নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল কাদের বলা হয়? উনিশ শতকে বাংলার ইতিহাসে নব্যবঙ্গদের অবদান উল্লেখ করো।

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল কাদের বলা হয়? উনিশ শতকে বাংলার ইতিহাসে নব্যবঙ্গদের অবদান উল্লেখ করো।

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল কারা —

উনিশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও-র নেতৃত্বে একদল যুবক হিন্দুসমাজ ও ধর্ম সংস্কারের কাজে বিশেষ খ্যাতিলাভ করে। মিল, বেন্থাম, টম পেইন, রুশো, ভলতেয়ার প্রমুখ দার্শনিকের রচনা পাঠ করার ফলে তাদের মতে যুক্তিবাদ ও সামাজিক চেতনা জেগে ওঠে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এই যুবগোষ্ঠী প্রচলিত হিন্দুসমাজ ও ধর্মের কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ডিরোজিও ও তাঁর অনুগামী যুবগোষ্ঠী ‘নব্যবঙ্গ’ বা ‘ইয়ং বেঙ্গল' নামে পরিচিত।

নব্যবঙ্গদের অবদান —

ভূমিকা : উনিশ শতকে যেসব আন্দোলন বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সর্বাধিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল নব্যবঙ্গ আন্দোলন বা ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট।

[1] প্রাণপুরুষ : নব্যবঙ্গ আন্দোলনের সূচনা ও প্রসারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯-৩১ খ্রি.)। তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে হিন্দু কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। তিনি অল্পদিনের মধ্যেই কবি, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

[2] স্বদেশপ্রীতি : ডিরোজিও একটি ইঙ্গ-ভারতীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও ভারতের প্রতি তাঁর দেশাত্মবোধ ছিল গভীর। ‘ক্রীতদাসের মুক্তি’ এবং ‘আমার জন্মভূমি ভারতের প্রতি' কবিতায় তাঁর গভীর দেশপ্রেমের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মধ্যে এই দেশপ্রেমের সঞ্চার করেন।

[3] যুক্তিবাদ : টমাস পেইন, হিউম, রুশো, ভলতেয়ার প্রমুখ দার্শনিকের যুক্তিবাদী দর্শন ডিরোজিও-কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন। তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে এই যুক্তিবাদের সঞ্চার করেন। তিনি ছাত্রদের স্বাধীন চিন্তার অধিকারী হতে বলেন এবং কোনো কিছুই বিনা বিচারে মেনে নিতে নিষেধ করেন।

[4] সংগঠন : ডিরোজিও হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন (১৮২৮ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন। ‘পার্থেনন’ নামে পত্রিকার মাধ্যমে নব্যবঙ্গরা তাঁদের মতামত সকলের কাছে পৌঁছে দিতেন।

[5] কুপ্রথার বিরোধিতা : ডিরোজিও-র পরামর্শে ছাত্ররা বুঝতে পারে যে, প্রাচীন রক্ষণশীলতা, বর্বর কুসংস্কার, ও কুপ্রথাগুলি হিন্দুধর্ম ও সমাজের প্রাণশক্তি নষ্ট করে দিয়েছে। তাই এই পুরোনো ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা দরকার। ডিরোজিও-র অনুগামী ছাত্রমণ্ডলী হিন্দুধর্মের পুরোনো কুপ্রথা ও রক্ষণশীলতাকে সরাসরি আক্রমণ করতে থাকেন। তাঁরা জাতিভেদ প্রথা ও অস্পৃশ্যতার নিন্দা করার উদ্দেশ্যে পইতা ছিঁড়ে ফেলেন ও নিষিদ্ধ মাংস খান।

[6] প্রতিক্রিয়া : নব্যবঙ্গদের এরূপ উগ্র আন্দোলন রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ মেনে নিতে পারেনি। তারা তাদের সন্তানদের হিন্দু কলেজ থেকে ছাড়িয়ে নিতে থাকেন শেষপর্যন্ত রক্ষণশীল হিন্দুদের চাপে ডিরোজিওকে পদচ্যুত করা হয়। এর কিছুদিন পর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

[7] অনুগামীদের আন্দোলন : ডিরোজিওর মৃত্যুর পরও তাঁর অনুগামী ছাত্রমণ্ডলী নব্যবঙ্গ আন্দোলন চালিয়ে যান। এই সময়ের ‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী'র সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী প্রমুখ। এঁরা সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, রাজনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে প্রগতিশীল মতবাদ প্রচার করেন। সাধারণ জ্ঞান অর্জন সমিতি’ (১৮৩৯ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করে তারা মানুষের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নেন।

উপসংহার : নব্যবঙ্গ আন্দোলনকে আপাত দৃষ্টিতে ভাঙনমূলক বা নৈরাজ্যবাদী বলে মনে হলেও বাংলার সমাজ ও ধর্মীয় জীবনে এই আন্দোলনের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। ‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী’র যুবকরা পরবর্তীকালে পরিণত সংস্কারক সমাজসেবীতে পরিণত হন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, নারীশিক্ষার প্রসার, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা, মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক কাজে তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাঁদের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘জ্ঞানান্বেষণ’, ‘এনকোয়েরার’, ‘বেঙ্গল স্পেকটেটর' প্রভৃতি পত্রপত্রিকা দেশবাসীর মনে কুসংস্কারবিরোধী মনোভাব ও যুক্তিবাদের প্রসারে সহায়তা করে। তাঁদের প্রশংসা করে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “এরাই বাংলায় আধুনিক সভ্যতার প্রবর্তক, এরাই আমাদের জাতির পিতা, এদের গুণাবলি চিরস্মরণীয়। এদের দুর্বলতা বা দোষত্রুটি সম্বন্ধে মুখর হয়ে ওঠা উচিত হবে না।”

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post