ন গ্যাস, জলীয় বাস্প, ধাতব পদার্থ ও গলিত ম্যাগমা বেরিয়ে আসে। এরফলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

(খ) ফাটল জাতীয় শান্ত আগ্নেয়গিরি ঃ এই জাতীয় আগ্নেয়গিরি ভূমির উপরিস্তরে দীর্ঘ ফাটলরূপে দেখা যায়। এই ফাটল থেকে গলিত ম্যাগমা বেরিয়ে এসে ভূমির উপর আস্তরণ তৈরী করে। এই আগ্নেয়গিরিতে বিস্ফোরণ খুব ধীরে হয় বলে এতে ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হয়।

আগ্নেয়গিরির ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি :

আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। আগ্নেয়গিরির গলিত লাভা ও বিস্ফোরণের ফলে প্রচুর মানুষের জীবন হানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, শিল্প, রাস্তাঘাট, রেল, বাঁধ, সেতু, জলাধার প্রভৃতি নষ্ট হয়। গলিত লাভার আগুণের ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অগ্নুৎপাতের সৃষ্টি হয়।

(i) উত্তপ্ত ও গলিত লাভা তীব্রগতিতে (সাধারণতঃ 48 km/hr) চারিদিকে ধাবিত হয়ে মানুষ সহ বিভিন্ন ঘরবাড়ি ও কৃষিভূমিকে কবরীভূত (bury) করে।

(ii) আগ্নেয়গিরিতে লাভার সঙ্গে নির্গত ছাই, ধূলো, ধোঁয়া, পাথরের টুকরো ভূ-পৃষ্ঠে একটি আবরণের সৃষ্টি করে বিভিন্ন শস্যের ক্ষতি করে, বাড়িঘর নষ্ট করে বিভিন্ন। বিষাক্ত গ্যাসের ক্রিয়ায় মানুষ ও জীবজন্তুদের অসুস্থ করে তোলে।

(iii) আগ্নেয়গিরির ফলে ভূস্তরে তীব্র তরঙ্গের (Seismic wave) সৃষ্টি হয়। 1883 সালে জাভা ও সুমাত্রার মধ্যবর্তী অঞ্চলে সুন্দা পাকে (Sunda strait) যে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে তাতে সমুদ্রের জলে তীব্র তরঙ্গ ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এই জলের ঢেউ 3040 মিটার উঁচু হয়। এর ফলে তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় 36,000 লোকের মৃত্যু ঘটে।

আগ্নেয়গিরির উপকারী দিক :

(i) আগ্নেয়গিরির লাভার সঙ্গে প্রচুর পরিমানে গলিত ধাতু নির্গত হয়। এই ধাতু শিল্পকার্যে ব্যবহৃত হয়।

(ii) লাভা শুষ্ক ও ঠান্ডা হয়ে মৃত্তিকার উপর যে আবরণ তৈরী করে সেটি অত্যন্ত উর্বর ও পোষক পদার্থ পূর্ণ বলে ওই অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের বৃদ্ধি ঘটে।

(iii) আগ্নেয়গিরি সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি করে যা প্রচুর ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।

নিরক্ষীয় সাইক্লোনের প্রকৃতি বর্ণনা কর। ভারতে এর ফলে ঘটিত ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দাও।

উঃ নিরক্ষীয় সাইক্লোনে প্রচন্ড ক্ষতির কারণ হল এর বায়ুর গতির তীব্রতা (180-400 কিমি/ঘন্টা) যার ফলে জলে সুউচ্চ ঢেউ ও অত্যধিক বৃষ্টিপাতের সৃষ্টি হয়। সাইক্লোনের সঙ্গে নদী ও সমুদ্রের ঢেউ ভূমির উপর আছড়ে পড়ার ফলে জীবন ও সম্পত্তির অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়।

ভারতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ :

নিরক্ষীয় সাইক্লোন ভারতের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে উৎপন্ন হয়। এই সাইক্লোন ভারতের পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চল যেমন পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি সাধিত করে।

(i) পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাইক্লোন 1970 সালের 12ই নভেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে দেখা যায়। এরফলে সরকারীভাবে প্রায় 3,00,000 লোকের মৃত্যু হয়।

(ii) 1977 সালে অন্ধ্রপ্রদেশে পরপর তিনটি সাইক্লোনের ধাক্কা দেখা যায়, ঝড়ের গতিবেগ ছিল 175 কিমি। সামুদ্রিক জলের উচ্চতা ছিল প্রায় 6 মিটার যেটি উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রায় 20 কিমি পর্যন্ত ভেতরে ঢুকেছিল। এর ফলে 55,000 মানুষ জলে ডুবে মারা যায়। কৃষিজমির এক বিশাল অংশ লবনাক্ত হয়ে পড়ে যেখানে 3 বছরের পূর্বে চাষ করা সম্ভব হয় না।

(iii) 1998 সালের ৭ই জুন গুজরাটের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে তীব্র সাইক্লোন দেখা যায়। এই সাইক্লোনের বায়ুর গতিবেগ ছিল ঘন্টায় 200 কিমি। প্রায় ৪ মিটার উচ্চতার জলের ঢেউ উপকূলবর্তী অঞ্চলে আছড়ে পড়ে এবং রাণ ও ছোট রাণ অঞ্চলে কর্মরত সমস্ত লবণ কর্মচারী এই জলের ঢেউয়ে ভেসে যায়। সাইক্লোনে সরকারী মতে 10,000 কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়। মানুষ মারা যায় সরকারী মতে প্রায় 1000।

বন্যা কাকে বলে ? বন্যার কারণগুলি কি কি ? বন্যা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগুলি আলোচনা কর।

উঃ কোন একটি বিস্তীর্ন স্থলভূমি যখন বেশ কয়েকদিনের জন্য বৃহৎ জলরাশির দ্বারা আবৃত হয় তখন তাকে বন্যা বলা হয়। সাধারণতঃ বন্যা নদী দ্বারা সংঘটিত হয়। নদীতে জলের পরিমাণ, জল ধারণ ক্ষমতা ও প্রবাহ ক্ষমতা থেকে বৃদ্ধি পেলে নদী তীরভূমিতে প্রসারিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে।

বন্যার কারণ :

বন্যা শুধুমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট কারণের ফলে হয় না, অনেকগুলি কারণ একসঙ্গে কার্য করলে তাদের আন্তঃক্রিয়ার ফলস্বরূপ বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যার বিভিন্ন কারণগুলিকে মুখ্যতঃ 2 ভাগে ভাগ করা যায় (a) প্রাকৃতিক কারণ (b) মনুষ্যজনিত কারণ।


(a) প্রাকৃতিক কারণ :

(i) কোন একটি অঞ্চলে অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে নদীতে জলের পরিমাণ অত্যধিক হয়। নদীর জলধারণ ও জলপ্রবহন ক্ষমতা নির্দিষ্ট হওয়ার ফলে এই জল একসঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে না ও জল তীরের দিকে প্রসারিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে।

(ii) বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে আনা পলি নদীর তলে জমা হয়। অনেকদিন ধরে পলি জমার ফলে নদীর গভীরতা কমতে থাকে ও নদীর প্রবাহক্ষমতা কমে যায়। ফলে একসঙ্গে হঠাৎ বেশী জলের আগমন হলে জল নদী উপচিয়ে তীরে ছাপিয়ে যায়।

(b) মনুষ্যজনিত কারণ :

(i) বিভিন্ন বাঁধ, রিজার্ভেয়র প্রভৃতি নির্মান করে নদীর গতিপথ ও প্রবাহের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নদীর একদিকে বাঁধ সৃষ্টি করে জল সঞ্চয় করলে হঠাৎ জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে নদীর উল্টোদিকে জলের প্রবাহ হয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়।

(ii) বৃহৎ জনসংখ্যার খাদ্যান্ন সরবরাহের জন্য কৃষিকার্যে অত্যধিক উন্নতি ঘটাতে হয়েছে। উন্নত কৃষিপ্রথায় বছরে 3-4 বার ভূমি কর্ষণ করা হয়। এতে ভূমির বাঁধন আলাদা হয় ও বৃষ্টিতে মৃত্তিকার উপরি অংশ ধুয়ে নদীতে আপতিত হয়। নদীতে পলিবৃদ্ধির ফলে নদীর প্রবাহ ক্ষমতার হ্রাস ঘটে ও বন্যার সৃষ্টি হয়।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ :

বন্যা একটি প্রাকৃতিক ঘটনা এটিকে পূর্ণমাত্রায় রোধ করা কখনও সম্ভব নয়। তবে আগাম কিছু ব্যবস্থা ও সতর্কতা নিলে বন্যার পরিমাণ ও তীব্রতা হ্রাস করা যায়। নীচে বিভিন্ন পদ্ধতিগুলি আলোচনা করা হল।

(i) বনসৃজন ঃ উদ্ভিদরা তার শিকড়ের সাথে মৃত্তিকাকে ধরে রাখে এবং এই মৃত্তিকা তাদের কণার ফাঁকে জল ধরে রাখে। এছাড়া অরণ্যভূমিতে মৃত্তিকায় আপতিত পাতার বিঘটনে জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয়। জৈব পদার্থ বনভূমির মৃত্তিকার উপর একটি আবরণের সৃষ্টি করে। জৈব পদার্থ প্রচুর পরিমানে জল শোষণ করে ফলে অত্যধিক বৃষ্টির ফলে হঠাৎ আপতিত জলের সমস্তটাই হঠাৎ নদীতে গিয়ে জড়ো হতে পারে না।

(ii) মৃত্তিকা ক্ষয়রোধ ঃ উদ্ভিদ বিহীন অংশে মৃত্তিকার ক্ষয় (soil erosion) বেশী হয় ও মাটি বৃষ্টির জলে ধুয়ে নদীতে গিয়ে আপতিত হয়। অনেকদিন ধরে মৃত্তিকা আপতিত হলে নদীর গভীরতা কমে ও বন্যার সৃষ্টি হয়। ফাঁকা স্থানে উদ্ভিদ লাগালে ভূমিক্ষয় হবে না।

(iii) বাঁধ নির্মাণ ঃ বন্যা প্রবণ অঞ্চলে নদীর উপর বাঁধের সৃষ্টি করতে হবে। এই বাঁধ অবশ্যই সেখানে নির্মাণ করতে হবে যেখানে বন্যার ফলে কোন ঘনবসতি অঞ্চলে বেশী ক্ষতি হয়।

(iv) জলাধার নির্মাণ ঃ বিভিন্ন অঞ্চলে নদীর ধারে জলাধারের নির্মাণ করতে হবে। এর ফলে নদীতে হঠাৎ আগত বিস্তীর্ন জলরাশি এখানে সঞ্চয় করা সম্ভব হবে।

খরা কাকে বলে ? খরার ক্ষতিকারক দিকগুলি আলোচনা কর। খরা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলি উল্লেখ কর।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে খরা একটি অতি মারাত্মক বিপর্যয়। খরার ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদা জল ও খাদ্যের অভাব ঘটে।

সি. জি. বেটস (1935)-অনুসারে “কোন এক অঞ্চলে যদি বার্ষিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের 75% এবং বৃষ্টির মাসগুলিতে প্রতি মাসের স্বাভাবিকের বৃষ্টিপাতের তুলনায় 60% হয় তবে তাকে খরা অবস্থা বলা হবে।”

ইন্ডিয়ান মিটিওরোলোজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (IMD) অনুযায়ী কোন এক অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের 75% হয় তাকে খরা বলা হবে। তারা এই খরাকে 2-ভাগে ভাগ করেছেন -

(i) প্রকট খরা যখন বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় 50% কম হয়। - (ii) মধ্যম খরা · যখন বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় 25-50% কম হয়। -

খরার বিভিন্ন ক্ষতিকারক দিকসমূহঃ

(i) তীব্র পানীয় জলের সঙ্কট হয়। মানুষ তার প্রাত্যহিক পানীয় জল ও রান্নার জল পায় না। জলের অভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা যায় না। তীব্র জলের সঙ্কটে মানুষ দূরবর্তী নোংরা জলের উৎস (দূষিত পুকুর, ডোবা প্রভৃতি) থেকে জল সংগ্রহ করে পান করে, • ফলে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের সৃষ্টি হয়।

(ii) কৃষিকার্যে প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। খরার সময় জলের অভাবে ক্ষেতের ফসল সেখানেই শুকিয়ে যায়। ফলে কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ও দেশের মানুষের খাদ্যান্নের সঙ্কট ঘটে।

(iii) পশুপালনে পশুর তৃষ্ণা নিবারণের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। খরার সময় এই প্রাণীগুলি জলের অভাবে মৃত্যুবরণ করে। এর ফলে দুধ, মাংস প্রভৃতির সঙ্কট সৃষ্টি হয়। (iv) বৃষ্টিপাতের ফলে ভূমির উপর থেকে জল চুইয়ে মাটির তলার জলের তল উঁচু করে। বৃষ্টির অভাবে জল না পাওয়া যাওয়ায় ভূ-নিম্নস্থ জলের তল ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে।

ফলে টিউবওয়েল ও বোরে জল ওঠে না ও জলের সঙ্কট তীব্রতর হয়।

খরা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি :

(i) বর্তমানে কম্পুটার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এবং উন্নতমানের আবহাওয়া গবেষণার দ্বারা কোন বছরের বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার সংকেত দেওয়া হয়। এর ফলে খরার মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

(ii) গাছপালা বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কৃত্রিম বনাঞ্চল সৃষ্টি করে বা বনসংরক্ষণ করে খরা প্রতিহত করা যায়।

(iii) বৃষ্টির জল সংরক্ষণের দ্বারা ভূ-নিম্নস্থ লের পরিমাণ বৃদ্ধি করা বা কৃত্রিম জলাশয় সৃষ্টি করা খরা প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

ভূপালের গ্যাস দুর্ঘটনা সম্পর্কে যাহা জান লেখ। এর কারণগুলি বর্ণনা কর।

রাত্রি সাড়ে বারোটা, 1984 সালের তেসরা ডিসেম্বর। ভূপালের বাসিন্দারা সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ তাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ ভীষণ জ্বলতে থাকে; এর সঙ্গে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট, তীব্র কাশি। ঘর, বাড়ী ছেড়ে সবাই পালাতে শুরু করে। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স বুঝতে পারছিলেন না অসুস্থদের নিয়ে কি করবেন। রোগীরা যে ধরণের দৈহিক উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন সেই ধরণের রোগের সঙ্গে তাঁরা বিশেষ পরিচিত ছিলেন না। প্রাথমিক যন্ত্রণা কেটে যাবার পর ভূপালের জনসাধারণের কাছে দুর্ঘটনার পরবর্তী কয়েকটি দিন ছিল তীব্র বিষাদের, চারিদিকে শুধু মৃত্যুর দৃশ্য। রাস্তাঘাটে গরু, ছাগলের সাথে পড়ে ছিল মানুষের পচাগলা মৃতদেহ।

দুর্ঘটনা ঘটার এক সপ্তাহের মধ্যে আনুমানিক 10,000 লোকের মৃত্যু হয়, 1,000 জন চোখের দৃষ্টি হারান। এছাড়াও কয়েক লক্ষ লোক বহুরকমের রোগজনিত দৈহিক উপসর্গের শিকার হন। যদিও সরকারী তথ্য অনুসারে ভূপাল দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা 2,500, পঙ্গু অসুস্থের 2 লক্ষ।

ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনার কারণ :

ভূপালের ইউনিয়ন কার্বাইডের কারখানার নিসৃঃত গ্যাসে কয়েক ঘন্টা ভূপাল শহর গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্তরে এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান শুরু হয়। ঠিক কি কারণে ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেই সম্বন্ধে কোনও স্থির সিদ্ধান্ত করা যায়নি। তবে এর সম্ভাব্য কারণ হিসাবে ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানীর গাফিলতিকে ধরা হয়। ভূপালে ইউনিয়ন কার্বাইডের কারখানায় কীটনাশক উৎপাদিত হয়। কীটনাশক প্রস্তুতিতে প্রয়োজন হয় মিথাইল আইসো সায়ানেট বা সংক্ষেপে মিক (MIC) গ্যাসের। মিক গ্যাস কারখানার মিক প্লান্টে সংরক্ষিত রাখা হয়। দুর্ঘটনাজনিত কোনও কারণে বাস্প ও তরল অবস্থার মিক গ্যাস ও তার সাথে যুক্ত তীব্র বিষাক্ত গ্যাস কার্বনিল ক্লোরাইড বা ফ্রঁসজিন গ্যাস, হাইড্রোজেন সায়ানাইড (HCN) বাতাসে ছড়িয়ে পরে। ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানীর তথ্য অনুসারে প্রায় 20 টন মিক গ্যাস বাতাসে মিশেছিল।

ভূপালে ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানীতে সুরক্ষার গাফিলতি ঃ

মিক গ্যাসের নির্গমণ প্রতিরোধে কোম্পানীতে অনেকগুলি সুরক্ষার ব্যবস্থা ছিল। বিভিন্ন তথ্যে প্রকাশ পায় দুর্ঘটনার রাতে প্রতিটি সুরক্ষা ব্যবস্থা মিকগ্যাস ছড়ানোর প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানীর সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলির ব্যর্থতা সম্বন্ধে নীচে আলোচনা করা হল,

(i) বায়ুশোধন করার যন্ত্র স্ক্রাবার (Scrubber) এর সাহায্যে মিকগ্যাসকে কস্টিক সোডার দ্বারা নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা ছিল। দুর্ঘটনার রাতে উপরোক্ত যন্ত্র কাজ করেনি।

(ii) নির্গত গ্যাসকে ফ্লেয়ার টাওয়ার (flare tower) দ্বারা পুড়িয়ে নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থা মিক গ্যাস প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়।

(iii) মিক গ্যাসকে শীতল রাখার জন্য রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্লান্টের রেফ্রিজারেটর কয়েকমাস ধরে খারাপ থাকার ফলে ট্যাঙ্কে গ্যাসের উষ্ণতা যেখানে শূণ্য ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড হওয়া উচিত সেখানে তাপমাত্রা ছিল 15 থেকে 20 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের মধ্যে হয়ে গিয়েছিল ।

উপসাগরীয় যুদ্ধ কি ? এই যুদ্ধে প্রাকৃতিক ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা কর।

১৯৯০ সালে ইরাক, কুয়েত দখল করে। এই কারণে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালী সহ কয়েকটি দেশ ইউনাইটেড নেশনস্-এর ব্যানারে যৌথভাবে ইরাকের উপর আক্রমণ করে। এই উপসাগরীয় যুদ্ধ 1991 সালে 42 দিন (16 ই জানুয়ারী থেকে 26 ফেব্রুয়ারী) পর্যন্ত চলেছিল। ক্ষয়ক্ষতি :

উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রায় 1 লক্ষ শক্তিশালী বোমা ইরাকের উপর নিক্ষেপ করা হয়। এতে ইরাক ও কুয়েতের বহু তেলের খনিতে আগুন লাগে। যুদ্ধ চলাকালীন প্রতিদিন প্রায় দশ লক্ষ টন তেল আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়। তেলের খনিগুলিতে আগুন লাগার ফলে দৈনিক প্রায় ৪ কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড ও 3.6 কোটি টন সালফার ডাই অক্সাইড বাতাসে মেশে। এছাড়া যুদ্ধের সময় প্রতিদিন ব্যবহৃত ট্যাঙ্ক ও বোমারু বিমানের জ্বালানীর দহনের ফলে প্রায় 4 কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড এবং 15 লক্ষ টন সালফার ডাই অক্সাইড দ্বারা বাতাস দূষিত হয়। এছাড়া ধোঁয়া ও ধূলিকণায় ইরাকের বাতাস ছেয়ে যায়। এর ফলে বায়ুদূষণজনিত বিভিন্ন সমস্যা পরিবেশে দেখা যায়। খনি থেকে তেল সমুদ্রে মেশার ফলে সমুদ্রজল ভীষণভাবে দূষিত হয়। এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন জীবপ্রজাতির সমূহ ক্ষতি হয়।

মিনামাটা বিপর্যয় কি ? এই বিপর্যয়ের কারণ কি ?

1953-1960 সালের মধ্যে জাপানের সমুদ্র উপকূলবর্তী মিনামাটা অঞ্চলে পারদ সংক্রমিত মাছ খাওয়ার ফলে 100 জন মানুষ মারা যায় ও কয়েক হাজার মানুষ চিরকালের মত পঙ্গু হয়ে যায়। এছাড়া নবজাতক শিশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়।

পরিবেশে জলদূষণের ফল কি মারাত্মক ধরনের হতে পারে মিনামাটার ঘটনা তা প্রমাণ করে। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পর প্রমাণিত হয় মিনামাটার এক রাসায়নিক কোম্পানীর নিসৃঃত বর্জ্য দ্বারা সমুদ্রের জল দূষিত হয়েছিল। ঐ কোম্পানীর নিঃসৃত বর্জ্য পদার্থে পারদ ছিল। সমুদ্রজলের পারদ জলজ খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করে। পারদ সংক্রমিত সেই মাছ খাওয়ার ফলে ঐ অঞ্চলের মানুষদের সেই রোগ দেখা দিয়েছিল।

চের্নোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনা সম্পর্কে যাহা জান লেখ। এতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃতি বর্ণনা কর।

পারমাণবিক দুর্ঘটনার ইতিহাসে রাশিয়ায় চের্নোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রের দুর্ঘটনা অন্যতম। 1986 সালের 28 শে এপ্রিল রাশিয়ার ইউক্রেনে চের্নোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক চুল্লীকে ঘিরে রাখা 4000 টনের ইস্পাতের কাঠামো ভেঙে যায়। পারমাণবিক চুল্লীর অভ্যন্তরস্থ তাপমাত্রা বেড়ে 2000 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড হয়। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ নিঃসৃত ধোঁয়ার মত পারমাণবিক বিস্ফোরণে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় ভস্ম আকাশে বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে।

রাশিয়া, ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত হয়। ধারণা করা হয় চের্নোবিল দুর্ঘটনায় 2000 লোকের মৃত্যু হয়েছিল, (যদিও সরকারী তথ্য অনুসারে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা মাত্র 2 জন।) বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুসারে চের্নোবিলের পারমাণবিক দুর্ঘটনার প্রভাব পরিবেশে কয়েক দশক ধরে দেখা দেবে।

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post