ইতিহাসের ধারণা বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন ও উত্তর (+ ১০ টি)

ইতিহাসের ধারণা বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন ও উত্তর + ১০ টি

ইতিহাসের ধারণা অধ্যায়ের বিশ্লেষণমূলক আরও ১০ প্রশ্ন ও উত্তর (প্রশ্নমান - ৪)


আধুনিককালে স্থাপত্যের ইতিহাসচর্চার পরিচয় দাও।

স্থাপত্যের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : প্রাচীন গুহামানব যেদিন ঘরবাড়ি তৈরি করতে শিখেছে, সেদিন থেকেই স্থাপত্যশিল্পের সূত্রপাত ঘটেছে। স্থাপত্যশিল্প ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

[1] স্থাপত্য নির্মাণ : অতীতে একসময় মূলত রাজা-মহারাজা ও ধনী ব্যক্তিরাই স্থাপত্য নির্মাণে আগ্রহ দেখাতেন। বর্তমান যুগে শাসকগোষ্ঠী ছাড়া অন্যান্য মানুষজনও স্থাপত্য নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত।

[2] স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাসচর্চা : স্থাপত্য নির্মাণের প্রেক্ষাপট, শিল্পরীতি, পৃষ্ঠপোষকতা প্রভৃতি বিষয়গুলি আধুনিক ইতিহাসচর্চায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপ, ভারত তথা বাংলার বিভিন্ন যুগের স্থাপত্যগুলি নিয়ে সাম্প্রতিককালে ইতিহাসচর্চায় স্থান পেয়েছে।

[3] ইতিহাসচর্চার সূচনা : ভারতে ঊনবিংশ-বিংশ শতকে স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত ঘটে। এক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন আলেকজান্ডার কানিংহাম, পার্সি ব্রাউন, জে ফার্গুসন, ক্যাথরিন অ্যাশার প্রমুখ।

[4] বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসচর্চা : বাংলার বিভিন্ন যুগের স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাস নিয়েও বিভিন্ন গবেষক চর্চা করেছেন এবং করছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জর্জ মিশেল, বিজয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শামসুন্নাহার লাভলী, ড. নাজিমুদ্দিন আহমেদ, রবিউল হুসাইন প্রমুখ।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় ফোটোগ্রাফির ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করো। অথবা, আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ফোটোগ্রাফির গুরুত্ব কী?

আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায়/ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ফোটোগ্রাফি

ভূমিকা : ক্যামেরার সাহায্যে কোনো ঘটনা বা বিষয়ের ছবি তোলার প্রক্রিয়া সাধারণভাবে ফোটোগ্রাফি বা আলোকচিত্র নামে পরিচিত। আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় বা ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ফোটোগ্রাফির ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। যেমন—

[1] তথ্য প্রদান : ক্যামেরায় তোলা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে থাকে। যেমন—জন মুরে, ফেলিক্স বিয়াতো, লাল দীনদয়াল প্রমুখ ফোটোগ্রাফারের তোলা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের বিভিন্ন ছবিগুলি মহাবিদ্রোহের ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতীয় কংগ্রেসের নানা অধিবেশনের ছবিগুলি সেকালের রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল রূপে বিবেচিত হয়।

[2] তথ্যকে সমর্থন : ফোটোগ্রাফ বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যকে আরও জোরালো করে তোলে। যেমন—১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায় তাকে আরও জোরালো করে তোলে সেই দাঙ্গার বিভিন্ন ছবিগুলি।

[3] তথ্যের যথার্থতা : কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে লোকমুখে বহু গুজব বা ভ্রান্ত তথ্য ঘুরে বেড়ালেও সেই ঘটনার বিষয়ে ক্যামেরায় তোলা ছবি থেকে যথার্থ ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। যেমন—দেশভাগ (১৯৪৭ খ্রি.), পরবর্তী উদ্বাস্তুদের জীবন-যন্ত্রণার ভয়াবহতা কোনো কোনো রাজনীতিক খাটো করে দেখাতে চাইলেও সমকালীন ফোটোগ্রাফগুলি সেই ভয়াবহতার প্রমাণ দেয়।

[4] সাবধানতা : ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ফোটোগ্রাফ ব্যবহারের সময় যথেষ্ট সচেতন থাকা উচিত। কেন-না, ফোটোগ্রাফার অনেকসময় নিজের দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ রাখার উদ্দেশ্যে বা প্রকৃত ঘটনা থেকে পৃথক ছবি তুলে নতুন কিছু দেখানোর উদ্দেশ্যে বিশেষ বিশেষ কিছু ছবি তুলতে পারেন। সে ছবি ইতিহাসের প্রকৃত তথ্য না-ও দিতে পারে। যেমন—১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম লিগ পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে তোলা ছবিতে জিন্না ও গান্ধিজির আন্তরিক সুসম্পর্ক ধরা পড়ে। কিন্তু এই ‘সুসম্পর্ক’ কতটা বাস্তব ছিল তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

দৃশ্যশিল্পের ক্ষেত্রে ছবি আঁকা ও ফোটোগ্রাফির ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

ছবি আঁকা ও ফোটোগ্রাফির ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : দৃশ্যশিল্পের অন্তর্গত চিত্রশিল্পের দুটি উল্লেখযোগ্য ধারা হল ছবি আঁকা এবং ফোটোগ্রাফি। শিল্পীরা রং-তুলির সহায়তায় কোনো দৃশ্য বা বিষয়ের ছবি আঁকেন, আর ফোটোগ্রাফার তাঁর ক্যামেরার সাহায্যে কোনো দৃশ্যের ছবি তোলেন।

[1] ছবি আঁকা : মানবসমাজে সুপ্রাচীনকালেই ছবি আঁকার সূত্রপাত ঘটে। চিত্রকররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমকালীন কোনো বিষয়ের ছবি এঁকে থাকেন। তবে সেই ছবিতে শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পড়লেও ছবির বিষয়বস্তু যে তথ্যনিষ্ঠ হয়ে থাকে তা পণ্ডিতরা স্বীকার করেন। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত এরূপ অসংখ্য ছবি সমকালীন ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

[2] ছবি আঁকার ইতিহাসচর্চা : বিভিন্ন পণ্ডিত আধুনিককালে ছবি আঁকার ইতিহাসচর্চা করে চলেছেন। এই চর্চার ক্ষেত্রে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাকার্য হল অশোক মিত্র রচিত ‘ভারতের চিত্রকলা’, ড. নীলিমা আফরিন রচিত ‘বাংলাদেশের শিল্পকলার উৎস সন্ধান', সৈয়দ লুৎফল হক রচিত ‘চিত্রকলা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ প্রভৃতি।

[3] ফোটোগ্রাফি : ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্ডার ওয়ালকট ক্যামেরা আবিষ্কারের পর থেকে ক্যামেরার সাহায্যে ছবি তোলা অর্থাৎ ফোটোগ্রাফি চর্চার বিষয়টি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধারণ ক্যামেরায় সাদা-কালো ও রঙিন ছবির যুগ পেরিয়ে বর্তমানে ডিজিট্যাল ক্যামেরায় উন্নতমানের ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছে। ফোটোগ্রাফাররা ক্যামেরার সাহায্যে কোনো ঘটনা বা বিষয়ের যথার্থ ছবি তোলেন যা পরবর্তীকালে ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজে লাগে।

[4] ফোটোগ্রাফির ইতিহাসচর্চা : বর্তমানকালে বিভিন্ন গবেষক ফোটোগ্রাফি নিয়ে ইতিহাসচর্চা করছেন। এই বিষয়ে এ কে এম মহসীন, মহম্মদ হুমায়ুন কবীর, জন ওয়েড, আর ডগলাস নিকেল প্রমুখ গবেষণা করেছেন।

বিভিন্ন দেশে যানবাহন-যোগাযোগ সম্পর্কে আলোচনা করো।

যানবাহন-যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব

ভূমিকা : প্রাচীনকালে ঢাকার আবিষ্কার থেকে শুরু করে আধুনিককালে জাহাজ, মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, আকাশযান, এমন কী অতি সাম্প্রতিককালে ইনটারনেট যোগাযোগব্যবস্থার প্রবর্তন বিভিন্ন দেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।

[1] আধুনিকতা : আধুনিক ইউরোপে যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সেখানকার সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতি ঘটাতে সহায়তা করেছে। ভারতে লর্ড ডালহৌসি ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে রেলপথের সূচনা করলে এদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার যে অগ্রগতি ঘটে তা ভারতে ‘আধুনিকীকরণের যুগের’ সূত্রপাত ঘটায় বলে কেউ কেউ মনে করেন।

[2] জাতীয় ঐক্য : রেলব্যবস্থা, ডাক যোগাযোগ, টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা প্রভৃতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সেখানকার জাতীয় ঐক্য ও জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করেছে। রেলব্যবস্থা অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরিতে জাতীয় ঐক্য বৃদ্ধি করে জাতিগঠনে সহায়তা করেছে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। রেলপথ প্রসারের পর ভারতীয় বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথ সুগম হয়েছিল।

[3] অর্থনৈতিক অগ্রগতি : রেলপথ, সড়কপথ, জলপথ প্রভৃতি ব্যবস্থার অগ্রগতি বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। রেলপথ ইউরোপে শিল্পবিপ্লব ঘটাতে সহায়তা করেছে।

[4] সাম্রাজ্যবাদী শোষণ : ঊনবিংশ শতকে রেলসহ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সহায়তায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি এশিয়া ও আফ্রিকার পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন দেশের অর্থসম্পদ শোষণ করতে শুরু করে। ব্রিটিশরা রেলের মাধ্যমে ভারত থেকে সস্তায় শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ করে এবং বিদেশে উৎপাদিত শিল্পজাত পণ্য ভারতের সর্বত্র পৌঁছে দেয়।

[5] বিশ্বায়ন : বিংশ শতকে আকাশপথে এবং সাম্প্রতিককালে ইনটারনেটের মাধ্যমে ই-মেল, মেসেজিং, টুইটার, ফেসবুক, হোয়াট্স অ্যাপ প্রভৃতি যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার ঘটায় সমগ্র বিশ্ব যেন একটি ছোটো ‘বিশ্ব গ্রাম’ বা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এ পরিণত হয়েছে।

যানবাহন যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়ে ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

যানবাহন-যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রাচীনকাল থেকেই সভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আসছে। প্রাচীনকালে চাকার আবিষ্কার থেকে শুরু করে হাল আমলের ইনটারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। এই ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশের ইতিহাসকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।

[1] ইউরোপে প্রভাব : আধুনিক যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ইউরোপের ইতিহাসকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। জাতীয় ঐক্য বৃদ্ধি, শিল্পবিপ্লব প্রভৃতি ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

[2] ভারতে প্রভাব : আধুনিক যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে ভারতের রেল, সড়ক, ডাক প্রভৃতি ব্যবস্থা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও ঐক্য বৃদ্ধি করে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়েছে। এর দ্বারাই ব্রিটিশ শক্তি নির্বিচারে ভারতীয় অর্থসম্পদ লুণ্ঠন করেছে। আবার রেলপথ ব্যবহার করে ভারতে বিপ্লবী কার্যকলাপ, বিপ্লবীদের পলায়ন প্রভৃতিও সম্ভব হয়।

[3] অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা : সাম্প্রতিককালে ইনটারনেট সমগ্র বিশ্বে নিমেষে যোগাযোগ স্থাপন করার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে আজ সমগ্র বিশ্ব যেন ঘরের দোরগোড়ায় চলে এসেছে। এখন যে-কোনো তথ্য বা খবর নিমেষে বিশ্বের যে-কোনো প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ায় এর দ্বারা বিশ্ব ইতিহাস যথেষ্ট প্রভাবিত হচ্ছে।

[4] যানবাহন-যোগাযোগের ইতিহাসচর্চা : বিংশ শতকে যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসচর্চা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। এই বিষয়ে জন আর্মস্ট্রং, ইয়ান কের, সুনীল কুমার মুন্সি, গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের, আর আর ভাণ্ডারী প্রমুখ আলোচনা।

[5] ইনটারনেট যোগাযোগের ইতিহাসচর্চা : সম্প্রতি ইনটারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে নানা গবেষণার কাজ চলছে। এই বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন প্রকাশ চক্রবর্তী, ফ্রেডরিখ কিটলার, নারায়ণ চন্দ্র বসাক, প্রশান্ত রায় প্রমুখ।

শহরের ইতিহাস ও এই বিষয়ে ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

শহরের ইতিহাস ও ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : কোনো ক্ষুদ্র ও জনবিরল পাড়া বা গ্রাম সময়ের ধারা বেয়ে কোনো একসময়ে ঘনবসতি পূর্ণ শহরে পরিণত হয়ে ওঠে। গ্রাম থেকে শহরের উদ্ভব, বিকাশ ও বিবর্তনের একটি অতীত ইতিহাস থাকে।

[1] শহরের ইতিহাসের গুরুত্ব : স্থানীয় ইতিহাসচর্চার মতো শহরের ইতিহাসচর্চাও অনেকটা ক্ষুদ্র অঞ্চল নিয়ে হয়ে থাকে। কিন্তু শহরগুলি কোনো বৃহৎ ভূখণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হয় ওঠায় দেশ বা জাতির ইতিহাসে শহরের ইতিহাসচর্চার বিশেষ গুরুত্ব থাকে। যেমন বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসচর্চায় কলকাতা শহরের উদ্ভব ও বিকাশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

[2] শহরের ইতিহাসের বিষয় : শহরের ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি হল শহরের আর্থসামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক চর্চা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, স্থাপত্য-ভাস্কর্য, শিল্প-সংস্কৃতি, ধর্ম, নগরায়ণ প্রক্রিয়া প্রভৃতি।

[3] ইউরোপে ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত : বিংশ শতকের প্রথমার্ধে শহরের ইতিহাসচর্চার প্রচলন থাকলেও এই বিষয়ে ইতিহাসচর্চায় গতি আসে ১৯৭০-এর দশকে। এই সময়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন থার্নস্টর্মের নেতৃত্বে শহরের ইতিহাসচর্চার ধারাটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এডুইন বরোজ, মাইক ওয়ালেস, এস জি বেকল্যান্ড, রোনাল্ড টেলর প্রমুখ এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন।

[4] ভারতে ইতিহাসচর্চা : ভারতীয় গবেষকদের মধ্যে নারায়ণী গুপ্তা দিল্লি নিয়ে, রীনা ওল্ডেনবার্গ লখনউ দিয়ে, ক্রিস্টিন ডবিন মুম্বই নিয়ে, যতীন্দ্রমোহন রায় ঢাকা নিয়ে, রাধারমন মিত্র কলকাতা নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন। শহরের ইতিহাসচর্চা নিয়ে বাংলায় যাঁরা গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে রাধারমন মিত্র, ড. সৌমিত্র শ্রীমানী, বিজয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মুনতাসীর মামুন, যতীন্দ্রমোহন রায় ও শামসুদ্দোহা চৌধুরী উল্লেখযোগ্য।

সামরিক ইতিহাস ও এই বিষয়ে ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

সামরিক ইতিহাস ও ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সভ্যতা, রাষ্ট্র ও রাজনীতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে অন্যতম সহায়ক উপাদান ছিল সামরিক শক্তি। যুদ্ধের জন্য সামরিক শক্তি অপরিহার্য ছিল।

[1] পরিবর্তন : নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিটি দেশ, জাতি ও সভ্যতায় সামরিক কাঠামো, যুদ্ধাস্ত্র প্রভৃতির ধারাবাহিক পরিবর্তন ঘটেছে। সামরিকবাহিনীতে পদাতিক, রথ বা হস্তিবাহিনীর পরিবর্তে বর্তমানে ট্যাংক বা সাঁজোয়াবাহিনী, বিমানবাহিনী প্রভৃতি এবং তিরধনুক, তরবারি প্রভৃতির পরিবর্তে কামান, বন্দুক, বোমা, বিষাক্ত গ্যাস প্রভৃতির প্রচলন হয়েছে।

[2] সামরিক ইতিহাসচর্চার প্রসার : ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত ঐতিহাসিকদের যুদ্ধ-সংক্রান্ত আলোচনা যুদ্ধের কারণ ও ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানকালে এই ধারার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে যুদ্ধাস্ত্র, সামরিক সজ্জা, রণকৌশল, সামরিক পোশাক প্রভৃতি খুঁটিনাটি বিষয়ও ইতিহাসচর্চার মধ্যে প্রবেশ করেছে।

[3] ইউরোপে সামরিক ইতিহাসচর্চা : বিংশ শতকে ইউরোপে সামরিক ইতিহাসচর্চার প্রসার ঘটে। বার্নেট, কোরেলি, শেলফোর্ড বিডওয়েল, জন টেরাইন প্রমুখ প্রাচীন ও আধুনিক যুদ্ধবি তুলনামূলক গবেষণা করেছেন। রজার স্পিলার, জন হোয়াইট ক্লে প্রমুখ যুদ্ধ ও যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত নানা কিংবদন্তিদের নিয়ে গবেষণা করেছেন।

[4] ভারতে সামরিক ইতিহাসচর্চা : ভারতে বিগত শতকে সামরিক ইতিহাসচর্চা শুরু হয়। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, সুরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন। এ ছাড়া রবার্ট আর্ম, সুবোধ ঘোষ, দীপ্তনীল রায়, নিখিলেশ ভট্টাচার্য প্রমুখ এবিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিককালে সামরিক ইতিহাসচর্চায় কৌশিক রায় অগ্রগণ্য নাম।

জেনে রাখো —
সাম্প্রতিককালে সামরিক ইতিহাসচর্চার একজন খ্যাতনামা গবেষক হলেন কৌশিক রায়। তাঁর লেখা 'ফ্রম হিদাসপিস টু কার্গিল : এ হিস্ট্রি অব ওয়ারফেয়ার ইন ইন্ডিয়া ফ্রম ৩২৬ বিসি টু ১৯৯৯ এডি’, ‘দ্য আর্মি ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’, ‘ওয়ার অ্যান্ড সোসাইটি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া', ‘দ্য ইন্ডিয়ান আর্মি ইন দ্য টু ওয়ার্ল্ড ওয়ার্স’, ‘দ্য আর্মড ফোর্সেস অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিয়া ১৯৪৭-২০০৬', ‘মিলিটারি ট্রানজিশন ইন আর্লি মডার্ন এশিয়া ১৪০০-১৭৫০', ‘ওয়ার অ্যান্ড স্টেট-বিল্ডিং ইন আফগানিস্তান’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

সাম্প্রতিককালে পরিবেশের ইতিহাসচর্চার বিকাশ ও অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা করো।

পরিবেশের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত পরিবেশ নিয়ে মানুষের ভাবনাচিন্তা ছিল যথেষ্ট কম। কিন্তু মানুষ যেভাবে পরিবেশের ধারাবাহিক ক্ষতি করে চলেছে তাতে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব আজ সংকটের মুখে পড়েছে।

[1] পরিবেশের ধ্বংসসাধন : আধুনিককালে যুদ্ধে বিভিন্ন ভয়ানক মারণাস্ত্র ব্যবহার, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার, গাছপালা কেটে আধুনিক নগর ও শিল্পসভ্যতার প্রসার প্রভৃতির ফলে আমাদের চারিদিকের পরিবেশ ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

[2] দূষণ : জল, বায়ু, খাদ্য, শব্দ প্রভৃতি দূষণ বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, দূষণের মাত্রা এরূপ হারে বাড়তে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষ তথা জীবকুলের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ লুপ্ত হতে পারে।

[3] আন্দোলন : পরিবেশের ধ্বংসসাধন ও দূষণের সম্পর্কে মানুষ ক্রমাগত সচেতন হয়ে উঠেছে। শুরু হয়েছে পরিবেশবাদী নানা আন্দোলন। ভারতে চিপকো আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, তেহরি-গাড়োয়াল আন্দোলন প্রভৃতি পরিবেশবাদী আন্দোলন যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে।

[4] ইউরোপে পরিবেশের ইতিহাসচর্চা : সাম্প্রতিককালে ইউরোপে পরিবেশের ইতিহাসচর্চার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে। এই বিষয়ে ইউরোপের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা কর্ম হল র‍্যাচেল কারসন রচিত 'সাইলেন্ট স্প্রিং', আলফ্রেড ক্রসবি রচিত ইকোলজিক্যাল ইম্পিরিয়ালিজম', রিচার্ড গ্রোভ রচিত ‘গ্রিন ইম্পিরিয়ালিজম' প্রভৃতি।

[5] ভারতে ও বাংলায় পরিবেশের ইতিহাসচর্চা : পরিবেশের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিককালে ভারতে এবং বাংলায়ও যথেষ্ট চর্চা হচ্ছে। ইরফান হাবিব, ড. মণীষ প্রধান, সুধাংশু পাত্র, অশোক কুমার বসু, তরুন সরকার, অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শমিত কর, সাহিদা বেগ এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন।

সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত ও প্রসার সম্পর্কে আলোচনা করো।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : আদিম মানুষ যখন চাকার আবিষ্কার করেছে বা পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছে তখন থেকেই বিজ্ঞানপ্রযুক্তির পথচলা শুরু হয়েছে বলে ধরা যায়। সেই সময় থেকে বিবর্তনের পথ বেয়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আজ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছে।

[1] প্ৰাচীনযুগে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি : প্রাচীনকালে মিশর, ব্যাবিলন, গ্রিস, ভারত প্রভৃতি দেশে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রগতি খুব ধীরগতিতে হয়েছিল। তবে মধ্যযুগে এসে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে কৃষি, যুদ্ধাস্ত্র প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে।

[2] আধুনিকযুগে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি : আধুনিককালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা, কৃষি, শিল্প, যুদ্ধসহ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় চূড়ান্ত বিকাশ লক্ষ করা যায়।

[3] ভৌগোলিক আবিষ্কার ও শিল্পবিপ্লব : পঞ্চদশ শতকে স্পেন, পোর্তুগাল, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের জাহাজ নির্মাণশিল্পে অগ্রগতি, পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড-সহ

ইউরোপের অন্যান্য দেশে সংঘটিত শিল্পবিপ্লব আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি সারা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে।

[4] ইতিহাসচর্চা : বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম হল জে ডি বার্নাল রচিত ইতিহাসে বিজ্ঞান’, টমাস কুহন রচিত ‘দ্য স্ট্রাকচার অব সায়েন্টিফিক রেভোলিউশনস্’, ডেভিড আরনল্ড রচিত ‘সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড মেডিসিন ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রচিত ‘এ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান ও সমাজ’ এবং ‘প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’, দীপক কুমার রচিত ‘সায়েন্স অ্যান্ড দ্য রাজ’, তপন চক্রবর্তী রচিত ‘শতবর্ষে বাঙালির বিজ্ঞানসাধনা' প্রভৃতি।

সাম্প্রতিককালে চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসচর্চার পরিচয় দাও।

চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাচীনকালেই চিকিৎসাবিদ্যার সূত্রপাত ঘটেছে। প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ পেরিয়ে চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

[1] বিবর্তন : প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন যুগে চিকিৎসাবিদ্যার নানা পরিবর্তন, উন্নতি ও বিবর্তন ঘটেছে। ফলে আয়ুর্বেদিক, কবিরাজি, হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি, আকুপাংচার প্রভৃতি চিকিৎসাবিদ্যার নানা শাখার উদ্ভব ঘটেছে।

[2] ভারতে অগ্রগতি : ভারতে প্রাচীনকাল থেকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল বলে জানা যায়। কুষাণ যুগ, গুপ্ত যুগ এবং তার পরবর্তীকালে বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ভারতীয় চিকিৎসকদের নাম জানা যায়। তবে মধ্যযুগে এসে ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি থমকে যায়।

[3] প্রাচ্যে পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যা : আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতি প্রথম ইউরোপে শুরু হয়। ইউরোপের বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে তা প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে মধ্যযুগীয় পিছিয়ে পড়া চিকিৎসাবিদ্যা ঔপনিবেশিক আমলে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।

[4] ইতিহাসচর্চা : সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দেশে চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসচর্চা যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই বিষয়ে ইতিহাসচর্চার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘প্রাচীন ভারতে চিকিৎসাবিজ্ঞান’, পার্থসারথি চক্রবর্তী রচিত ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের আজব কথা’, তপন চক্রবর্তী রচিত ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস’ প্রভৃতি।

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post