উনিশ শতকে বাংলা তথা ভারতে সমাজ ও ধর্মসংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা আলোচনা করো।

উনিশ শতকে বাংলা তথা ভারতে সমাজ ও ধর্মসংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা

সমাজ ও ধর্ম সংস্কারে রাজা রামমোহন রায় —

ভূমিকা : রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩ খ্রি.) ছিলেন উনিশ শতকে বাংলা তথা ভারতের এমনই অনন্য প্রতিভাধর একজন মনীষী। তাঁকে ‘ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত’ বলা হয়। তিনিই প্রথম তাঁর যুক্তিবাদী মন ও অসীম জ্ঞানের আলোতে সমকালীন ভারতীয় সমাজের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও দোষত্রুটিগুলি দূর করার চেষ্টা করেন। তিনি ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তখন থেকেই তাঁর সমাজ ও ধর্মসংস্কার আন্দোলন শুরু হয়।

[1] সামাজিক ও ধর্মীয় কুপ্রথা : রামমোহন হিন্দুসমাজে প্রচলিত বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কন্যাপণ প্রভৃতি কুপ্রথার বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, হিন্দুধর্মের জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, পৌত্তলিকতা, বহু দেবতার পূজা, ব্রাহ্মণবাদ, পুরোহিততন্ত্র, সতীদাহ, গঙ্গাজলে সন্তান বিসর্জন, অর্থহীন ধর্মীয় রীতিনীতি প্রভৃতি প্রথা হিন্দু ধর্মকে কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রেখেছে। তিনি এসব কুপ্রথার প্রতিবাদে সরব হন।

[2] একেশ্বরবাদের প্রচার : রামমোহন রায় প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্র থেকে প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। একেশ্বরবাদী নিরাকার ব্রহ্মার আরাধনাই হিন্দুধর্মের মূল কথা। তিনি একেশ্বরবাদের সমর্থনে ‘তুহাফৎ-উল-মুয়াহিদ্দিন নামে ফারসি ভাষায় একটি পুস্তিকা রচনা করেন এবং পাঁচটি প্রধান উপনিষদের বাংলা অনুবাদ করেন।

[3] আত্মীয় সভা ও ব্রাসভা প্রতিষ্ঠা : রামমোহন কলকাতায় তাঁর বন্ধু ও অনুগামীদের নিয়ে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেন। একেশ্বরবাদের প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এর নাম হলো ব্রাহ্মসমাজ।

[4] সতীদাহ প্রথা : ভারতীয় হিন্দুসমাজে সতীদাহ নামে এক কুপ্রথার প্রচলন ছিল। এই প্রথা অনুসারে স্বামীর মৃত্যুর পর তার জীবিত স্ত্রীকে স্বামীর সঙ্গে জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা হত। রামমোহন এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। শেষপর্যন্ত তাঁর সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতায় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে আইনের মাধ্যমে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

[5] শিক্ষাসংস্কার : রামমোহন উপলব্ধি করেছিলেন যে, আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ না করলে ভারতীয়দের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। এজন্য তিনি লর্ড আমহার্স্টকে লেখা এক পত্রে (১৮২৩ খ্রি.) ভারতীয়দের ইংরেজি, পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শন শিক্ষাদানের জন্য সরকারি অর্থব্যয়ের দাবি জানান। তিনি নিজে কলকাতায় একটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু কলেজ (১৮১৭ খ্রি.) প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে অনেকে মনে করেন। কলকাতায় জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন (১৮৩০ খ্রি.) প্রতিষ্ঠায় তিনি আলেকজান্ডার ডাফকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন।

[6] অন্যান্য সংস্কার : রামমোহন ভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন ও ভারতীয় সাংবাদিকতার অগ্রদূত ছিলেন। তিনি বিচারব্যবস্থার দুর্নীতি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, প্রশাসনে ভারতীয়দের নিয়োগে বঞ্চনা প্রভৃতির প্রতিবাদ করেন। কৃষকদের দুর্দশা মোচনেও তিনি চিন্তা করতেন। তিনি বাংলা ভাষায় ‘সম্বাদ কৌমুদী' এবং ফারসি ভাষায় ‘মিরাৎ-উল-আখবর' নামে সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। তিনি ছিলেন বাংলা গদ্যের জনক। ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ ও ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

উপসংহার : ভারতীয় সমাজ ও ধর্মের সংস্কারের কাজে রামমোহনের অবদানের মূল্যায়ন করতে গিয়ে পণ্ডিতগণ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়েছেন। আবার রামমোহনের জীবদ্দশাতে এবং পরবর্তীকালেও অনেকে তাঁর কঠোর সমালোচনা করেছেন। কিশোরীচাঁদ মিত্র, প্যারীচাঁদ মিত্র, আচার্য ব্রজেন্দ্রলাল শীল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধি—সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে 'ভারতপথিক' বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক দিলীপ কুমার বিশ্বাস আরও একধাপ এগিয়ে তাঁকে ‘বিশ্বপথিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করে লিখেছেন, “তোমার উপাধি রাজা। জড়ময় ভূমিখণ্ড তোমার রাজ্য নয়। তুমি একটি সুবিস্তর মন রাজ্য অধিকার করিয়া রাখিয়াছ।.... কেবল ভারতবর্ষীয়দের বন্ধু কেন, তুমি জগতের বন্ধু।”

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post