আধুনিক ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্য সম্পর্কে আলোচনা করো

আধুনিক ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্য সম্পর্কে আলোচনা করো

আধুনিক ইতিহাস চর্চার বৈচিত্র্য সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা

আধুনিক ইতিহাসচর্চা কিভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

অথবা

টীকা : আধুনিক ইতিহাসচর্চা।

ভূমিকা : ‘ইতিহাস' বলতে বোঝায় অতীতের কথা। বিগত শতক পর্যন্ত ইতিহাসের আলোচনায় মূলত রাজারাজড়া, অভিজাত সম্প্রদায়সহ সমাজের উচ্চবর্গের বিভিন্ন মানুষকে নিয়ে আলোচনা করা হত। কিন্তু বর্তমানকালে বহু নতুন নতুন বিষয়ের ইতিহাসচর্চা শুরু হয়েছে। ফলে আধুনিক ইতিহাসচর্চা যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

[1] নতুন সামাজিক ইতিহাস : সাম্প্রতিককালে সমাজের দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর প্রমুখের আলোচনা ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে। এই ধরনের ইতিহাসচর্চা ‘নতুন সামাজিক ইতিহাস' নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক ফার্নান্দ ব্রদেল, লাদুরি জেনোভিস, রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, শাহিদ আমিন, সুমিত সরকার, গৌতম ভদ্র প্রমুখ এই ধারার ইতিহাসচর্চা করছেন।

[2] খেলার ইতিহাস : সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, দেশ বা জাতির সম্পর্কও খেলাধুলার মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। খেলাধুলার ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন গবেষক চর্চা করছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বোরিয়া মজুমদার, রূপক সাহা, গৌতম ভট্টাচার্য, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

[3] খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস : বিভিন্ন দেশ বা জাতির খাদ্যাভ্যাস যুগে যুগে অন্য কোনো জাতির খাদ্যাভ্যাস বা কোনো বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এর ফলে সেই দেশ বা জাতির খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ করেছে। খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিককালে শরিফউদ্দিন আহমেদ, কে টি আচয়, প্যাট চ্যাপম্যান প্রমুখ গবেষক চর্চা করছেন। ধারণ

[4] পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস : প্রতিটি সমাজে সামাজিক স্তরভেদে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ পৃথক হয়। তা ছাড়া যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বা অন্য কোনো জাতির প্রভাবেও কোনো দেশ বা জাতির মানুষের পোশাকপরিচ্ছদের পরিবর্তন ঘটে। সাম্প্রতিককালে যারা পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মলয় রায়, কার্ল কোহলার, এম্মা টারলো প্রমুখ।

[5] শিল্পচর্চার ইতিহাস : সংগীত, নৃত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রাঙ্কন, ফোটোগ্রাফি প্রভৃতি শিল্পকলা আধুনিক যুগে মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। এসব শিল্পকলার পরিবর্তন ও বিবর্তন চলেছে ধারাবাহিকভাবে। সমকালীন ঐতিহাসিক ঘটনাবলিও এসব শিল্পকলার বিষয়বস্তুতে স্থান করে নেয়। সাম্প্রতিককালে যাঁরা শিল্পের ইতিহাসচর্চায় খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ক্যারল ওয়েলস, সুধীর চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজীবন মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিক কুমার ঘটক, সত্যজিৎ রায়, ফার্গুসন, লালা দীনদয়াল, অশোক মিত্র প্রমুখ।

[6] যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাস : যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে সভ্যতারও অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। আধুনিক যুগে রেল, সড়ক, বিমান, জাহাজ প্রভৃতি পথে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতির ফলে দেশ-বিদেশের মানুষ খুব কম সময়ে স্থান থেকে স্থানান্তরে যাতায়াত করতে পারছে। এসবের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিককালে জন আর্মস্ট্রং, ইয়ান কের, সুনীল কুমার মুন্সি, নীতি সিন্হা প্রমুখ চর্চা করছেন।

[7] স্থানীয় ও শহরের ইতিহাস : সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ক্ষুদ্র অঞ্চল নিয়ে স্থানীয় ইতিহাস এবং বিভিন্ন শহরের ইতিহাসচর্চা শুরু হয়েছে। এসব বিষয়ের ইতিহাসচর্চায় যাঁরা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কুমুদনাথ মল্লিক, সতীশচন্দ্র মিত্র, রাধারমন সাহা, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুধীরকুমার মিত্র, পুর্ণেন্দু পত্রী, রাধারমন মিত্র, নারায়ণী গুপ্ত প্রমুখ।

[৪] বিজ্ঞানের ইতিহাস : প্রাচীনকাল থেকে বিজ্ঞানের যেসব শাখায় গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন ও অগ্রগতি ঘটেছে সেগুলির মধ্যে অন্যতম হল যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র ও কৌশল, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতি। এর ফলে বিশ্ববিজ্ঞান আজ চরম উৎকর্ষতার শিখরে পৌঁছেছে। বিজ্ঞানের এসব শাখার অগ্রগতি সম্পর্কে যাঁরা ইতিহাসচর্চা করেছেন ও করছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বার্নেট, যদুনাথ সরকার, জে ডি বার্নাল, ডেভিড আরনল্ড, কৌশিক রায় প্রমুখ।

[9] পরিবেশের ইতিহাস : যুদ্ধ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন প্রভৃতির ফলে বর্তমানকালে বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমাগত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিককালে পরিবেশ সম্পর্কে মানুষ ক্রমে সচেতন হয়ে উঠছে এবং পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনে দিকে দিকে আন্দোলন, প্রচারাভিযান প্রভৃতি শুরু হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিয়ে আলফ্রেড ক্রসবি, রিচার্ড গ্রোভ, ইরফান হাবিব, মাধব গ্যাডগিল, রামচন্দ্র গুহ, মহেশ রঙ্গরাজন প্রমুখ গবেষক সাম্প্রতিককালে ইতিহাসচর্চা করেছেন।

[10] নারী ইতিহাস : পুরুষের মতো নারীর ভূমিকাও ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ব্যক্তির উদ্যোগে নারীর ইতিহাসচর্চা বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীদের কার্যকলাপ এবং ভূমিকাও ইতিহাসে সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হচ্ছে। নারী ইতিহাস নিয়ে জোয়ান কেলি, জোয়ান স্কট, নীরা দেশাই, জেরাল্ডিন ফোর্বস, বি আর নন্দ, কমলা ভাসিন প্রমুখ গবেষক যথেষ্ট চর্চা করেছেন।

উপসংহার : বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইতিহাসে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন বিষয়ের চর্চা স্থানলাভ করছে। ফলে ইতিহাসচর্চা ক্ৰমে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বৈচিত্র্যের ফলে রাজকাহিনির গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাস আজ প্রকৃতপক্ষে সর্বস্তরের মানুষের ইতিহাস হয়ে উঠেছে। ফলে ‘সামগ্রিক ইতিহাস' (Total History) চর্চার বিষয়টিও সম্পন্ন হচ্ছে।

Samiran

Content Creator / Author

Previous Post Next Post