হারিয়ে যাওয়া কালি কলম (শ্রীপান্থ) প্রশ্ন উত্তর সাজেশন

Madhyamik Bengali Suggestion Pdf, হারিয়ে যাওয়া কালি কলম (শ্রীপান্থ) প্রশ্ন উত্তর সাজেশন, হারিয়ে যাওয়া কালি কলম সাজেশন প্রশ্ন উত্তর. Techofpal

হারিয়ে যাওয়া কালি কলম (শ্রীপান্থ) প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান - ৫)


“কথায় বলে—কালি কলম মন, লেখে তিনজন।”উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

● শ্রীপান্থ রচিত ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে স্বয়ং লেখক অতিপ্রচলিত এই প্রবাদটি উল্লেখ করেছেন। হারিয়ে যাওয়া কালিকলম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়েই লেখকের এরূপ মন্তব্য

মানুষের মনের ভাব ও ভাবনা কলমের ডগা দিয়ে কালির রেখায় সাদা কাগজের ওপর বাণীরূপ লাভ করে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ তার মনের কথাকে কালান্তরের মানুষের কাছে রেখে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লেখার সামগ্রী ব্যবহার করে আসছে | এই পথ ধরেই কালি আর কলম এসেছে আমাদের সভ্য জগতে | কলম মানুষের আবেগের উদ্‌গাতা। তাকে হাতে নিয়ে মানুষ মনের সাহায্যে ভাবনাকে আবাহন করে আনে | কলম হল তুলি, কালি হল রং আর মন হল শিল্পী | এই তিনের মিলনে অমৃত ভাবনা মূর্ত হয়ে ওঠে। এমনিভাবেই লেখা হয়েছে অজস্র গ্রন্থ। অর্থাৎ সাহিত্যের অপর নাম যে মিলন, তা কালি, কলম আর মনের ত্রিবেণী সংগমের দ্বারা সম্ভব| হাতে লেখার মাহাত্ম্যকে তুলে ধরতেই লেখকের এই মন্তব্যটির অবতারণা।


“আমরা কালিও তৈরি করতাম নিজেরাই।” লেখকরা কীভাবে কালি তৈরি করতেন তা প্রবন্ধ অনুসরণে লেখো।

● নিখিল সরকার ওরফে ‘শ্রীপান্থ’ রচিত ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ রচনায় উদ্ধৃতাংশটি ব্যবহৃত হয়েছে | ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' প্রবন্ধে লেখকের ছেলেবেলায় কালি তৈরি নিয়ে প্রচলিত ছড়ার কথা বলেছেন | ছড়াটি হল—“তিল ত্রিফলা সিমুল ছালা/ছাগ দুগ্ধে করি মেলা/লৌহপাত্রে লোহায় ঘসি/ছিঁড়ে পত্র না ছাড়ে মসি।” এই ছড়ায় তিল, ত্রিফলা সিমুল গাছের ছাল, ছাগলের দুধ ইত্যাদি বিভিন্ন উপকরণের কথা আছে। এতগুলি উপকরণ জোগাড় করে কালি তৈরি করা খুব সহজ কাজ ছিল না। তাই লেখক অন্য সহজ পথ ধরেন।

লেখকের বাড়ির রান্না হত কাঠের আগুনে | তাতে কড়াইয়ের তলায় প্রচুর কালি জমত | লাউ পাতা দিয়ে তা ঘসে তুলে, পাথরের বাটিতে জলে গুলে রাখা হত। যারা কালি তৈরিতে ওস্তাদ তারা এই কালো জলে হরীতকী ঘসত। কখনো কখনো আতপ চাল ভেঙে পুড়িয়ে এবং তা বেটে জলে মেশানো হত। এইসব ভালো করে মিশিয়ে একটা খুন্তির গোড়ার দিক পুড়িয়ে লাল করে জলে স্পর্শ করালে তা টগবগ করে ফুটত। তারপর ন্যাকড়ায় ছেঁকে মাটির দোয়াতে ভরে নিলেই তৈরি হয়ে যেত কালি।


“বলতে গেলে তাই নিয়ে আমাদের প্রথম লেখালেখি।”— শৈশবের কোন্ বর্ণনা লেখক দিয়েছেন?

● ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ রচনায় লেখক তাঁর শৈশবজীবনের লেখালেখির সূচনার এক চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।

গ্রামজীবনের সঙ্গে যাঁদের শৈশব যুক্ত, লেখকের সমবয়সি সেইসব মানুষরা তাঁর এই বর্ণনার সঙ্গে একমত এবং একাত্ম হতে পারবেন এই আশা প্রকাশ করে লেখক বর্ণনাটি উপস্থাপন করেছেন। শৈশবে লেখক সরু বাঁশের কঞ্চি কেটে কলম তৈরি করতেন। বড়োদের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি কলমের মাথাটা একটু চিরে দিতেন, তাহলে কালির ধীরপ্রবাহ হত। লেখার পাতা ছিল কলাপাতা | কাগজের আকৃতিতে কলাপাতা কেটে তাতে বাড়ির পড়ার কাজ তৈরি করে মাস্টারমশাইকে দেখিয়ে তা পুকুরে ফেলে দিতে হত। কলম তৈরির পাশাপাশি কালিও লেখকরা নিজেরাই তৈরি করতেন। এক্ষেত্রেও তাঁরা বড়োদের সাহায্য নিতেন | সম্পূর্ণ আয়োজনহীন এক সহজ পদ্ধতিতে তাঁরা কালি তৈরি করতেন। কাঠের উনুনে কড়া বসিয়ে তার তলায় জমে যাওয়া কালি তাঁরা লাউপাতা দিয়ে ঘষে তুলে তা জলে গুলে নিতেন, কখনও তার সঙ্গে হরীতকী মেশাতেন। এই সাধারণ পদ্ধতির সঙ্গে কখনো আতপ চাল ভেজে পুড়িয়ে তা বেটে মেশানো হত। তারপর ওই জলে একটা গরম লোহা ঠেকিয়ে নিয়ে ন্যাকড়ায় ছেঁকে বোতলে কালি ভরা হত।

এইভাবেই লেখকের শৈশবজীবনের ‘প্রথম লেখালেখি |’


“ভাবি, আমি যদি জিশু খ্রিস্টের আগে জন্মাতাম!”—কোন্ প্রসঙ্গে লেখকের এই ভাবনা? জিশু খ্রিস্টের আগে জন্মালে তিনি কী করতেন ?

● লেখক শ্রীপান্থ ছেলেবেলায় বাঁশের কলম, মাটির দোয়াত, ঘরে তৈরি কালি আর কলাপাতা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন। অতীত স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি আলোচ্য প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছেন।

→ লেখক ভেবেছেন, তাঁর যদি প্রাচীন মিশরে জন্ম হত, তাহলে তিনি নীলনদের তীর থেকে নলখাগড়া ভেঙে নিয়ে এসে সেটিকে ভোঁতা করে তুলি বানিয়ে লিখতেন। আবার বাঙালি না হয়ে প্রাচীন সুমোরিয়ান বা ফিনিসিয়ান হলে বনপ্রান্ত থেকে একটা হাড় কুড়িয়ে এনে কলম বানাতেন। আবার ভেবেছেন, রোমসম্রাজ্যের অধীশ্বর হলে তিনি জুলিয়াস সিজারের মতো ব্রোঞ্জের শলাকা বা স্টাইলাস ব্যবহার করতেন। সিজার যে কলমটি দিয়ে কাসকাকে আঘাত করেছিলেন, সেটি আসলে ছিল ব্রোঞ্জের ধারালো শলাকা | চিনাদের কলম অবশ্য তুলি। এইভাবে লেখক কলম আবিষ্কারের প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে যেতে চেয়েছেন।


“পালকের কলম তো দূরস্থান, দোয়াত কলমই বা আজ কোথায়!”—পালকের কলম সম্পর্কে লেখক কী জানিয়েছেন? দোয়াত কলম প্রসঙ্গে লেখক কী বলেছেন?

● নিখিল সরকার ওরফে শ্রীপান্থ রচিত ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ রচনায় ব্যবহৃত হয়েছে উদ্ধৃতাংশটি। আজকাল কলম এবং দোয়াত প্রায় দেখাই যায় না প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক আলোচ্য উদ্ধৃতাংশটি ব্যবহার করেছেন।

পালকের কলমকে ইংরেজিতে বলা হয় কুইল । বাঁশের কলম, খাগের কলম চলে যাওয়ার পর একসময় পালকের কলমের আধিপত্য ছিল। পাখির পালক দ্বারা তৈরি হত এই কলম | লেখক আক্ষেপ করেছেন, “পালকের কলম দেখতে হলে পুরানো দিনের, তৈলচিত্র কিংবা ফোটোগ্রাফ ছাড়া গতি নেই।” ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধেও পালকের কলমের প্রচলন ছিল। উইলিয়ম জোন্স বা স মুনশি কেরি সাহেবের চিত্রে দেখা যায় পালকের কলম | মিশনারিরা এবং ইংরেজ সাহেবরা পালক কেটে কলম তৈরির জন্য পেনসিল শার্পনারের মতো একপ্রকারের যন্ত্রও বানিয়েছিলেন।

● লেখক তাঁর শৈশবে কালি তৈরি করে কাচের দোয়াত রাখতেন। কাচের, কাট-গ্লাসের, পোর্সেলিনের, শ্বেতপাথরের, জেডের, পিতলের, এমনকি গোরুর শিং বা সোনার দোয়াতও হত। লেখক নিজে সুভো ঠাকুরের দোয়াতের সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। এমনকি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বয়স্করা আশীর্বাদ দিতেন— ‘তোমার সোনার দোয়াত কলম হোক |’ সেই দোয়াত কলম আজ উধাও । কোনো কোনো অফিসে গিয়ে লেখক ছদ্মবেশী দোয়াত কলম টেবিলে সাজানো দেখেছেন, আসলে যা বল পেন |


“কলম তাদের কাছে আজ অস্পৃশ্য।”—কলম কাদের কাছে অস্পৃশ্য? কলম সম্পর্কে লেখক কেন এরূপ বলেছেন?

● ‘হারিয়ে যাওয়া কালি-কলম’ রচনায় সময়ের অগ্রগতিতে কলমের পরিণতি দেখে লেখক নিখিল সরকার এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি করেছেন।

আধুনিকতার পথে কলম ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে মানুষের হাত থেকে| সময়ের ধারায় বাঁশের পেন, পালকের পেন ক্রমশ হারিয়ে গিয়ে ফাউন্টেন পেন, সস্তার বল পেন বাজারে আসে। তাই পকেটমারও কলম চুরি করে না— ‘কলম তাদের কাছে আজ অস্পৃশ্য।'

→ একসময়ে মানুষের লেখার একমাত্র অবলম্বন ছিল বাঁশের কলম | শৈশবে লেখকরা এরূপ কলম নিজেরাই বানাতেন। সময়ের অগ্রগতিতে বাঁশের কলম উধাও হয়ে এল পালকের কলম । তারপর ফাউন্টেন পেন এবং বল পেন বাজার দখল করল। ক্রমশ ফেরিওয়ালারাও কলম বিক্রিকে পেশা করলে | লেখক দেখেছেন অতি আধুনিক ছেলেরা কলম বুকপকেটে রাখার পরিবর্তে কাঁধের ছোটো পকেটে সাজিয়ে রাখে। এমনকি ভিড় ট্রামে-বাসে মহিলাদের মাথার খোঁপাতেও কলম গুঁজে রাখতে দেখা গিয়েছে। “বিস্ফোরণ! কলম বিস্ফোরণ।” কলম একসময় সর্বভোগ্য এবং সার্বজনীন হয়ে উঠল। শিক্ষা বা বিদ্যাবুদ্ধি আর কলমের যে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক ছিল তা মুছে যেতে থাকল| কলম সুলভ এবং সর্বভোগ্য হওয়ার ফলে তার কদরও হারিয়েছে। ফলে যে পকেটমার একসময় কলম হাতসাফাই করত তার কাছেও এখন কলম অস্পৃশ্য!


ওয়াটারম্যান কীভাবে কালির ফোয়ারা খুলে দিয়েছিলেন?

● লুইস অ্যাডসন ওয়াটারম্যান ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতো দোয়াত কলম নিয়ে কাজে বের হতেন। একবার এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তিপত্র সই করতে গিয়ে দোয়াত থেকে কালি ফেলে দিলেন সেই দলিলে। শূন্য দোয়াতে কালি ভরতে ছুটলেন কিন্তু ফিরে এসে শোনেন, ইতিমধ্যে আরেকজন ব্যবসায়ী এসে সেই চুক্তিপত্রে সই করে চুক্তি পাকা করে ফেলেছেন | হতাশ ও বিমর্ষ ওয়াটারম্যান তখনই ঠিক করলেন যে তিনি এমন একটা পদ্ধতির খোঁজ করবেন যেখানে কলমের সঙ্গে কালির দোয়াত নিয়ে ঘুরতে হবে না। এইভাবেই জন্ম নিল ফাউন্টেন পেন |

ফাউন্টেন পেনের আগের নাম রিজার্ভার পেন। ওয়াটারম্যান তাকেই উন্নত করে তৈরি করেছিলেন ফাউন্টেন পেন। কলম হিসেবে ফাউন্টেন পেনের বিরাট বিস্তার ঘটে। একটি বিজ্ঞাপনে লেখক দেখেছিলেন “তাঁদের তহবিলে নাকি রয়েছে সাতশো রকম নিব।” দোকানে গিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির নাম লেখক শুনেছিলেন—পার্কার, নোর্ফাড, সোয়ান ইত্যাদি | উনি যখন কলেজে পড়তেন, তখন তাঁর সব বন্ধুর পকেটেই ফাউন্টেন পেন জমানোর নেশার কথাও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সুতরাং ওয়াটারম্যান তাঁর আবিষ্কারের পর সত্যিই যেন কালির ফোয়ারা খুলে দিয়েছিলেন |


“আমার মনে পড়ে প্রথম ফাউন্টেন কেনার কথা।”— লেখক কোথায় ফাউন্টেন কিনতে গিয়েছিলেন? তাঁর কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল?

● ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' রচনায় লেখক জানিয়েছেন কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটি নামি দোকানে তিনি ফাউন্টেন পেন কিনতে গিয়েছিলেন।

● ফাউন্টেন পেন আবিষ্কার পেনের জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে এক অফুরন্ত কালির ফোয়ারা খুলে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে কোনো একদিন তিনি কলেজ স্ট্রিটের একটি নামি দোকানে ফাউন্টেন পেন কিনতে গিয়েছিলেন। দোকানদার তাঁকে পার্কার, শেফার্ড, ওয়াটারম্যান, সোয়ান, পাইলট হরেক রকম পেনের নাম ও তাদের দামের কথাও বলেন। লেখকের মুখের অবস্থা দেখে আর তাঁর পকেটের অবস্থা বুঝতে পেরে দোকানদার তাঁকে একটা সস্তা জাপানি পাইলট কলম কিনতে বলেন। দোকানদার পেনটির ঢাকনা খুলে একটি কাঠের বোর্ডের ওপর ছুঁড়ে দেন | সার্কাসে যেমন জীবন্ত মানুষের দিকে ছুরি ছুঁড়ে দেওয়ার পরও সে অক্ষত থাকে, বোর্ড থেকে খুলে দোকানদারও দেখান পেনটার নিব অক্ষত আছে | তারপর তিনি দু-এক ছত্র লিখেও দেখান | আনুমানিক পনেরো-ষোলো বছরের কিশোর লেখকের কাছে পেনটি জাদুপেন বলেই মনে হয়। লেখক পরবর্তীতে অনেক ফাউন্টেন পেন কিনলেও দীর্ঘদিন ওই জাপানি পাইলটটি তিনি যত্ন করে রেখেছিলেন। এই প্রসঙ্গেই লেখক জানিয়েছেন যে ফাউন্টেন পেন সংগ্রহের নেশা অনেক লেখকের মধ্যেই তিনি দেখেছেন।


“আশ্চর্য সবই আজ অবলুপ্তির পথে।”— লেখকের আশ্চর্য হওয়ার কারণ বুঝিয়ে দাও।

● ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ রচনায় লেখক আধুনিকতার কালপ্রবাহে কলম কীভাবে অবলুপ্ত হতে চলেছে সেই বিষয়েই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। শৈশব থেকেই লেখকের শিক্ষাজীবনের সূচনার সঙ্গী ছিল বাঁশের কলম, লেখার জন্য কলাপাতা আর হাতে তৈরি কালি। কিন্তু সভ্যতার প্রবহমান পরিবর্তনে খাগের কলম, কলাপাতা, পালকের কলম, দোয়াত কালি ইত্যাদিকে সরিয়ে বাজারে আসে ফাউন্টেন পেন | কলমের বাজারে এই পেন একছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। ফাউন্টেন পেনকেও ম্লান করে এরপর বাজারে এসে যায় বল পেন | কলম হয়ে ওঠে সস্তা এবং সর্বভোগ্য | কলম সর্বজনীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার নিজস্ব কদর হারাতে থাকে | একদিন যে দোয়াত কলম দিয়ে লিখে দেশ-বিদেশের সাহিত্যিকরা অমর সৃষ্টি রেখে গিয়েছেন, সেই দোয়াত কলম ইতিহাসের পাতায় চলে যায়; বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সৃষ্টির জায়গা দখল করে নেয় কম্পিউটার| সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় লেখার কাজেই ব্যস্ত লেখকের এক অদ্ভুত কলমপ্রীতি ছিল যন্ত্র-আধুনিকতার যুগেও। বাঁশের কলম, খাগের কলম ছেড়ে আধুনিক বল পেনের হাতে আত্মসমর্পণ করেও লেখক বিপন্ন বোধ করেছেন ‘যদি হাতের লেখা মুছে যায় চিরকালের জন্য’ একথা ভেবে। সমকালে কম্পিউটারের বিশ্বব্যাপী প্রভাবে তাই সর্বপ্রকারের কলমের অবলুপ্তি হতে দেখেই লেখক আশ্চর্য হয়েছেন।


“কিন্তু সে ছবি কতখানি যন্ত্রের, আর কতখানি শিল্পীর ?” ‘সে ছবি’ বলতে লেখক কোন্ ছবির কথা বলেছেন? যন্ত্রের ছবি আর শিল্পীর ছবির মধ্যে পার্থক্য কী?

● ‘সে ছবি’ বলতে লেখক কম্পিউটারের আঁকা ছবির কথাই বলেছেন।

● কম্পিউটার নামক যন্ত্রে কারিগরি সহায়তায় ছবি আঁকা হয়। সেই ছবির সঙ্গে মনের কোনো সংযোগ নেই | ছবি আঁকাও উন্নত শিল্পকর্ম | শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক অভেদ্য | কম্পিউটারের মন বলে কিছু নেই | তার রেখা নিছকই যন্ত্রের আঁকিবুঁকি| আর শিল্পী ছবি আঁকেন অনুভূতির রং ও রেখায় | সেখানে মনের মাধুরী মিশে থাকে। থাকে শিল্পীর আবেগ এবং মনের গভীরে সযত্নলালিত চিন্তা। রবীন্দ্রনাথও অক্ষর কাটাকাটি করতে গিয়ে আনমনে এঁকে ফেলতেন সাদা-কালো ছবি। এর ছবির মধ্যে আছে খেয়ালি আবেগের প্রকাশ। কিন্তু কম্পিউটারে সেই আবেগ-অনুভূতির কোনো বালাই নেই | লেখক বলতে চেয়েছেন, মনের জিনিসকে যন্ত্রের সাহায্যে রূপ দিতে গেলে তা কৃত্রিম হয়ে পড়ে। আবেগ ছাড়া শিল্প কখনও জীবন্ত হয় না। ভাব ঘনীভূত হলে মনের ক্যানভাসে অমূর্ত ছবি দানা বাঁধে| শিল্পী তাকে রংতুলির সাহায্যে মূর্ত করে তোলেন | তাই কমপিউটারের ছবি অপেক্ষা শিল্পীর আঁকা ছবি বেশি প্রাণময় এবং শিল্পিত।


“মনে মনে সেই ফরাসি কবির মতো বলেছি”—লেখক ফরাসি কবির মতো কী বলেছেন? তাঁর সেকথা বলার কারণ কী?

● লেখক ফরাসি কবির মতো মনে মনে বলেছেন, “তুমি সবল আমি দুর্বল | তুমি সাহসী, আমি ভীরু | তবু যদি আমাকে হত্যা করতে চাও, আচ্ছা, তবে তাই হোক | ধরে নাও আমি মৃত।”

● সময়ের পরিবর্তনে কালিকলম হারিয়ে গেছে স্মৃতির আড়ালে। লেখক শ্রীপান্থ মনের মধ্যে পোষণ করেন সেই হারিয়ে যাওয়া কালিকলমের মাহাত্ম্য। অনেক লেখক যুগের দাবিকে মেনে নিয়ে পুরোনো কালিকলম ছেড়ে ফাউন্টেন ও বলপেনকে বরণ করে নিয়েছেন। কেউ কেউ কম্পিউটারকে ব্যবহার করেন লেখার কাজে। পুরোনো কালিকলমকে স্মৃতির পাতায় রেখে দিয়ে লেখকও শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছেন বল পেনের কাছে আত্মসমর্থন করতে। স্বেচ্ছায় তিনি পুরোনো কলম ছেড়ে বল পেন হাতে তুলে নেননি। যুগের দাবিই তাঁকে বাধ্য করেছে নতুন লেখার সামগ্রীকে বরণ করে নিতে। তাঁর মনে হয়েছে, শক্তিশালী বল পেন সত্যিই যদি তাঁর ইচ্ছাকে হত্যা করে, তাতে কীই বা করার আছে তাঁর| যুগের প্রভাবকে তিনি এড়াবেন কীভাবে? যুগের দাবির কাছে তাই তিনি মৃত সৈনিক। উদ্দিষ্ট ফরাসি কবির মতোই তাঁর অসহায়তা প্রকাশ পেয়েছে এখানে।


“কম্পিউটার তাদের জাদুঘরে পাঠাবে বলে যেন প্রতিজ্ঞা করেছে।” কম্পিউটার কাদের জাদুঘরে পাঠাবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে? এই উক্তির মধ্যে লেখকের কোন্ মনোভাব প্রকাশিত?

● আলোচ্য অংশটি শ্রীপান্থর লেখা ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' নামক প্রবন্ধটি থেকে গৃহীত | পুরোনো দিনের নানা ধরনের কলম, কালি ও দোয়াতকেই কমপিউটার জাদুঘরে পাঠাবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে।

→ লেখক শ্রীপান্থ কালিকলমের ভক্ত ছিলেন। ছোটোবেলায় নানা ধরনের কলম তিনি ব্যবহার করতেন | কালি তৈরির পদ্ধতিও ছিল বিচিত্র। তারপর বাজারে এল নানা ধরনের ফাউন্টেন পেন। অতীতের প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা এই কালি-কলম দিয়েই তাঁদের অমর রচনাগুলি লিখে গেছেন। কিন্তু পুরোনো দিনের সেই কালিকলম এবং দোয়াত এখন অবলুপ্তির পথে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে কম্পিউটার | বোতামের ওপর চাপ দিয়ে এখন অক্ষর বিন্যাস করা যায়। লেখকের মতে, এই পদ্ধতি তো যান্ত্রিক। এতে মনের সংযোগ খুবই কম | হাতের লেখার একটি আলাদা মূল্য আছে, যার মাহাত্ম্য কমপিউটার কখনও ক্ষুণ্ন করতে পারে না | লেখক মনে করেছেন, এই জন্যই ইতিহাসে কলমের স্থান চিরকাল গৌরবের। উদ্ধৃতিটির মধ্যে দিয়ে কালি ও কলমের প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসার কথাই ব্যক্ত হয়েছে।


আধুনিক যন্ত্রযুগকে মেনে নিয়েও লেখকের মনের আবেগ ও শিল্পীসত্তা কীভাবে ফুটে উঠেছে?

● কালি আছে কাগজ নেই, কলম আছে মন নেই গ্রন্থ থেকে নেওয়া ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' রচনায় আমরা লেখক শ্রীপান্থ মনের আবেগ ও শিল্পীসত্তার এক অপূর্ব পরিচয় পেয়েছি।

শৈশবে বাঁশের কলম, লেখার জন্য কলাপাতা, বাড়িতে সহজ পদ্ধতিতে তৈরি কালি ছিল লেখকের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু তিনি বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কলমের বাঁশের কলম, খাগের কলম, পালকের কলম, ফাউন্টেন পেন, বল পেন—এভাবে কালের ধারায় পেনকে আধুনিক এবং উন্নত হতে দেখেছেন। আধুনিকতার বিস্ময়কর সৃষ্টি কম্পিউটার কলমের স্থান দখল করে নেওয়ায় কলম তার কদর হারাতে থাকে এবং অবলুপ্তির পথে চলে যেতে থাকে। লেখক এখানেই বিপন্ন বোধ করেছেন, কারণ কলমের প্রতি তাঁর অদ্ভুত এক ভালোবাসা ও গভীর প্রীতি ছিল। লেখালেখির কাজের সুবাদে পেনের সঙ্গে এক অপূর্ব সখ্য গড়ে উঠেছিল তাঁর। অফিসে তাঁর সহকর্মীরা কম্পিউটার ব্যবহার করলেও তিনি পেনকেই আঁকড়ে ছিলেন। অত্যন্ত দরদ দিয়ে কলমের পরিবর্তন এবং ইতিহাস বলতে গিয়ে শ্রীপান্থ মনের আবেগকে লুকিয়ে রাখতে পারেননি।

সাংবাদিক হিসেবে লেখার অফিসে শ্রীপান্থ যেমন ব্যস্ত, তেমন দীর্ঘকাল কলকাতার সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, নিয়ে লেখক দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। প্রতি সোমবার তাঁর লেখা ‘কলকাতার কড়চা’ একসময় আনন্দবাজার পত্রিকার পাঠকের মন জয় করেছিল। অনেক প্রবন্ধও লিখেছেন তিনি। পুরোনো দিনের কালি-কলমের প্রতি ভালোবাসা, ভালোবাস থাকলেও একজন শিল্পী হিসেবে আধুনিকাতর পথে পা রেখেই লেখার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। তিনি তাই বলপেনের কাছে আত্মসমর্পন করলেও শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই লেখক এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করেছেন।


কালিকলমের প্রতি লেখকের ভালোবাসা এবং এগুলি হারানোর বেদনা কীভাবে ফুটে উঠেছে আলোচনা করো।

● ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ রচনায় কলম, দোয়াত, দোয়াতের কালি— এগুলি ঘিরে লেখকের স্মৃতিমেদুর ভালোবাসা এবং সভ্যতার কালপ্রবাহে এগুলির হারিয়ে যাওয়ার বেদনা ফুটে উঠেছে |

শৈশবে লেখকের লেখাপড়ার সঙ্গী ছিল বাঁশের কলম এবং কাগজাকৃতি কলাপাতা | বাড়ির কাঠের উনুনে কড়াইয়ের নীচে জমে যাওয়া কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে একটা পাথরের বাটিতে জলে গুলে নেওয়া হত। ক্রমশ বাঁশের কলম হারিয়ে খাগের কলম, পালকের কলম প্রচলিত হতে থাকে | এরপর কলমের জগতে বিপ্লব নিয়ে আসে ফাউন্টেন পেন। পেন হয়ে ওঠে সস্তা আর সর্বভোগ্য। ফাউন্টেন পেনকে কেন্দ্র করে বিলাসিতাও বাড়ে। বাজারে কাজল কালি, সুলেখা কালি দোয়াত ও বোতলে বিক্রি হতে থাকে | এরপর বাজারে আসে বল পেন। বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় বিস্ময় সৃষ্টি করে কম্পিউটার যা মানুষকে যন্ত্রমানবে পরিণত করে। বাজার থেকে সব ধরনের পেন, কালি হারিয়ে যেতে থাকলে লেখকের মতো ‘কালি কলমের ভক্ত’ মানুষের মন কেঁদে ওঠে। লেখক বিপন্ন বোধ করতে থাকেন। তিনি সাংবাদিক হিসেবে লেখালেখির কাজে যুক্ত ছিলেন। পেনের প্রতি ঐকান্তিক টান লেখকের বাঁশের পেন থেকে নিজেকে বল পেনের হাতে সঁপে দিয়েও লেখক আক্ষেপ করেছেন। অফিসে কোনোদিন পেন নিয়ে যেতে ভুলে গেলে বিপদে পড়েন তিনি, কারণ, ‘কারও সঙ্গে কলম নেই।’ কালপ্রবাহে এমনটাই হয়েছে যে, কালি, কলম ছাড়াও আজ সকলে মুনশি | কম্পিউটারের আধিপত্যকে মেনে নিলেও কলমের সঙ্গে লেখকের শৈশবজীবনের স্মৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে, যা তাঁর মনকে ভারাক্রান্ত করেছে।


“কাল গুণে বুঝি বা আজ আমরাও তাই।”—এখানে কোন্ বিশেষ অবস্থার কথা বলা হয়েছে? এহেন অবস্থার কারণ কী ?

● ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' প্রবন্ধে লেখক শ্রীপান্থ বলেছেন—“কালি নেই, কলম নেই, বলে আমি মুনশি!”—কলমের এখানে বলেছেন।

সঙ্গে সংযোগহীন এই অবস্থার কথাই লেখক → “কালি কলম মন, লেখে তিনজন”—লেখক এই আপ্তবাক্যকে মন থেকে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু বাস্তবে কলমের অভাব তাঁকে পীড়িত করেছে | লেখালেখির অফিস অর্থাৎ সংবাদপত্র কার্যালয়ে তাঁর কাজ| তাই সবাই সেখানে লেখক | কিন্তু একমাত্র প্রবন্ধকার ছাড়া আর কারও কাছেই কলম নেই | সকলের সামনেই রয়েছে কম্পিউটারের মনিটর, আর হাতে কি-বোর্ড | সেখানে বোতামে ছাপা রয়েছে একটি করে হরফ, যাতে হাত লাগিয়ে টাইপ করে চলেছেন আর পর্দার দিকে তাকাচ্ছেন লেখকরা। এরকম অবস্থায় প্রবন্ধকার যদি কোনোদিন কোনো কারণে কলম নিয়ে যেতে ভুলে যান তাহলে বিপদ, কারণ কারও কাছেই কলম চেয়ে পাওয়া যায় না। যদি বা পাওয়া যায় তা ব্যবহারঅযোগ্য, কোনোভাবে কাজ সারতে হয় | অথচ তাঁদের অফিস পরিচিত ‘লেখালেখির অফিস' হিসেবে | অন্যভাবে এ হলো ‘লেখকের কারখানা”। এই পরিবেশে লেখক নিজেকে কলম ছাড়া মুনশি হিসেবে ভাবেন। মানুষের যত্ননির্ভরতা যে তাকে তার পুরোনো অভ্যাস ও অহংকার থেকে দূরবর্তী করে তুলছে তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত এবং হতাশ লাগে প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থের উচ্চারণ |

 


প্রবন্ধ কী? বস্তুনিষ্ঠ বা Formal Essay হিসেবে প্রবন্ধটি তদূর সার্থক?

● প্রবন্ধ শব্দটির ইংরেজি অর্থ হলো ‘Essay’ | সংস্কৃতে বলা হয় ‘প্রকৃষ্টরূপে বন্ধন।’ প্রবন্ধের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “Any brief composition in prose that undertakes to discuss a matter, express a point of view, or persuade us to accept a thesis on any subject whatever". প্রবন্ধ দুই প্রকার হয়— [১] বস্তুনিষ্ঠ বা Formal Essay, [২] ব্যক্তিনিষ্ঠ বা Informal Essay

আমাদের পাঠ্য শ্রীপান্থ রচিত ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ রচনাটি এক বিশেষ ধরনের রচনার উদাহরণ | একদিকে যেমন বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আছে, আছে যুক্তিনিষ্ঠ ও ভাবনার শৃঙ্খলা, পাশাপাশি রয়েছে ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের ব্যক্তিগত আবেগ ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ, সরসতা কৌতুকপ্রবণতা।

আলোচ্য প্রবন্ধটির শুরুতেই রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছোঁয়াচ| লেখকের অফিসে কলমের ব্যবহার আর কেউ করেন না—এই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখক ফিরে যান তাঁর শৈশবে। বাঁশের কঞ্চির কলম, লেখার পাতা হিসেবে কলাপাতা, কালি তৈরির কৌশল—এসব দিয়ে শুরু হয় কলমের ইতিহাস-পরিক্রমা | কথায় কথায় আসে মিশর বা রোমের কলমের ইতিহাস পরিক্রমা | কথায় কথায় আসে মিশর বা রোমের কলমের প্রসঙ্গ | ক্রমে আসে লুইস, অ্যাডসন ওয়াটারম্যান আর তাঁর ফাউন্টেন পেন আবিষ্কারের কথা। এই ফাউন্টেন পেন থেকে কম্পিউটার, লেখার ইতিহাসের এই বিবর্তনই তাঁর রচনার কেন্দ্রে থাকলেও তাঁর ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাসও শোনা যায় কলমের অবলুপ্তির কারণে | সমগ্র প্রবন্ধের মধ্যে তথ্যের জোগান যথেষ্ট, কিন্তু প্রাবন্ধিকের ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভব এই প্রবন্ধটিকে যে অত্যন্ত সরস ও মনোগ্রাহী করে তুলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।


প্রাবন্ধিক যেভাবে কলমের বিবর্তনের কথা বলেছেন, তা প্রবন্ধ অনুসরণে লেখো।

● ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক শ্ৰীপান্থ আমাদের দেশে ও বিদেশে কলমের বিবর্তনের একটি হদিশ পাঠকের সামনে রেখেছেন। জিশুখ্রিস্টের জন্মের আগে প্রাচীন মিশরে নল-খাগড়া ভেঙে নিয়ে, সেটিকে ভোঁতা করে তুলি বানিয়ে লেখার কথা তিনি বলেছেন | ফিনিশীয় দেশে হাড় দিয়ে কলম তৈরি হত। ব্রোঞ্জের শলাকা দিয়ে কলম বানাত প্রাচীন রোমের লোকেরা। এর পোশাকি নাম স্টাইলাস | চিনের লোকেরা লিখত তুলিতে।


আমাদের এখানে বাঁশের কঞ্চির কলম, খাগের কলম, পাখির পালকের কলমের চল ছিল। রোগা বাঁশের কঞ্চি কেটে মুখটি চিরে বাঁশের কঞ্চির কলম বানাতে হত। এখন কোথাও এই ধরনের কলমের চল নেই | আজকাল খাগের কলম দেখা যায় শুধু সরস্বতী পুজোর সময় | ব্রিটিশ আমলে পাখির পালকের কলম দিয়ে বাঙালি সাংবাকিদের লেখাকে ইংরেজরা নাম দেন, ‘বাবু কুইল ড্রাইভারস’ | পাখির পালকের কলমকে ‘কুইল’ বলা হত।

অর পরবর্তী ইতিহাস ফাউন্টেন পেনের। লুইস অ্যাডসন ওয়াটারম্যানের আবিষ্কৃত ফাউন্টেন পেন সব-রকমের কলমকে সরিয়ে জায়গা করে নেয়। নানা ধরনের ফাউন্টেন পেন বাজারে চলে আসে, যেমন পার্কার, শেফার্ড, সোয়ান ইত্যাদি| ফাউন্টেন পেনও একদিন জায়গা ছেড়ে দিল বল-পেন বা ডট্ পেনকে। সেই বল-পেন বা ডট্ পেনও আজ অবলুপ্তি পথে।


‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' প্রবন্ধে লেখক বেশ কয়েকটি প্রবাদের ব্যবহার করেছেন—প্রবাদের এই ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

● প্রবাদ হল সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। এই সামাজিক অভিজ্ঞতার মধ্যে লুকিয়ে আছে সামাজিক ইতিহাসেরও ধারা। অনেক সময়ে দেখা যায় যে সমাজের নানা দিক প্রথাগত ইতিহাসচর্চায় ধরা পড়ে না, অনেক সময়ে দেখা যায় যে সমাজের নানা দিক প্রথাগত ইতিহাসচর্চায় ধরা পড়ে না, অথচ তা থেকে যায় লোকমুখে এবং লোক-অভিজ্ঞতায় | প্রাবন্ধিক শ্ৰীপান্থ কালিকলমের ইতিহাস বলতে গিয়ে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে এই প্রবাদকে তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন।

‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে পাঁচটি প্রবাদের ব্যবহার চোখে পড়ে। শুরুতেই রয়েছে “কালি, কলম, মন লেখে তিন জন।” এই তিনটির মধ্যে ‘মন’ বাদে ‘কালি’, ‘কলম’ প্রাবন্ধিকের মতে লুপ্তপ্রায় এবং এই বিষয়টিই প্রধান আলোচ্য বিষয় | এরই সুত্র ধরে এসেছে পরের প্রবাদটি ‘কালি নেই, কলম নেই, বলে আমি মুনশি।

কালি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যে প্রবাদটি ব্যবহার করেছেন, লোকঅভিজ্ঞতা ও লোকশিক্ষার ছাপ তাতে স্পষ্ট। “তিল ত্রিফলা ছালা/ ছাগ দুগ্ধে করি মেলা/লৌহপাত্রে লোহায় ঘসি / না ছাড়ে মসি।” প্রবাদটি অনুসরণ করলে বোঝা যায় যে কালি তৈরি কীধরনের পরিশ্রমের কাজ ছিল | ফলে কলম ও আজকের এত সহজলভ্য ছিল না | সমাজের বিশেষ বিশেষ মানুষের অধিকার ছিল কলমের উপর, “কলমে 'কায়স্থ চিনি, গোঁফেতে রাজপুত |’ মাহাত্ম্য ছিল কালিরও, “কালির অক্ষর নাইকো পেটে, চণ্ডী পড়েন কালীঘাটে।” এভাবেই প্রবাদ হয়ে উঠেছে কখনও ইতিহাসের উপাদান, অভিজ্ঞতার ফসল, কখনও বা সমাজের দর্পণ।


‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ রচনাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

● সাহিত্যের নামকরণ যে একটি ‘Art’, এ-বিষয়ে বলাই বাহুল্য | সাহিত্য রচয়িতার অভিপ্রায় এবং সাহিত্যের গভীরার্থ অনেকাংশেই সংক্ষিপ্ত নামের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়। নামকরণ সাধারণত চরিত্রধর্মী, বিষয়ভিত্তিক বা ব্যঞ্জনাধর্মী হয়ে থাকে| পাঠ্য ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ নামকরণটি কতদূর । সার্থক তা আলোচনাযোগ্য |

কালি-কলম-মন, লেখে তিনজন—অর্থাৎ, প্রাচীনকাল থেকেই মনের সঙ্গে কালি এবং কলমের সম্পর্ক। সময় এগিয়ে চলে নদীর স্রোতের মতো। বহমানতার যুগে মানুষ ক্রমশ যন্ত্রকেন্দ্রিক আধুনিক হয়ে উঠছে। এরফলেই মানুষ মনের সঙ্গে যুক্ত থাকা ছোটো ছোটো সামগ্রী হারাতে বসেছে। লেখক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই বলেছেন যে তাঁর অফিসে সবাই কম্পিউটার ব্যবহারে পারদর্শী। একমাত্র তিনিই কলম ব্যবহার ছাড়তে পারেননি। এরফলে “একদিন যদি কোনও কারণে কলম নিয়ে যেতে ভুলে যাই তবেই বিপদ| কলম! কারও সঙ্গে কলম নেই।” এই বিলাপ থেকেই স্পষ্ট যে কলম হারিয়ে যেতে বসেছে। শৈশবে লেখকরা যেভাবে বাঁশের কলম তৈরি করে ব্যবহার করেছেন এবং কড়াইয়ের নীচের কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে তুলে জলে গুলে যেভাবে কালি তৈরি করেছেন তা এখন স্মৃতি প্রায়| ফাউন্টেন পেন আসার পর কলম হয়ে ওঠে সস্তা এবং সর্বভোগ্য। ক্রমশ ফাউন্টেন পেনের আধিপত্যকে পরাভূত করে বাজার দখল করে বল পেন | ইতিহাসের পাতায় চলে যায় বাঁশের পেন, খাগের পেন, পালকের পেন প্রভৃতি। কড়াইয়ের কালি, সুলেখা কালি, কালি শুকানোর ব্লটিং পেপার সব উধাও হয়ে যেতে থাকে। আক্ষেপের সুরে তাই লেখক বলেছেন, “আশ্চর্য, সবই আজ অবলুপ্তির পথে। কম্পিউটার তাদের জাদুঘরে পাঠাবে বলে যেন প্রতিজ্ঞা করেছে।” তাঁর আক্ষেপ বিষাদে পরিণত হয়েছে, কারণ তিনিও জানেন যে আধুনিকতার কাছে নিজেকে তুলে দিতে হবে| তবুও শৈশবের সেই কালিকলম হারিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন এবং আধুনিকতার স্বরূপটি বুঝিয়েছেন লেখক। তাই বিষয়ের সঙ্গে নামটি সাযুজ্যপূর্ণ এবং সংগতিলাভ করেছে। বিষয়ধর্মী নামকরণ হিসেবে নামটি তাৎপর্যপূর্ণ।

We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.