প্রলয়োল্লাস কবিতার রচনাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

প্রলয়োল্লাস কবিতার রচনাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর, প্রলয়োল্লাস কবিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, Proloyollash Descriptive Questions Answers Pdf.

প্রলয়োল্লাস কবিতার রচনাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান-৩)


“ওই নূতনের কেতন ওড়ে”— ‘নূতনের কেতন’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

● কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সত্য ও সুন্দরের পূজারি | প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বাংলায় নেমে এসেছিল অবক্ষয়ের কালো ছায়া। মানুষ বন্দি হয়ে পড়েছিল জড়বাদী অচলায়তনে | বাঙালি নিজস্বতা হারিয়ে অপসংস্কৃতির গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল | সত্য ও সুন্দর হয়েছিল পরাজিত |স্তূপীকৃত কুসংস্কার, দাসত্ব, জড়তা এবং অবক্ষয়ী মূল্যবোধের অবসানে কবি কালবৈশাখীরূপ নটরাজের আগমন কামনা করেছেন। ধ্বংসের মধ্যে দিয়েই হবে সৃষ্টির নবউত্থান | ‘নূতনের কেতন’ বলতে কবি পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার শুভদিনের আগমনকেই ইঙ্গিতবাহী করে তুলেছেন।


“সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।”— ‘সিন্ধুপারের সিংহদ্বার’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? সেখানকার আগল ভাঙার কথা বলা হয়েছে কেন?

● ‘সিন্ধুপারের সিংহদ্বার’ বলতে কবি আন্দামানের প্রধান ফটকের কথা বলেছেন। ইংরেজরা আন্দামানের সেলুলার জেলে ভারতীয়দের বন্দি করে রাখত | সেই জেলের প্রধান ফটক ভাঙার কথাই কবি বলতে চেয়েছেন।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আগ্রাসী হয়ে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে | গান্ধিজির নেতৃত্বে সারা ভারতে জাতীয় আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ইংরেজরা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের বিনাবিচারে আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি করে রাখত। এই জেল ছিল ভারতীয়দের কাছে অত্যাচারের প্রতীক। ধ্বংসরূপী মহাকালই প্রলয়নেশায় মত্ত হয়ে সেই বন্দিশালার আগল ভেঙে দিয়েছেন বলে কবির বিশ্বাস |


“আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশায় নৃত্য পাগল”মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।

● পরাধীনতার যন্ত্রণা, সামাজিক শোষণ-বঞ্চনা—এসব থেকে মুক্তির জন্য মানুষের সংগ্রাম ক্রমশই তীব্রতর হচ্ছিল। সেই সংগ্রাম ধ্বংসকে নিশ্চিত করে। নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর তরুণ বিপ্লবীপ্রাণদের দেখলে মনে হয় তারা যেন ‘প্রলয় নেশার নৃত্য পাগল'। সমুদ্রপারে সিংহদরজার আগল ভাঙাই তাদের লক্ষ্য | কালবৈশাখির ঝড়ে তারা প্রগতিশীলতার পতাকা উড়িয়ে দেয়। এদেরই জয়ধ্বনি করার জন্য কবি আহবান করেছেন।


“বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!”—এই ভয়ংকরের আগমনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। Ø018"

● নজরুল ইসলাম ভয়ংকরের বেশে নতুনের আগমনকে প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রলয়ের নেশায় মত্ত হয়ে নৃত্যরত পাগলের মতো বিদ্রোহী শক্তির আগমন ঘটছে | তাকে প্রতিহত করার শক্তি, তার সামনে দাঁড়াবার শক্তি, কারও নেই | মহাকালের চণ্ডমূর্তিতে অর্থাৎ শিবের ধ্বংসমূর্তিতে যেন মুক্তিদূত অর্থাৎ বিপ্লবী শক্তির আগমন ঘটছে | কালবৈশাখির ঝড়ে উড়ছে নতুনের পতাকা, ধ্বংসের মধ্যে সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি | ভয়ংকরের পথেই এভাবে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখেছেন কবি |


“ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর!” - ভয়ংকর কে? তার হাসির কারণ কী?

● ‘ভয়ংকর’ বলতে ধ্বংসরূপী মহাকাল বা শিবকেই বোঝানো হয়েছে।

শিব ধবংস ও সৃষ্টির প্রতীক | ধ্বংসরূপী শিব সংহারক | ভয়াল তাঁর রুদ্ররূপ | বিকট অট্টহাসি হেসে তিনি জীর্ণ-পুরাতন এবং যা-কিছু অসুন্দর, তা বিনাশ করেন। তাঁর আগমনে প্রলয় সৃষ্টি হয়। অসুন্দররূপী অসুরকে নাশ করে তিনি সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা দেন। প্রলয়ের উল্লাসই তাঁর হাসি | অসুন্দরকে ছিন্ন করতে সংহারক শিব বড়ো নির্মম | অট্টরোল তাঁর সেই নির্মমতার বহিঃপ্রকাশ।


“ঝাপটা মেরে গগন দুলায়।”— কে ঝাপটা মেরে গগন দুলায়? গগন দোলানোর নেপথ্যে তার কী উদ্দেশ্য নিহিত?

● মহাকালরূপী শিব ঝাপটা মেরে গগন দুলিয়ে দেন।

● সংহারক শিব বড়ো ভয়ংকর। তাঁর আগমনে পৃথিবীতে প্রলয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাঁর জটাভার দুলে উঠলে আকাশ-বাতাসসহ চরাচর কেঁপে ওঠে। যাবতীয় জীর্ণতা দূর হয় তাঁর আগমনে। তারপরই নতুন সৃষ্টির প্রকাশ ঘটে পৃথিবীতে। তাঁর ঝাপটা আসলে পুরাতন জড়বাদী অচলায়তনকে ভাঙার আঘাত। সেই আঘাতে গগনমণ্ডলও কেঁপে ওঠে। এর মধ্যেই নিহিত আছে নবসৃষ্টির গোপন বার্তা।


“সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায়!”—কোন্ প্রসঙ্গে একথা বলা হয়েছে লেখো।

● সংগ্রামের পথ কখনও ফুলে ঢাকা নয় | স্বাধীনতার জন্য মানুষের যে সংগ্রাম, তার পথ তৈরি হয় মৃত্যু আর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে | যে কারণে কবি তাঁর কল্পনায় বিশ্বপিতার কোলে রক্তমাখা তরবারি দেখেছেন| সুন্দরের বা নবীনের কোনো শান্ত, সৌম্য মূর্তি এখানে বর্ণিত হয়নি| নতুনের প্রলয় রূপই বর্ণিত হয়েছে | সর্বনাশের বেশে সুন্দরের সেই আগমনকে বর্ণনা করতে গিয়েই কবি বলেছেন অগ্নিস্রাবি ধূমকেতু যেন তার ‘চামর ঢুলায়’ অর্থাৎ পুচ্ছ নাচায়।


“অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর।”'— সম্প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা লেখো।

● মহাকালের আগমনে প্রলয়-বিক্ষুব্ধ পৃথিবীর কথা বলতে গিয়ে কবি আলোচ্যমান উদ্ধৃতিটির অবতারণা করেছেন।

মহাকালরূপী শিব ধবংসলীলায় মেতে উঠেছেন | তাঁর প্রলয়তাণ্ডবে বিশ্বচরাচর কম্পিত। বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। কালবৈশাখী ঝড়ের রূপ ধারণ করে তিনি আসছেন নবসৃষ্টির বার্তা নিয়ে। তাঁর অট্টরোলে মুখরিত আকাশবাতাস | পৃথিবীর জীবকুল ভীতসন্ত্রস্ত | তাই সমগ্র চরাচর স্তব্ধ।


“দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়,” মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।

● স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন এক কঠিন সংগ্রাম। এ যেন এক ভয়ংকরের আহবান। মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো আগুন যেন বিপ্লবের বার্তাবাহকের চোখে। আবার কখনও তা মেঘের থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে মহাসিন্ধুর চেহারা নেয়। দুর্যোগের ঘনঘটায়, ভয়াবহতার উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির রুদ্ররূপে যেন নতুনের জয়ধ্বনি ঘোষিত হয়।


“বিশ্বমায়ের আসন তাঁরই বিপুল বাহুর পর।”— ‘বিশ্বমা’ কে? কার বাহুর ওপর, কেন তাঁর আসন?

● ‘বিশ্বমা’ বলতে কবি এই বিশাল পৃথিবীকেই বুঝিয়েছেন।

→ প্রলয়ংকর শিব বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে অসুন্দরকে ধ্বংস করে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি পৃথিবীতে আনবেন শান্তিসুখের বার্তা। তাঁর বিশাল বাহুর ওপরই বিশ্বমাতার স্থান হবে। কেননা, মহাকালই হলেন এই মহাবিশ্বের রক্ষাকর্তা। তিনিই যাবতীয় পঙ্কিলতা থেকে বিশ্বমাকে রক্ষা করে চলেছেন। সেই কারণেই কবি মনে করেছেন মহাকালরূপী শিবের বিপুল বাছুর ওপর জগজ্জননীর অবস্থান।


“মাভৈঃ মাভৈঃ ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে।” প্রলয় ঘনিয়ে আসা সত্ত্বেও কবি ‘মাভৈঃ মাভৈঃ’ বলেছেন কেন?

● ঝড় না উঠলে গাছের জীর্ণপাতা ঝরে না। জীর্ণপাতা না ঝরলে নবকিশলয়ের আগমন ঘটে না| ধ্বংসের পিছনেই থাকে সৃষ্টির বীজ | জড়তাগ্রস্ত সমাজকে নাড়া দিতে হয়। তাতে লুকানো প্রাণ জেগে ওঠে। রুদ্ররূপী শিব ধ্বংসের ত্রিশূল হাতে আবির্ভূত হন। তাঁর আগমনে জগতে নেমে আসে প্রলয়ের পরিবেশ | ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে জীবকুল। কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই আছে নববিধানের দুর্ধর্ষ আশ্বাস। এই কারণেই কবি ‘মাভৈঃ মাভৈঃ' বলে উল্লাস প্রকাশ করেছেন।


“জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে।”উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

● কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত | রুদ্ররূপী মহাকালের কর্মপন্থা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি আলোচ্যমান প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছেন।

মহাকাল শিব আসেন ধ্বংসরূপী কালবৈশাখীর রূপ ধারণ করে। তাঁর তাণ্ডবে পৃথিবীর জরাজীর্ণ সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়| তারপর ঘটে নতুনের আগমন | জড়তাগ্রস্ত মৃতপ্রায় জীবজগৎ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। তাই কবি বলেছেন রুদ্ররূপী শিবের বিনাশমূর্তির নেপথ্যেই উজ্জীবনের মহামন্ত্র লুকিয়ে আছে।


“এবার মহানিশার শেষে/আসবে ঊষা অরুণ হেসে” এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে কবি কোন্ ইঙ্গিত দিয়েছেন লেখো।

● পৃথিবীজুড়ে কবি নজরুল স্থিতাবস্থার ভাঙন লক্ষ করেছেন। পরাধীনতা এবং সামাজিক শোষণ-বঞ্চনার মধ্য দিয়ে যে অন্ধকার নেমে এসেছে তার অবসান ঘটবে, সভ্যতার নতুন সূর্যোদয় ঘটবে, কবি এরকমটাই প্রত্যাশা করেছেন। মহাদেব ধ্বংসের দেবতা হলেও তাঁর কপালে থাকে চাঁদ | একইভাবে ধ্বংসের মধ্যে সুন্দরকে বারবার প্রত্যক্ষ করেছেন বলেই কবি প্রত্যাশা করেছেন যে সেই চাঁদের আলোয় ঘর পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।


“ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে।” উদ্ধৃতিটির অন্তর্নিহিত অর্থ বিশ্লেষণ করো।

● কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত। মহাকালরূপী শিবের আগমন ও স্বরূপ বর্ণনা প্রসঙ্গে আলোচ্যমান উদ্ধৃতিটির অবতারণা করা হয়েছে।

কবি কল্পনা করেছেন মহাকালের রথের ঘোড়া ছুটে চলেছে দুরন্তবেগে | তার ক্ষুরের আঘাতে আকাশের তারা থেকে উল্কা খসে পড়ছে | গম্বুজ আকৃতির আকাশটাকে কবি অট্টালিকার খিলানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেখানে রক্ত-তড়িৎ-চাবুক হেনে মহাকালের রথের সারথি দুরন্ত গতিতে এগিয়ে আসছেন | এক অপূর্ব চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি প্রলয়দেবের আগমনকে ফুটিয়ে তুলেছেন।


“এই তো রে তার আসার সময় ওই রথঘর্ঘর—মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।

● যা কিছু জরাজীর্ণ, প্রগতিবিরোধী, স্বাধীনতা-পরিপন্থী সেই সব কিছুর অবসান চেয়েছেন কবি। মানুষের দেবতাকে এখানে অন্ধকার কারাগারে বেঁধে রাখা হয়েছে। কিন্তু তার মুক্তির সময় সমাগত | মহাকালের রথের সারথি বিদ্যুৎরূপ চাবুক দিয়ে আঘাত করে, ঝড়তুফানের মধ্য দিয়ে যেন তাঁর অশ্বের হ্রেষাধবনিও জেগে ওঠে। বিপ্লবীশক্তির অগ্রগমন, প্রতিবাদ এবং প্রত্যাঘাতই যেন এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়| ‘দেবতা বাঁধা যজ্ঞযূপে’—দেবতা এখানে স্বাধীনতা এবং সমাজমুক্তির প্রতীক। কবি তাদেরই নবপ্রতিষ্ঠা লক্ষ করেছেন।


“আসছে নবীন—জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!” কথাটির মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

● স্বাধীনতা ও সমাজরূপান্তরের জন্য কবি নবীন বিপ্লবীশক্তির আগমন প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রলয়ের মধ্য দিয়ে ধ্বংসের রূপ ধরে তার আবির্ভাব ঘটছে | কিন্তু সেই ধ্বংসের মধ্যেই রয়েছে সৃজনের সম্ভাবনা | ভাঙার মধ্য দিয়ে গড়ার প্রতিশ্রুতি থাকে | ধবংস যদি নাই হয়, তবে সৃষ্টি কোনোদিন সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে না। চিরসুন্দরের এভাবেই আবির্ভাব ঘটে। তাই নবীনের ধ্বংসোন্মত্ততা আসলে জীবনবিমুখ অসুন্দরকে দূর করার জন্য।


“প্রলয় বয়েও আসছে হেসে / মধুর হেসে।”— কার আগমনের কথা বলা হয়েছে? প্রলয় বয়েও তার হাসির কারণ কী? ১+২=৩

● আলোচ্যমান উদ্ধৃতিতে ধবংসরূপী শিবের আগমনের কথা বলা হয়েছে।

● শিব রক্ষক ও সংহারক | সংহারকরূপী শিব ভয়ংকর | তিনি তখন প্রলয়দেবতা | তাঁর জটাভার দুলে উঠলে বিশ্বচরাচর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। যা-কিছু জরাজীর্ণ, অসুন্দর, তা সবই তিনি ধ্বংস করেন পাগলা ভোলার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে | কিন্তু এই ধ্বংসের পিছনে লুকিয়ে থাকে নবসৃষ্টির আশ্বাস | এই কারণেই প্রলয় বয়ে আনলেও আপন সৃষ্টির আনন্দে মহাকালের মধুর হাসি ধ্বনিত হয় |


“ওই ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কীসের তরে ভর?”—কবির এই মন্তব্যটিতে কোন্ ইঙ্গিত পাওয়া যায় ?

● রাজনৈতিক এবং সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই কখনও শান্তির পথে হতে পারে না। রুদ্রমূর্তিতেই সুন্দরের অভিষেক হয়| বাস্তবজীবনেও ধ্বংসের মধ্যেই থাকে সৃজনের বীজ। তাই ভাঙন দেখে ভয় না পেয়ে জয়ধ্বনি করা প্রয়োজন | কারণ, ভয়ানকের মধ্যে দিয়ে অভয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটে। সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে| ভয়ংকরের বেশে সুন্দরের আগমনকে স্বাগত জানানোর কথাই এখানে কবি বলেছেন।


“দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর—” প্রসঙ্গটি উল্লেখের কারণ লেখো।

● ‘দিগম্বর’ অর্থাৎ মহাদেব নটরাজমূর্তিতে ধ্বংসের তাণ্ডব সৃষ্টি করেন। কিন্তু তা আসলে সৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্যই। দিগম্বরের তৃতীয় নেত্রের উপরে থাকে চাঁদ, যা সবহারানো রূপে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা ঘটায়। স্বাধীনতা ও সমাজ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখা কবি এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন কারণ, বিপ্লবের পথে ধ্বংস অনিবার্য হলেও তা আসলে সুন্দরের অভিষেককেই নিশ্চিত করে। কবি কল্পনা করেছেন, ওই চাঁদের আলোই অন্ধকারে পথ দেখাবে।


“বধূরা প্রদীপ তুলে ধর।” কবি বধূদের প্রদীপ তুলে ধরতে আহ্বান করেছেন কেন?

● চিরসুন্দরের পূজারি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী চেতনায় উপলব্ধি করেছেন প্রলয়দেবের আগমন | জীর্ণ সমাজের অচলায়তন ভেঙে মহাকাল শিব সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর আগমন ধ্বংসাত্বক হলেও নেপথ্যে আছে শুভসৃষ্টির বার্তা | তাই প্রলয়দেবকে স্বাগত জানানোর জন্য কবি বধূদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলেছেন। আসলে কবি এখানে ভাঙনদেবকে বরণ করে নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন বধূদের উদ্দেশ্যে।

প্রলয়োল্লাস কবিতার রচনাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান-৫)


“ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখির ঝড়।” ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার বিষয়বস্তুর পরিপ্রেক্ষিতে মন্তব্যটির তাৎপর্য আলোচনা করো।

● ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অগ্নিগর্ভ সময়ে কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি রচিত হয়েছে | অন্যদিকে, সমগ্র পৃথিবীজুড়ে নানাভাবে মুক্তি আন্দোলনের যে ঘটনা ঘটছিল কবি সেগুলি সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন। এসব থেকেই তাঁর মনে হয় যে, নতুন দিনের আগমন সুনিশ্চিত হতে চলেছে। এবং তার আগমন ‘কালবৈশাখির ঝড়’-এর মতো অর্থাৎ কঠিন সংগ্রামের রক্তাক্ত পথ ধরে সর্বনাশের বিস্তারে এই পরিবর্তন আসবে—“বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর।” সর্বনাশী ধুমকেতুর মতো তার আগমন ঘটবে। সশস্ত্র সেই আবির্ভাবে (“রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে”) স্থিতাবস্থার আসন টলে যাবে। মধ্যাহ্ন সূর্যের প্রখরতা কিংবা মেঘগর্জনের মতো প্রবলভাবে ঘটবে বিপ্লবীশক্তির আগমন। মহাসমুদ্র দুলে উঠবে সেই ভয়ংকরের আগমনে। এই ভয়ংকরের আড়ালেই রয়েছে সুন্দরের প্রতিশ্রুতি। “মহানিশার শেষে/আসবে ঊষা অরুণ হেসে।” প্রলয়ের বে এ হল ‘চিরসুন্দর’এর আগমন— ভাঙনের মধ্য দিয়ে সৃজনই তার লক্ষ। তাই ভয়ংকরকে ভয় না পেয়ে তার জয়ধ্বনি করতে বলেছেন কবি, কারণ ‘কালবৈশাখির ঝড়’-এই ওড়ে ‘নূতনের কেতন’—“কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর।”


“দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়।”— মন্তব্যটির বিশ্লেষণ করো। কবিতাটিতে প্রসঙ্গটি উল্লেখের কারণ কী?

● কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবল স্বরূপকে তুলে ধরার জন্য প্রশ্নোদ্ভূত বিষয়টির উপস্থাপনা করেছে। মধ্যাহ্নকালীন সূর্যের দীপ্তি ভয়াল, তা অগ্নিজ্বালা সৃষ্টি করে। আবার যখন সেই আকাশে মেঘ করে, মনে হয়, যেন পিঙ্গল জটাজাল সৃষ্টি হয়েছে | সেই মেঘ থেকে ঝড়ে পড়া বৃষ্টি যেন দিগন্তেরই কান্না | বিন্দু বিন্দু করে পড়া সেই চোখের জলই সপ্তমহাসিন্ধুকে আলোড়িত করে তোলে | প্রলয়ের এই রূপকে শুধু প্রকৃতিতেই নয়, চারপাশের সমাজজীবনেও কবি প্রত্যক্ষ করেছেন। ● প্রলয়ের বিভীষিকাতেই বিশ্বমায়ের অভিষেক দেখেছেন কবি। যুগবাণী গ্রন্থের ‘নবযুগ' নামক রচনায় নজরুল লিখেছেন—“আজ মহাবিশ্বে মহাজাগরণ, আজ মহামাতার মহা আনন্দের দিন, আজ মহামানবতার মধ্যযুগের মহাউদ্‌বোধন।” এই অভিষেককেই কবি দেখেছেন ভয়ংকরের মধ্য দিয়ে। বিক্ষোভ-আন্দোলনের তীব্রতায় ধ্বংসের যে উন্মাদনা কবির চোখে পড়ে তার সঙ্গে কবি মিল খুঁজে পান প্রকৃতির রুদ্ররূপের। সেই রূপে মানুষ শঙ্কিত ও দিশাহারা হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তার মধ্যেই নতুন দিন ও জীবনের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি কবি খুঁজে পেয়েছেন। সংগ্রামের সেই ভয়ংকর রূপকে প্রকাশ করতে গিয়েই কবি মন্তব্যটি করেছেন।


“জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে/জরায় মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে!” ‘জগৎ জুড়ে প্রলয়’ কথাটির অর্থ লেখো। এই প্রলয়ের সার্থকতা কী?

● কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পটভূমিতে রচিত হলেও পৃথিবীজুড়ে যে গণমুক্তির সংগ্রামসমূহকে কবি নানাভাবে সংঘটিত হতে দেখেছেন, তাও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে | কাব্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাও কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে। রাশিয়ার বিপ্লব, তুরস্কে কামাল পাশার উত্থান, আয়ারল্যান্ডের বিপ্লব ইত্যাদি ঘটনা নজরুলের মধ্যে প্রবলভাবে রেখাপাত করেছিল | সংগ্রাম এবং শোষণমুক্তির নানা চেহারা বিক্ষিপ্ত আকারে নানাভাবে থাকলেও বিপ্লবের সেই উন্মাদনা কবিকে স্পর্শ করেছিল | ‘জগৎ জুড়ে প্রলয়’ বলতে এই বিশ্বব্যাপী সংগ্রাম-আন্দোলনের কথাই বোঝানো হয়েছে।

প্রলয় ধ্বংসের বার্তাবাহক হলেও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এই প্রলয়কে কবি স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ, তাঁর মতে এই প্রলয় প্রচলিত ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন দিনের প্রতিষ্ঠাকে নিশ্চিত করবে।—“ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?—প্রলয় নূতন সৃজনবেদন!/আসছে নবীন—জীবনহারা অসুন্দরে করতে ছেদন!” এই ‘সৃজন’ই আসলে স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা| ‘যুগবাণী’র ‘নবযুগ’ রচনায় নজরুল লিখেছিলেন—“নরে আর নারায়ণে আজ আচার-ভেদ নাই | আজ নারায়ণ মানব। তাঁহার হাতে স্বাধীনতার বাঁশী।” প্রলয়ের মধ্যে এই নতুন ব্যবস্থাকেই প্রত্যক্ষ করেছেন কবি| তাই ভয়ংকরকে ভয়কে না পেয়ে তার জয়ধ্বনি করার কথা বলেছেন তিনি।


“ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?— প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন! - কোন্ ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে? প্রলয়কে ‘নূতন সৃজনবেদন’ বলার তাৎপর্য কী?

● জাগ্রত যৌবনের সার্থক রূপকার কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় রুদ্ররূপী শিবের সংহারমূর্তি কল্পিত হয়েছে। সেই সংহারমূর্তিতে শিব অসুন্দরকে ধ্বংস করে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করবেন । এখানে মহাকাল শিবের ধ্বংসলীলার কথাই বলা হয়েছে।

জীর্ণ পাতা ঝরে গিয়েই গাছে গাছে নবকিশলয়ের জন্ম হয়। সামাজিক জীর্ণতাকেও ধ্বংস করতে হয়; না হলে নতুন সৃষ্টি সম্ভব নয়| সমকালীন বাংলাদেশে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কালো ছায়া নেমে এসেছিল | সাম্রাজ্যবাদী শাসন মানুষের প্রাণের মুক্তিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল | অন্যদিকে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, পরানুকরণপ্রিয়তা ইত্যাদি বিষয়গুলি সমাজের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করেছিল। মনুষ্যত্বের পদদলন, শোষণ, বঞ্চনা প্রভৃতি হয়েছিল সাধারণ মানুষের ভাগ্যলিপি। নজরুল আন্তরিকভাবে এই সমাজের ধ্বংস চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই প্রলয়রূপী শিবের আবির্ভাব কামনা করেছেন | শিব হলেন একাধারে সংহারক ও রক্ষক | তিনি ধ্বংসের মধ্যে দিয়েই সৃষ্টি করেন। তাঁর আবির্ভাবে প্রলয় সংঘটিত হয় | প্রলয় নিয়ে আসে ধ্বংস আর ধ্বংসের সঙ্গেই আসে বিনাশের জন্য বেদনা | কিন্তু প্রলয়ের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টির আগমনে নিশ্চিত হয়। আপাত ধ্বংসের নেপথ্যে সৃজনের অবস্থান বলে কবি প্রলয়কে ‘সৃজন-বেদন’ বলেছেন।

“কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর!” -কালভয়ংকরের পরিচয় দাও। কীভাবে তিনি সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করবেন বলে কবির ধারণা।

● কালভয়ংকর হলেন ‘প্রলয়- নেশার নৃত্য পাগল' শিব। তিনি আসেন কালবৈশাখীর রূপ ধরে। তাঁর হাতে বজ্রশিখার মশাল। সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতুর মতো তাঁর আগমন | রক্তমাখা কৃপাণ হাতে অট্টহাসি হেসে তিনি যাবতীয় অশুভ শক্তির অবসান ঘটান। জীবনহারা অসুন্দরকে তিনি ছেদন করেন বলে তাঁর আগমন ধ্বংসাত্মক | সমাজসভ্যতা যদি রথের প্রতীক হয়, তবে তিনি রথের সারথি। রক্ত-তড়িৎ চাবুক হেনে তিনি দুরন্ত অশ্বের গতিকে আরও বাড়িয়ে দেন। সেই অশ্বক্ষুরের দাপটে আকাশের খিলানে উল্কার ছোটাছুটি শুরু হয় | পরিবর্তন বা সমাজবদল নিশ্চিত হয়।

→ সমাজের জীর্ণপুরাতনকে ধ্বংস করে মহাকাল শিব নতুনের বার্তা বয়ে আনেন | প্রলয়রূপী শিবের আগমন প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে নতুন সূর্যোদয় প্রার্থনা করেছেন। মানুষের অন্ধবিশ্বাস, বিপথগামিতা, দাসত্ব এবং সর্বোপরি মূল্যবোধের অবক্ষয় দূর করতে না পারলে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় | শিব নিজেই সত্য ও সুন্দরের প্রতীক। তাঁর ধ্বংসমূর্তি যেমন প্রলয়, তেমনই তাঁর সৃষ্টিক্রিয়া সুন্দরের প্রতিষ্ঠা। সমাজের জীর্ণ অচলায়তনের প্রাচীর ভেঙে দিয়ে তিনি সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করবেন। এই কারণেই কবি মহাকালরূপী শিবের আগমনে সকলকে জয়ধ্বনি দিতে বলেছেন।


“তোরা সব জয়ধ্বনি কর!” —কাদের উদ্দেশ্যে কবির এই আহ্বান? কবিতায় কেন এই আহ্বানটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে লেখ।

● ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি নজরুল ইসলাম দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এই আহবান জানিয়েছেন।

● ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় মোট উনিশবার ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ এই আহবানসূচক পঙ্ক্তিটি উচ্চারিত হয়েছে, যা বুঝিয়ে দেয় এই পঙ্ক্তিটিতেই কবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। আসলে ‘প্রলয়োল্লাস’ হল ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে সৃজনের বন্দনা | স্বাধীনতাপ্রিয় যে তরুগের দল তাদের দুর্জয় সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে পরাধীনতা এবং সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে চায় কবি তাদেরই জয়ধ্বনি করতে বলেছেন। এই যুবশক্তির মধ্যে আপাত ধ্বংসের উন্মাদনা রয়েছে, কবির কথায় তারা হল ‘অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল,' কিন্তু তারাই সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে আঘাত করে নতুন চেতনা, বিপ্লবের বার্তাকে বহন করে আনে। শক্তির প্রচণ্ডতা আর অদম্য স্পৃহায় তারা সমাজের যাবতীয় অসুন্দরকে দূর করে আপাত ভয়ংকরের বেশ ধরে। এর মধ্যে দিয়ে পৃথিবীতে নবপ্রাণের প্রতিষ্ঠা ঘটে, প্রাণহীনতার বিনাশ সাধন হয়। “...জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে/জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো ওই বিনাশে!” প্রলয়ংকর শিবের মতো রুদ্রমূর্তিতে যে বিপ্লবী শক্তির অভ্যুদয় ঘটে তারাই ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে সৃজনের কারিগর। তাই তাদের অভ্যর্থনা জানাতে হবে সমাজকে সুন্দর করে তুলতে। এ কারণেই ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ পঙ্ক্তিটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে কবিতায় | এ হল বিপ্লবী যুবশক্তির প্রতি কবির মুগ্ধ অভিবাদন |


“ওই ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কীসের তবে ডর?” ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় ভাঙা-গড়ার কোন্ রূপকে কবি ফুটিয়ে তুলেছেন লেখো।

● ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি নজরুল চিরবিদ্রোহী নবযৌবনের বন্দনা করেছেন | এই বিপ্লবী শক্তির আগমন ঘটে ভয়ংকরের বেশ ধরে। ‘মহাকালের চণ্ড-রূপে’ অর্থাৎ শিবের প্রলয়ংকর মূর্তিতে যেন তাদের আগমন। ‘জয় প্রলয়ঙ্কর’ ধ্বনি তুলে জরাগ্রস্থ মুমূর্ষু সমাজের তারা অবসান ঘটায় | চারপাশ দিশাহারা হয়ে যায় শক্তির সেই প্রচণ্ডতায়| রক্তাক্ততা আর বিশৃঙ্খলতা ও অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে তাদের এই আবির্ভাবে যে ধ্বংসের উন্মাদনা থাকে তা মানুষকে শঙ্কিত করে তোলে।

ধ্বংসের এই প্রচণ্ডতা আসলে সৃষ্টির নবনির্মাণের জন্য। প্রলয়ের দেবতা শিব ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকে নিশ্চিত করেন। সেভাবেই বিপ্লবী শক্তিও আপাত নৈরাজ্যের আড়ালে সুস্থ সুন্দর এক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখে | কবির চোখে এই প্রলয় তাই জরত্বের অবসান ঘটানোর জন্যও | মহানিশার শেষেই রয়েছে ভোরের সূর্যোদয় | অন্ধকারাগারের বন্ধকূপে যূপকাষ্ঠে যে দেবতা বাঁধা আছেন তাকে মুক্ত করে মানবতার প্রতিষ্ঠা ঘটানোই এই তরুণদের লক্ষ্য। এই প্রলয় তাই “নূতন সৃজন-বেদন”। জীবনহারা অসুন্দরকে ছিন্ন করার জন্য যার আগমন ঘটে। তাই ভাঙনের অনুশীলনে আসলে নিহিত থাকে সৃজনের স্বপ্ন | স্বাধীনতা, সাম্য আর সম্প্রীতির বীজমন্ত্রে থাকে নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত।


‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে আলোচনা

● কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ আসলে কবির জীবনউল্লাসের কবিতা। শোষণ-বঞ্চনা, পরাধীনতার নাগপাশকে ছিন্ন করে জীবনের যে জাগরণ ঘটে, স্বাধীনতা আর সাম্যের ভোরে যার প্রতিষ্ঠা হয় তাকেই কবি স্বাগত জানিয়েছেন | গ্রন্থাকারে যে বছর ‘প্রলয়োল্লাস’-এর প্রকাশ সেই ১৯২২ সালেই ধূমকেতু পত্রিকায় এক সংখ্যায় নজরুল লেখেন— —“পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে। সকল কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খলা মানা-নিষেধের বিরুদ্ধে।” ‘প্রলয়োল্লাস' কবিতাতেও দেখা যায়—"সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল'—স্পষ্ট বিদ্রোহ | ভয়ংকরের বেশে এ হল সুন্দরের আবির্ভাব | প্রবল তেজ, বিপর্যয় নিয়ে যে বিপ্লবীশক্তির আগমন ঘটে তা প্রাথমিকভাবে শঙ্কিত করতে পারে, কিন্তু বিশ্বমায়ের আসন সে-ই পাতে| “অন্ধ কারার বন্ধ কূপে/দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে”— এই ‘দেবতা’ স্বাধীনতার প্রতীক। এখান থেকে মুক্ত হয়ে তার আগমনের সময় হয়ে গিয়েছে। রথচক্রের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তাই ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি বলেছেন যে ধ্বংস দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, প্রাণহীন অসুন্দরকে বিনাশ করতেই এই ধ্বংস | এরপরই চিরসুন্দরের প্রতিষ্ঠা ঘটবে। তাকেই স্বাগত জানানোর জন্য সকলকে আহবান করেছেন কবি।


‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটিতে কবির রচনারীতির যে যে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে, তা লেখো।

● বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে নজরুলের প্রতিষ্ঠা হলেও সেই বিদ্রোহের সুরকে কবিতায় সার্থক করে তুলেছিল নজরুলের অনবদ্য রচনাশৈলী । এক্ষেত্রে শব্দব্যবহারের বৈচিত্র্য তাঁর কবিতাকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল | পবিত্র সরকার নজরুল সম্পর্কে বলেছেন— “বাংলার প্রায় সমস্ত কবির তুলনায় নজরুলের অভিধান বিস্তৃততর।” কিন্তু আরবি-ফারসি শব্দের যে বিপুল ব্যবহার সাধারণত নজরুলের কবিতায় দেখা যায় তা ‘প্রলয়োল্লাস’-এ নেই | বরং তৎসম শব্দবাহুল্য এই কবিতায় বনিময়তা থাকা সত্ত্বেও গাম্ভীর্য নিয়ে এসেছে। যেমন—“দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়/ দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!” কবিতার চালে একই সঙ্গে উচ্ছ্বাস আর গাম্ভীর্য মিলে যাওয়া নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী | কবিতার পঙ্ক্তিগুলি অসম | কিন্তু তারই অন্ত্যমিল সার্থকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে | প্রায় ধ্রুবপদের মতো ফিরে এসেছে “তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ এই পঙ্ক্তিটি। এই জয়ধ্বনিই কবিতার মূলকথা—তা স্বাধীনতার, নবযুগের। বিপ্লবীশক্তির যে জীবনোল্লাস কবিতার প্রাণ তাকে ভাষা এবং ছন্দের মধ্যে অনায়াসে মিশিয়ে দিয়েছেন কবি | তীব্র বেদনা, ক্রোধ, সেখান থেকে নতুন জাগরণের স্বপ্ন—কবিতার নির্মাণকে ছুঁয়ে আছে ভালো করেই।


‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা অবলম্বনে কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামী চেতনার পরিচয় দাও।

● কবি নজরুল কলমকে তরবারিতে রূপান্তরিত করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের শরিক হয়েছিলেন। ‘প্রলয়োল্লাস' কবির সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার অনবদ্য প্রকাশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়েই নজরুলের কবিপ্রতিভার বিকাশ | তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন সমকালীন সমাজের সর্বব্যাপী অবক্ষয়ের রূপ | এই পচনশীল সমাজ ধ্বংস করে নতুন সমাজ গড়ার অদম্য ইচ্ছা বুকে নিয়ে কবি মহাকালরূপী শিবের আগমন কামনা করেছেন | নজরুল জানেন, সর্বব্যাপী দুর্দশা আর অবক্ষয় থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে অপ্রতিরোধ্য নটরাজ শিবকেই প্রয়োজন। এই অলৌকিক শক্তিই সামাজিক পঙ্কিলতায় ফোটাবে মনুষ্যত্বের শতদল | মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হলেই সমাজে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা হয়। তার জন্য জীর্ণতার অবসান চাই | ধ্বংসরূপী শিব তাঁর বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে রুদ্রমূর্তিতে আবির্ভূত হবেন। তিনি ভেঙে দেবেন জড়তাগ্রস্ত, বিপথগামী সমাজকে | সমগ্র কবিতায় প্রলয়রূপী শিবের সংহারক মূর্তিকেই কবি তুলেছেন। নজরুলের সংগ্রামী চেতনার পথেই নটরাজ শিবের আবাহন সূচিত হয়েছে। এই শিবই দিনবদলের সূচনা করবেন। শিবের প্রতীকে নজরুল তারুণ্যের শক্তিকে গৌরবময় মর্যাদা দিয়েছেন | সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠার জন্য কবির এই প্রয়াস তাঁর দেশপ্রেমের স্বরূপকেই স্পষ্ট করে তোলে |


‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় নজরুল সমাজ পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তার বর্ণনা দাও। অথবা, ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার পটভূমি আলোচনা প্রসঙ্গে নজরুলের কবিমানসের পরিচয় দাও।

● ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ | একদিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে ইংরেজ সরকার সন্ত্রস্ত হয়ে কঠোর দমননীতির আশ্রয় নিয়েছে। বাংলার বিপ্লবীরা দেশের স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িকতার কালসাপ ফণা তুলেছে সমাজের অলিতে-গলিতে। ধর্মের নামে ভণ্ডামি চলছে চারিদিকে মেকি দেশনেতারা স্বার্থ স্বার্থ খেলায় মেতে উঠেছে। কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয়কে আরও সর্বব্যাপী করেছে। এই অবস্থায় নজরুল উপলব্ধি করেছিলেন যে আগে সমাজ পালটাতে হবে। জড়তাগ্রস্ত মুমূর্ষু মানুষকে জীবনের আলোয় ফিরিয়ে আনতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন প্রলয়রূপী শিবের মতো কোনো অলৌকিক শক্তিকে| সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে জাতিকে গ্রাস করবে অসুন্দর| কবি কামনা করলেন নটরাজ শিবের আবির্ভাবকে | এই নটরাজ শিবই হলেন নববিধানের বাণীবাহক | তিনিই জীর্ণ সমাজকে ধ্বংস করে সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করবেন। মানসনেত্রে সেই মহাকালের উপস্থিতি উপলব্ধি করলেন | আর আশাবাদী হলেন এই ভেবে—

“এবার মহানিশার শেষে

আসবে ঊষা অরূণ হেসে।”

নবসৃষ্টির নবআশ্বাসে জয়ধ্বনি দিলেন সেই প্রলয়ংকরের। ধ্বংস দেখে ভয় নয়, বরং সৃষ্টিসুখের উল্লাসে টগবগিয়ে উঠল কবিমন | সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় কাল-ভয়ংকরের ভীষণমূর্তি তখন আর ভীতিজনক মনে হল না। বরং তাঁকে বরণ করার প্রত্যাশায় কবি দেশবাসীকে আহবান জানালেন |


কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস' কবিতার নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে বিচার করো।

● ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি কবি নজরুল ইসলামের শুভচেতনার | বাণীরূপ | সত্য, শিব ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করতে কবি এই কবিতায় ধ্বংসের দেবতা শিবকে আহবান করে এনেছেন। ‘প্রলয়োল্লাস' নামকরণটির মধ্যেই শিবের ভাঙাগড়ার নিগূঢ় তত্ত্ব আভাসিত।

শিব হলেন প্রলয়দেব। একদিকে তিনি যেমন রক্ষক, অন্যদিকে তেমনই সংহারক| আলোচ্যমান কবিতায় প্রলয়দেবের ধ্বংসাত্মক মূর্তিই প্রধান| তিনি আসছেন কালবৈশাখী ঝড়ের রূপ ধরে। সামাজিক অসংগতি, ধর্মান্ধতা, পরাধীনতা এবং সর্বব্যাপী অন্যায়-অবিচারের নিরসন ঘটাবেন নটরাজ শিব। তাঁর আগমনে কবি আকাশে নতুনের কেতন উড়তে দেখেছেন। প্রলয়নেশায় নৃত্যপাগল শিব সিন্ধুপারের আগল ভেঙে বন্দি ভারতীয়দের মুক্তি দেবেন | মহাভয়ংকর রূপে বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে তিনি আসছেন |

তাঁর ‘অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর।” দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা তাঁর চোখে প্রতিভাত। জগৎ জুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্কের পরিবেশ। কিন্তু কবি বলতে চেয়েছেন সেই আতঙ্ক সাময়িক কারণ মহাকাল শিব ভাঙাগড়ার নিত্যখেলায় মগ্ন। সামাজিক অন্ধকার দূর করে, তিনিই শুভচেতনার উদয় ঘটাবেন | নতুন সৃষ্টির জন্য ভাঙন তাঁর নেশা | তাই প্রলয়কালেও তাঁর উল্লাস দেখা যায়। কবিও সেই কথাই বলেছেন— “প্রলয় বয়েও আসছে হেসে/ মধুর হেসে।” কবির অভিপ্রেত বক্তব্যকে সামনে রাখলে কবিতাটির নামকরণ সার্থক বলেই মনে হয়।


We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.