আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার প্রধান উপাদানগুলি কী কী ? এই উপাদানগুলি সম্পর্কে আলোচনা করো।

আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার প্রধান উপাদান

আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার প্রধান উপাদান

ভূমিকা : বর্তমানকালের নতুন নতুন বিষয় আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এসব উপাদানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— [1] সরকারি নথিপত্র, [2] আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা, [3] ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, [4] সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র প্রভৃতি। এসব উপাদান সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল

[1] সরকারি নথিপন্ন : ব্রিটিশ শাসনকালের বহু সরকারি নথিপত্র দিল্লির জাতীয় মহাফেজখানা, কলকাতা, চেন্নাই ও মুম্বই-এর লেখ্যাগারে সংরক্ষিত আছে। এসব নথিপত্র আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার বিভিন্ন উপাদান সরবরাহ করে থাকে। সরকারি নথিপত্রগুলিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায়—

i. প্রতিবেদন : সরকারের পুলিশ, গোয়েন্দা, বিভিন্ন পদস্থ অধিকারিক প্রমুখের বিভিন্ন রিপোর্ট বা প্রতিবেদন থেকে ব্রিটিশ-বিরোধী গণবিদ্রোহ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বিপ্লবী আন্দোলন, গুপ্ত সমিতিগুলির কার্যকলাপ প্রভৃতি সম্পর্কে সমকালীন বহু তথ্য জানা যায়।

ii. বিবরণ : বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী, ইংরেজ সেনাপতি, সরকারের ঘনিষ্ঠ বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রমুখ ব্রিটিশ শাসনকালের বিভিন্ন ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে সেসব ঘটনা বিবরণ বা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন। এসব বিবরণ থেকে সমকালীন বহু তথ্য জানা যায়। এরূপ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিবরণ হল— সৈয়দ আহমদ খান রচিত ‘দি কজেস অব ইন্ডিয়ান রিভোল্ট’, রিজলের ব্যক্তিগত দিনলিপির বিবরণ, লেপেল গ্রিফিন-এর বিবরণ প্রভৃতি।

iii. চিঠিপত্র : সরকারের বিভিন্ন দপ্তর বা বিভিন্ন আধিকারিকদের মধ্যে চিঠিপত্রের আদানপ্রদান চলত৷ এরূপ বহু চিঠিপত্র আজও সংরক্ষিত আছে। এগুলির বিষয়বস্তু থেকে ইতিহাসের বহু তথ্য পাওয়া যায়। এরূপ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিঠিপত্র, মেকলের চিঠিপত্র, ডাফরিনের চিঠিপত্র প্রভৃতি।

[2] আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা :বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথাগুলিতে সমকালীন ভারতের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব রচনায় ভারতীয়দের ওপর ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন, স্বাদেশিকতা, সমাজ, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিভিন্ন দিকের নানা ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা হল বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’, সরলা দেবী চৌধুরানির জীবনের ঝরাপাতা’ মহাত্মা গান্ধির 'দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ’, সুভাষচন্দ্র বসুর ‘অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম’ (অসমাপ্ত), জওহরলাল নেহরুর অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’, ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদের ‘আত্মকথা', মুজাফ্ফর আহমেদের ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (১৯২০-২৯ খ্রি.)', মণিকুন্তলা সেনের ‘সেদিনের কথা’ প্রভৃতি।

[3] ব্যক্তিগত চিঠিপত্র : ব্রিটিশ শাসনকালে বিভিন্ন বিশিষ্ট এবং সাধারণ ব্যক্তির লেখা অসংখ্য চিঠিপত্র থেকে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের বহু তথ্য জানা যায়। ভারতের ইতিহাসের উপাদান সমৃদ্ধ এরূপ চিঠিপত্রগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল টিপু সুলতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখের লেখা বিভিন্ন চিঠিপত্র।

[4] সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র : আধুনিক ভারতের বিভিন্ন ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ উল্লেখ পাওয়া যায় সমকালীন ভারতের বিভিন্ন সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্রে। ফলে এগুলি আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত হয়। যেমন—‘বঙ্গদর্শন’, ‘সোমপ্রকাশ', ‘সংবাদ কৌমুদী’, ‘জ্ঞানান্বেষণ’, ‘বেঙ্গল স্পেকটেটর', ‘সমাচার চন্দ্রিকা’, ‘তত্ত্ববোধিনী’, ‘সংবাদ প্রভাকর’, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, ‘সন্ধ্যা’, ‘সঞ্জীবনী’, ‘বন্দেমাতরম’ প্রভৃতি।

উপসংহার : আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার সময় উপরোক্ত উপাদানগুলি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধান থাকা দরকার। কেন-না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের দেওয়া তথ্যগুলি পরস্পর-বিরোধী হয়ে ওঠে। এসব তথ্য অন্য কোনো তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে এর যথার্থতা বিচার করে তবে ইতিহাস রচনার কাজে ব্যবহার করা উচিত।

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post