অসুখী একজন (পাবলো নেরুদা) মাধ্যমিক বাংলা সাজেশন

Madhyamik Bengali Suggestion Asukhi Ekjon, অসুখী একজন (পাবলো নেরুদা) মাধ্যমিক বাংলা সাজেশন, অসুখী একজন প্রশ্ন ও উত্তর Pdf, Techofpal.

অসুখী একজন (পাবলো নেরুদা) মাধ্যমিক বাংলা সাজেশন (প্রশ্নমান - ৩)


“আমি তাকে ছেড়ে দিলাম”—এই ছেড়ে দেওয়ার তাৎপর্য কী?

● যুদ্ধক্ষেত্রের আহবান কবিকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে। এই সময় গৃহসুখ, প্রিয়জনের সান্নিধ্য সবই অর্থহীন হয়ে যায় | বৃহত্তর জীবনের আহবান তুচ্ছ করে দেয় সাংসারিক বন্ধন | কবিকে চলে যেতে হয় দূরে। এই বিচ্ছেদের কথাই এখানে বাThe Unhappy Oneবজলা হয়েছে। শুধু অ-ই নয়, তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে কিছুই না জানিয়ে, তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই বৃহত্তর জগতের আহবানে তাঁকে বেরিয়ে আসতে হয়।


“আমি চলে গেলাম দূর ... দূরে।” কে, কেন দূরে চলে গিয়েছিলেন?

● পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়জনকে ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিলেন। মানুষ অনেক সময় কর্তব্যের খাতিরে,The Unhappy One দেশ ও দশের মুক্তির জন্য বিপ্লবের পথে পা বাড়ায়। তার ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা থাকে The Unhappy Oneনা | কেন-না, বিপ্লবের পথ, যুদ্ধের পথ সবসময় প্রত্যাবর্তনের পথ হয় না | এভাবেই রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে অথবা স্বদেশের মুক্তির লক্ষ্যে কবিও আত্মীয়পরিজন, প্রিয়জনের সান্নিধ্য ছেড়ে দূরে, অনেক দূরে চলে গিয়েছিলেন।


“একটা কুকুর চলে গেল, হেঁটে গেল গীর্জার এক নান”প্রসঙ্গটি উল্লেখের কারণ আলোচনা করো।

● সংগ্রামী মানুষকে যুদ্ধজয়ের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেই হয় | কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে তার প্রিয়তমা। বিপ্লবীর কাছে এইThe Unhappy One অপেক্ষা অর্থহীন। অপেক্ষারতা মেয়েটি তাইThe Unhappy Oneজানেও না যে বিপ্লবী মানুষটি আর কখনও ফিরে আসবে না| ফলে সময় বয়ে যায় | রাস্তা দিয়ে কুকুর কিংবা গির্জার সন্ন্যাসিনীর হেঁটে যাওয়া বোঝায় যে জীবন তার স্বাভাবিক বিচিত্র গতিতে বয়ে যায় | অপেক্ষা চলতেই থাকে।


“বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ”—কবি এ কথার মধ্যে দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন?

● বৃহত্তর সমাজ ও পৃথিবীর দাবি কখনো কখনো মানুষকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে| অগ্নিগর্ভ ভয়ানক বিপ্লবের পথকেই সে তার পথ বলে মনে করে। তার স্মৃতি, চেনা পৃথিবী, প্রিয় মানুষেরা—সব কিছুকে পিছনে ফেলে সে এগিয়ে যায় চূড়ান্ত সংগ্রামের লক্ষ্যে| সাংসারিক পৃথিবীতে ক্রমশ ধূসর হয়ে যায় মানুষটির স্মৃতি। প্রশ্নোদ্ভূত মন্তব্যে কবি এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।


“ঘাস জন্মালো রাস্তায়”—উদ্ধৃতিটি কোন্ তাৎপর্য বহন করে?

● পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কথকের স্বদেশত্যাগের কথা বলতে গিয়ে উদ্ধৃত অংশটির অবতারণা করা হয়েছে।

কবিতার কথক তাঁর প্রিয়জনের সান্নিধ্য ত্যাগ করে পা বাড়িয়েছিলেন ঠিকানাবিহীন বিপ্লবের পথে | সেই পথে যারা যায় তাদের ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না | কবিতার কথক যে পথ ধরে স্বদেশ-স্বজন ত্যাগ করেছি লেন সেই পথে আর ফিরে আসেননি। যুদ্ধ তাঁর ফেরার পথকে অবরুদ্ধ করেছিল। তাই তাঁর যাওয়ার পথে ঘাস জন্মেছিল।


“নেমে এল তার মাথার ওপর।” কী নেমে এল? এই নেমে আসার তাৎপর্য কী?

● পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় অপেক্ষারত মেয়েটির

মাথার ওপর অতিক্রান্ত বছরগুলো পাথরের মতো নেমে এল | → কবির কথামতো মেয়েটি দরজায় অপেক্ষা করতে থাকল দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। অথচ তিনি আর ফিরে এলেন না। প্রিয়জনকে হারিয়ে স্বজন-স্বদেশ অসুখী | তাই অতিক্রান্ত বছরগুলো ক্রমেই ভারী বলে অনুভূত হল। আর এই অনুভূতি চৈতন্য আচ্ছন্ন করেছিল বলে মনে হল তা যেন মাথার ওপর নেমে এসেছে।


“সেই মেয়েটির মৃত্যু হল না।”—এই ‘মৃত্যু না হওয়ার তাৎপর্য কী?

● বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ মানুষকে লড়াইয়ের লক্ষ্যে যেতেই হয়। এই যাওয়ার পথে সে তার সংসার, প্রিয়জন সব কিছুকেই পিছনে ফেলে যায়। কিন্তু এই কঠোর বাস্তবকে মানতে পারে না তার প্রিয়তমা মেয়েটি। প্রিয় মানুষটির জন্য তার অপেক্ষা চলতেই থাকে| যুদ্ধ হয়, অজস্র ধ্বংস এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কিন্তু মেয়েটির মৃত্যু ঘটে না। কারণ, তার ভালোবাসা চিরজীবী | তার কখনও মৃত্যু হয় না।


“সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন।” কী কারণে সমতলে আগুন ধরে গেল? আগুন ধরে যাওয়ার ফলে কী হয়েছিল?

● এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো যুদ্ধ এল, আর তাতেই সমতলে আগুন ধরে গেল।

● যুদ্ধের আগুন ধ্বংসাত্মক। তাই ভেঙে পড়ল মন্দির। টুকরো টুকরো হয়ে গেল শান্ত হলুদ দেবতাদের পাথরের মূর্তি | পুড়ে গেল স্বপ্নের ঘরবাড়ি, সাধের বাগান, গোলাপি গাছ, চিমনি আর প্রাচীন জলতরঙ্গ | বলা যায় সবকিছুই চুরমার হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে। যেখানে শহর ছিল সেখানে পড়ে রইল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর কবন্ধ পাথরের মূর্তির মাথা।


“তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না।”—মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।

● যুদ্ধ হলে সমাজের স্থিরতার অবসান ঘটে। যুদ্ধ হল রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো, যাতে শিশুমৃত্যু ঘটে, মানুষ নিরাশ্রয় হয়। সমতলে যেন আগুন ধরে যায়। এই অবস্থায় যে ঈশ্বরেরা হাজার বছর ধরে মন্দিরে ধ্যানমগ্ন ছিল তারাও ভেঙে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে। তাদের স্বপ্ন দেখা, বিশ্ববিধানকে নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদির শেষ হয়। এ আসলে ঈশ্বরের ভেঙে পড়া নয়, ঐশ্বরিকতার বা মানুষের ঈশ্বরবিশ্বাসের ভেঙে পড়া।


“সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে”—কবির এ কথা বলার কারণ উল্লেখ করো।

● বিপ্লবের পথ আসলে যুদ্ধের পথ। এ হল স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সমাজ পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ| তাই সাম্রাজ্যবাদী হোক বা শোষক শক্তি—প্রত্যাঘাত করে। সেই প্রবল লড়াইয়ে ভেঙে পড়ে সেই সুন্দর বাড়ি, যেখানে কবিতার বিপ্লবী মানুষটি একদিন থাকতেন, সেই বারান্দা যেখানে তিনি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমাতেন, কিংবা গোলাপি গাছ, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ ইত্যাদি। যুদ্ধের তাণ্ডবের অনিবার্যতায় সব কিছুই ভেঙে পড়ে, চূর্ণ হয়ে যায়।


“রক্তের একটা কালো দাগ।”—বিষয়টি কোন্ তাৎপর্যকে বহন করে।

● যে-কোনো যুদ্ধই আসলে ধ্বংসকে বহন করে আনে | জনজীবন কাঠকয়লা, যেন ধ্বংসস্তূপের সাক্ষ্য হয়ে। দোমড়ানো লোহা, মৃত বিনষ্ট হয়ে যায় | যেখানে একদিন শহর ছিল, সেখানে পড়ে থাকে শুধু পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা ইত্যাদি যেন ধ্বংসের চিহ্ন হয়ে থাকে| আর রক্তের কালো দাগ হত্যা, হিংসা, রক্তাক্ততার কাহিনিকে স্পষ্ট করে দেয় | সমাজে অত্যাচারী শাসক শক্তির নিজেকে রক্ষার তাগিদ এই রক্তপাত ঘটায়।


“যেখানে শহর ছিল”—–শহরের কী পরিণতি হয়েছিল এবং কেন?

● পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতার প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে একটা শহরের মর্মান্তিক পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। শান্ত সমাহিত পরিবেশে যুদ্ধ অস্থিরতা আর ধ্বংসকে আবাহন করে আনে। ঠিক তেমনই এক যুদ্ধে একটা শহর পুড়ে ছারখার হয়ে গেল | চারিদিকে শুধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রইল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা। এভাবেই যুদ্ধের তাণ্ডবে আস্ত একটা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

 

অসুখী একজন (পাবলো নেরুদা) মাধ্যমিক বাংলা সাজেশন (প্রশ্নমান - ৫)


“সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না।”— কার কথা বলা হয়েছে? কোথা থেকে কেন এই না ফেরার কথা বলা হয়েছে? না ফেরার কথা জানা না থাকায় কোন্ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতার প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে কবি তাঁর প্রিয়তমার কথা বলেছেন।

• → কবি এখানে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাঁর না ফেরার কথা জানিয়েছেন। মুক্তিসংগ্রামের লক্ষ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেছে যে মানুষ, স্বাধীনতা কিংবা শোষণমুক্তিই তার লক্ষ্য। এই লড়াইয়ের পথ কখনোই মসৃণ নয় | তাই বিরুদ্ধ শক্তির প্রবল বাধা এবং প্রত্যাঘাতে মৃত্যুকেই সেখানে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করতে হয়। এই কারণেই কবি ফিরে না আসার কথা বলেছেন।

→ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সবসময় সামাজিক দাবিকে বুঝতে সক্ষম হয় না। আবেগের সঙ্গে আদর্শের, অনুভূতির সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব তৈরি হয় | কবি বিপ্লবের যে সুকঠিন পথে যাত্রা করেছেন, তার স্বরূপ কবির প্রিয়তমার কাছেও তাই স্পষ্ট হয় না | ফলে তাঁর অপেক্ষা চলতেই থাকে| সপ্তাহের পরে সপ্তাহ, বছরের পর বছর কেটে যায় | দরজায় দাঁড়িয়ে প্রিয়তমের জন্য অপেক্ষা শেষ হয় না | সময়ের প্রবাহে কবির পায়ের ছাপ একদিন বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়, রাস্তা ঢেকে যায় ঘাসে, আরও অনেক বছর কেটে যায় | কিন্তু অপেক্ষার শেষ হয় না।


“তারপর যুদ্ধ এল”— তারপর' কথাটির দ্বারা কবি কোন্ সময়ের কথা বলেছেন? যুদ্ধের কোন্ প্রভাব কবি প্রত্যক্ষ করেছিলেন?

» পাবলো নেরুদা-র ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবি বিপ্লবের আহবানে ঘর ছেড়েছিলেন | কবির প্রিয়তমা অপেক্ষা করেছিলেন যে, একদিন কবি ফিরে আসবেন। অপেক্ষার প্রহর কিন্তু শেষ হয় না। বৃষ্টির জলে একসময় ধুয়ে যায় কবির পায়ের ছাপ | রাস্তা ঢেকে যায় ঘাসে। বছরের পর বছর এভাবে কেটে যাওয়ার পরে একসময় প্রস্তুতির কাল পেরিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় | ‘তারপর' কথাটির দ্বারা এই সময়কেই বোঝানো হয়েছে।

→ প্রস্তুতির কাল পেরিয়ে যখন যথার্থই মুক্তির লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু হয় সে যুদ্ধ আসে রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো। শিশুরাও সে হত্যালীলা থেকে রেহাই পায় না, মানুষের বসতি ধবংস হয় | আগুন লেগে যায় সমতলে। যেসব দেবতারা মন্দিরে ধ্যানমগ্ন ছিল হাজার বছর ধরে—তারা উলটে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অর্থাৎ ধ্বংস আর বিশ্বাসের ফাটল একইসঙ্গে ঘটে। যে সুন্দর বাড়িতে একদা কবি থাকতেন, বারান্দার যে ঝুলন্ত বিছানায় তিনি ঘুমাতেন এবং তার পুরোনো স্মৃতির সব আশ্রয় একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় যুদ্ধের তাণ্ডবে। শহর রূপান্তরিত হয় ধ্বংসস্তূপে| কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা যেন ধ্বংসের প্রতীক হয়ে উঁকি দেয়। আর রক্তের কালো দাগ প্রামাণ্যতা দেয় সেই হত্যালীলা ও ধ্বংসস্তূপের। এভাবেই যুদ্ধ আসে সর্বগ্রাসী চরিত্র নিয়ে |


“সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে”—অসুখী একজন’ কবিতা অবলম্বনে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

● পাবলো নেরুদার Extravagaria গ্রন্থের একটি কবিতার নবারুণ ভট্টাচার্যের করা অনুবাদ ‘অসুখী একজন' কবিতায় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চিরজীবী ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ কবির কাছে ‘রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো। শিশুহত্যা, নিরাশ্রয়তা—যুদ্ধের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে দেয়। মারণ যুদ্ধের স্পর্শে ছারখার হয়ে যায় পৃথিবী | প্রলয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ধ্বংস হয়ে যায় সব কিছু। যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ হয়ে যায় চারপাশ | মন্দিরের ভিতরে প্রতিমার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরের ঈশ্বরত্বও ধ্বংস হয়। যুদ্ধের নির্বিকার ধ্বংসে লুপ্ত হয়ে যায় কবির স্মৃতি| তার ফেলে আসা সুন্দর বাড়ি, সেই বারান্দা যেখানে তিনি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমাতেন, গোলাপি গাছ, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ অর্থাৎ যা কিছু ছিল কবির ফেলে আসা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী জীবনের স্মৃতি সবই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়| যুদ্ধ শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি বা জীবনহানি নয়, যুদ্ধ মানবিক বিপর্যয়ও | মানুষের স্মৃতির সঞ্চয়কেও সে শূন্য করে তোলে। যেসব জিনিসকে আশ্রয় করে অনুভূতির বিস্তার ঘটে সেগুলি যুদ্ধের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়| ঘরছাড়া একজন বিপ্লবীর মধ্যেও পুরোনো ফেলে আসা দিনের জন্য যে আবেগ কাজ করে, তা এই গোপন দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায়।


“আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়।”— এই অপেক্ষার তাৎপর্য সমগ্র কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো।

● পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভালোবাসার বিস্তারের কথা বলেছেন | মুক্তির আহ্বানে সাড়া দিতে ঘর, পরিজন—সব ছেড়ে বেরিয়ে আসে তরুপ বিপ্লবীর দল। আর সেই আহবানে সাড়া দিতে গিয়ে একজন বিপ্লবীকে তার সংসার, পরিজনকে পিছনে ফেলে যেতে হয়। কিন্তু একান্ত প্রিয় মানুষ এই বিচ্ছেদকে মেনে নিতে পারে না। চলে তার অপেক্ষা | সপ্তাহ শেষ হয়ে বছর চলে যায়, প্রতীক্ষার অবসান হয় না। যুদ্ধ শুরু হয়। সাজানো শহর ধ্বংসস্তূপে রূপান্তরিত হয়। মানুষ নিরাশ্রয় হয়, শিশুহত্যার মতো নারকীয় ঘটনা ঘটে | ভেঙে পড়ে মন্দিরের প্রতিমা। যে বিপ্লবী যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিল তার স্মৃতিসূত্রগুলিও ধ্বংস হয়ে যায় | ধ্বংস হয়ে যায় তার সুন্দর বাড়ি, বারান্দার ঝুলন্ত বিছানা ইত্যাদি । শহর হয়ে ওঠে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর পাথরের মূর্তির এক ধ্বংসস্তূপ | রক্তের কালো দাগ নিশ্চিত করে দেয় ধ্বংসের উন্মত্ত চেহারাকে| কিন্তু পাথরের ফুলের মতো ধ্বংসস্তূপের উপরে জেগে থাকে ভালোবাসা | কবির প্রিয়তমা মেয়েটির অপেক্ষার শেষ হয় না| যুদ্ধ সম্পত্তি বিনষ্ট করতে পারে, জীবনহানি ঘটাতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার অবসান ঘটাতে পারে না।


‘অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে দরজায় /আমি চলে গেলাম দূর...দূরে।”—বক্তা চলে যাওয়ার পরে কী কী ঘটেছিল?

● পাবলো নেরুদা-র ‘অসুখী একজন’ কবিতায় বিপ্লবী তাঁর প্রিয়তমাকে দরজায় অপেক্ষা দাঁড় করিয়ে রেখে নিজের লক্ষ্যে চলে যান। মেয়েটি জানত না যে কর্তব্যের সুকঠিন পথ পেরিয়ে তাঁর পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। তার অপেক্ষার সময় এগিলে চলে। রাস্তায় কুকুরের পাশাপাশি হেঁটে যায় গির্জার নান| সপ্তাহ, বছর কেটে যায় এইভাবে। বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় চলে যাওয়া মানুষটির পায়ের দাগ, রাস্তায় ঘাস জন্মায়। তারপরে যুদ্ধ আসে—রক্তের আগ্নেয় পাহাড়ের মতো। শিশুহত্যা ঘটে, মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস হয়। যুদ্ধের তাণ্ডবে ঈশ্বরের ঈশ্বরত্বও ভেঙে পড়ে। দেবতারা আর মানুষের বেঁচে থাকার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে না। ধ্বংসের এই উন্মত্ততায় বিপ্লবীর স্মৃতির স্মারকগুলোও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তার সুন্দর বাড়ি, তার বারান্দা, প্রিয় গোলাপি গাছ, ‘ছড়ানো করতলের মতো পাতা চিমনি’, প্রাচীন জলতরঙ্গ—সবকিছু চূর্ণ হয়ে যায়, জ্বলে যায় আগুনে, শহর পুড়ে ছড়িয়ে থাকে কিছু কাঠকয়লা। রক্তের কালো দাগের সঙ্গে দোমড়ানো লোহা আর পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা যেন পড়ে থাকে ধ্বংসস্তূপের স্মারক হয়ে। এই ধ্বংস আর রক্তাক্ততার মধ্যে বিপ্লবীর প্রিয়তমা মেয়েটির অপেক্ষা একইরকমভাবে জেগে থাকে।


“ “সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে।”—‘সব’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? তা কীভাবে আগুনে জ্বলে যায় আলোচনা করো।

→ ‘অসুখী একজন’ কবিতার উল্লিখিত অংশে বিপ্লবী তাঁর প্রিয় যে বাড়িটিতে থাকতেন, সেই বারান্দা যার ঝুলন্ত বিছানায় তিনি ঘুমিয়ে থাকতেন, প্রিয় গোলাপি গাছ, ‘ছড়ানো করতলের মতো পাতা চিমনি’, প্রাচীন জলতরঙ্গ— এইসব কিছু চূর্ণ হয়ে যায়।


● বিপ্লবীর পথ চলা সংগ্রামের দুর্গম পথে। তাই যুদ্ধ সেখানে অনিবার্য | যুদ্ধ আসে রক্তের আগ্নেয়পাহাড়ের মতো | অর্থাৎ ধ্বংস আর রক্তাক্ততাই যুদ্ধের অনিবার্য ফলশ্রুতি। এভাবেই কবির মতে সমস্ত সমতলভূমিতে ধরে যায় আগুন। সে আগুন অনেক কিছুকেই ধ্বংস করে। ধ্যানমগ্ন দেবতারা চূর্ণ হন। মানুষের আশ্রয় আর অবলম্বন হিসেবে সেটি আর গ্রাহ্য হয় না। অর্থাৎ আগুন লাগে মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাসেও | তার ফলেই যুদ্ধের আগুনে

ছাই হয়ে যায় সমস্ত স্মারক। বিপ্লবীর যা কিছু প্রিয় এবং একান্তভাবেই নিজস্ব—সে সবই চূর্ণ হয়ে জ্বলে যায়| এই যুদ্ধ যেন মানবিক বিনষ্টি আর ধবংসকে নিশ্চিত করে দিয়ে যায় | আগুনের সর্বগ্রাসী তাণ্ডবের শিকার হয়ে তার চিহ্নস্বরূপ পড়ে থাকে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা ইত্যাদি | এভাবেই সবকিছু আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়|


‘অসুখী একজন’ কবিতার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে আলোচনা করো।

● পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি যুদ্ধের পটভূমিকায় ভালোবাসার চিরকালীনতার কথা। একজন বিপ্লবীর যথার্থ জায়গা যুদ্ধক্ষেত্র | এরজন্য যে-কোনো রকম ত্যাগস্বীকারে বিপ্লবী দ্বিধাহীন কিন্তু যে প্রিয়জনকে ছেড়ে তিনি মুক্তিসন্ধানে যান তার পক্ষে বিচ্ছেদকে মেনে নেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই চলতে থাকে অনন্ত প্রতীক্ষার প্রহর গোনা | সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলে যায়, চলে যায় বছরের পর বছর। বৃষ্টি ধুয়ে দেয় বিপ্লবীর পায়ের ছাপ| কিন্তু অপেক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকে তাঁর প্রিয় মানুষটি| যুদ্ধের প্রস্তুতি শেষ করে যখন যথার্থই যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ধ্বংসের তাণ্ডবে হতশ্রী হয়ে যায় পৃথিবী। হত্যা, রক্তাক্ততা আর নিরাশ্রয়তা তৈরি হয়। পৃথিবীজুড়ে যেন আগুন ধরে যায়। মন্দিরের প্রতিমা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় বিপ্লবীর ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিও। চেনা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। যেখানে ছিল শহর সেখানে ছড়িয়ে থাকে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর ‘মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা|’ রক্তের কালো দাগ স্পষ্ট করে দেয় ধ্বংসলীলার প্রচণ্ডতা| কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও জেগে থাকে ভালোবাসা। বিপ্লবীর জন্য অপেক্ষা করে থাকে তার প্রিয়তমা। ভালোবাসা মৃত্যুহীন |


‘অসুখী একজন’ কবিতাটির নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে বিচার করো।

→ পাঠকের কৌতূহলকে রচনার ভাবসত্যের গভীরে নিয়ে যেতে হলে নামের মধ্যেই থাকে তার আভাস |

‘অসুখী একজন’ কবিতার কথক তাঁর প্রিয়জনকে দরজায় অপেক্ষা করতে বলে চলে যান দূরে। আর সেই মেয়েটি, যাকে কবি অপেক্ষা করতে বলেছিলেন, সে তার প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এবং একসময় বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হয়। বিপ্লবী যে পথে তাঁর স্বভূমি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন সেই পথে জন্মায় ঘাস। তারপর আসে ভয়ানক যুদ্ধ| ধ্বংস হয়ে যায় সবকিছু |

শুধু মৃত্যু হয় না অপেক্ষারত মেয়েটির| এত বিপর্যয়ের পরও সে কবির প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে | যুদ্ধ সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে, কিন্তু স্বজন ও স্বদেশের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে না। যুদ্ধের আগুনে বাড়িঘর পোড়ে, ছাই হয়ে যায় প্রাসাদ, উদ্যান, সবকিছু; কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জেগে থাকে ভালোবাসা | দীর্ঘ অপেক্ষা তার হৃদয়কে বেদনাভারাক্রান্ত করেছে বলে সে অসুখী | আর এইজন্যই কবিতার শিরোনাম ‘অসুখী একজন’ সার্থকতা লাভ করে যায়।


We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.