পথের দাবী গল্পের বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্নাবলী (প্রশ্নমান - ৫)

পথের দাবী গল্পের বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্নাবলী (প্রশ্নমান - ৫), পথের দাবী Pdf, Pather Dabi Question Answer, পথের দাবী রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর.

পথের দাবী গল্পের বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো । সবশেষে পিডিএফ (PDF) ফাইল দেওয়া আছে ।

পথের দাবী গল্পের বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্নাবলী (প্রশ্নমান - ৫)

১. পলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিককে পুলিশ স্টেশনে আনার পর ক্ষী ঘটনা ঘটেছিল?

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী' গল্পাংশে পলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিককে পুলিশের বড়োকর্তার সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাকে দেখে মনে হয়েছিল তার আয়ু যেন আর বেশিদিন নেই | ফরসা রং রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গিয়েছিল। বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি নয়, কিন্তু তার শীর্ণ চেহারা দেখে তা মনে হয়। অল্প কাশির পরিশ্রমেই সে হাঁপাতে শুরু করেছিল। তাকে নিজের পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হলে সে নিজের নাম গিরীশ মহাপাত্র বলে, তার পোশাকও ছিল অদ্ভুত | তেলের খনিতেই কাজ করত জানায় সে। বর্মা থেকে সে-ও রেঙ্গুনে এসেছিল। তার ট্যাঁক থেকে একটা টাকা, লোহার কম্পাস, মাপ করার জন্য কাঠের ফুটরুল, কয়েকটা বিড়ি, একটা দেশলাই আর একটা গাঁজার কলকে বার করা হয়। পুলিশের কর্তা নিমাইবাবু তাকে জিজ্ঞাসা করেন সে গাঁজা খায় কিনা। তার উত্তরে গিরীশ মহাপাত্র বলে, গাঁজার কলকেটা সে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে। কারোর যদি কাজে লাগে সে দিয়ে দেবে। গিরীশ মহাপাত্রের কথাবার্তা শুনে, তার সাজপোশাক, আচার-ব্যবহার দেখে, সকলেই নিশ্চিত হয় যে, এই গিরীশ মহাপাত্র কখনোই সব্যসাচী মল্লিক হতে পারেন না। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, খানিকক্ষণ পুলিশ স্টেশনে তার সঙ্গে তামাশা করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

২. “এ লোকটিকে আপনি কোনো কথা জিজ্ঞেস না করেই ছেড়ে দিন, যাকে খুঁজছেন সে যে এ নয়, তার আমি জামিন হতে পারি।”—লোকটি কে? তাকে ছেড়ে দিতে বলার কারণ কী?

লোকটি হল গিরীশ মহাপাত্রের ছদ্মবেশে পলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী চক্রবর্তী।

রেঙ্গুন পুলিশ স্টেশনে বর্মা অয়েল কোম্পানির তেলের খনির কারখানায় মিস্ত্রির কাজ করা কিছু লোককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আটক করেছিলেন। তাদের মধ্যে সব্যসাচী সন্দেহে একটি লোককে রেখে অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হয়। লোকটি কাশতে কাশতে আসে| বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি নয় | কিন্তু ভীষণ রোগা | একটু কাশির পরিশ্রমেই সে হাঁপিয়ে উঠছিল। দেখে মনে হচ্ছিল সংসারে তার মেয়াদ বোধহয় আর বেশি নেই। এ ছাড়াও তার পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল অদ্ভুত ধরনের। গায়ে জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাঞ্জাবি, তার বুক পকেট থেকে একটা রুমালের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল| পরনে বিলিতি মিলের কালো ঝলমল পাড়ের সূক্ষ্ম শাড়ি, পায়ে সবুজ রঙের ফুল মোজা, হাঁটুর ওপরে লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা, আর বার্নিশ করা পাম্প শু। মাথার চুল সামনের দিকে বড়ো, কিন্তু ঘাড় ও কানের দিকে নেই বললেই চলে | এই অদ্ভুতদর্শন ব্যক্তি কখনোই সব্যসাচী হতে পারেন না বলেই অপূর্বর মনে হয়েছিল| হয়তো সব্যসাচী বলে সন্দেহ হলেও অপূর্ব মন থেকে চাইছিল তিনি যেন পুলিশের হাতে ধরা না পড়েন। এই কারণেই অপূর্ব নিমাইবাবুকে অনুরোধ করেছিলেন তাকে ছেড়ে দিতে।

৩. “মহা হুঁশিয়ার পুলিশের দলকে আজকের মতো নির্বোধ আহাম্মক হতে বোধ করি কেউ কখনো দেখিনি।”—পুলিশের দলকে ‘নির্বোধ আহাম্মক’ বলা হয়েছে কেন? পুলিশ সম্পর্কে বক্তার এমন উক্তির পিছনে তার কোন্ মানসিকতা সক্রিয় লেখো। ২+৩

নিমাইবাবুর নেতৃত্বে পুলিশের দল রাজবিদ্রোহী সব্যসাচীকে ধরার জন্য সন্দেহভাজন কিছু লোককে থানায় আটক করে। তাদের মধ্যে গিরীশ মহাপাত্র নামে এক ব্যক্তিকে সব্যসাচী ভেবে নানাভাবে জিজ্ঞাসা ও তল্লাশি চালায় | শেষপর্যন্ত কোনো তথ্য না পেয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসার নিমাইবাবুও ব্যর্থ হন সব্যসাচীকে খুঁজে বের করতে। কিন্তু অপূর্ব বুঝেছিল গিরীশ মহাপাত্রই ছদ্মবেশী সব্যসাচী| এই কারণেই সে পুলিশদলকে ‘নির্বোধ আহাম্মক’ বলেছে।

পুলিশদল সম্পর্কে অপূর্বর এই মন্তব্যের পিছনে তার প্রচ্ছন্ন দেশপ্রেম সক্রিয় ছিল। কেন-না, সে মনেপ্রাণে চাইছিল সব্যসাচী যেন ধরা না পড়েন। তার এমনও বিশ্বাস ছিল যে, সব্যসাচী এত সাধারণ রাজবিদ্রোহী নন। তাঁর ছদ্মবেশ, এতই অকৃত্রিম ছিল যে, বোঝাই মুশকিল হত তিনি কোন্ দেশের মানুষ | দশ-বারোটা ভাষায় তিনি অনর্গল কথা বলতে পারতেন। সুতরাং তাঁকে ধরা সহজ কাজ নয়। অপূর্ব নিজেই বিস্মিত হয়েছিল সব্যসাচীর পোশাক ও চেহারা দেখে। নাটক যে এত বাস্তব হতে পারে, তা তার কল্পনার অতীত ছিল। পুলিশকে নির্বোধ আহাম্মক বলার মধ্যে পুলিশের প্রতি তাচ্ছিল্য যেমন আছে তেমনই সব্যসাচীর দক্ষতা এবং কৌশলকে নীরবে সেলাম জানানোও আছে।

8. “পৃথিবীর যে-কোনো দেশে, যে-কোনো যুগে যে-কেউ জন্মভূমিকে তার স্বাধীন করবার চেষ্টা করেছে, তাকে আপনার নয় বলবার সাধ্য আর যার থাক, আমার নেই।”—এই উক্তির আলোকে বক্তার মনোভাব ব্যক্ত করো।

অপূর্ব বাংলাদেশের ছেলে। একসময় সেও স্বদেশি করত। সেই সূত্রে বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা | বিশেষ করে সব্যসাচীর মতো দেশভক্তরা তাঁর কাছে পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। শুধু দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে এঁরা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। জীবনমৃত্যু এঁদের কাছে পায়ের ভৃত্য। দেশের মুক্তিপথের অগ্রদূত এই বীর নায়কদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের ছিল দমনমূলক মনোভাব। যে-কোনো উপায়ে এঁদের গ্রেফতার করাই ছিল ব্রিটিশ পুলিশের লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যেই নিমাইবাবু রেঙ্গুনে এসেছেন। তাঁর শিকার সব্যসাচী মল্লিক | অপূর্ব নিমাইবাবুকে কাকা বলে ডাকে | কিন্তু নিমাইবাবুর কার্যকলাপকে | অপূর্ব সমর্থন করে না | স্বদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীকে গ্রেফতার করা মানেই দেশদ্রোহিতা | অপূর্ব চায় না যে, সব্যসাচী গ্রেফতার হোক | এই মনোভাব অপূর্বর দেশপ্রেমকেই তুলে ধরে। নিমাইবাবু তাঁর কর্তব্য পালন করতে এলেও অপূর্বর কাছে কর্তব্যের চেয়ে স্বদেশ বড়ো | পরের দাসত্ব করে আপন জন্মভূমির স্বাধীনতা নে বাধাদানকে অপূর্ব সমর্থন করতে পারে না| তাই যত বিপদই আসুক, সে সব্যসাচীকে একান্ত নিজের বলে স্বীকার করতে পিছপা হয় না। আলোচ্য উক্তির মধ্যে দিয়ে অপূর্বর এই স্বদেশানুরাগই বড়ো হয়ে উঠেছে।

৫. “..তিনি ঢের বেশি আমার আপনার”—অপূর্ব কেন এ কথা বলেছিল?

• শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি মূলত স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল। পরাধীন ভারতবর্ষে দেশকে স্বাধীন করার জন্য, ইংরেজদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য অনেকেই লড়াই করছিলেন, সব্যসাচী, তাঁদের মধ্যে একজন | সব্যসাচী একজন বিপ্লবী ছিলেন, যিনি দেশের জন্য নিজের প্রাণটুকু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন| ‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশে দেখি সব্যসাচী গিরীশ মহাপাত্র ছদ্মবেশ ধারণ করে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। সব্যসাচী এমন ছদ্মবেশ ধারণ করতেন যাতে পুলিশ তাকে ধরতে না পারে। অপূর্ব সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলন না করলেও, সব্যসাচীকে সে মনেপ্রাণে সমর্থন করত। সে জানত যে দেশকে সে ভালোবাসে, সেই দেশকে স্বাধীন করার জন্যই সে লড়াই করছে | পুলিশের। সব্যসাচীকে ধরার জন্য অনেক চেষ্টা করছিল। দেশের টাকায় দেশের লোক দিয়েই শিকারের মতো তারা সব্যসাচীকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল | আর পুলিশের কর্তা ছিলেন অপূর্বর আত্মীয়, সে তাঁকে কাকা বলে ডাকত। আর অপূর্ব এই কারণে নিজেও যথেষ্ট লজ্জিত ছিল | তাই সে বলেছে, দেশকে তথা দেশবাসী'কে এই লজ্জা, অপমান, লাঞ্ছনা থেকে যে মুক্তি দিতে চায় সেই সব্যসাচী অপূর্বর আত্মীয় পুলিশকর্তার থেকে অনেক বেশি আপনার, অনেক বেশি কাছের।

৬. ভামো নগরের উদ্দেশে যাত্রাকালে অপূর্বর কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা বর্ণনা করো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী' গল্পাংশে অপূর্ব রেঙ্গুন থেকে ভামো নগরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। অপূর্ব প্রথম শ্রেণির যাত্রী ছিল। সন্ধ্যা হলে সে প্রতিদিন নিয়ম করে যা করে সেইসবই করেছিল। রাতের খাওয়ার পর অপূর্ব যখন শুতে যায় তখন সে ভেবেছিল প্রথম শ্রেণির যাত্রী হয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাকি রাস্তাটা যেতে পারবে| কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল | সেই রাতে পুলিশের লোক এসে বার-তিনেক তার ঘুম ভাঙিয়ে নাম, ঠিকানা লিখে নিয়ে যায় | অবশেষে বিরক্ত হয়ে অপূর্ব এই ঘটনার প্রতিবাদ করলে বর্মা সাব-ইনস্পেক্টর কটুকণ্ঠে তাকে বলে যে, সে ইউরোপিয়ান নয়, তাই এটা স্বাভাবিক ব্যাপার | এই কথা শুনে অপূর্ব তাকে বলে, সে প্রথম শ্রেণির যাত্রী। তাই কেউ তার ঘুমের বিঘ্ন ঘটাতে পারে না। তার কথায় পুলিশ হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিল এইসব নিয়ম শুধুমাত্র রেলওয়ে কর্মচারীদের জন্য। তাই পুলিশ যদি ইচ্ছে করে তাহলে তাকে ট্রেন থেকে নামিয়েও দিতে পারে, তার প্রতিবাদ করার কোনো অধিকার নেই। পরাধীন ভারতবর্ষে ইংরেজদের হাতে অপমান, লাঞ্ছনার আর-একটি ঘটনা এভাবে সংযোজিত হয় অপূর্বর অভিজ্ঞতায় |

৭. বিদেশি সাহেবের কাছে অপূর্বর অপমানিত ও লাঞ্ছিত হওয়ার যে দুটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তা লেখো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ গল্পাংশে দুটি ঘটনা দেখি যেখানে ইংরেজরা অপূর্বকে অপমান করেছে।

একবার অপূর্বকে বিনা দোষে দণ্ডভোগ করতে হয়েছে। স্টেশনে একবার কিছু ফিরিঙ্গি ছেলে কোনো দোষ ছাড়াই লাথি মেরে তাকে প্ল্যাটফর্ম থেকে বার করে দেয়। অপূর্ব যখন সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যায় তখন সাহেব স্টেশনমাস্টার তাকে শুধু ভারতীয় বলে অপমান করে কুকুরের মতো দূর করে দেয়। নিজের দেশে এইভাবে লাঞ্ছনার দুঃখ অপূর্ব কোনোদিন ভুলতে পারেনি।

আর-একবার রেলপথে অপূর্ব রেঙ্গুন থেকে ভামো নগরের উদ্দেশে যাত্রা করছিল। অপূর্ব ছিল প্রথম শ্রেণির যাত্রী। সারাদিনের সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে অপূর্ব ভেবেছিল প্রথম শ্রেণির যাত্রী হওয়ায় শান্তিতে ঘুমোবে। কিন্তু তার সে ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। বারংবার পুলিশের লোক এসে অপূর্বর ঘুম ভাঙিয়ে তার নামঠিকানা লিখে নিয়ে যায়। একবার সে বিরক্ত হয়ে প্রতিবাদ করলে সাব-ইনস্পেক্টর তাকে কটুকণ্ঠে বলে যে, এসব তাকে সহ্য করতেই হবে কারণ সে ইউরোপিয়ান নয় | অপূর্ব যখন বলে সে প্রথম শ্রেণির যাত্রী, তার সঙ্গে এইরকম কিছু করা অনুচিত, তখন ইনস্পেক্টর জবাব দেয়, এই সমস্ত নিয়ম রেলের কর্মচারীর জন্য তার জন্য নয়। এইভাবেই শুধুমাত্র ভারতীয় বলে তাকে অপমানিত হতে হয়েছিল।

৮. “আমি ভীরু, কিন্তু তাই বলে অবিচারে দণ্ডভোগ করার অপমান আমাকে কম বাজে না, রামদাস।”—প্রসঙ্গ উল্লেখ করে উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

জনপ্রিয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী' রচনাংশ থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত | বাংলাদেশের ছেলে অপূর্ব রেঙ্গুনে অবস্থানকালে ফিরিঙ্গি ও অন্যদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছিল। সেই নিগ্রহের কথা বলতে গিয়েই আলোচ্য উক্তিটির অবতারণা।

অপূর্ব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙালি সন্তান | চাকরির সূত্রে সে রেঙ্গুনে এসেছে| কিন্তু সেখানে একদিন বিনা দোষে কিছু ফিরিঙ্গি ছেলে তাকে লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দেয়। স্টেশনে থাকা কোনো ভারতীয়ই এই ঘটনার প্রতিবাদ করেনি; বরং অপূর্বর হাড়পাঁজর খুব একটা ভাঙেনি জেনে তারা স্বস্তি বোধ করেছে। এর প্রতিবাদ জানাতে গেলে স্টেশনমাস্টার তাকে ভারতীয় বলে কুকুরের মতো বের করে দিয়েছিলেন। বিনা দোষে এই অত্যাচার সহ্য করে এক অব্যক্ত বেদনা তার বুকের মধ্যে গুমরে ওঠে। তাই রামদাসের কাছে সে বলেছে, “তার লাঞ্ছনা এই কালো চামড়ার নীচে কম জ্বলে না তলয়ারকর।” অপূর্ব শিক্ষিত, সভ্য, বিচক্ষণ যুবক | নিরুপদ্রব স্বভাবের হলেও অকারণে অত্যাচারকে সে সমর্থন করতে পারে না। শাসক ইংরেজদের বর্বরোচিত এই আচরণ সমস্ত স্তরের দেশবাসীকেই সহ্য করতে হচ্ছে বুঝে অপূর্ব যন্ত্রণা অনুভব করেছে। আলোচ্য উক্তিটি তার সেই অব্যক্ত বেদনার প্রকাশমাত্র।

৯. “বাস্তবিক, এমন তৎপর, এতবড়ো কার্যকুশলা মেয়ে আর যে কেহ আছে মনে হয় না, হে তলওয়ারকর। তা ছাড়া এত বড়ো বন্ধু”— মেয়েটির সম্পর্কে অপূর্বর এই মন্তব্যের কারণ বিশ্লেষণ করো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী' উপন্যাসের থেকে গৃহীত আমাদের পাঠ্যাংশে অপূর্ব এই মন্তব্যটি করেছে| অপূর্বর বাড়ির ওপরের তলায় যে ক্রিশ্চান মেয়েটি থাকত তার সম্বন্ধে এই কথাটি বলা হয়েছে। অপূর্বর অনুপস্থিতিতে তার ঘরে একদিন চুরি হয়ে গিয়েছিল। ক্রিশ্চান মেয়েটির কৃপায় টাকাকড়ি ছাড়া বাকি সমস্ত কিছু চুরি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে | ক্রিশ্চান মেয়েটি নিজে চোরকে তাড়িয়ে অপূর্বর ঘর তালাবন্ধ করে দেয় । অপূর্ব না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে, অপূর্ব ফেরার পর সে নিজে চাবি দিয়ে তার ঘর খুলে অনাহূতের মতো তার ঘরে যা কিছু ছড়ানো জিনিসপত্র ছিল সেগুলো সব নিজের হাতে গুছিয়ে দেয়। কী চুরি গেছে আর কী কী জিনিস চুরি যায়নি তার এমন নিখুঁত হিসেব সে বানিয়েছিল যে, এই সমস্তকিছু দেখে অপূর্বর মনে হয়েছিল একজন পাস করা অ্যাকাউন্টেন্টের পক্ষেও তা বিস্ময়কর। অন্যের জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে কীভাবে সাহায্য করা যায় তা এই মেয়েটিকে না দেখলে অপূর্ব বুঝতেও পারত না। সবকিছু দেখে অপূর্বর তাকে একজন প্রকৃত বন্ধু বলেই মনে হয়েছিল। মেয়েটির প্রখর বুদ্ধি আর সব দিকে অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে অপূর্ব আশ্চর্য হয়ে আলোচ্য মন্তব্যটি করেছিল।

১০. “আমার মা, আমার ভাই-বোনকে যারা এই-সব সহস্র কোটি অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে চায় তাদের আপনার বলে ডাকবার যে দুঃখই থাক আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম।”—কে, কোন্ প্রসঙ্গে এই উক্তি করেছেন? এর মধ্যে বক্তার কোন্ মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে? ৩+২

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী' উপন্যাসে উপরিউক্ত উক্তিটি আমরা অপূর্বর মুখে শুনি। ফিরিঙ্গিদের হাতে একদিন কীভাবে অপমানিত, নিগৃহীত হয়েছিল সে যন্ত্রণার কথা বার্মা অফিসের সহকর্মী রামদাস তলওয়ারকরের কাছে বলতে গিয়ে অপূর্ব উদ্ধৃত কথাগুলি বলেছে।

অপূর্বকে বিনা দোষেই ফিরিঙ্গি ছোঁড়ারা লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দিয়েছিল| অপূর্ব এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে সাহেব স্টেশনমাস্টার তাকে কেবল ‘দেশি লোক’ এই অজুহাতে কুকুরের মত দূর করে দিয়েছিল। এ অপমান পরাধীন দেশে নিত্য নৈমিত্তিকভাবে ঘটছে| অপূর্ব এই ঘটনায় বেদনা বোধ করে; সে ক্রুদ্ধ হয়, সেই সঙ্গে স্থির সিদ্ধান্তে আসে—দেশের মা-ভাই-বোনকে যারা সমস্ত অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে চায়, তারাই তার সত্যকার আপনার। আর সেই মানুষগুলোকে কাছের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার সমস্ত দুঃখই সে মাথা পেতে নিতে চায়।

এ কথায় অপূর্বর দেশপ্রেমিক সত্তার দিকটি যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই কষ্টসহিস্নুতার, অকপট সাহসিকতার এবং সেইসঙ্গে গভীর হৃদয়ভাবনার দিকেরও প্রকাশ ঘটেছে। কেবল আত্মসর্বস্ব ক্ষুদ্র ঘেরাটোপের সুখী জীবন নয়; বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক অনিশ্চিত জীবনকে গ্রহণ করার আত্মপ্রত্যয়ের পরিচয়ও অপূর্বর কথায় পাই |

১১. “আমাদের তিনি আত্মীয়, শুভাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু তাই বলে আমার দেশের চেয়ে তো তিনি আপনার নন।”—কে, কার সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছে? এই উক্তির আলোকে বক্তার মনোভাবটি ব্যক্ত করো।

অপূর্ব নিমাইবাবু সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছে।

নিমাইবাবুর সঙ্গে আত্মীয়তার সুবাদে অপূর্ব জাহাজঘাটে গিয়ে পলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিক ওরফে গিরীশ মহাপাত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। সেই সূত্রে সে দেখেছিল মহা হুঁশিয়ার পুলিশের দলের নাজেহাল হওয়ার কৌতুককর খণ্ডচিত্র| তলওয়ারকর-এর সঙ্গে এই নিয়ে কথোপকথন প্রসঙ্গে অপূর্বর মনোভাবের কয়েকটি দিক ধরা পড়েছে—

দেশপ্রেমিক: অপূর্ব সাধারণ চাকুরিজীবী হলেও পরাধীন দেশকে বিদেশি শাসনমুক্ত দেখতে চায়। দেশের কল্যাণের জন্যই আন্তরিকভাবে চায়, যেন সব্যসাচী মল্লিক পুলিশের হাতে ধরা না পড়েন।

দেশভক্তির প্রাধান্য: নিমাইবাবু অপূর্বর পিতৃবন্ধু, পরম সুহৃদ | কিন্তু তিনি সুদূর বাংলাদেশ থেকে বর্মায় এসেছেন যে সব্যসাচী মল্লিককে হাজতে পুরতে, তিনি আসলে দেশপ্রেমিক, মুক্তিযোদ্ধা| দেশের মা, ভাই, বোনকে ইনি সহস্র কোটি অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে চান। তাই নিমাইবাবুর চেয়ে সব্যসাচী মল্লিকই অপূর্বর আত্মার আত্মীয় |

স্পষ্টবক্তা: রামদাস অফিসের সহকর্মীমাত্র হলেও তার কাছে নিজের আত্মীয় সম্পর্কে যে ভাবনা অপূর্ব মেলে ধরেছে—তাতে তাকে স্পষ্টবক্তা বললে অত্যুক্তি হয় না।

আবেগপ্রবণতা: এ কথাও ঠিক, অপূর্ব আবেগপ্রবণ | তাই রামদাস যখন নিমাইবাবুর কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্তের জন্য অপূর্বর প্রতি দিক্‌নির্দেশ করেন; তখনই অপূর্ব জোর করে অনেকটা আবেগের বশে, বন্ধুকে অপ্রতিভ করতে না চেয়ে উপরিউক্ত কথাগুলো বলেছিল।

তেজের সঙ্গে বলা অপূর্বর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের ঋজু দিকটির প্রকাশ ঘটেছে।

১২. ‘পথের দাবী’ রচনাংশ অবলম্বনে অপূর্বর চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী' রচনাংশে অপূর্বর অনুভবই হয়ে উঠেছে কাহিনির মুখ্য উপজীব্য।

অপূর্ব বাংলাদেশের ছেলে। একসময় সে-ও স্বদেশি আন্দোলন করত। এখন চাকরির জন্য দেশ ছেড়ে রেঙ্গুনে এসেছে। এখানে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তার বাবার বন্ধু পুলিশকর্তা নিমাইবাবুর| নিমাইবাবুর মুখে সব্যসাচীর বর্ণনা শুনে অপূর্বর মনে এই মহান দেশপ্রেমিক সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও ভক্তি জেগে ওঠে। তবে ক্ষোভ হয় নিমাইবাবুর ওপর | কারণ বাঙালি হয়েও তিনি তাঁর স্বদেশের এতবড়ো একজন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেফতার করতে তৎপর| সব্যসাচী সন্দেহে আটক গিরীশ মহাপাত্রই যে সব্যসাচী তা অপূর্বর অনুমান করতে বিলম্ব হয়নি | তাই সে নিমাইবাবুকে বলেছে—“এ লোকটিকে কোনো কথা জিজ্ঞেস না করেই ছেড়ে দিন, যাকে খুঁজেছেন সে যে এ নয়, তার আমি জামিন হতে পারি।” পুলিশের কাছে এই স্বীকারোক্তি অপূর্বর চরিত্রের দৃঢ়তা এবং দেশপ্রেমকেই তুলে ধরে। সে রামদাসের কাছে পুলিশের সমালোচনা করেছে | এতে অপূর্ব রাজদ্রোহিতার অপরাধে শাস্তি পেতে পারে। কিন্তু মনের ক্রোধ সে চেপে রাখতে পারেনি| শান্তশিষ্ট হলেও অপূর্ব প্রতিবাদী | বৰ্মা সাব-ইনস্পেক্টরের আচরণের প্রতিবাদ করতে তার মধ্যে বিন্দুমাত্র বিচলন দেখা যায় না | সবদিক দিয়ে বিচার করে বলা যায় ‘Doing and Suffering'-এর ভিত্তিতে অপূর্ব আলোচ্য কাহিনি অংশের মুখ্য চরিত্র |

১৩. ‘পথের দাবী’ রচনাংশ অবলম্বনে নিমাইবাবুর চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথের দাবী’ শীর্ষক স্বদেশপ্রেমমূলক উপন্যাসে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের প্রতি লেখকের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী হলেও কিছু অপ্রধান চরিত্র কাহিনির গতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সহায়তা করেছে। এই ধরনের চরিত্রগুলির মধ্যে গল্পাংশে নিমাইবাবুর চরিত্রটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

পেশাগত দায়বদ্ধতা : নিমাইবাবু পেশায় পুলিশ অফিসার। তিনি নিজে বাঙালি তথা ভারতীয় | তথাপি কর্তব্যের খাতিরে ভারতের মুক্তিসংগ্রামের অগ্রদূত সব্যসাচী মল্লিককে ধরতে তিনি সুদূর রেঙ্গুনে এসেছেন। কোনো মোহ বা ভাবাবেগ তাঁকে কর্তব্যচ্যুত করতে পারেনি।

মানবিকতা: পুলিশের বড়োকর্তা হলেও নিমাইবাবু কঠোর বা নিষ্ঠুর নন | সব্যসাচী সন্দেহে ধৃত গিরীশ মহাপাত্রকে নিয়ে তিনি যে রসিকতা করেছেন তা নিছক রঙ্গতামাশা নয়, এর মধ্যে দিয়ে তাঁর চরিত্রের মানবিক গুণও প্রকাশিত। গিরীশ মহাপাত্রের শরীরের প্রতি লক্ষ রেখে তিনি তাকে গাঁজা না খেতে অনুরোধ করেছেন—“ -“কিন্তু ক'দিনই বা বাঁচবে, — এই তো তোমার দেহ, — আর খেয়ো না। বুড়োমানুষটার কথা শুনো।” অন্যদিকে নিমাইবাবুর ভদ্র, শান্ত, মিতবাক স্বভাব তাঁকে শ্রদ্ধেয় করে তুলেছে। এই সমস্ত বিশেষত্বগুলিই কাহিনিতে নিমাইবাবুকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করেছে।

১৪. স্বল্প পরিসরে হলেও ‘পথের দাবী' রচনাংশে রামদাস তলওয়ারকর চরিত্রটি কীভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে লেখো।

রামদাস ‘পথের দাবী' রচনাংশে অতি অল্প পরিসরজুড়ে থাকলেও চরিত্রবৈশিষ্ট্যে সে উল্লেখযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিচক্ষণতা ও বন্ধুপ্রীতি : রামদাস তলওয়ারকর একজন শিক্ষিত মারাঠি যুবক | অপূর্বর অন্যমনস্কতা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সে ভেবেছিল বাড়ি থেকে কোনো দুঃসংবাদের চিঠি পেয়েছে সে। পরে অবশ্য তার ভুল ভেঙে যায় | সে বুঝতে পারে সব্যসাচীর প্রতি অবিচল ভক্তিই অপূর্বকে অন্যমনস্ক করে তুলেছে | তবে সেই ভক্তির প্রত্যক্ষ প্রকাশ বিপদ ডেকে আনতে পারে ভেবে সে অপূর্বকে সাবধান করে দিয়েছে।

সহমর্মিতা: রামদাস অপূর্বর সহমর্মী। ফিরিঙ্গি ছেলেদের অত্যাচার, স্টেশনমাস্টারের অমানবিক আচরণের কথা যখন অপূর্ব বলছিল, তখন সমবেদনায় রামদাসের ফরসা মুখ লাল হয়ে উঠেছে | তার দুই চোখ ছলছল করে উঠেছে।

স্বাদেশিকতা; গাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে অপূর্ব যখন গিরীশ মহাপাত্ররূপী সব্যসাচীর পিছনে পুলিশের ঘুরে বেড়ানোর কথা বলে তখন রামদাসকে শঙ্কিত হয়ে উঠতে দেখা যায় | লেখকের বর্ণনায় সেই ছবি ধরা পড়েছে এইভাবে—“এই মুহূর্তকালের মধ্যে রামদাসের প্রশস্ত উজ্জ্বল ললাটের উপরে যেন কোন এক অদৃশ্য মেঘের ছায়া আসিয়া পড়িয়াছে এবং সেই সুদূর দুর্নিবীক্ষ্য লোকেই তাহার সমস্ত মনশ্চ ক্ষু একেবারে উধাও হইয়া গিয়াছে।”

১৫. ‘পথের দাবী' রচনাংশে খুব স্বল্প পরিসরেও পরিশীলিত মানবিক চরিত্রের আলোয় রামদাস ভাস্বর।

তোমাদের পাঠ্যাংশ ‘পথের দাবী’তে গিরীশ মহাপাত্র যদি সত্যিই সব্যসাচী হন, তবে তাঁর সম্পর্কে তোমার মনোভাব ব্যক্ত করো।

‘পথের দাবী’ রচনাংশে বর্ণিত গিরিশ মহাপাত্রই সব্যসাচী কি না, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সমগ্র উপন্যাসের কাহিনি অনুসারে গিরীশ মহাপাত্রই সব্যসাচী | কিন্তু আলোচ্যমান আংশিক কাহিনিতে বোঝার কোনো উপায় নেই যে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিই সব্যসাচী। এমনকি, অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসার নিমাইবাবু বা জগদীশবাবুও তা বুঝতে পারেননি। ধরা যাক, গিরীশ মহাপাত্রই সব্যসাচী| তাহলে প্রথমেই তাঁকে জানাতে হয় লক্ষ কোটি প্রণাম | শুধু আমি কেন, যেকোনো ভারতীয়ই অবনত মস্তকে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাবে।

গিরীশ মহাপাত্রের বেশভূষা শুধু নিমাইবাবুর পুলিশদলকে, বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমস্‌কেও হার মানিয়ে দেবে। সদা সতর্ক ইংরেজ পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার এমন কৌশল আর কী হতে পারে? সব্যসাচী জানেন, ছদ্মবেশ যেন কখনোই নিছক ‘ছদ্ম’ না হয়। সেই কারণেই তিনি মাথার চুল ছেঁটেছেন অদ্ভুতভাবে | কালচার পালটাতে পারলে পুলিশ তাঁকে চিনতে অক্ষম হবে। সব্যসাচী তাঁর সমগ্র কালচারটাই পালটে ফেলেছিলেন। তাঁর রোগা জীর্ণ শরীর তো ছদ্মবেশ নয় | স্বদেশের মুক্তির জন্য দেশবিদেশে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে শরীরের দিকে নজর দেওয়ার কোনো অবকাশ তাঁর ছিল না। তবে অমর প্রাণশক্তিটুকুর জন্যই সব্যসাচীকে মৃত্যু স্পর্শ করতে পারে না। এমন নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিককে হাজারও কুর্নিশ জানালেও আবেগ প্রশমিত হয় না |

১৬. ‘পথের দাবী’ রচনাংশটির নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে বিচার করো।

‘পথের দাবী’ রচনাংশটি জনপ্রিয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘পথের দাবী’ থেকে সংকলিত | মূল উপন্যাসের নামটিই এখানে অক্ষত রাখা হয়েছে। এখন বিচার্য সংকলিত অংশটির সঙ্গে নামকরণটি কতদূর সংগতিপূর্ণ।

বাঙালি পুলিশ অফিসার নিমাইবাবু সদলবলে এসেছেন রেঙ্গুনে রাজবিদ্রোহী সব্যসাচী মল্লিককে ধরতে। ইংরেজদের অধীনে চাকরি করায় কর্তব্যের খাতিরে তাঁকে সব্যসাচীকে গ্রেফতার করতেই হবে | নিমাইবাবুরা পুলিশস্টেশনে কয়েকজনকে আটক করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজনকে তাঁরা সব্যসাচী বলে সন্দেহ করেন| লোকটির নাম গিরিশ মহাপাত্র | লোকটির পোশাকপরিচ্ছদ দেখে পুলিশেরা নিশ্চিন্ত হন যে, সে সব্যসাচী নয়। কারণ সব্যসাচীর মতো একজন বড়ো মাপের রাজবিদ্রোহীর কালচারের সঙ্গে গিরীশ মহাপাত্রের কোনো মিলই ছিল না। শেষপর্যন্ত তাঁরা গিরীশ মহাপাত্রকে ছেড়ে দেন। অপূর্ব নিজেও ব্রিটিশ সরকারের দমন পীড়নের শিকার হয়েছিল | রেঙ্গুন থেকে ভামো যাবার সময় ট্রেনের কামরায় পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর তাঁকে যেভাবে নিগ্রহ করেছিল, সে-কথা সে ভোলেনি | তাই নিমাইবাবুর ওপর তার ক্ষোভ তীব্র হয়। একজন ভারতীয় হয়ে নিমাইবাবু তাঁরই দেশের মুক্তিসংগ্রামীকে কেন গ্রেফতার করতে এসেছেন তা অপূর্বর মনে প্রশ্ন জাগায়। সব্যসাচী যে দাবি নিয়ে দেশ ছেড়েছেন বা লড়াই করেছেন, সেটাই তো ‘পথের দাবী’| আর অপূর্ব সেই দাবিকেই সমর্থন করেছে। এই বিচারে রচনাংশটির ‘পথের দাবী’ নামকরণ সার্থক।

১৭. ‘পথের দাবী’ রচনাংশে অপূর্বর স্বদেশপ্রেমের যে পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
অথবা, “আমার মা, আমার ভাই-বোনকে যারা এই-সব সহস্রকোটি অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে চায় তাদের আপনার বলে ডাকবার যে দুঃখই থাক আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম।”—এই উক্তির আলোকে বক্তার দেশপ্রেমের পরিচয় দাও।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ রচনাংশে অপূর্ব চরিত্রটির হৃদয়ে স্বদেশ ও স্বজনের প্রতি অনুরাগ থেকেই বোঝা যায় তার দেশেপ্রেম কতখানি অকৃত্রিম |

নিজের বাড়িতে চুরির সংবাদ জানাতে থানায় এসে অপূর্ব দেখেছিল সব্যসাচী সন্দেহে ধৃত গিরীশ মহাপাত্রের খানাতল্লাশির ঘটনা| ‘সব্যসাচী’ নামটি শুনেই অপূর্বর সংবেদ বিচলিত হয়েছিল| গিরিশ মহাপাত্রকে সব্যসাচী ভেবেই সে অন্তঃকরণে প্রার্থনা করেছে যেন পুলিশ তাকে গ্রেফতার না করে। তাই তাকে বলতে শুনি— “কাকাবাবু, এ লোকটিকে আপনি কোনো কথা জিজ্ঞেস না করেই ছেড়ে দিন, যাকে খুঁজছেন সে যে এ নয়, তার আমি জামিন হতে পারি।” আবার নিমাইবাবুর কার্যকলাপকেও সে সমর্থন করেনি। অন্তরের প্রচ্ছন্ন স্বদেশপ্রেম ক্ষোভের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে— “তাছাড়া আমার বড়ো লজ্জা এই যে, এদের যিনি কর্তা তিনি আমার আত্মীয়, আমার পিতার বন্ধু।”

অপূর্বর দেশপ্রেমের সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় রামদাসের সঙ্গে কথোপকথনের মধ্যে। সব্যসাচী সম্পর্কে তার শ্রদ্ধা-ভক্তি চেপে রাখতে না পেরে সে বলেছে—“যাঁকে তিনি দেশের টাকায়, দেশের লোক দিয়ে শিকারের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছেন তিনি ঢের বেশি আমার আপনার।” কোনো কোনো সময় অপূর্ব আবেগময় হয়ে পড়েছে। রাজরোষে পড়তে হবে জেনেও সে মনের ক্ষোভ ও বেদনাকে চেপে রাখতে পারেনি। রচনাংশটির নাম ‘পথের দাবী' হলেও আসলে কাহিনিটি অপূর্বর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের বাণীরূপ।


পথের দাবী গল্পের ব্যাখ্যাভিত্তিক সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্নাবলী (প্রশ্নমান - ৩).pdf File Size - 665KB
View

We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.