বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সাজেশন

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সাজেশন, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ সাজেশন, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর pdf.

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান-৫)


বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে কী কী অসুবিধার কথা প্রাবন্ধিক আলোচনা করেছেন?

● প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' রচনার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি অসুবিধের কথা বলেছেন। প্রথমত, পারিভাষিক শব্দের অপ্রতুলতা। এক্ষেত্রে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এ সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি।

দ্বিতীয় সমস্যা হল, পাশ্চ্যত্য জনসাধারণের তুলনায় এদেশের জনসাধারণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য। বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণাগুলির সঙ্গে পরিচয় না থাকলে কোনো বৈজ্ঞানিক লেখা বোঝা কঠিন। বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার ঘটলে এ সমস্যা অনেকটাই মিটে যাবে।

তৃতীয় সমস্যা, বিজ্ঞান রচনার জন্য যে রচনাপদ্ধতির দরকার, তা এখনও আমাদের লেখকরা রপ্ত করতে পারেননি| বহুক্ষেত্রেই ভাষা আড়ষ্ট এবং ইংরেজি ভাষার আক্ষরিক অনুবাদ হয়ে পড়ে। ফলে রচনাটি উৎকট হয়ে যায়। এই সমস্যার হাত থেকে বাঁচবার জন্য, “অনেকে মনে করেন পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করলে রচনা সহজ হয়|” কোনো কোনো ক্ষেত্রে একথা সুপ্রযুক্ত হলেও বহুস্থলে তা অস্পষ্টতার সৃষ্টি করে।

চতুর্থ সমস্যাটি হল, লেখকের অল্পবিদ্যার সমস্যা। বিজ্ঞান রচনায় ভুল তথ্য বা অস্পষ্ট তথ্য সাধারণ পাঠকের পক্ষে অনিষ্টকর। তাই প্রাবন্ধিকের পরামর্শ হল, বৈজ্ঞানিক লেখা প্রকাশের আগে অভিজ্ঞ লোককে দিয়ে যাচাই করে নেওয়া উচিত।


বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বাধা ও দোষ দূর করতে লেখক কী কী পরামর্শ দিয়েছেন ও বক্তব্য রেখেছেন?

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বাধা ও দোষ দূর করতে রাজশেখর বসু তাঁর সুচিন্তিত অভিমত ও পরামর্শ দিয়েছেন।

লেখকের মতে, বাংলায় পরিভাষা সংকলনে সমবেত উদ্যোগ আবশ্যক | উপযুক্ত বাংলা প্রামাণিক শব্দ রচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাংলা বানানে ইংরেজি শব্দই চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

আমাদের দেশের জনসাধারণের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য, তাই যাঁরা বিজ্ঞান প্রবন্ধ লিখবেন তাঁদের তিনি প্রাথমিক বিজ্ঞানের মতো গোড়া থেকেই আলোচনার কথা বলেছেন।

লেখক মনে করেন, ভাষার আড়ষ্টতা এবং ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদের ত্রুটি দূর করা দরকার।

ইংরেজি শব্দের অর্থব্যাপ্তির দিকে নজর না দিয়ে বাংলায় অর্থভেদে বিভিন্ন শব্দের প্রয়োগকেই তিনি যথাযথ বলেছেন। যেমন—‘Sensitized paper’-এর অনুবাদ ‘স্পর্শকাতর কাগজ’ না বলে ‘সুগ্রাহী কাগজ’ লেখাই লেখকের মতে সংগত।

তাঁর মতে, সাধারণের জন্য লিখিত বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভে স্বল্প পরিচিত পারিভাষিক শব্দের প্রথমবার প্রয়োগের সময় তার ব্যাখ্যা দেওয়া আবশ্যক।

বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের ভাষা সরল, স্পষ্ট এবং অলংকারবর্জিত হওয়া উচিত |

সবশেষে লেখকের অভিমত, পত্র-পত্রিকায় বৈজ্ঞানিক প্রবধ প্রকাশের আগে সম্পাদকের উচিত অভিজ্ঞ লোককে দিয়ে সন্দর্ভটি যাচাই করিয়ে নেওয়া।


‘যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত।”—মন্তব্যটির তাৎপর্য 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধ অবলম্বনে আলোচনা করো।

● রাজশেখর বসু তাঁর ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' শীর্ষক রচনায় ইংরেজি জানা এবং ইংরেজি ভাষায় বিজ্ঞান পড়তে অভ্যস্ত মানুষদের বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সমস্যার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মন্তব্যটি করেছেন।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ বা প্রবন্ধের পাঠকদের লেখক দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। প্রথম শ্রেণির পাঠকেরা ইংরেজি ভাষায় দক্ষ নন এবং বিজ্ঞানের সঙ্গেও তাদের অতি সামান্য যোগাযোগ | কয়েকটি পারিভাষিক শব্দ বা বৈজ্ঞানিক ঘটনা সম্পর্কে স্থূল তথ্য ছাড়া তাঁদের আর কিছুই জানা নেই | এঁদের ক্ষেত্রে বাংলা পরিভাষা আয়ত্ব করে বাংলায় বিজ্ঞান শেখা কোনো সমস্যার নয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখক বলেছেন যে তিনিও এভাবেই ব্রজমোহন মল্লিকের বই থেকে বাংলা জ্যামিতি শিখেছেন। কিন্তু সমস্যাটা হল যাঁরা ইংরাজি ভাষায় দক্ষ এবং তাতেই শিক্ষাগ্রহণ করেছেন তাঁদের নিয়ে। এঁদের মনে ‘ভাষাগত বিরোধী সংস্কার’ তৈরি হয় | অর্থাৎ বাংলায় কিছু শিখতে গেছে ইংরেজিতে শেখা জ্ঞান বাধা হয়ে দাঁড়ায়| এই ‘পূর্ব সংস্কার দমন করে’ তাকে বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভের পাঠ গ্রহণ করতে হয়, যা তাঁদের পক্ষে শ্রম ও সমস্যার। বিষয়টা আজন্ম ইজার পরা লোকের হঠাৎ ধুতি পরতে বাধ্য হওয়ার মতো। অত্যন্ত মনোযোগ আর প্রীতির সঙ্গে মাতৃভাষায় পদ্ধতি গ্রহণের মধ্যে দিয়ে সমস্যার সমাধান হতে পারে।


“পরিভাষা রচনা একজনের কাজ নয়...।” ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ নামক রচনায় পরিভাষা বিষয়ে লেখকের যে মতামত উল্লিখিত হয়েছে তা নিজের ভাষায় লেখো।

● রাজশেখর বসু ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ নামক প্রবন্ধে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে যেসব বাধার কথা ভেবেছেন তার অন্যতম হল পারিভাষিক শব্দের অপ্রতুলতা | একদা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী লেখক নানা বিষয়ে পরিভাষা রচনা করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তাঁরা কাজটি একত্রে করেননি, ফলে সংকলনের পরিভাষাগুলির মধ্যে সমতা ছিল না। একই বিষয়ের অনেকগুলি করে পরিভাষা তৈরি হয়েছিল। বরং ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিযুক্ত পরিভাষা সমিতি অনেক একত্রিত ভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মানুষদের নিয়ে পরিভাষা সংকলন তৈরি করতে পেরেছিল | তবে সংকলনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হওয়া প্রয়োজন বলে লেখক মনে করেছেন। পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা সম্ভব নয়, আবার পরিভাষা তৈরির সময় বিজ্ঞান আলোচনায় যে নিজস্ব রচনাপদ্ধতি সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু সবার আগে প্রয়োজন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাগুলির সমন্বয়ের মাধ্যমে সমবেত উদ্যোগ তৈরি করে পরিভাষা গড়ে তোলা।


পরিভাষা রচনার ক্ষেত্রে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বিশদে লেখো।

• বাংলাভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে খুব বড়ো সমস্যা হল পারিভাষিক শব্দের অপ্রতুলতা। যথাযথ পরিভাষা না থাকায় বাংলাভাষায় লেখা বিজ্ঞান বিষয়টি দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন লেখক নানা বিষয়ের পরিভাষা রচনা করতে উদ্যোগী হন। পরিভাষা রচনা একজনের কাজ নয়, সমবেতভাবে না করলে নানা ত্রুটি দেখা দেয় | বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্‌যোগের ত্রুটি ছিল এটিই | তার ফলে সংকলিত পরিভাষার সাম্য রক্ষিত হয়নি। একই ইংরেজি সংস্কার বিভিন্ন প্রতিশব্দ রচিত হয়েছে।

এরপর ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে পরিভাষা সমিতি নিযুক্ত করেছিলেন, তাতে বিভিন্ন বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, সংস্কৃতের অধ্যাপক এবং কয়েকজন লেখক একযোগে কাজ করছিলেন। এরফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচেষ্টা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের চেয়ে অধিকতর সফল হয়েছিল।

কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকলন খুব বড়ো নয়। আরও শব্দের প্রয়োজন ছিল | কিন্তু প্রয়োজনমতো বাংলা পরিভাষা পাওয়া না গেলেও বৈজ্ঞানিক রচনা চলতে পারে। সেক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দই বাংলা বানানে চালানো ভালো | বিশ্ববিদ্যালয়-নিযুক্ত সমিতি বিস্তর ইংরেজি শব্দ বজার রেখেছেন। যেমন, অক্সিজেন, প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন, ফার্ন, আরথ্রোপোডা ইনসেকটা ইত্যাদি ।


বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ কী? বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ লেখার জন্য কীরূপ রচনাপদ্ধতি আবশ্যক বলেছেন লেখক?

● রাজশেখর বসু রচিত ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে আমরা ‘বৈজ্ঞানিক সন্দৰ্ভ’ শব্দবন্ধ পেয়েছি | বিজ্ঞান-সংক্রান্ত প্রবন্ধ বা গ্রন্থকে বলা হয় বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ।

● বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ রচনার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দেশের পাঠকদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই অজ্ঞ | তাই লেখার ভাষা হবে ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ-মুক্ত | বাংলায় অর্থভেদে বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগ করে লেখাকে জনসাধারণের কাছে সুবোধ্য করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বাংলা শব্দের পরিবর্তে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা সংগত | লেখার সময় লেখক যদি ইংরেজিতে ভেবে বাংলায় অনুবাদের চেষ্টা করেন তবে তা হবে বাংলা ভাষার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। তাই বাংলা ভাষার প্রকৃতি বজায় রেখে বাক্য তৈরি করতে হবে। যেমন “পরমাণু ইঞ্জিন নীল চিত্রের অবস্থাতেও পৌঁছায়নি।”—এই ‘মাছিমারা নকল’ না করে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা হতে পারে এই অনুবাদে—“পরমাণু ইঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি।” বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ রচনার ক্ষেত্রে লেখকদের একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল করতে বলেছেন প্রাবন্ধিক; তা হল লেখা হবে অলংকারবর্জিত, স্পষ্ট এবং সরল | বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশনে যত্নবান হতে হবে। লেখার মানে সুবোধ্য, সুস্পষ্ট হবে।পাঠকদের মানসিকতা, জ্ঞান এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের পরিচিতি মাথায় রেখে রচনায় লিপ্ত হতে হবে।


“আমাদের আলংকারিকগণ শব্দের ত্রিবিধ শক্তির কথা বলেছেন।”— এগুলি কী কী? উদাহরণ-সহ এই ‘ত্রিবিধ শক্তি’ বুঝিয়ে দাও।

● শব্দের ত্রিবিধ শক্তি বলতে— অভিধা, লক্ষণা এবং ব্যঞ্জনাকে বোঝানো হয়েছে।

• শব্দবৃত্তির প্রথমটি হল অভিধা। শব্দের মুখ্যার্থ বা বাচ্যার্থ প্রকাশিত হয় যে বৃত্তির দ্বারা, তাকে বলা হয় অভিধা| এই বৃত্তিতে শব্দটি বাচক। শব্দের অর্থটি বাচ্য বা অভিধেয় | যেমন—পঙ্কজ শব্দে পদ্ম অর্থটাই মুখ্য (পাঁকে জন্মে যা, তা ‘পঙ্কজ’ হলেও শব্দটির অভিধা ‘পদ্ম’ অর্থেই সীমাবদ্ধ)।

শব্দবৃত্তির দ্বিতীয় ভাগ হল লক্ষণা | কোনো শব্দের মুখ্যার্থ অতিক্রম করে শব্দটির গৌণ অর্থ যখন প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তা হয় লক্ষণা। যেমন—“এই রিকশা, এদিকে এসো”—রিকশা জড়পদার্থ। কিন্তু বাক্যে রিকশা শব্দটির মধ্যে দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বোঝানো হয়েছে।

শব্দবৃত্তির তৃতীয় ভাগ হল ব্যঞ্জনা | অভিধা ও এবং লক্ষণা দ্বারা শব্দার্থ যখন ব্যাখ্যা করা যায় না, এবং শব্দ যখন নতুন অর্থের দ্যোতনা তৈরি করে, তখন তাকে বলা হয় ব্যঞ্জনা। যেমন— “সোনার হাতের সোনার কাকন কে কার অলংকার?”

এই বাক্যে সোনা— ধাতু (অভিধা)।

সোনার হাত এবং সোনার কাকন – রং (লক্ষণা)

কে কার অলংকার-হাতের অলংকার হয়ে সোনা হাতকে অলংকৃত করেছে। স্বর্ণকাররের কারুকার্য ঈশ্বরের সৃষ্ট হাতের অহংকার | আবার ফরসা হাতের সৌন্দর্য সোনার রঙে প্রতিভাত। সোনা শব্দের প্রয়োগ এখানে ব্যঞ্জনা এনেছে।


“কিন্তু বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে যত কম থাকে ততই ভালো।” কী কম থাকার কথা বলা হয়েছে? সেগুলি কম থাকার সুবিধা কী?

● রাজশেখর বসুর ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধটি থেকে প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে | আলংকারিকগণ শব্দের ত্রিবিধ শক্তির কথা বলেছেন। এগুলি হল— অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা। এইগুলি কম থাকার কথা বলা হয়েছে।

• যে শক্তির দ্বারা শব্দ সাক্ষাৎভাবে তার মূল অর্থটিকে প্রতিপালন করে, তার নাম অভিধা শক্তি | এই শক্তির দ্বারা যে অর্থ প্রকাশিত হয় তার নাম অভিধেয় অর্থ বা বাচ্যার্থ। যে শক্তির দ্বারা বাচ্যার্থের সঙ্গে সম্বন্ধবিশিষ্ট প্রকৃত অর্থের ধারণা জন্মায় তার নাম লক্ষণা । অভিধা বা লক্ষণা শক্তি নিজ নিজ অর্থ বুঝিয়ে বিরত হওয়ার পর অনেক সময় সেগুলির অতিরিক্ত একটি নতুন অর্থের প্রকাশ ঘটে—এর নাম ব্যঞ্জনা। এই ব্যঞ্জনা হল শব্দের অন্য এক অর্থ | যেমন—‘অর্ধচন্দ্ৰ’ বলতে অর্ধেক চাঁদকে না বুঝিয়ে গলাধাক্কা বোঝায়। এগুলির ব্যবহার সাহিত্যে চলতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে অলংকার সম্পূর্ণ বর্জনীয় | কিছু উপমার হয়তো প্রয়োজন হতে পারে, রূপক স্থানবিশেষে চলতে পারে, কিন্তু অলংকার একেবারেই বর্জন করা উচিত। কেন-না, সাহিত্য ভাবের কথা, আর বিজ্ঞান হল জ্ঞানের কথা। জ্ঞানের কথাকে সহজ, সরল ও স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করতে হয়। না হলে তার বোধগম্যতা আসে না।


“এই রকম ভুল লেখা সাধারণ পাঠকের পক্ষে অনিষ্টকর।”—কী ধরনের ভুল লেখার কথা বলা হয়েছে? তা সাধারণ পাঠকের কাছে অনিষ্টকর কেন?

● ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লিখিত হয়েছে যে, লেখক রাজশেখর বসু একবার এক পত্রিকায় দেখেছিলেন“অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন স্বাস্থ্যকর বলে বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। তারা জীবের বেঁচে থাকার পক্ষে অপরিহার্য অঙ্গ মাত্র | তবে ওজন গ্যাস স্বাস্থ্যকর।” এই ধরনের ভুল লেখার কথাই এখানে বলা হয়েছে ।

● বিজ্ঞান সত্যভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। পরীক্ষা, প্রামাণ্যতা এবং প্রত্যক্ষতার দ্বারা তা সর্বজনগৃহীত, বিশ্বস্ত এবং সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত। কোনো কল্পনা বা আজগুবি গল্প বিজ্ঞানের সত্য হতে পারে না। বিজ্ঞান বিষয়ক রচনায় বৈজ্ঞানিক সত্যকে হুবহু রক্ষা করতে হয়। তা না হলে সাধারণ পাঠকের কাছে ভুল বার্তা চলে যাবে। যেমন— যদি লেখা হয়, নাইট্রিক অ্যাসিড তৃম্না মেটায়—তবে সাধারণ পাঠক সেই লেখাটি পড়ে নাইট্রিক অ্যাসিড পান করতে পারে। তাতে সমূহ বিপদ | তাই লেখক বলতে চেয়েছেন, বৈজ্ঞানিক রচনা পত্রিকায় প্রকাশের আগে কোনো অভিজ্ঞ লোককে দিয়ে যাচাই করে নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সম্পাদককে অনেক সচেতন থাকতে হবে। তাহলে পাঠকের অনিষ্টের সম্ভাবনা থাকবে না।


“তাদের মোটামুটি দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে।”— কাদের কথা বলা হয়েছে? দুই শ্রেণির পরিচয় দাও।

● ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধের উল্লিখিত অংশে লেখক রাজশেখর বসু যাদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থ বা প্রবন্ধ লেখা হয় তাদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।

● যে দুটি শ্রেণির কথা প্রাবন্ধিক বলেছেন তাদের প্রথমটি হল যারা ইংরাজি জানে না বা অতি অল্প জানে | দ্বিতীয়টি হল,যারা ইংরাজি এবং ইংরাজি ভাষায় কিছু বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা পড়েছে। প্রথম শ্রেণির পাঠকদের বিজ্ঞানের সঙ্গে কোনো পূর্ব পরিচয় নেই | কিছু ইংরাজি পারিভাষিক শব্দ তাদের জানা থাকতে পারে, কিংবা কিছু স্থূল তথ্য তাদের অভিজ্ঞতায় থাকতে পারে। কিন্তু কোনো সুশৃঙ্খল আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যই জানা থাকে না। যেহেতু এরা ইংরাজি ভাষার প্রভাবমুক্ত, তাই বাংলা পরিভাষা আয়ত্ত করে বাংলায় বিজ্ঞান শেখায় তাদের বিশেষ আপত্তি থাকে না। কিন্তু সমস্যা হয় যাদের ইংরাজি শিক্ষা হয়েছে তাদের নিয়ে | প্রথম শ্রেণির পাঠকের ক্ষেত্রে সুবিধা হল বিষয়টি বুঝতে পারলেই বাংলায় তারা বিজ্ঞান শিক্ষা করে নিতে পারে, ভাষা সেখানে বাধা হয় না | কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠক যখন বাংলা বিজ্ঞান শিক্ষা করতে যায় তখন তাকে পূর্বসংস্কার ত্যাগ করতে হয়| ইংরাজির প্রতি যে আনুগত্য তা ত্যাগ করতে হয়। এই কারণে তার পাঠ বা শিক্ষা কষ্টকর হয়ে ওঠে।


“পাশ্চাত্য দেশের তুলনায় এদেশের জনসাধারণের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য।'—লেখকের এই মন্তব্যের যথার্থতা আলোচনা কর।

● বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান যারা পড়েন, তাঁদের স্বরূপ নির্ণয় করতে গিয়ে লেখক পাঠকদের দুটি শ্রেণিতে ভাগও করেছেন | প্রথম শ্রেণি, যাঁরা ইংরাজি জানেন না বা খুব অল্প জানেন, দ্বিতীয় শ্রেণি যাঁরা ইংরাজি জানেন এবং ইংরাজি ভাষায় কিছু বিজ্ঞান বই পড়েন। পাশ্চাত্যের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে এ দেশের মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সীমাদ্ধতার কথা তিনি বলেছেন। বিজ্ঞানের প্রাথমিক বিষয়গুলির সঙ্গে পরিচিত না থাকলে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বোঝা সম্ভব নয়, যা এ দেশে উপলব্ধি করা যায়। ইউরোপ আমেরিকায় পপুলার সায়েন্স লেখা খুব সহজ, কারণ সাধারণ মানুষ তা অনায়াসে বোঝে | কিন্তু আমাদের দেশের সামাজিক পরিস্থিতি এতটা সহজ নয়। এখানে বয়স্কদের জন্য যা লেখা হয়, তা-ও প্রাথমিক বিজ্ঞানের মতো গোড়া থেকে না লিখলে বোঝার উপযোগী হয় না | বাংলা ভাষায় যাঁরা বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখি করেন, তাঁদের জনপ্রিয়তা পেতে গেলে এই বিষয়গুলো মনে রাখতে হবে। বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে প্রাবন্ধিক এই কথাগুলো বলেছেন। মনে রাখা দরকার যে, বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার যথাযথ না হলে বিজ্ঞান বিষয়ক সাহিত্যের বিস্তারও ঘটা সম্ভব নয়।


“এই কথাটা সকল লেখকেরই মনে রাখা উচিত।” –বক্তা কে? লেখকের কী মনে রাখা উচিত?

● ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' রচনায় উল্লিখিত মন্তব্যটির বক্তা প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু স্বয়ং।

● প্রাবন্ধিকের মতানুসারে, যে-কোনো বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—এ কথা সকল লেখকের মনে রাখা উচিত। আমাদের মতো দেশে মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অত্যন্ত সামান্য | তাই তাদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা লিখতে গেলে প্রাথমিক বিজ্ঞানের একেবারে গোড়া থেকে সহজ ভাষায় লিখে যেতে হবে। এমন এক রচনাপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, যা ইংরাজির আক্ষরিক অনুবাদ হবে না | অর্থাৎ ভাষার আড়ষ্টতাকে সর্বার্থে ত্যাগ করতে হবে। ইংরেজিতে ভেবে বাংলায় অনুবাদ করার যে চালু অভ্যাস কারোর কারোর মধ্যে আছে তা বিষয়কে কঠিন করে তোলে। অনেকে মনে করেন, রচনাকে সহজ করার জন্য পারিভাষিক শব্দ বাদ দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয় | পরিভাষা ছাড়া কখনো-কখনো ভাব প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে ভাষাকে সরল করার জন্য ব্যঞ্জনা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি যতটা সম্ভব ত্যাগ করাই ভালো| সাহিত্য বা অন্য বিষয়ের ভাষার সঙ্গে বিজ্ঞানের ভাষার স্পষ্ট পার্থক্য আছে | এ কথা মনে রেখেই বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাকর্মে লেখকদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন বলে প্রাবন্ধিক মনে করেছেন।


বাংলায় বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ বা প্রবন্ধ যাঁদের জন্য লেখা হয়, পাঠক হিসেবে তাঁদের অবস্থান চিহ্নিত করো।

● ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে বিজ্ঞান-পাঠকদের দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে আছেন যাঁরা ইংরেজি জানেন না বা খুব অল্প জানেন | অন্যদিকে ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজি ভাষায় কিছু বিজ্ঞান বই পড়েছেন, তাঁরা দ্বিতীয় ভাগের অন্তর্ভুক্ত |

প্রথম ভাগে যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে বিজ্ঞানের পূর্ব-পরিচয় ঘটেনি | আধুনিক বিজ্ঞানের সুশৃঙ্খল ধারা সম্বন্ধে এঁরা অবগত নন | ইংরেজি ভাষা না-জানায় এঁরা ইংরেজি ভাষার প্রভাব থেকে মুক্ত | বাংলায় বিজ্ঞান শিখতে তাঁদের অসুবিধে হয় না। ব্রহ্মমোহন মল্লিকের বাংলায় লেখা জ্যামিতি বই থেকে একটি বাক্য প্রাবন্ধিক উদাহরণ হিসেবে দিয়েছেন—“এক নির্দিষ্ট সীমাবিশিষ্ট সরলরেখার উপর এক সমবাহু ত্রিভুজ অঙ্কিত করিতে হইবে।” একজন ইংরেজি-না-জানা পাঠকের কাছে এর অর্থ বুঝতে অসুবিধা হয়নি, কারণ ভাষাগত বিরোধী কোনো সংস্কার এক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল থাকে না | বিজ্ঞান শেখার ক্ষেত্রে ভাষা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

দ্বিতীয় ভাগে যাঁরা আছেন, তাঁরা ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজি ভাষায় বিজ্ঞানের বইও পড়ে ফেলেছেন। তাঁদের কাছে বাংলায় লেখা কোনো বাক্য ‘সুশ্রাব্য’ ঠেকে না, তার অর্থ ও অস্পষ্ট থাকে। দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকদের আসল সমস্যা ইংরেজি ভাষার প্রতি পক্ষপাত ৷ এই পাঠকদের তুলনায় বেশি চেষ্টা করতে হয় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান পাঠ করার ক্ষেত্রে।


‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে লেখকের যে বক্তব্য ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

● সাহিত্যরচনার পাশাপাশি রাজশেখর বসু তাঁর বিচিত্র/ অভিজ্ঞতালব্ধ মনন দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, আমাদের দেশে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার কিছু বাধা রয়েছে। বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা সন্দর্ভ যাদের জন্য লেখা হত, তাদের দুটি শ্রেণি | প্রথম হল, যারা ইংরেজি জানে না, দ্বিতীয়, যারা ইংরেজি জানে। প্রথম শ্রেণি ইংরেজি প্রভাবমুক্ত, ফলে বাংলা পরিভাষা আয়ত্ত করতে সক্ষম। দ্বিতীয় শ্রেণিকে বাংলার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে ইংরেজির প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব বর্জন করে পাঠে নিযুক্ত হতে হবে। লেখকের সমকালে পরিভাষাসংকলনও যথাযথ ছিল না। পরিভাষাসংকলনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নিযুক্ত সমিতির সক উদ্যোগকে আরও সমৃদ্ধ এবং প্রশস্ত করার প্রয়োজনের কথা প্রাবন্ধিক বলেছেন| বাংলা প্রামাণিক শব্দ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ইংরেজির ব্যবহারকেই তিনি সংগত মনে করেছেন। আমাদের দেশের মানুষদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যেহেতু নগণ্য, তাই বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ রচনার সময় তাদের কথা মাথায় রেখে ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ মুক্ত হয়ে সহজ, সরল, অলংকারহীন সন্দর্ভ লিখতে হবে। বাংলা ভাষার প্রকৃতি অনুযায়ী অনুবাদ করা বাঞ্ছনীয়। পত্রপত্রিকায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখার সময় সম্পাদকের উচিত ভালো করে দেখে নেওয়া, নতুবা ভুল তথ্য পাঠকদের অনিষ্ট করবে।


‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.