বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার সম্পর্কে আলোচনা করো।

বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার সম্পর্কে আলোচনা করো

বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার —

ভূমিকা : ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকে সরকার এদেশে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ নেয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী চার্লস গ্রান্ট ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘অবজারভেশন’ নামে এক পুস্তিকায় মত প্রকাশ করেন যে, ভারতের পশ্চাদপদ সমাজ, ধর্ম ও নৈতিকতার উন্নয়নের জন্য এদেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানো দরকার। যদিও কোম্পানি তখন এবিষয়ে গুরুত্ব দেননি। কেননা, সরকার মনে করত যে, ভারতের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থা এদেশে চাপিয়ে দিলে ভারতীয়রা ক্ষুব্ধ হতে পারে।

[1] ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা : প্রথমদিকে ব্রিটিশ সরকার ভারতে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ না নিলেও এদেশে বিভিন্ন কারণে ইংরেজি শিক্ষার চাহিদা ক্রমশ বাড়তে থাকে। [1] এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ব্যাবসাবাণিজ্য, প্রশাসন, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতির ধারাবাহিক প্রসার ঘটলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ইংরেজি জানা কর্মচারীর বিশেষ প্রয়োজন দেখা দেয়। [2] মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকরা চাকরি লাভের আশায় ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। [3] এদেশে আগত খ্রিস্টান মিশনারিরা খ্রিস্টধর্মের প্রচারের জন্যও ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর প্রয়োজন অনুভব করে।

[2] প্রাথমিক উদ্যোগ : এদেশে ইংরেজি শিক্ষার চাহিদা ক্রমশ বাড়তে থাকলে প্রথমদিকে কয়েকজন বিদেশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলকাতায় কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শোরবোর্ন, মার্টিন, বাউল, অরটুন পিট্রাস, ডেভিড ড্রামন্ড প্রমুখ।

[3] মিশনারিদের উদ্যোগ : ইউরোপের বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি গোষ্ঠী বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রসারের উদ্দেশ্যে এখানকার বিভিন্ন স্থানে ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে আসে। লন্ডন মিশনারি সোসাইটি, চার্চ মিশনারি সোসাইটি ও শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনের উদ্যোগে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে এবং কলকাতার বাইরে চুঁচুড়া, বর্ধমান, বহরমপুর ও কালনা, মালদহ প্রভৃতি শহরে বেশ কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাপটিস্ট মিশনের উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান, ওয়ার্ড প্রমুখের উদ্যোগে ১২৬টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। লন্ডন মিশনারি সোসাইটির রবার্ট মে চুঁচুড়ায় একটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। স্কটিশ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার ডাফ-এর প্রচেষ্টায় বাংলায় কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হল ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ)। কলকাতার প্রথম বিশপ মিডলটন শিবপুরে বিশপ কলেজ (১৮১৯ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন। জেসুইট মিশনারিরা কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ (১৮৩৫ খ্রি.) এবং লরেটো হাউস স্কুল (১৮৪২ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন।

[4] বিভিন্ন মনীষীর উদ্যোগ : বাংলায় রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, তেজচন্দ্র রায়, জয়নারায়ণ ঘোষাল এবং স্কটল্যান্ডের ঘড়ি প্রস্তুতকারক ডেভিড হেয়ার প্রমুখ মনীষীও বাংলায় ইংরেজি শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ভবানীপুরে এবং ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে চুঁচুড়ায় ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। রামমোহন রায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ডেভিড হেয়ার, রাধাকান্ত দেব, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট প্রমুখের উদ্যোগে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ডেভিড হেয়ার পটলডাঙ্গা অ্যাকাডেমি (১৮১৮ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে হেয়ার স্কুল নামে পরিচিত। বিভিন্ন স্থানে ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্যে ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি (১৮১৮ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত হয়। গৌরমোহন আঢ্য ওরিয়েন্টাল সেমিনারি (১৮২৮ খ্রি.) নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

উপসংহার : বড়োলাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ঘোষণা করেন যে, ইংরেজি ভাষাজ্ঞানকে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকরা সরকারি চাকরি লাভের আশায় ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে উডের ডেসপ্যাচ বা নির্দেশনামায়ও ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের সপক্ষে অভিমত দেওয়া হয়। সরকারি উদ্যোগে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এদেশে ১৫১টি ইংরেজি বিদ্যালয় গড়ে ওঠে।

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post