সিন্ধুতীরে (সৈয়দ আলাওল) প্রশ্ন ও উত্তর সাজেশন

সিন্ধুতীরে (সৈয়দ আলাওল) প্রশ্ন ও উত্তর সাজেশন, সিন্ধুতীরে প্রশ্ন উত্তর, সিন্ধুতীরে সাজেশন, সিন্ধুতীরে সাজেশন Pdf, সিন্ধুতীরে প্রশ্ন সাজেশন.

সিন্ধুতীরে (সৈয়দ আলাওল) প্রশ্ন ও উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান-৩)


“দিব্য পুরী সমুদ্র মাঝার।”—মন্তব্যটির পরিপ্রেক্ষিত আলোচনা করো।

● সমুদ্রের ঢেউ পদ্মাবতীর মান্দাসকে যেখানে পৌঁছে দেয়, সেখানে জলের মধ্যে এক সুন্দর নগরী ছিল। তা ‘দিব্য’, কারণ সেখানে মানুষের কোনো দুঃখ কষ্ট ছিল না। সেখানে মানুষ সুখে, শান্তিতে, নির্বিঘ্নে বসবাস করত। তাদের কোনো ভয় ছিল না, কারণ তারা বিপদ বা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হত না। সকলেই ধর্ম মেনে চলত এবং সবসময় সদাচার করত । অর্থাৎ নৈতিক আদর্শের উচ্চতা সেই নগরীকে অলৌকিক মহিমা দিয়েছিল।


‘অতি মনোহর দেশ।'— কাকে ‘অতি মনোহর দেশ’ বলা হয়েছে? সেই দেশের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশে সমুদ্রকন্যা পদ্মার একটি প্রাসাদ কল্পনা করা হয়েছে। এই প্রাসাদটিকে সমুদ্রের মাঝে

দ্বীপভূমির মতো দেখায়। একেই অতি মনোহর দেশ বলা হয়েছে। ` ` কবির বর্ণনানুসারে এই দিব্যপুরী অতি মনোহর | সেখানে কোনো দুঃখকষ্ট নেই | আছে শুধু সত্যধর্ম এবং সদাচার। আর আছে একটি পর্বত এবং নানা পুষ্পসম্বলিত অপূর্ব এক উদ্যান। সেখানে ফুলের সুবাস স্বর্গীয় পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছে। নানা ফলের সমারোহে গাছগুলি দৃষ্টিনন্দন |


‘সিন্ধুতীরে দেখি দিব্যস্থান।'— সিন্ধুতীরে এই দিব্যস্থানে কে থাকেন? স্থানটিকে দিব্যস্থান বলা হয়েছে কেন? ১+২

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশে সিন্ধুতীরের দিব্যস্থানে থাকেন সমুদ্রকন্যা পদ্মা |

→ ‘দিব্যস্থান’ কথাটির অর্থ হল সুন্দর, মনোহর স্থান | সমুদ্রবেষ্টিত এই স্থানটি অতি মনোহর | সেখানে দুঃখকষ্ট নেই | সত্য এবং সদাচার স্থানটিকে স্বর্গীয় মহিমা দান করেছে। সেখানে দৃশ্যমান একটি পর্বত এবং সুরম্য উদ্যান | বিচিত্র ফুল ও ফলের সমারোহে বৃক্ষরাজিও বড়ো নয়নাভিরাম। এই কারণেই স্থানটিকে দিব্যস্থান বলা হয়েছে।


“তথা কন্যা থাকে সর্বক্ষণ”— মন্তব্যটির প্রসঙ্গ নির্দেশ করো।

● মান্দাস ভাসতে ভাসতে পদ্মাবতীকে যেখানে নিয়ে গিয়ে ফেলে, া ছিল অত্যন্ত মনোহর এক দেশ। সেখানে দুঃখ-কষ্টের কোনো জায়গা ছিল না। সেখানে সত্যধর্ম এবং সদাচার পালন করা হত। ওপরে ছিল এক পর্বত। সেখানে নানা সুন্দর এবং সুগন্ধি ফুল আর ফলের গাছের উদ্যান তৈরি করেছিলেন সমুদ্রকন্যা পদ্মা | সেখানেই সোনা এবং অন্যান্য বহুমূল্য রত্নে সজ্জিত এক প্রাসাদে পদ্মা থাকতেন | সেই প্রাসাদই এখানে ‘তথা’ শব্দটিতে নির্দেশিত হয়েছে।


‘মনেতে কৌতুক বাসি’— কার মনে, কেন কৌতুকের উদয় হয়েছিল?

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশ থেকে প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি গৃহীত হয়েছে।

সমুদ্রকন্যা পদ্মা সখীপরিবেষ্টিত হয়ে সুরম্য উদ্যানে এসেছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে সমুদ্রতীরে একটি কলার ভেলা পড়ে রয়েছে। সেই ভেলার মাঝখানে অপূর্বসুন্দরী এক কন্যা অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন। তাঁকে ঘিরে রয়েছে তাঁর চারজন সখী। নির্জন সমুদ্রতীরে এমন দৃশ্য দেখে পদ্মার মনে কৌতুকের উদয় হয়।


“রূপে অতি রম্ভা জিনি/নিপতিতা চেতন রহিত।”—মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।

● সকালবেলা সমুদ্রকন্যা পদ্মা তাঁর সখীদের নিয়ে নিজের সুরম্য উদ্যানের দিকে যাচ্ছিলেন। এইসময়ে সমুদ্রের ধারে একটি ভেলা পড়ে থাকতে দেখে কৌতূহলী হয়ে তিনি দ্রুত সেখানে আসেন। সেখানে পৌঁছে পদ্মা দেখেন, চারদিকে চারজন সখী পড়ে আছেন, আর মাঝখানে এক অপরূপা কন্যা অচেতন হয়ে আছেন। তাঁর রূপের সৌন্দর্য এতটাই ছিল যে, তা স্বর্গের বিখ্যাত অপ্সরী রম্ভার সৌন্দর্যকেও পরাজিত করে।


“অনুমান করে নিজ চিতে।”—কোন্ অনুমানের কথা বলা হয়েছে আলোচনা করো।

● সখীদের সঙ্গে সকালবেলা উদ্যানে যাবার সময় সমুদ্রকন্যা পদ্মা দেখেন সমুদ্রতীরে একটি মান্দাস পড়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তিনি সখীদের মধ্যে অচেতন পদ্মাবতীকে দেখতে পান। তার সৌন্দর্য যেন স্বর্গের অপ্সরী রম্ভাকেও পরাজিত করবে। তার সেই রূপের বিস্তারে বিস্মিতা পদ্মা নানারকম অনুমান করতে থাকেন । তখন তাঁর মনে হয় যে, এ কোনো সাধারণ মানবী নয়, স্বর্গের নর্তকী বিদ্যাধরী যেন স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছে।


‘অচৈতন্য পড়িছে ভূমিতে।'— কে অচৈতন্য হয়ে ভূমিতে পড়েছিলেন? তাঁর অচৈতন্য হওয়ার কারণ কী?

● সিংহল-রাজকন্যা পদ্মাবতী অচৈতন্য হয়ে সমুদ্রতীরে ভূমিতে পড়েছিলেন | তিনি চিতোরের রানা রত্নসেনের পত্নী।

● রানা রত্নসেনের সঙ্গে পদ্মাবতী সমুদ্রপথে চিতোরে ফিরে যাচ্ছিলেন। সমুদ্রের রোষে তাঁদের জলযান বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কোনো রকমে একটি ভেলায় রত্নসেন এবং সখীসহ পদ্মাবতী আশ্রয় নেন। কিন্তু সেই ভেলাও দুখণ্ড হয়ে যায় এবং পদ্মাবতী রত্নসেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সামুদ্রিক ঝঞ্ঝার প্রকোপে এবং প্রাণহানির আশঙ্কায় পদ্মাবতী জ্ঞান হারান। এই অবস্থায় চারজন সখী তাঁকে ঘিরে রাখে।


“বেথানিত হৈছে কেশ বেশ।”— কার, কেন এরূপ অবস্থা | হয়েছিল?

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশে এরকম অবস্থা হয়েছিল পদ্মাবতীর।

→ সিংহল-রাজকন্যা পদ্মাবতী স্বামী রত্নসেনের সঙ্গে চিতোরে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। সমুদ্রপথে তাঁদের জলযান বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। একটি কলার ভেলায় রত্নসেন, পদ্মাবতী ও চারজন সখী আশ্রয় নিলেও সেটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। এর ফলে পদ্মাবতী সখীসহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে রাজকন্যার কেশ এলোমেলো হয়ে পড়ে এবং সাজসজ্জা নষ্ট হয়।


“মোহিত পাইয়া সিন্ধু-ক্লেশ।”—মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

● সখীদের সঙ্গে উদ্যানে যাওয়ার সময় পদ্মা অচেন পদ্মাবতীকে প্রত্যক্ষ করেন। অপরিচিতা সুন্দরী কন্যাকে দেখে তাঁর মনে নানারকম ভাবনা জাগে। বিধবস্ত সেই সুন্দরীর চোেখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, তার বেশভূষাই বিপর্যয়ের সাক্ষ্য দেয়। এলোমেলো সেই কন্যার কেশদাম এবং পোশাক। সমুদ্রকন্যা পদ্মা ভেবে নেন যে, প্রবল বাতাস হয়তো নৌকা ভেঙে দিয়েছে। সমুদ্রের জলে ভাসতে ভাসতে প্রবল কষ্টেই হয়ত মেয়েটি আচ্ছন্ন হয়ে আছে।


'চিত্রের পোতলি সমা/নিপাতিত মনোরমা'- মনোরমা কে? তিনি কোথায়, কেন নিপতিতা ছিলেন?

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশে সিংহল-রাজকন্যা পদ্মাবতীকে ‘মনোরমা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

→ রানা রত্নসেনের সঙ্গে বিয়ের পর পদ্মাবতী সমুদ্রপথে চিতোরে আসছিলেন। কিন্তু প্রবল ঝড়ে তাঁদের জাহাজ ডুবে যায়| কলার মান্দাসে আশ্রয় নিলেও শেষরক্ষা হয়নি। পদ্মাবতী রত্নসেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর বিধবস্ত রাজকন্যা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন | সমুদ্রের তীরে অচৈতন্য অবস্থায় চারজন সখী-পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ে থাকেন তিনি।


“বিধি মোরে না কর নৈরাশ”—কোন্ প্রসঙ্গে বক্তা এরকম ভেবেছে আলোচনা করো।

● সমুদ্রের তীরে অচৈতন্য পদ্মাবতীকে মান্দাসের ওপরে দেখে পদ্মা সেই অপরূপ নারীর জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন যে, ভয়াবহ কোনো সামুদ্রিক বিপর্যয়ের জন্যই ওই রমণীর এই অবস্থা। ছবির প্রতিমার মতো সুন্দরী সেই নারীর শ্বাস সামান্য পড়ছে। পদ্মা সেই রমণীর প্রতি স্নেহার্দ্র হয়ে পড়েন। প্রার্থনা করতে থাকেন, বিধাতা যেন নিরাশ না করেন অর্থাৎ সেই কন্যাকে বাঁচিয়ে রাখেন।


“বাহুরক কন্যার জীবন” এখানে বক্তা কোন্ কন্যার জীবনের কথা বলেছেন? উল্লিখিত কন্যাকে বক্তা কোথায়, কী অবস্থায় প্রথম দেখেছিলেন?

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশ থেকে উদ্ধৃত বাক্যাংশটিতে বক্তা সমুদ্রকন্যা পদ্মা সিংহলের রাজকন্যা এবং চিতোরের রাজবধূ পদ্মাবতীর জীবনের কথা বলেছেন।

● পদ্মা পদ্মাবতীকে প্রথমে সমুদ্রতীরে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তখন পদ্মাবতী মরণাপন্ন, তাঁর বেশ ও কেশ এলোমেলো অবস্থায় ছিল। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় চারজন সখীসহ রাজকন্যা সমুদ্রতীরে পড়েছিলেন | তাঁকে দেখে পদ্মার মনে হয়েছিল কোনো অপরূপ স্বর্গবালা শাপভ্রষ্টা হয়ে মাটিতে পড়ে আছে | তখনও তাঁর শ্বাসবায়ু অল্প অল্প প্রবাহিত হচ্ছে দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মা রাজকন্যাকে বাঁচানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন।


“কৃপা কর নিরঞ্জন।”—বক্তার এই প্রার্থনার কারণ আলোচনা করো।

● সমুদ্রতীরে অচেতন পদ্মাবতীকে দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মা অত্যন্ত সহমর্মী হয়ে ওঠেন। স্নেহসিক্ত হৃদয়ে তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যে, তিনি যেন তাঁকে নিরাশ না করেন, অর্থাৎ বিধাতা যেন ওই কন্যার প্রাণ রক্ষা করেন। পিতার পুণ্য আর তাঁর নিজের ভাগ্যবলে কন্যার জীবন ফিরে আসুক বলে পদ্মা প্রার্থনা করেন। তাকে সুস্থ করার জন্য যথাসাধ্য চিকিৎসা করবেন বলেও পদ্মা জানান। এভাবে এক প্রবল স্নেহাসক্তিতে তিনি পদ্মাবতীর জীবন প্রার্থনা করেন।


“সখী সবে আজ্ঞা দিল।” - সখীদের কে, কী আজ্ঞা দিলেন? -

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশে সমুদ্রকন্যা পদ্মা সখীদের আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

● সামুদ্রিক ঝড়ে বিধবস্ত সিংহল-রাজকন্যা অচৈতন্য অবস্থায় সমুদ্রতীরে শায়িত | চারজন সখী তাঁকে ঘিরে রয়েছে। সুরম্য প্রাসাদ থেকে সমুদ্রকন্যা পদ্মা এই দৃশ্য দেখে বিচলিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ রাজকন্যাকে উদ্ধার করে আনতে সখীদের নির্দেশ দিলেন| শুকনো বসন দিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে, আগুন জ্বেলে সর্বাঙ্গ সেঁকে দিতে বললেন। আর তন্ত্রমন্ত্র সহকারে মহৌষধ দিতে আজ্ঞা করলেন ।


“পঞ্চকন্যা পাইল চেতন।” -পঞ্চকন্যা কীভাবে চেতনা পেয়েছিল তা উল্লেখ করো।

● সমুদ্রকন্যা পদ্মা শুধু বিধাতার কাছে অচেতন পদ্মাবতীর জন্য প্রার্থনা করেই তাঁর দায় শেষ করেননি। তিনি তাঁর উপযুক্ত চিকিৎসার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। পদ্মার আদেশে তাঁর সখীরা অচেতন পদ্মাবতী ও তাঁর সখীদের দেহ বসনে ঢেকে উদ্যানের মধ্যে নিয়ে যান | তারপরে তন্ত্র-মন্ত্র-মহৌষধি সহযোগে তাদের মাথায় এবং পায়ে আগুনের সাহায্যে সেঁক দেওয়া হয়। এইভাবে চার দণ্ড বহু যত্নসহ চিকিৎসা করার ফলে চন্দ্রপ্রভা, রোহিণী, বিজয়া ও বিষুল্লা এই চার সখী-সহ পদ্মাবতী প্রাণ ফিরে পায় |


“শ্ৰীযুত মাগন গুণী...” ‘মাগন’ কে?

● উদ্ধৃতাংশের মাগন ছিলেন রোসাঙ্গরাজ নরপদিগ্যির বিশ্বস্ত মন্ত্রী | নরপদিগ্যির মৃত্যুর পর তাঁর কন্যা রাজ্যের মুখ্য পাটেশ্বরী হলে তিনি মাগনকে রাজা থদোমিতারের মুখ্য পাত্ররূপে নিযুক্ত করেন। এরপর ১৬৫২ সালে গদো নিতারের মৃত্যু হলে নাগন রাজার নাবালক পুত্র চদ্রসুধর্মার অভিভাবক হিসেবে বিধবা রাজপত্নীকে রাজকার্যে সহায়তা করতেন। ১৬৪৫ সালে বা তার পরবর্তী কোনো সময়ে এই মাগন ঠাকুরই আলাওলকে আরাকানের অমাত্যসভায় নিয়ে আসেন। তিনি বক্তৃত্তাবাবিদ, শাম্ৰজ্ঞানী, বিদ্যোৎসাহী, কাব্যরসিক এবং সাহিত্যসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

সিন্ধুতীরে (সৈয়দ আলাওল) প্রশ্ন ও উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান-৫)


“সিন্ধুতীরে দেখি দিব্যস্থান।”—এই দিব্যস্থানের পরিচয় দাও। এখানে যে উদ্যানটির কথা আছে তা উল্লেখ করো।

● সৈয়দ আলাওল অনূদিত পদ্মাবতী কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত ‘সিন্ধুতীরে’ কবিতাংশে যেখানে সমুদ্রের মধ্যে মান্দাসে করে পদ্মাবতী গিয়ে পৌঁছোয়, সেখানেই ছিল এক দিব্যপুরী| কবির কথায় তা ছিল ‘মনোহর দেশ’ | মানুষের জীবনে কোনো দুঃখ-কষ্ট ছিল না। সমাজে নৈতিক আদর্শ ছিল অত্যন্ত উঁচুতে—“সত্য ধর্ম সদা সদাচার।” অর্থাৎ মানুষজন ছিল ধার্মিক এবং সৎ আচারআচরণে তারা অভ্যস্ত ছিল।

→ সমুদ্রতীরে যে দিব্যস্থানটি ছিল তার পাশে ফল-ফুলে পরিপূর্ণ এক উদ্যান রচনা করেছিলেন সমুদ্রকন্যা পদ্মা। সেখানে নানা মনোহর ফুল ফুটে থাকত। তাদের সুগন্ধ চারপাশকে আমোদিত করত। বিভিন্ন উপকারী বৃক্ষে নানা ফল ধরে থাকত। তারই মধ্যে ছিল এক অতি সুরম্য প্রাসাদ—‘বিচিত্র টঙ্গি’। সেই প্রাসাদ স্বর্ণনির্মিত এবং বিবিধ রত্নে প্রাসাদটিকে সুসজ্জিত করে নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই রত্নখচিত প্রাসাদে আলো পড়লে নানান রঙের বর্ণালি বিচ্ছুরিত হত। তাই কবিতায় প্রাসাদের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ‘হেম রত্নে নানা রঙ্গি'। অর্থাৎ, সোনা এবং মণিমাণিক্যের ছটায় চারদিক আলো করে বহু বর্ণে শোভা পাচ্ছিল এই অপূর্ব পুরী | চেতনাহীন পদ্মাবতীর পুনর্জাগরণের জন্য এইভাবে দিব্যপুরী এবং উদ্যানের বর্ণনা মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশ সৃজন করেছেন কবি।


“দেখিয়া রূপের কলা বিস্মিত হইল বালা/অনুমান করে নিজ চিতে।”—কে কাকে দেখে বিস্মিত হয়েছিল? সেই রূপবতী সেখানে কীভাবে এসেছিল? তাকে দেখে কী মনে হয়েছিল?

● সৈয়দ আলাওল অনূদিত পদ্মাবতী কাব্যের ‘পদ্মা সমুদ্র খণ্ড’ থেকে নেওয়া ‘সিন্ধুতীরে' কবিতায় সমুদ্র-কন্যা পদ্মা অচেতন চিতোরের রানি পদ্মাবতীর রূপ দেখে বিস্মিত হয়েছিল।

→ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে রত্নসেনের কাছে দান ভিক্ষা করে প্রত্যাখ্যাত হয় সমুদ্র | তখন সমুদ্রের রোষে রত্নসেনের নৌকা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় | পদ্মাবতী এবং তার চার সখীকে রত্নসেন একটি মান্দাসে তুলে দেন, নিজে অন্য একটিতে ওঠেন | প্রবল ঢেউ পদ্মাবতীদের মান্দাসটিকে তীরে নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছোনোর আগেই ভয়ে সখী-সহ পদ্মাবতী চেতনা হারান। যেখানে তাঁরা পৌঁছোন তা ছিল এক মনোরম পুরী |

● পদ্মাবতীকে দেখে পদ্মার মনে হয়েছিল যে, ইন্দ্রের অভিশাপে স্বর্গের নর্তকী বিদ্যাধরী যেন স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে মাটিতে অচৈতন্য হয়ে পড়েছে | পদ্মাবতীর ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ এবং আলুথালু বেশ দেখে পদ্মা এ–ও অনুমান করেন যে, তার ওপর দিয়ে কোনা প্রবল ঝড় বয়ে গেছে | এলোমেলো চুল এবং বেশ বাসের এই অবস্থা দেখে পদ্মার মনে হয় যে, হয়তো সমুদ্রে তরী বেয়ে চলার পথে দুরন্ত ঝড়ের বাতাসে নৌকা ভেঙে তাঁরা বিপদে পড়েছিলেন। সমুদ্রের কষ্টেই তাঁর এই অজ্ঞান অবস্থা।


“অচৈতন্য পড়িছে ভূমিতে।” '—কার কথা বলা হয়েছে? তাকে দেখে কার কী মনে হয়েছিল? সে এই অবস্থায় কোন্ ভূমিকা নিয়েছিল ?

● সৈয়দ আলাওল অনূদিত পদ্মাবতী কাব্যের ‘পদ্মা সমুদ্র খণ্ড’ থেকে সংকলিত ‘সিন্ধুতীরে’ নামক কাব্যাংশের উল্লিখিত অংশে পদ্মাবতীর কথা বলা হয়েছে।

→ পদ্মাবতীর বিস্ফারিত চোখ, এলোমেলো বসন এবং কেশদাম দেখে পদ্মা অনুমান করে যে, সমুদ্রের প্রবল বাতাসে নৌকা ভেঙেই বোধহয় মেয়েটির এই কষ্ট। শুধু তাই নয়, গভীর সহানুভূতি দিয়ে পদ্মা দেখেন যে মেয়েটির শ্বাস তখনও অল্প অল্প পড়ছে। স্নেহার্দ্র পদ্মা বিধাতার কাছে মেয়েটির জীবন প্রার্থনা করেন । তিনি প্রত্যাশা করে তাঁর পিতার পুণ্যের ফলে এবং তাঁর নিজের ভাগ্যের কারণে যেন মেয়েটির জীবন ফিরে আসে।

● পদ্মাবতীর প্রাণ ফিরে পাওয়ার আশায় পদ্মা শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেই থেমে থাকেনি, তার চিকিৎসারও যথাসাধ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। সখীগণ-সহ পদ্মাবতীকে বস্তু আচ্ছাদিত করে উদ্যানে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি তাঁর সখীদের নির্দেশ দেন। সেখানে তন্ত্রাচারের মাধ্যমে, বিধিমতো মন্ত্রপাঠ করে নানান মহান গুণসম্পন্ন ঔষধের দ্বারা তাদের চিকিৎসা করা হয় | আগুন জ্বালিয়ে পায়ে মাথায় সেঁক দেওয়া হয়। চার দণ্ড এরকম যত্নের সঙ্গে চিকিৎসা হওয়ার পরে চার সখী-সহ পদ্মাবতী চেতনা ফিরে পান।


“পঞ্চকন্যা পাইলা চেতন।”- পঞ্চকন্যা কে কে? তাদের অচৈতন্যের কারণ কী? কীভাবে তারা চেতনা ফিরে পেয়েছিল?

● সৈয়দ আলাওল রচিত ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের অংশবিশেষ ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্য-কাহিনিতে বর্ণিত পঞ্চকন্যার মধ্যমণি হলেন সিংহল-রাজকন্যা পদ্মাবতী। আর তাঁর চারজন সখী হল চন্দ্রকলা, বিজয়া, রোহিনী ও বিধুন্নলা |

→ স্বামী রত্নসেনের সঙ্গে রাজকন্যা পদ্মাবতী সমুদ্রপথে চিতোরে প্রত্যাবর্তন করার সময় আকস্মিকভাবে তাঁদের জলযানটি সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে এবং নিমজ্জিত হয়। রত্নসেনের এবং সখী-সহ রাজকন্যা কোনো রকমে একটি মান্দাসে আশ্রয় নন। শেষপর্যন্ত মান্দাস খণ্ডিত হয়ে সখী-সহ রাজকন্যা রত্নসেনের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন |খণ্ডিত ভেলায় সমুদ্রতীরের ভূমিতে পৌঁছোন | কিন্তু প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে অসম লড়াই, দৈহিক ক্লেশ ইত্যাদির প্রভাবে রাজকন্যা ও তাঁর সখীরা জ্ঞান হারান।

● পঞ্চকন্যার এই অবস্থায় দেবতা নিরঞ্জনকে স্মরণ করে চিকিৎসাকর্মে ব্রতী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সমুদ্রকন্যা পদ্মা | প্রাণপণ সেবাশুশ্রূষা করে পঞ্চকন্যার জীবনরক্ষাই ছিল তাঁর ঘোষিত অভীষ্ট | সেইমতো শুকনো কাপড় দিয়ে সখী-সহ রাজকন্যার শরীর আবৃত করা হয়। আগুন জ্বেলে সর্বাঙ্গ সেঁকে দেওয়া হয় এবং তন্ত্রমন্ত্র সহকারে মহৌষধ প্রয়োগ করা হয়। একটানা চারদণ্ড সেবাশুশ্রুষার পর পঞ্চকন্যা চেতনা ফিরে পান। করুণাময়ী পদ্মার আন্তরিক সেবাযত্নে সখী-সহ পদ্মাবতীর জ্ঞান ফিরে আসে।


‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশ অবলম্বনে পদ্মার মনোহর প্রাসাদের বর্ণনা দাও। সখী-সহ রাজকন্যা পদ্মাবতীর রূপ দেখে সমুদ্রলক্ষ্মীর কী ধারণা হয়েছিল?

● ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশে দেখা যায় সমুদ্রতীরে দিব্যস্থানে ফুলেফলে পরিপূর্ণ এক সুরম্য উদ্যান রচনা করেছিলেন সমুদ্রকন্যা পদ্মা | সেই উদ্যানের মধ্যেই ছিল তাঁর সুরম্য প্রাসাদ | তা ছিল অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর এবং বৈচিত্র্যময়—‘বিচিত্র টঙ্গি’। তা ছিল স্বর্ণনির্মিত এবং বিবিধ মূল্যবান রত্নে সুসজ্জিত। সেই রত্নখচিত প্রাসাদে আলো পড়লে বর্ণালি বিচ্ছুরিত হত। ‘হেম রত্নে নানা রঙ্গি’ অর্থাৎ সোনা ও রত্নাসম্ভারে তা বিচিত্র দেখতে লাগছিল।

→ সমুদ্রতীরের অসামান্য পরিবেশে সখীদের নিয়ে উদ্যানে যাওয়ার সময়ে সমুদ্রকন্যা পদ্মা লক্ষ করেন সমুদ্রতীরের মান্দাসটিকে। দ্রুত । নিকটে গিয়ে অচেতন চার সখীর মধ্যে পদ্মাবতীকে তিনি লক্ষ করেন। পদ্মাবতীকে দেখে সমুদ্রকন্যার মনে হয় রূপ ও সৌন্দর্যে তিনি স্বর্গের অপ্সরা রম্ভাকেও পরাজিত করতে পারেন।—“দেখিয়া রূপের কলা বিস্মিত হইল বালা” | সমুদ্রকন্যার মনে হয় যে ইন্দ্রের অভিশাপে স্বর্গের গায়িকা বিদ্যাধরী যেন স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে মাটিতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। তার ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ, আলুথালু বেশ ইত্যাদি দেখে পদ্মার মনে হয় যে, তার ওপর দিয়ে কোনো ঝড় বয়ে গেছে | ছবিতে আঁকা মূর্তির মতো সুন্দরী মেয়েটির সামান্যমাত্র শ্বাস-প্রশ্বাস বইছিল।


‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশটিতে কবির রচনারীতির যে বিশেষত্ব দেখতে পাওয়া যায় লেখো।

→ ‘সিন্ধুতীরে’-এর সংক্ষিপ্ত পরিসরেও অচৈতন্য অপরিচিতা রাজকুমারী পদ্মাবতীর প্রতি সমুদ্রকন্যা পদ্মার যে সহানুভূতি ও ভালোবাসা তা মানবিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন | ধীর লয়ের ত্রিপদী ছন্দে এই আবেগকে প্রকাশ করেছেন কবি। আবার শেষে ভণিতায় পাঁচালির রীতিও ব্যবহার করেছেন—

“শ্ৰীযুত মাগন গুণী মোহন্ত আরতি শুনি হীন আলাওল সুরচন।।”

আরবি ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও আলাওলের কাব্যে এগুলির প্রয়োগ কম| পরিবর্তে তৎসম শব্দের প্রচুর ব্যবহার লক্ষ করা যায়—‘সদাচার’, ‘সুতা’, ‘পুষ্প,’ ‘মনোহর’, ‘স্বর্গভ্রষ্টা’, ‘কেশ’ ইত্যাদি | কাব্যিক শব্দের ব্যবহারেও আলাওল দক্ষতা দেখিয়েছেন | যেমন—‘মাঝারে’, ‘চিতে’, ‘তুরিত’ ইত্যাদি | আলাওল আখ্যানকাব্য রচনা করেছিলেন, ফলে তাঁর ‘সিন্ধুতীরে’ কবিতাটি পাঠ করলেও গল্প পড়ার আনন্দ উপভোগ করা যায় | পরপর প্রতিটি দৃশ্যকেই তিনি ছবির মতো সাজিয়ে তুলেছেন, সেইসঙ্গে দৃশ্যগুলিকে তাঁর বচনে অত্যন্ত সুমধুর ও সুপাঠ্য করে তুলেছে তাঁর সাবলীল লেখনী। ঘটনার পরম্পরাটিকেও তিনি সাজিয়েছেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে। যেভাবে ঘটনা তৈরি করা হয়েছে তা কাব্যাংশটিকে নাটকীয়তা দিয়েছে | শেষে কবি আলাওল লিখেছেন—“হীন আলাওল সুরচন।” অনস্বীকার্য যে, ‘সিন্ধুতীরে’ আলাওলের একটি সুরচনা।


‘সিন্ধুতীরে’ কবিতায় পদ্মার চরিত্রটি যেভাবে পাওয়া যায় আলোচনা করো।

● সৈয়দ আলাওলের অনূদিত পদ্মাবতী কাব্যের ‘পদ্মা সমুদ্র খণ্ড’ থেকে সংকলিত ‘সিন্ধুতীরে’ কবিতায় পদ্মা-ই সবথেকে সক্রিয় চরিত্র। সে সমুদ্রকন্যা| কাহিনিতে তার কিছু বিশেষত্ব লক্ষ করা যায়।

১. সৌন্দর্যপ্রিয় : পদ্মার মধ্যে ছিল সৌন্দর্যপ্রিয়তা। তাই যে উদ্যান তিনি তৈরি করেছেন সেখানে নানা মনোহর ফুল সুগন্ধ বিস্তার করেছে, গাছে নানা ফল ধরেছে। তাঁর প্রাসাদটিও ছিল সোনায় মোড়া। তার ওপরে নানান রত্নের ঝিকিমিকি সেই প্রাসাদের সৌন্দর্যও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

২. প্রাণচঞ্চল : পদ্মা ছিলেন প্রাণচঞ্চল | তাই রাত্রি অবসান হতেই দেখা যায় সকালবেলা সখীদের সঙ্গে হাসি-খেলায় মেতে উঠে তিনি তাঁর প্রিয় উদ্যানের দিকে চলেছেন| সখীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত মধুর।

৩. মানবিক : পদ্মা চরিত্রটি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে তার মানবিকতায়। অপরিচিতা পদ্মাবতীকে সমুদ্রতীরের মান্দাসে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তাঁর উৎকণ্ঠা, ঈশ্বরের কাছে তাঁর কাতর প্রার্থনা আত্মীয়তার সেতু তৈরি করেছে | তাঁরই নির্দেশে পদ্মার সখীরা তন্ত্র-মন্ত্র-মহৌষধি সহযোগে আগুনের সেঁক দিয়ে পদ্মাবতীর চেতনা ফিরিয়েছে | মধ্যযুগের কবিতায় আলাওলের সৃষ্ট এই চরিত্রটিতে মানবিকতা এক অসামান্য বিশেষত্ব। এভাবেই সমুদ্রকন্যা পদ্মা অনন্য হয়ে উঠেছেন।

‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশ অবলম্বনে সৈয়দ আলাওলের কবিপ্রতিভার পরিচয় দাও।

● আলাওলের ‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশটির প্রথমে সমুদ্রকন্যা পদ্মার দিব্যপুরীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেই মনোহর পুরীর বর্ণনায় আলাওলের সৌন্দর্যপ্রীতির পরিচয় ধরা পড়েছে। পদ্মার প্রাসাদের সন্নিকটে এক পর্বত দণ্ডায়মান। তার পাশে পুষ্প ও ফল শোভিত অপূর্ব এক উদ্যান | কবির ভাষায়—

‘নানা পুষ্প মনোহর সুগন্ধি সৌরভতর নানা ফল বৃক্ষ সুলক্ষণ। তাহাতে বিচিত্র টঙ্গি হেমরত্নে নানা রঙ্গি তথা কন্যা থাকে সর্বক্ষণ।।’

মধ্যযুগে রচিত এই কাব্যের ভাষা লৌকিক শব্দসঞ্জাত এবং হৃদয়স্পর্শী | কাহিনি-কাব্যের ধারা অনুযায়ী আলাওল ঘটনাক্রমকে গল্পের মতো সাজিয়েছেন। সমুদ্রকন্যার উদার মানবিক চরিত্রের দ্যুতি কাব্যাংশটিকে সর্বজনীন করে তুলেছে| সম্পূর্ণ অপরিচিতা পদ্মাবতীর জন্য তাঁর উদ্‌বেগ এবং তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য তাঁর আকুলতা নিখাদ মানবিক| কাব্যের নায়িকা পদ্মাবতীর রূপমাধুরীর বর্ণনায় তিনি তাঁর প্রতিভাকে উজাড় করে দিয়েছেন। অচৈতন্য পদ্মাবতীকে দেখে সমুদ্রকন্যার মনে হয়েছে—ইন্দ্রশাপে বিদ্যাধরি/কিবা স্বর্গভ্রষ্ট করি/অচৈতন্য পড়িছে ভূমিতে।' অর্থাৎ ‘নিপতিতা চেতন রহিত’ নারীর রূপসৌন্দর্যে স্বর্গীয় ছোঁয়া থাকতে পারে, কিন্তু সে যে এই মর্তপৃথিবীর মরণশীল একজন, তাতে কোনো সংশয় নেই | মানব-মানবীর রূপচরিত্র নির্মাণে আলাওল যে পথের দিশারি তা সে-যুগের পক্ষে বিরল দৃষ্টান্ত। এইভাবে ‘সিন্ধুতীরে'র স্বল্প পরিসরেও আলাওলের উচ্চ কবিপ্রতিভার পরিচয় ফুটে উঠেছে।


‘সিন্ধুতীরে’ কাব্যাংশটির নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে তা বিচার করো।

● ‘সিন্ধুতীরে’ নামকরণটি কবিকৃত নয়। কাব্য-কাহিনির বিষয়বস্তুকে সামনে রেখে সংকলকগণ এরূপ নামকরণ করেছেন|

সিংহল-রাজকন্যা পদ্মাবতী স্বামীর সঙ্গে চিতোরে ফেরার সময় সামুদ্রিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন। তাঁদের জলযানটি সমুদ্রে ডুবে যায়। একটি মান্দাসে রত্নসেন ও সখী-সহ পদ্মাবতী আশ্রয় নিলেও সেটিকে রক্ষা করা যায়নি। মান্দাস দ্বিখণ্ডিত হয়ে পদ্মাবতী রত্নসেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দুর্যোগজনিত ক্লেশ এবং প্রাণসংশয়ের আশঙ্কায় রাজকন্যা জ্ঞান হারিয়ে সমুদ্রতীরে পতিত হন। সাগরকন্যা পদ্মা তাঁর সুরম্য প্রাসাদ থেকে এই দৃশ্য দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি সখীদের নির্দেশ দেন অচৈতন্য রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে। সখীরাও সেই নির্দেশমতো রাজকন্যা পদ্মাবতীকে উদ্যানের মধ্যিখানে নিয়ে এসে চারদণ্ড ধরে নানা সেবাযত্নের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এই হল সংক্ষিপ্ত কাব্যকাহিনি। এখানে লক্ষণীয় যে, যাবতীয় ঘটনা ঘটেছে সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে। কাব্যাংশটির শুরুতেও এই সমুদ্রতীরবর্তী ‘দিব্যস্থান’টির শোভা-সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে।

‘সিন্ধুতীরে’ শব্দটির অর্থ সমুদ্রতীরে। সেই স্থাননামের উল্লেখেই কাব্যাংশটির নামকরণ। এই অংশে সংঘটিত যাবতীয় ঘটনা এবং বর্ণিত যাবতীয় বিষয় সমুদ্রতীর-কেন্দ্রিক| সংঘটক চরিত্রের চেয়ে জায়গাটাই ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ রূপে প্রতিভাত হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে নামকরণটি বিষয়কেন্দ্রিক এবং যথাযথ।

 


We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.