জ্ঞানচক্ষু (আশাপূর্ণা দেবী) বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর

জ্ঞানচক্ষু (আশাপূর্ণা দেবী) বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন

জ্ঞানচক্ষু (আশাপূর্ণা দেবী) বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (প্রশ্নমান - ৫)

১. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন কীভাবে হয়েছে তা বর্ণনা করো।

তপনের কাছে লেখকরা ছিল স্বপ্নজগতের মানুষ | তার লেখক ছোটোমেসোকে সে দেখে এবং তাঁর আচার-ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে তপন বুঝল লেখকরা সাধারণ মানুষের মতোই। সেই মুহূর্তে তার জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল। যদিও জ্ঞানচক্ষুর প্রকৃত উন্মীলন হল আরও পরে।

তপনের সারা দুপুর বসে লেখা গল্পটা তার ছোটোমাসি একরকম জোর করেই তার মেসোকে দেখায়, ছোটোমেসো সেই লেখার প্রশংসাও করেন । কিন্তু পাশাপাশি এ কথাও বলেন যে গল্পটার একটু সংশোধনের দরকার। ছোটোমেসো সেই লেখা ছাপানোর ব্যবস্থাও করে দেবেন বলে কথা দেন | তপন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখবে বলে।

‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় সত্যিই তার লেখা প্রকাশিত হয়। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে তপন এক অদ্ভুত আনন্দ অনুভব করে। কিন্তু লেখাটা পড়তে গিয়ে সে ছাপার অক্ষরে লেখার সঙ্গে নিজের লেখাটির কোনো মিল দেখতে পায় না। পুরো লেখাটা আগাগোড়াই তার মেসোমশাইয়ের সংশোধন করা | দুঃখে, লজ্জায়, অপমানে তপন ভেঙে পড়ে। এবার যেন প্রকৃতই তার অন্তর্দৃষ্টির জাগরণ হয়| তপন সংকল্প করে নিজের লেখা ছাপতে হলে সে নিজে গিয়েই তা ছাপতে দেবে, অন্যের দাক্ষিণ্য গ্রহণ করবে না।

২. ‘লেখার প্রকৃত মূল্য বুঝলে নতুন মেসোই বুঝবে”- এ কথা কার, কেন মনে হয়েছিল তা আলোচনা করো।

আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের মনের সুপ্ত ইচ্ছেই ছিল লেখককে সামনে থেকে দেখার। সে ভাবত লেখকরা হয়তো অন্য কোনো জীব, তাঁরা সাধারণ মানুষ নন। তপনের নতুন মেসোমশাই কলেজের অধ্যাপক এবং লেখক। তিনি অনেক বই লিখেছেন আর সেইসব বই ছেপেও বেরিয়েছে | মেসোমশাই যেহেতু লেখালেখি করেন তাই তিনি যে-কোনো গল্প বা যে-কোনো লেখার মূল্য অন্য সকলের থেকে বেশি বুঝবেন বলেই তপনের ধারণা ছিল।

তপন এক দুপুরবেলায় বসে একটা গোটা গল্প লিখে ফেলে। আস্ত একটা গল্প লিখে প্রথমে সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু সেই গোটা গল্পটা লিখেছে দেখে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। গল্পটা সে প্রথমে শোনায় ছোটামাসিকে, কারণ তপনের ছোটোমাসি ছিল তার বন্ধুর মতো। ছোটোমাসি তার লেখাটা দেখে সেটা ছোটোমেসোকে দেখায়, মুখে কিছুটা লজ্জাবশত অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও মনে মনে তপন এটাই চেয়েছিল, কারণ হয়তো সবাই লেখাটা পড়বে, কিন্তু লেখার গুণগত মান বা লেখার প্রকৃত মূল্য, তপনের মতে, একমাত্র তার ছোটোমেসোমশাই বুঝবেন। কারণ তিনি নিজে একজন লেখক | আর একজন লেখকই আর একজন লেখকের লেখার মূল্য বুঝতে পারে।

৩. নিথর দুপুরবেলায় তপন কী করেছিল আর তারপর কী ঘটনা ঘটেছিল সংক্ষেপে লেখো।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপন এক নিথর দুপুরবেলায় তার হোমটাস্কের খাতায় একটা গোটা গল্প লিখে ফেলে | গল্প লেখার পর আনন্দে আর রোমাঞ্চে তার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে তার লেখা গল্প প্রথম শোনায় তার ছোটোমাসিকে | ছোটোমাসি তার গল্পটা পড়ে একপ্রকার জোর করেই ছোটোমেসোর হাতে সেটি দিয়ে দেয় এবং গল্পপ্রকাশের অনুরোধও করে। ছোটোমেসো গল্পটা পড়ে কিছু সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। পাশাপাশি এটাও বলেন যে তার বয়সি ছেলেরা হয় রূপকথা, না হয় অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে গল্প লেখে | তাই ভরতি হওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তপনের লেখা গল্প প্রশংসার যোগ্য | তারপর তিনি তপনকে কথা দেন যে তার লেখা গল্প ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থাও করে দেবেন।

মেসোমশাই তাঁর কথা রাখেন। তিনি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় লেখা ছাপান এবং সেটা তপনকে দেখানোর জন্য নিয়ে আসেন | কিন্তু তপন সেই লেখা মা-কে পড়ে শোনাতে গিয়ে দেখে তার হাতে লেখা গল্পের সঙ্গে ছাপার অক্ষরে লেখার কোনো মিল নেই, তা পুরোপুরি মেসোমশাইয়ের পাকা হাতের লেখা। নিজের নামে অন্যের লেখা পড়তে গিয়ে লজ্জায়, অপমানে সে ভেঙে পড়ে এবং সংকল্প করে যদি কখনও নিজের লেখা ছাপতেই হয় তাহলে নিজে গিয়ে সেটা ছাপতে দেবে| কারও ভরসায় সে আর থাকবে না।

8. “লেখার পর যখন পড়ল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তপনের”।—কোন্ লেখার কথা এখানে বলা হয়েছে? সেই লেখা পড়ে তপনের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার কারণ কী?

তপনের ছোটোমেসো তার প্রথম লেখা গল্পটি নিয়ে গিয়েছিলেন ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার জন্য | সেই থেকে তপনের উৎসাহ বেড়ে যায়। এই উৎসাহে সে তিনতলার ঘরে একাসনে বসে আরও গল্প লিখে ফেলে। এখানে এই গল্পটির কথাই বলা হয়েছে।

• নতুন মেসোকে দেখে তপনের গল্প লেখার উৎসাহ বেড়ে গিয়েছিল। আগে সে ধারণা করত, লেখকরা তাদের মতো সাধারণ মানুষ নন, অন্য কোনো অলৌকিক জগতের মানুষ। কিন্তু নতুন মেসোকে দেখে তার ধারণা পরিবর্তিত হয়। তখন লেখক হতে তার কোনো বাধা থাকে না। সেই প্রেরণায় হোমটাস্কের খাতা নিয়ে সে তিনতলার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যায় | তারপর একান্তে বসে লিখে ফেলে গোটা একটি গল্প | মা যেমন সন্তানকে দেখে খুশি হয়, তপনও তেমনি তার সৃষ্টিতে উল্লসিত হয়েছিল। যখন সে সেটি আগাগোড়া পড়ে ফেলল তখন তার শরীরে একটা শিহরন খেলে যায় । তপন ভাবতেই পারেনি এত সুন্দর গল্প সে লিখতে পারবে। নিজস্ব ভাব ও ভাবনার বাণীমূর্তি দেখে তার গায়ে তখন কাঁটা দিয়ে ওঠে।

৫. “তপন কৃতার্থ হয়ে বসে বসে দিন গোনে।” কী কারণে তপন দিন গুনছিল ? তার দিন গোনার ফল কী হয়েছিল?

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের লেখা গল্পটি পড়েন তার লেখক ছোটোমেসোমশাই | সবার সামনে তিনি তপনের লেখার বিষয় নির্বাচনের প্রশাংসা করেন। সবশেষে তিনি লেখাটি ছাপানোর আশ্বাস দিয়ে সেটি নিয়ে চলে গেলে তপনের আহ্লাদের অন্ত থাকে না। মেসোর ক্ষমতার প্রতি অগাধ আস্থাবান তপন পত্রিকায় নিজের লেখা দেখাবার প্রতীক্ষায় অধীর হয়ে দিন গুনতে থাকে।

● একসময় তপনের প্রতীক্ষার অবসান হয়। সে ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকাটি হাতে পায়| লেখকসূচিতে নিজের নাম এবং গল্পের শিরোনাম দেখে তপন শিহরিত হয়। কিন্তু মা-কে গল্পটি পড়ে শোনাতে গিয়ে সে দেখতে পায়, তার মেসোমশাই পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী লেখার ‘কারেকশান’ করতে গিয়ে আদ্যোপান্ত লেখার খোলনলচে বদলে ফেলেছেন। গোটা গল্পের একটি বাক্যও সে চিনতে পারে না এবং ক্রমশ উপলব্ধি করে মেসোমশাই শুধু গল্পটি প্রকাশের ব্যবস্থাই করেননি, আদতে গোটা গল্পটিই তাঁর লেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কৃতিত্বের কোনো অংশই তপনের নিজের প্রাপ্য নয়। গভীর দুঃখে ভেঙে পড়লেও তপন সেই মুহূর্তেই প্রতিজ্ঞা করে, যে, এরপর লেখা ছাপতে দিলে সে নিজেই কাঁচা হাতে সেটা লিখবে এবং নিজে গিয়ে প্রকাশকের দপ্তরে লেখাটি দিয়ে আসবে।

৬. “সত্যিই তপনের জীবনে সবচেয়ে সুখের দিনটি এল আজ?” -কোন্ দিনটির কথা এখানে বলা হয়েছে? দিনটি সম্পর্কে এই উচ্ছ্বাসের কারণ লেখো।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের তপন তার নতুন মেসোর মাধ্যমে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় একটি গল্প পাঠিয়েছিল। গল্পটি ছাপার অক্ষরে দেখার প্রত্যাশায় তপন দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকে | তারপর একদিন ছোটোমাসি আর মেসো তাদের বাড়ি বেড়াতে আসেন। মেসোর হাতে ‘সন্ধ্যাতারা’ দেখে চমকে ওঠে তপন | এখানে মেসোর আগমনের এই বিশেষ দিনটির কথাই বলা হয়েছে।

● লেখক ছোটোমেসোমশাই তপনের গল্পটিকে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপিয়ে দেবেন বলে জানান। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর সে একপ্রকার নিশ্চিত হয়েছিল যে, গল্পটি আর ছাপা হবে না। তাই ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকা হাতে নিয়ে ছোটোমাসি আর মেসোকে আসতে দেখে তার বুকের রক্ত চলকে ওঠে। স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশা আর ব্যর্থতার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো সে দুলতে থাকে। জীবনের প্রথম লেখা, সর্বোপরি কাঁচা হাতের লেখা সত্যিই ছাপা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তার মনে সংশয় দেখা দেয় | যদি সত্যিই ছাপা হয় তাহলে দিনটি তপনের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। অপ শিত সাফল্য ব্যক্তি মনে সংশয় আনে। তাই দিনটি সম্পর্কে একটি জিজ্ঞাসার অবতারণা করা হয়েছে।

৭. তপনের লেখক হওয়ার পিছনে তার ছোটোমাসির ভূমিকা কতখানি ছিল আলোচনা করো।

সূচনাপর্বে ভূমিকা : ছোটোমাসির বিয়ে হওয়ার পর নতুন মেসোমশাইকে দেখে লেখক সম্পর্কে তপনের ধারণা সম্পূর্ণ পালটে যায় | নতুন মেসো একজন লেখক এবং তিনি আর পাঁচজন মানুষের মতোই | এবার তপন নিশ্চিত হয় যে, তার পক্ষে লেখক হওয়ার পথে আর কোনো বাধা নেই | সুতরাং তপনের লেখক হওয়ার সূচনাপর্বটি তৈরি করে দিয়েছে তার মাসি এবং তার বিবাহ | তপনের লেখা নিয়ে তার মাসিই তাকে বেশি উৎসাহ দিয়েছে।

গল্প লেখা ও গল্পপ্রকাশে ভূমিকা : তপনের লেখা গল্পটা তার মাসিই নতুন মেসোকে দিয়ে বলেছে—“তা হলে বাপু তুমি ওর গল্পটা ছাপিয়ে দিও— মেসোর উপযুক্ত কাজ হবে সেটা।” আর একদিন দুপুরবেলা হোমটাস্কের খাতায় তপন আর একটি গল্প লিখে ফেলে প্রথমে মাসিকেই দেখায় |

মূল্যায়ন : ছোটোমাসিই তপনের চিরকালের বন্ধু—“বয়সে বছর আষ্টেকের বড়ো হলেও সমবয়সি, কাজেই মামার বাড়ি এলে সব কিছু ছোটোমাসির কাছে।” ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় মেসোর উদ্যোগে গল্প ছাপা হলে ছোটোমাসির মধ্যে আত্মপ্রসাদের প্রসন্নতা লক্ষ করা যায় | তাই বলা যায়, তপনের গল্প লেখার পিছনে তার ছোটোমাসির উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা ছিল অপরিসীম |

৮. “কিন্তু নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।”—কী কারণে এ কথা বলা হয়েছে? সত্যিই তার জ্ঞানচক্ষু খুলেছিল কি না আলোচনা করো।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে মামার বাড়িতে গিয়ে তপন তার নতুন মেসোমশাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়, যিনি আবার লেখক | লেখকরা কতটা সাধারণ মানুষদের মতো তা নিয়ে সন্দেহ ছিল তপনের | কিন্তু ছোটো মেসোকে দেখার পরে তার ভুল ভাঙে। তিনি ছোটোমামা বা মেজোকাকুর মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, থালা থেকে খাবার তুলতে বলেন, স্নানের সময়ে স্নান করেন, ঘুমানোর সময়ে ঘুমান, খবরের কাগজের সংবাদ নিয়ে তর্কে মাতেন এবং দেশ-বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে সিনেমা দেখতে চলে যান। বেড়াতে বেরোন সেজেগুজে। অর্থাৎ আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর কোনো পার্থক্যই নেই। এই সত্য উপলব্ধি করেই তপন মনে করেছিল যে তার জ্ঞানচক্ষু খুলে গিয়েছে।

●তপনের জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন সম্পূর্ণ হয় গল্পের শেষে। তার লেখা গল্পটি ছোটোমাসি জোর করেই ছাপানোর জন্য মেসোকে দিয়েছিল। কিন্তু ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরে দেখা যায়, লেখাটি সম্পূর্ণ পালটে গেছে। তার প্রত্যেকটি লাইন তপনের অপরিচিত । গভীর দুঃখ ও গ্লানিতে দগ্ধ হয়ে তপন সংকল্প করে যে এরপরে যদি লেখা ছাপাতে দিতে হয় তাহলে সে নিজের হাতেই তা দেবে। এভাবেই তার জ্ঞানচক্ষুর যথার্থ উন্মীলন ঘটে।

৯. “গল্প ছাপা হলে যে ভয়ঙ্কর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ খুঁজে পায় না।”—কার, কোন্ গল্প, কোথায় ছাপা হয়েছিল? গল্প ছাপা হলেও সে আহ্লাদ খুঁজে পায়নি কেন?

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের তপন একটি গল্প লিখেছিল। সেই গল্পটি তপনের নতুন মেসোর ফরমায়েশে ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

● তপন বয়সে কিশোর। তার নবীন আবেগের প্রকাশ ঘটে তার লেখা ‘প্রথম দিন’ নামক প্রথম গল্পতে । গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। মেসোর হাতে পত্রিকাটি দেখে বুকের রক্ত চলকে ওঠে তার | পত্রিকার সূচিপত্রে গল্পের ও নিজের নাম দেখেই তপনের মন নতুন আশায় জেগে ওঠে। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি | তপন গল্পটি পড়ে চমকে ওঠে। বাড়ির সকলেই বলে—“বারে, চমৎকার লিখেছে তো।” কিন্তু তপনের মেসোমসাই মৃদু হেসে বলেন—“একটু আধটু কারেকশান করতে হয়েছে অবশ্য | নেহাত কাঁচা তো।” তপনের মাসি ছাড়া বাড়ির আর কেউ তেমন বাহবা দেয়নি। বরং তার বাবা বলেন—“তা নইলে ফট করে একটা লিখল, আর ছাপা হলো”। অন্যদিকে তপনের মেজোকাকুর মন্তব্য—“তা ওরকম একটি লেখক মেসো থাকা মন্দ নয়। আমাদের থাকলে আমরাও চেষ্টা করে দেখতাম।” বাড়ির কর্তাস্থানীয় ব্যক্তিদের এইসব কথার মধ্যে একটা নিরুত্তাপ ঔদাসীন্য প্রচ্ছন্ন ছিল । আর ছিল তপনের লেখার প্রতি একটা সূক্ষ্ম শ্লেষ। এই কারণেই তপন অভিপ্রেত আহ্লাদটা খুঁজে পায় না।

১০. “তপনের মনে হয় আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন।”—তপনের এই মনে হওয়ার কারণ গল্পের কাহিনি অবলম্বনে আলোচনা করো।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তার নতুন মেসোমশাইকে দেখে লেখকদের সম্পর্কে তপনের কাল্পনিক ধারণা সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছিল। সে বিস্মিত হয়েছিল এই দেখে যে, লেখকরাও একেবারেই সাধারণ মানুষ | তখন তপনের মনেও লেখক হবার সাধ জেগে ওঠে এবং সে লিখে ফেলে তার জীবনের প্রথম গল্প | কৌশলে ছোটোমাসির হাত ঘুরে সে গল্প পৌঁছেও যায় মেসোমশাইয়ের কাছে | কিছু কারেকশনের কথা বললেও তপনের বিষয়ভাবনার মৌলিকতার কথা বলে সেটিকে ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন মেসোমশাই | শুরু হয় তপনের দিন গোনা। একসময় ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সেই লেখা—‘প্রথম দিন’। কিন্তু যা হতে পারত তপনের জীবনের ‘সবচেয়ে সুখের দিন’, তা-ই হয়ে যায় তার ‘সবচেয়ে দুঃখের দিন'। ছাপার অক্ষরে নিজের যে লেখা প্রকাশকে তার ‘অলৌকিক’ ঘটনা বলে মনে হয়েছিল তা-ই তাকে প্রায় বাক্যহীন করে দেয়। চারপাশে তপনের গল্পের প্রশংসার থেকেও মেসোর মহত্ত্ব আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অপমান তীব্র হয় যখন লেখাটি পড়তে গিয়ে তপন দেখে রচনার একটি লাইনও তার চেনা নয়—মেসোমশাই গল্পটিকে আগাগোড়াই কারেকশন করে দিয়েছেন। লেখক তপন হারিয়ে গিয়েছে সেই গল্প থেকে। চোখ জলে ভিজে যায় তপনের।

১১. “তার থেকে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের।” —দুঃখ আর অপমানের কারণ কী? এই দুঃখ আর অপমান দূর করতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কী সংকল্প গ্রহণ করেছিল? অথবা, দুঃখ আর অপমানের কারণ কী? এই দুঃখ আর অপমান থেকে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কী শিক্ষালাভ করেছিল?

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপন লেখক হতে চেয়েছিল। কিন্তু তার ধারণা ছিল লেখকরা সাধারণ মানুষ নন, আকাশ থেকে পড়া অতিলৌকিক কোনো প্রতিভা | তপনের এই ধারণা দূর হয় তার নতুন মেসোকে দেখে| এবার তপন লিখে ফেলে একটা গল্প। মেসো প্রতিশ্রুতি দেন ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় তিনি সেটা ছাপিয়ে দেবেন| কিন্তু ছাপানো গল্পটা পড়ে তপন হতবাক হয়ে যায় | গল্পের প্রতিটি লাইন নতুন, আনকোরা। তার মধ্যে তপন নিজেকে খুঁজে পায় না। তার মনে হয় লেখাটা তার নয়। নিজের লেখার আমূল পরিবর্তন দেখে তপন দুঃখিত হয় ও অপমানিত বোধ করে।

● দুঃখ আর অপমান থেকে তপন নতুন এক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল| তপন সংকল্প করেছিল, ভবিষ্যতে সে যদি কখনও লেখা ছাপতে দেয়, তা সে নিজেই পত্রিকা সম্পাদকের কাছে জমা দিয়ে আসবে |ছাপা হোক বা না হোক তাতে তার দুঃখ নেই | কেউ তো আর বলতে পারবে না, ‘অমুক তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে |’ সে আরও | বুঝেছিল যে, অপরের সাহায্য নিয়ে লেখক হওয়া যায় না। কাঁচা লেখাই একদিন পরিপক্ব হয়ে ওঠে নিরন্তর অনুশীলনের মাধ্যমে।

১২. “শুধু এই দুঃখের মুহূর্তে গভীরভাবে সংকল্প করে তপন।” তপনের দুঃখের কারণ কী? সে কী ধরনের সংকল্প গ্রহণ করেছিল?

‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের তপন ভাবত লেখকরা অন্য জগতের বাসিন্দা। ইতিমধ্যে তার ছোটোমাসির বিয়ে হয় একজন লেখকের সঙ্গে | তপন দেখতে পায় মেসো তার বাবা কাকুর মতোই একজন স্বাভাবিক মানুষ | তখন থেকেই লেখক হবার জেদ তার মাথায় চেপে বসে। সে লিখেও ফেলে একটি গল্প | লেখক মেসো সেই গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’ নামক একটি পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন | ছাপা লেখা হাতে পেয়ে তপন হতভম্ব হয়ে যায় | সে দেখতে পায় পুরো লেখাটাই তার নতুন মেসো কারেকশান করে দিয়েছেন। তপন তার নিজের লেখার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায় না। এতে তখন নিজে অপমানিত বোধ করে। নিজের লেখার এই সামগ্রিক রূপান্তরই তপনের দুঃখের কারণ।

● রূপান্তরিত গল্প দেখে লজ্জিত ও দুঃখিত তপন এক দৃঢ় সংকল্প করে। সে মনে করে, নিজের লেখা কাঁচা হলেও অন্যের দ্বারা সংশোধন করানো সমীচীন নয়। তাই তপন প্রতিজ্ঞা করে এবার থেকে সে নিজে গিয়ে পত্রিকা সম্পাদকের হাতে লেখা জমা দিয়ে আসবে। যেন নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন তাকে আর পড়তে না হয়।

১৩. “তপন যেন কোথায় হারিয়ে যায় এইসব কথার মধ্যে।”— কোন্ সব কথার মধ্যে? তপন কেন হারিয়ে যায়?

→ ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের ছোটোমেসোমশাই নিজের প্রতিশ্রুতিমতো ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় তপনের লেখা গল্প 'প্রথম দিন' প্রকাশ করে দেন | পত্রিকাটি বাড়ির সকলের হাতে হাতে ঘোরে আর সকলের প্রশংসা পায় | মেসো অবশ্য মৃদু হেসে জানান যে, লেখাটিতে কিছু ‘কারেকশান' করতে হয়েছে। মাসি 'নতুন' লেখার যুক্তি দেন। ক্রমশ অবশ্য তগনের লেখা অপেক্ষা লেখা কারেকশানের কথাই ছড়িয়ে পড়ে। তপনের বাবাও লেখাপ্রকাশের কৃতিত্ব মেসোকেই দেন। মেজোকাকুও প্রকারান্তরে জানিয়ে দেন যে, মেসো না থাকলে তগনের লেখা প্রকাশিত হত না। এভাবে সেদিন চারপাশে শুধু তপনের গল্প আর তপনের নতুন মেসোর মহত্বের কথাই ছড়িয়ে গড়ে। তপন এইসব কথার মধ্যেই যেন হারিয়ে যায়।

● তপন এইসব কথার মধ্যে হারিয়ে যায় কারণ, এসব কথায় তপনের লেখকপ্রতিভার কোনো স্বীকৃতিই ছিল না। এমনও কথা তপন শুনেছিল যে তপনের মেসোমশাই যদি নিজে না গিয়ে দিতেন তাহলে ‘সন্ধ্যাতারা'র সম্পাদক তগনের গল্প 'কড়ে আঙুল' দিয়ে ছুঁয়েও দেখত না। এইসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম গল্পপ্রকাশে যে প্রবল আনন্দ হওয়ার কথা ছিল, তখন তা খুঁজে পায় না। যে আগ্রহ নিয়ে সে গল্প ছাপা হওয়ার জন্য বসেছিল তা কোথাও যেন আহত হয়। নানা মানুষের নানা বিরূপ মন্তব্য তার আনন্দের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

১৪. আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে লেখো।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প একজন কিশোরের অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত হওয়ার কাহিনি | গল্পের নামকরণের মধ্যে তারই ইঙ্গিত। তপন একসময় ভাবত যাঁরা গল্প, কবিতা, উপন্যাস লেখেন তাঁরা আসলে আলাদা জগতের মানুষ | তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তার মেসোমশাইকে দেখে, যিনি কিনা তপনের বাবা, ছোটোমামা ও মেজোকাকুর মতোই মানুষ। তিনি ওঁদের মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, স্নান করেন এবং সকলের মতোই খেতে বসে বলেন ‘আরে ব্যস, এত কখনও খাওয়া যায়' ইত্যাদি।

তপনের লেখা গল্প একদিন তার মেসোমশাই নিয়ে যান ছাপিয়ে দেবেন বলে। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও তপন তার গল্পটা আর ছাপার অক্ষরে দেখতে পায় না। হঠাৎ একদিন মাসি ও মেসোকে সে তাদের বাড়ি আসতে দেখে ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকা হাতে। এই পত্রিকায় তপনের পাঠানো গল্পটা ছাপা হয়েছে। কিন্তু সেই গল্প পড়ে তো তপনের চক্ষু চড়কগাছ | মেসো প্রায় পুরো লেখাটাই পালটে দিয়েছেন। তপনের তখন মন খারাপ হয়ে যায়। সে ভাবে এবার থেকে সে নিজেই লেখা পাঠাবে, কারও হাত দিয়ে নয়। এভাবে তপনের জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন ঘটে।

১৫. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প অবলম্বনে তপন চরিত্রটির পরিচয় দাও।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপন| তার চরিত্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলি গল্পে দেখতে পাওয়া যায়—

কল্পনাপ্রবণ: লেখক সম্পর্কে তপনের মনে ছিল এক অতিলৌকিক ধারণা। সে ভাবত লেখকরা অন্য জগতের বাসিন্দা, মানুষের সঙ্গে তাঁদের কোনো মিল নেই।


সৃজনশীল : ছোটোমাসির বিয়ের পর তপনের ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। কারণ তার নতুন মেসো ছিলেন একজন লেখক, যাঁর অনেক বই ছাপা হয়েছে। একজন লেখককে খুব কাছ থেকে দেখে লেখক হওয়ার অদম্য বাসনায় তপন লিখে ফেলে আস্ত একটা গল্প | নতুন মেসো সেই গল্পের প্রশংসা করায় তপনের চোখে লেখক হবার স্বপ্ন ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল : 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় তপনের গল্পটা ছেপে বেরোলে সে অবাক হয়ে যায়, কারণ মেসো সংশোধন করতে গিয়ে আগাগোড়া গল্পটাকে পালটে দিয়েছেন। তপন নিজেকে খুঁজে পায় না গল্পের মধ্যে। সে হতাশ হয়।

আত্মাভিমানী: মেসোর সংশোধনে তার লেখার মৌলিকতা নষ্ট হওয়াকে তপন মেনে নিতে পারে না। তাই তপন সংকল্প করে ছাপা হোক বা না হোক, এবার থেকে নিজের লেখা নিজেই পত্রিকা সম্পাদকের কাছে জমা দেবে। এই আত্মসম্মানবোধই তপনকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ করেছে।

১৬. ছোটোগল্প হিসেবে ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটির সার্থকতা আলোচনা করো।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পেটির সূচনা হয়েছে ছোটোগল্পের প্রত্যাশিত আকস্মিকতা দিয়ে—“কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল!” তপন নামের একটি কিশোর চরিত্রকে মাঝখানে রেখে লেখিকা তার স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি রচনা করেছেন। তপনের লেখক মেসোমশাই তার লেখাকে আপাদমস্তক পালটে দিয়ে ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ঘটনায় তপনের লেখকসত্তা প্রবল আঘাত পায় | ছাপার অক্ষরে নিজের নামপ্রকাশ নয়, নিজের সৃজনশীলতার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং যন্ত্রণা তপন চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দেয়। কাহিনির পরিণতি যতই গুরুগম্ভীর হোক তাকে অসামান্য ভঙ্গিতে তুলে | ধরেছেন লেখিকা। গল্পে তপনের লেখক মেসোমশাইয়ের স্বরূপ প্রতিষ্ঠার দৃশ্যটি বর্ণনার গ্রুপে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। – “ঠিক ছোটোমামাদের মতোই খবরের কাগজের সব কথা নিয়ে প্রবলভাবে গল্প করেন, তর্ক করেন, আর শেষ পর্যন্ত ‘এ দেশের কিছু হবে না’ বলে সিনেমা দেখতে চলে যান...।”—এ অনবদ্য রচনাশৈলী কাহিনিকে গতিশীল করেছে। তবে নিঃসন্দেহে ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি সার্থকতা পেয়েছে তার পরিণতিতে। মৌলিকতার বিশ্বাসী এক কিশোর ও নব্য লেখকের যন্ত্রণা শুধু চরিত্রটিকে নয় গল্পকেও আসামান্যতা দেয়।

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post