উনিশ শতকে ‘বাংলার নবজাগরণ' বলতে কী বোঝ? এই নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করো।

উনিশ শতকে ‘বাংলার নবজাগরণ' বলতে কী বোঝ? এই নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করো।

উনিশ শতকে ‘বাংলার নবজাগরণ' —

ভূমিকা : ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে বাংলাদেশে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটলে বাংলা সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতি সর্বক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে। এর প্রভাবে বাঙালির ভাবজগতে এক বৌদ্ধিক আন্দোলন শুরু হয়।

[1] পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার : উনিশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে। কলকাতার মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ধনী ব্যবসায়ী, নব্য জমিদারশ্রেণি প্রমুখ পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এলে তারা পাশ্চাত্যের আধুনিক সাহিত্য, দর্শন, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, উদারবাদ প্রভৃতির দ্বারা বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন।

[2] নবজাগরণ : উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্যোগে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, ধর্মীয় উদারতা, সমাজসংস্কার, আধুনিক সাহিত্যের বিকাশ প্রভৃতি শুরু হয়। ফলে ঊনবিংশ শতকে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতিতেও ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে। এই অগ্রগতিকে কেউ কেউ উনিশ শতকে বাংলার ‘নবজাগরণ’ বলে অভিহিত করেছেন।

[3] নবজাগরণের প্রসার : উনিশ শতকে বাংলার বৌদ্ধিক অগ্রগতি বা নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা। কলকাতা থেকে এই অগ্রগতির ধারা পরবর্তীকালে বাংলা তথা ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। রাজা রামমোহন রায়ের সময়কে এই জাগরণের সূচনাকাল হিসেবে ধরা হয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখ এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

বাংলার নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি

ভূমিকা : পঞ্চদশ শতকে সংঘটিত ইউরোপের নবজাগরণের সঙ্গে অনেকে উনিশ শতকে সংঘটিত বাংলার নবজাগরণের তুলনা করেছেন। এর ফলে বাংলার নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন—

[1] সীমিত পরিসর : উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ব্যাপ্তি বা পরিসর ছিল খুবই সীমিত। তা ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক, বিশেষ করে কলকাতাকেন্দ্রিক। কলকাতার বাইরে গ্রামবাংলায় এই নবজাগরণের প্রসার ঘটেনি এবং গ্রামবাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এই নবজাগরণের কোনো সুফল পায়নি।

[2] মধ্যবিত্ত সমাজে সীমাবদ্ধ : বাংলার জাগরণ শুধু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত প্রগতিশীল সমাজে সীমাবদ্ধ ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক এই সমাজের লোকেদের ‘মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক' বলে অভিহিত করেছেন। এজন্য অধ্যাপক অনিল শীল এই জাগরণকে এলিটিস্ট আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন। বাংলার এই জাগরণের সঙ্গে গ্রামগঞ্জের হাজার হাজার দরিদ্র মেহনতি মানুষের কোনো প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুও মনে করেন যে, ঔপনিবেশিক শাসনের জ্ঞানদীপ্তি শুধু উচ্চবর্গের হিন্দুদের ওপরই প্রতিফলিত হয়েছিল। সাধারণ জনগণের মধ্যে এর বিশেষ প্রভাব পড়েনি।

[3] ব্রিটিশ নির্ভরতা : বাংলার এই জাগরণ অতিমাত্রায় ব্রিটিশনির্ভর হয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নবজাগরণের নেতৃবৃন্দ মনে করতেন যে, ব্রিটিশ শাসনের দ্বারাই ভারতীয় সমাজের মঙ্গল সাধিত হবে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার লিখেছেন, ‘ইংরেজদের দেওয়া সবচেয়ে বড়ো উপহার হল আমাদের উনিশ শতকের নবজাগরণ। তিনি ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠাকে এজন্য ‘গৌরবময় ভোর’ বলে অভিহিত করেছেন।

[4] হিন্দু জাগরণবাদ : বাংলার নবজাগরণ প্রকৃতপক্ষে হিন্দু জাগরণবাদে' পর্যবসিত হয়। রাধাকান্ত দেব, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রমুখের কার্যকলাপে হিন্দু জাগরণবাদের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর হিন্দুশাস্ত্রকে ভিত্তি করে সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন। তাই অনেকে মনে করেন যে, উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের ভূমিকা ছিল খুবই গৌণ।

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post