ইতিহাসের ধারণা বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

ইতিহাসের ধারণা বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

ইতিহাসের ধারণা (মাধ্যমিক) বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন ও উত্তর (প্রশ্নমান - ৪)


‘ইতিহাস’ বলতে কী বোঝ? বিগত শতকে ইতিহাসচর্চার প্রধান বিষয়বস্তুগুলি কী ছিল?

‘ইতিহাস' বলতে বোঝায় ‘অতীতের কাহিনি'। অর্থাৎ লিখিত ইতিহাসের যুগ এবং লিখিত ইতিহাসের আগের যুগ—উভয় যুগের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মসহ বিভিন্ন বিষয়ের চর্চাই হল ইতিহাস।

বিগত শতকে ইতিহাসচর্চার বিষয়বস্তু

ভূমিকা : আগে মূলত সমাজের উচ্চস্তর, সমাজ, রাজনীতি ও ধর্মের বড়ো বড়ো ঘটনাবলি প্রভৃতির আলোচনাই ছিল ইতিহাসচর্চার বিষয়বস্তু। যেমন—

[1] রাজারাজড়ার কাহিনি : আগে ইতিহাসচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতন, যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্যজয়, সেনাপতি ও দিগ্বিজয়ী বীরদের সাফল্য-ব্যর্থতা প্রভৃতি।

[2] উচ্চবর্গের কাহিনি : রিগত শতকে অর্থাৎ রাজার পারিষদবর্গ, অভিজাত শ্রেণি, স্থানীয় ভূস্বামী, জমিদার ও শাসকগোষ্ঠী প্রমুখের জীবনযাত্রার ঘটনাবলি ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় ছিল।

[3] ধর্মীয় কাহিনি : বিগত শতকে ইতিহাসের আলোচনার একটি প্রধান বিষয় ছিল মানুষের ধর্মীয় জীবন নানা ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ।

[4] রাজনৈতিক ঘটনাবলি : অতীতের বড়ো ধরনের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাবলি আগে ইতিহাসের আলোচনায় স্থান লাভ করত। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, পাশ্চাত্য ভাবধারার প্রসার প্রভৃতি সহজেই ইতিহাসের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

[5] বিপর্যয় : অতীতের বিভিন্ন বড়ো ধরনের বন্যা, খরা, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ মহামারি, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতির ফলে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি প্রভৃতি ঘটনাবলি আগে ইতিহাসের আলোচনায় উঠে আসত।


সাম্প্রতিককালের ইতিহাসচর্চায় সাধারণ মানুষের কোন্ কোন্ দিকগুলি গুরুত্ব সহকারে স্থান লাভ করেছে?

ইতিহাসচর্চায় সাধারণ মানুষ

ভূমিকা : বিগত শতকেও ইতিহাসচর্চায় মূলত রাজারাজড়া, সমাজের উচ্চবর্গ, অভিজাত শ্রেণি, সামন্তপ্রভু, জমিদার প্রমুখের নানা ঘটনাবলি আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সমাজের সাধারণ মানুষের নানা দিক ইতিহাসের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। যেমন—

[1] মানুষের বাঁচার তাগিদ : যুদ্ধবিগ্রহ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাবলির আড়ালে সমাজের সাধারণ মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তা বর্তমানকালে ইতিহাসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

[2] জীবনের চিত্র : সমাজের উচ্চবর্গের পাশাপাশি নিম্নবর্গের মানুষের জীবনের ঘটনাবলি সাম্প্রতিককালে ইতিহাসচর্চার অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ মানুষের ভূমিকা নিয়ে বর্তমানে চর্চা বৃদ্ধি পেয়েছে।

[3] শিল্পসংস্কৃতি : রাজারাজড়াদের যুদ্ধবিগ্রহের পাশাপাশি বর্তমানকালে সাধারণ মানুষের শিল্পসংস্কৃতি চর্চাও গুরত্বের সঙ্গে ইতিহাসে আলোচিত হতে শুরু করেছে। সাধারণ ইতিহাসের ধারণা মানুষের জীবনের সমাজ, খেলাধুলা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, দৃশ্যশিল্প, চিত্রকলা প্রভৃতি বিষয়গুলি নিয়ে ইতিহাসচর্চা আজকাল বেড়েছে।

[4] লড়াই : সাধারণ মানুষের নানা লড়াইয়ের ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের কীরূপ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সেসব বিষয় বর্তমানে ইতিহাসচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

[5] বিবর্তন : প্রাচীনকাল থেকে সাধারণ মানুষের হাত ধরেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়গুলির বিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান যুগের ইতিহাসচর্চায় সেসব বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।


সাম্প্রতিককালে ইতিহাসের আলোচনার বিষয়বস্তু নানা শাখায় প্রসারিত হওয়া প্রসঙ্গে আলোচনা করো।

অথবা, আধুনিককালে ইতিহাসচর্চার নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ দিকগুলি উল্লেখ করো।

আধুনিককালে ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্য

ভূমিকা : একদা ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে মূলত রাজামহারাজদের কাহিনি, রাজবংশের উত্থান-পতন, সেনাপতি বা দিগ্বিজয়ী বীরদের সাফল্য-ব্যর্থতার কাহিনি, সমাজের উচ্চবর্গের জীবনচর্চা প্রভৃতি আলোচনাই গুরুত্ব পেত। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বহু নতুন বিষয় ইতিহাসচর্চার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ইতিহাসচর্চা বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন—

[1] রাজাদের কার্যকলাপ : বিগত শতাব্দীর মতো বর্তমানকালেও যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্যজয়, শান্তিপ্রতিষ্ঠা, সন্ধি, রাজবংশের উত্থান-পতন প্রভৃতি বিষয়ের ইতিহাসচর্চা অব্যাহত আছে।

[2] উচ্চবর্গের আলোচনা : বিগত শতকের মতো সাম্প্রতিককালেও অভিজাত, ভূস্বামী, জমিদার, সামন্তপ্রভু প্রভৃতি সমাজের উচ্চবর্গের আলোচনা ইতিহাসচর্চার অন্যতম বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

[3] সাধারণ মানুষের আলোচনা : বিগত শতক পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাকপরিচ্ছদ, শিল্প-সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়ের ইতিহাসচর্চা অনেকটা উপেক্ষিত থাকলেও সাম্প্রতিককালে এসব বিষয়ের চর্চা ও গুরুত্ব যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

[4] স্থানীয় ইতিহাস : সাম্প্রতিককালে আঞ্চলিক ও স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে চর্চাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মহাদেশ থেকে দেশ, দেশ থেকে স্থানীয় অঞ্চলের শহর ও গ্রাম, শহর ও গ্রাম থেকে ব্যক্তি, মানুষ প্রভৃতি সবকিছুই ইতিহাসের আলোচনায় স্থান পাচ্ছে।

[5] বিজ্ঞানের ইতিহাস : প্রাচীনকাল থেকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার যে ধারাবাহিক অগ্রগতি ঘটেছে সে বিষয়ের ইতিহাসচর্চাও সাম্প্রতিককালে বৃদ্ধি পেয়েছে।

[6] নারী ইতিহাস : একদা ইতিহাসচর্চায় নারীরা যথেষ্ট উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমানেও বিভিন্ন ইতিহাসবিদ নারীইতিহাসচর্চায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন।


‘নতুন সামাজিক ইতিহাস' কী? কোন্ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন সামাজিক ইতিহাসের চর্চা করা হয়?

নতুন সামাজিক ইতিহাস

ইতিহাসের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সামাজিক ইতিহাস। আগে সামাজিক ইতিহাস শুধু রাজা-মহারাজা, অভিজাতবর্গ ও উচ্চবর্গের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানকালে এই আলোচনার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে এবং সমাজের সাধারণ, নিম্নবর্গ ও প্রান্তিক মানুষের আলোচনাও এতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে সামাজিক ইতিহাস ‘নতুন সামাজিক ইতিহাস’ রূপে পরিচিত হয়েছে।

নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিভঙ্গি

ভূমিকা : ১৯৬০-৭০-এর দশকে নতুন সামাজিক ইতিহাসের আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। এই সময় থেকে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেসব মানুষের ইতিহাসচর্চা শুরু হয়।

[1] নীচ থেকে ওপর দিকে দৃষ্টিপাত : নতুন সামাজিক ইতিহাসের আলোচনায় ওপর থেকে নীচের দিকে দেখার পরিবর্তে নীচে থেকে ওপরের দিকে দেখার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ সমাজের মুষ্টিমেয় উচ্চবর্গের মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রে সাধারণ ও নিম্নবর্গের মানুষের ভূমিকার ভিত্তিতে সমাজকে দেখার চেষ্টা করা হয়।

[2] বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য : নতুন সামাজিক ইতিহাসে মুষ্টিমেয় উচ্চবর্গকে নয়, বৃহত্তর সাধারণ, নিম্নবর্গের ও প্রান্তিক মানুষকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। সমাজ-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবদান নতুন সামাজিক ইতিহাসে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।


‘নতুন সামাজিক ইতিহাস’-এ কাদের আলোচনা প্রাধান্য পায়? আধুনিককালে কারা নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চাকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন?

নতুন সামাজিক ইতিহাসে প্রাধান্য

বিংশ শতকের নতুন সামাজিক ইতিহাসে সমাজের নিম্নবর্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ, দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আলোচনা প্রাধান্য পায়।

নতুন সামাজিক ইতিহাসের চর্চা

ভূমিকা : বিগত শতকে ১৯৬০-৭০-এর দশকে নতুন সামাজিক ইতিহাসের আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। এই সময় থেকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নতুন সামাজিক ইতিহাসকে জনপ্রিয় করে তোলেন। যেমন—

[1) অ্যানাল গোষ্ঠীর ভূমিকা : মার্ক ব্লখ ও লুসিয়েন ফেবর ‘অ্যানাল্স অব ইকনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল হিস্ট্রি' (১৯২৯) খ্রি.) নামে পত্রিকার প্রকাশ করেন। ফ্রান্সের এই অ্যানাল পত্রিকাগোষ্ঠী নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই গোষ্ঠীর ফার্নান্দ ব্রদেল, লাদুরি প্রমুখ সাধারণ মানুষের পরিসংখ্যান, পরিবার, মনস্তত্ত্ব, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি প্রভৃতি ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।

[2] মার্কিন ঐতিহাসিকদের ভূমিকা : ইউজিন জেনোভিস, হারবার্ট গুটম্যান প্রমুখ মার্কিন ঐতিহাসিক সমাজের সাধারণ শ্রমিকদের জীবনযাত্রা, ক্রীতদাসপ্রথা, দাস সমাজ প্রভৃতি নিয়ে ইতিহাসচর্চা করেছেন। ‘পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’ পত্রিকায়ও এই ধারার ইতিহাসচর্চার নানা প্রমাণ পাওয়া যায়।

[3] নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা : ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ১৯৮০-র দশক থেকে নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা (সাবলটার্ন স্টাডিজ) ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, শাহিদ আমিন, সুমিত সরকার, দীপেশ চক্রবর্তী, গৌতম ভদ্র প্রমুখ ঐতিহাসিক জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের ইতিহাসচর্চা করে নিম্নবর্গের ইতিহাসকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।

জেনে রাখো ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ তাঁর ‘সিলেক্টেড সাবলটার্ন স্টাডিজ', ‘এলিমেন্টারি অ্যাসপেক্ট অব পিজেন্ট ইনসারজেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’, ‘সাবলটার্ন স্টাডিজ রিডার : ১৯৮৬-১৯৯৫' প্রভৃতি গ্রন্থে সামাজিক ইতিহাসে নিম্নবর্গের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতি আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন যে, ভারতের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস মূলত “উচ্চবর্গের মাহাত্ম্য ও আদর্শনিষ্ঠার বিবরণ। এই ইতিহাসে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকে, সত্যিকারের অস্তিত্ব থাকেব না।”


সাম্প্রতিককালে খেলাধুলা ও খেলাধুলার ইতিহাসচর্চা কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে?

খেলায় ইতিহাস

ভূমিকা : খেলাধুলার ইতিহাস খুবই প্রাচীন। মানুষের জীবনে খেলাধুলার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রোমান কবি জুভেনাল বলেছেন, “মানুষ দুটো জিনিসের জন্য আকুল হতে পারে—রুটি ও খেলাধুলো।”

[1] খেলাধুলার জনপ্রিয়তা : বিগত শতক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলাধুলা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক হবসবম উল্লেখ করেছেন যে, বিংশ শতকে ইউরোপীয় জীবনধারার অন্যতম প্রধান সামাজিক অভ্যাস হল খেলাধুলা।

[2] খেলাধুলার গুরুত্ব : কোনো সমাজের খেলাধুলা সেই সমাজের স্বরূপ প্রকাশ করে থাকে। খেলাধুলায় কোনো সমাজের মেয়েদের অংশগ্রহণ সেই সমাজে নারী স্বাধীনতার প্রমাণ দেয়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের হারিয়ে বাংলার মোহনবাগান দল আই এফ এ শিল্ড জিতে যে আনন্দে মেতে ওঠে তা ছিল প্রকৃতপক্ষে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের বাংলা ভাগের জবাব।

[3] জাতীয় আবেগ : খেলাধুলা বর্তমানকালে জাতীয় আবেগে পরিণত হয়েছে। খেলাধুলা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সমাজ-বিবর্তন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভৃতিকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে চলেছে।

[4] পাশ্চাত্যে খেলার ইতিহাসচর্চা : সাম্প্রতিককালে পাশ্চাত্যে খেলাধুলার ইতিহাসচর্চা শুরু হয়। জে এ ম্যাসান, রিচার্ড হোল্ড প্রমুখ গবেষক এই বিষয়ে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে গড়ে ওঠে ‘ব্রিটিশ সোসাইটি অব স্পোর্টস হিস্ট্রি'।

[5] ভারতে খেলার ইতিহাসচর্চা : সাম্প্রতিককালে বাংলা তথা ভারতে খেলাধুলার ইতিহাসচর্চায় যাঁরা বিশেষ খ্যাতিলাভ করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বোরিয়া মজুমদার, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রূপক সাহা, গৌতম ভট্টাচার্য প্রমুখ।


খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস এবং সাম্প্রতিককালের খ্যাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস ও ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : সুদূর প্রাচীনকাল থেকে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ধারাবাহিক বিবর্তন ও পরিবর্তন ঘটে চলেছে। এই বিবর্তন ও পরিবর্তনে কোনো বিশেষ সভ্যতা বা সংস্কৃতির বিশেষ প্রভাব থাকে।

[1] পরিবর্তন : কোনো মানবসমাজ ও সভ্যতার খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন সেই সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তনের পরিচায়ক। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন থেকে সেই সমাজ সম্পর্কে নানা তথ্য জানা যায়।

[2] প্রাচীন বাংলার দৃষ্টান্ত : প্রাচীনকালে বিভিন্ন সময়ে বাংলায় আমিষ আহার বিশেষ জনপ্রিয় হলেও পালযুগে বৌদ্ধধর্ম এবং সেনযুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে বাংলায় ভাত ও নিরামিষ খাবারের প্রচলন বাড়ে। খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তন থেকে সেযুগে ধর্মীয় প্রাধান্যের আভাস পাওয়া যায়।

[3] সুলতানি আমলে বাংলার দৃষ্টান্ত : সুলতানি আমলে বাংলায় ইসলামি সংস্কৃতির প্রসার এখানকার খাদ্যাভাসে প্রভাব ফেলে। অধ্যাপক শরিফউদ্দিন আহমেদ দেখিয়েছেন যে, একসময় ঢাকা প্রাদেশিক মুসলিম শাসকদের রাজধানী হলে এখানকার খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে। তখন থেকে ঢাকার রন্ধনপ্রণালীতে পারসিক খাদ্যরীতির প্রবেশ ঘটে এবং ‘ঢাকাই খাবার’-এর উদ্ভব হয়।

[4] ঔপনিবেশিক আমল : ঔপনিবেশিক শাসনও এদেশের খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ প্রভাব ফেলে। পোর্তুগিজদের প্রভাবে হুগলি জেলায় মিষ্টি তৈরিতে ছানার ব্যবহার শুরু হয়। এভাবে খাদ্যাভ্যাস কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্ জীবনকেও প্রভাবিত করে।

[5] খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চা : সম্প্ৰতি খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষকরা হলেন ড. কে টি আচয়, হারভে লেভেনস্টেইন, জোনাথন রাইট, রিয়াই টান্নাহিল, বিজয়া চৌধুরী, হরিপদ ভৌমিক প্রমুখ।


সাম্প্রতিককালে পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চার প্রয়োজনীয়তা কী?

পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চার প্রয়োজনীয়তা

ভূমিকা : প্রতিটি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদে নানা বিবর্তন ও

পরিবর্তন দেখা যায়। সামগ্রিক ইতিহাসচর্চার প্রয়োজনে পোশাকপরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চারও বিভিন্ন প্রয়োজন রয়েছে। যেমন— পোশাক-পরিচ্ছদ কোনো জনগোষ্ঠীর বা ব্যক্তি-মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি পরিচয় বহন করে।

[1] অর্থনৈতিক পরিস্থিতি : অভিজাত, ধনী, গরিব কৃষক ও শ্রমিক প্রভৃতি বিভিন্ন মানুষের পোশাকের মান পৃথক হয়। পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া যায়।

[2] সামাজিক পরিস্থিতি: কোনো সমাজের সামাজিক বিধিনিষেধ কেমন ছিল, সেই সমাজ কতটা প্রগতিশীল বা রক্ষণশীল ছিল, সমাজে লিঙ্গবৈষম্য ছিল কিনা প্রভৃতি সম্পর্কে সেই সমাজের মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে জানা যায়।

[3] অন্য সমাজের প্রভাব : কোনো সংস্কৃতি অন্য কোনো সমাজের সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল কিনা বা কতটা প্রভাবিত ছিল তা সেই সমাজের মানুষের পোশাকপরিচ্ছদ থেকে বোঝা সম্ভব। যেমন—ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতীয়দের পোশাক-পরিচ্ছদের ওপর পাশ্চাত্যের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

[4] সাংস্কৃতিক পরিচয় : পোশাক-পরিচ্ছদ জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অবস্থার পরিচায়ক। যেমন—আদিবাসী কৃষক এবং শহুরে বাবুদের পৃথক পৃথক পোশাক-পরিচ্ছদ উভয় গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পার্থক্যেরও পরিচয় বহন করে।

[5] প্রযুক্তির অগ্রগতি : উন্নত পোশাক-পরিচ্ছদ তৈরির জন্য উন্নতমানের প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। তাই কোনো জনগোষ্ঠীর পোশাক-পরিচ্ছদের উৎকর্ষতা দেখে সেই জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে আভাস পাওয়া সম্ভব।


সাম্প্রতিককালের ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করা প্রতিটি সভ্য মানবসমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রতি জাতির পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে সেই সমাজ বা জাতির ইতিহাসের নানা দিক জানা যায়। বর্তমানকালে

[1] পোশাক-পরিচ্ছদের বিবর্তন : সুপ্রাচীনকাল থেকেই প্রতিটি মানবজাতির পোশাক-পরিচ্ছদে ধারাবাহিক পরিবর্তন ও বিবর্তন লক্ষ করা যায়।

[2] পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চা : বর্তমানে পোশাকপরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষক চর্চা করে ইতিহাসের নতুন নতুন দিক উন্মোচন করছেন।

[3] চর্চার সূচনা : বিংশ শতকের সূচনালগ্নে বিভিন্ন পণ্ডিত পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চা শুরু করেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই ইতিহাসচর্চার ব্যাপক প্রসার ঘটে। ইউরোপের পাশাপাশি ভারতেও বিভিন্ন পণ্ডিত পোশাকপরিচ্ছদের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করছেন।

[4] ইউরোপে : সাম্প্রতিককালে ইউরোপে বিভিন্ন গবেষক পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস নিয়ে ব্যাপক চর্চা করেছেন। এসব গবেষণা কাজের মধ্যে—কার্ল কোহলার, জে ফর্বস ওয়াটসন, ও মাইকেল ডেভিস-এর অবদান উল্লেখযোগ্য।

[5] ভারতে : সাম্প্রতিককালে ভারতেও পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস নিয়ে চর্চা চলছে। এই বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল ত্রৈলোক্যনাথ বসুর ‘তাঁত ও রঙ’, মলয় রায়ের ‘বাঙালির বেশবাস : বিবর্তনের রূপরেখা', নিরুপমা পুণ্ডির ‘ফ্যাশন টেকনোলজি : টুডে অ্যান্ড টুমরো' প্রভৃতি।


সাম্প্রতিককালে শিল্পচর্চার কোন্ শাখাগুলি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে? শিল্পের ইতিহাসচর্চায় সংগীত কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

শিল্পচর্চার বিভিন্ন শাখা

কোনো মানবগোষ্ঠীর শিল্পচর্চার ইতিহাস থেকে তার সাংস্কৃতিক অগ্রগতির আভাস পাওয়া যায়। এই শিল্পচর্চার প্রধান ধারাগুলি হল সংগীত, নৃত্য, নাটক ও চলচ্চিত্র।

সংগীতের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : মানব ইতিহাসে শিল্পচর্চা সুপ্রাচীন। এই শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হল সংগীতের চর্চা। সাম্প্রতিককালে সংগীতের ইতিহাসচর্চা ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

[1] উচ্চবর্গের সংগীতচর্চা : প্রাচীনকালে রাজদরবার বা মন্দিরে যে সংগীতের চর্চা হত তা মূলত সমাজের উচ্চবর্গের মানুষের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর বিশেষ সংযোগ ছিল না। প্রাচীন সমাজে শ্রেণি বা বর্ণবৈষম্যের বিষয়ে স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায় সেই সমাজের সংগীতচর্চা থেকে।

[2] প্রভাব : কোনো জাতি বা সমাজের সংগীত অন্য কোনো জাতি বা সমাজের সংগীতের দ্বারা প্রভাবিত কিনা বা কতটা প্রভাবিত তা সংগীতের ইতিহাসচর্চা থেকে জানা সম্ভব। কোনো জাতি বা সমাজের সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ তার আভাস পাওয়া যায় অন্য জাতি বা সমাজের ওপর নিজেদের সংগীতের প্রভাব বিচার করে।

[3] বিবর্তন : ভারতীয় সমাজে একসময় ধর্মীয় সংগীতের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ধারাবাহিক বিবর্তনের ফলে বিংশ শতকে ভারতীয় সংগীতের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। বাংলা সংগীতে বিবর্তনের ধারায় বিংশ শতকে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, রজনীকান্তের গান প্রভৃতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

[4] বৈচিত্র্য : ধারাবাহিক বিবর্তন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সংগীতের ভাণ্ডারে বিভিন্ন ধরনের সংগীত জায়গা করে নেয়। বর্তমানকালে যেমন ধর্মীয় সংগীতের পাশাপাশি পল্লিগীতি, লোকগীতি, বাউল গান, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, ব্যান্ডের গান প্রভৃতির সমন্বয়ে বাংলা সংগীতের ভাণ্ডার বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

[5] ইতিহাসচর্চা : সাম্প্রতিককালে দেশবিদেশের বিভিন্ন গবেষক ও পণ্ডিত সংগীতের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করছেন। ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসচর্চায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন উমেশ জোশী, রাজ কুমার, করুণাময় গোস্বামী, সুধীর চক্রবর্তী, মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী এবং জয়শ্রী ব্যানার্জী প্রমুখ।


সাম্প্রতিককালে দৃশ্যশিল্পের শাখা হিসেবে নৃত্যশিল্পের ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

নৃত্যশিল্পের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : মানবসমাজে শিল্পচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা হল নৃত্যকলা। সুপ্রাচীনকাল থেকে নৃত্যকলা বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে চলে আসছে।

[1] ধর্মীয় ক্ষেত্রে নৃত্যকলা : প্রাচীন ভারতে ধর্মীয় ক্ষেত্রে নৃত্যকলার প্রচলন থাকলেও এই নৃত্যকলার সঙ্গে একমাত্র সমাজের উচ্চবর্গের যোগ ছিল, সাধারণ মানুষের কোনো যোগ ছিল না। বিভিন্ন মন্দিরে দেবদাসীদের নৃত্য ব্রাক্ষ্মণ ও উচ্চবর্গীয় মানুষের উপভোগের বিষয় ছিল। প্রচার করা হত যে এই রীতি ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপেরই অঙ্গ। নৃত্যকলা থেকে সে যুগের সামাজিক বৈষম্যের পরিচয়ও পাওয়া যায়।

[2] বিবর্তন :যুগে যুগে নৃত্যকলার বিবর্তন ঘটেছে। প্রাচীনকালের ধর্মীয় বন্ধন থেকে নৃত্য মুক্তিলাভ করে পরবর্তীকালে লোকসমাজের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। উচ্চবর্গের সঙ্গে আদিবাসীসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের নৃত্যও সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

[3] বৈচিত্র্য : আধুনিককালে প্রতিটি সমাজের নৃত্যকলাতেই নানা বৈচিত্র্য এসেছে। কত্থক, ভরতনাট্যম, ছৌ, কুচিপুরী, কথাকলি, গৌড়ীয় নৃত্য প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের নৃত্যের সমন্বয়ে ভারতের নৃত্যকলার ভাণ্ডার বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদয়শঙ্কর, অমলাশঙ্কর, রুক্মিনী দেবী, মল্লিকা সারাভাই, পণ্ডিত বিরজু মহারাজ, অনিতা রত্নম-সহ বিভিন্ন নৃত্যশিল্পী এই বৈচিত্র্য বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।

[4] নৃত্যকলার ইতিহাসচর্চা : বিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে নৃত্যকলার ইতিহাসচর্চা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নৃত্যের ইতিহাসচর্চার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল জে অ্যাডশিড ল্যান্সডেল সম্পাদিত 'ড্যান্স হিস্ট্রি : অ্যান ইনট্রোডাকশন', ওয়াং কেফেনের ‘দ্য হিস্ট্রি অব চাইনিজ ড্যান্স', রাগিনী দেবীর ‘ড্যান্স ডায়ালেক্ট অব ইন্ডিয়া', আকৃতি সিন্হার ‘লেট’স নো ড্যান্সেস অব ইন্ডিয়া’, শোভনা গুপ্তার ‘ড্যান্স অব ইন্ডিয়া', গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভারতের নৃত্যকলা’ প্রভৃতি।


সাম্প্রতিককালে দৃশ্যশিল্পের ইতিহাসে নাটকের ইতিহাসচর্চা কীভাবে, কীরূপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

নাটকের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন সভ্যতায় নাট্যশিল্প অর্থাৎ নাটকের প্রচলন ছিল। সুপ্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় প্রচলিত সুবিখ্যাত নাটকগুলি আজও বিভিন্ন দেশে মঞ্চস্থ হলে তা দর্শকদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

[1] ইউরোপে নাট্যচর্চা : প্রাচীনকালে ইউরোপে নাট্যচর্চার প্রচলন থাকলেও ইউরোপে আধুনিক নাট্যচর্চা শুরু হয় ষোড়শ সপ্তদশ শতকে এবং বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে। ইউরোপে শেকসপিয়ার, ক্রিস্টোফার মার্লো, বেন জনসন, জন গলসোর্দি, জর্জ বার্নার্ড শ প্রমুখের লেখা বিভিন্ন নাটক মঞ্চস্থ হলে সেগুলি প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

[2] বাংলায় নাট্যচর্চা : অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে ভারতে বিশেষ করে বাংলায় আধুনিক নাট্যচর্চার প্রসার ঘটে। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে বাংলা নাট্যচর্চার সূচনা হয় এবং ঊনবিংশ শতকে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, শিশির ভাদুড়ী, শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত প্রমুখ বাংলা নাটকে অসামান্য অবদান রাখেন।

[3] প্রতিচ্ছবি : বিভিন্ন দেশ বা সমাজে প্রচলিত নাটকগুলিতে সেখানকার সমকালীন ঘটনাবলি, শোষণ, অত্যাচার, বৈষম্য, সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি কাহিনি উঠে আসে। ফলে নাটক সেই সমাজের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে। নাটক আবার বিশেষ গণমাধ্যমেরও কাজ করে।

[4] নাটকের ইতিহাসচর্চা : সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন গবেষক যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নাটকের ইতিহাসচর্চা করছেন। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় নাট্যশালার ইতিহাস’, সত্যজীবন মুখোপাধ্যায়ের ‘দৃশ্যকাব্য পরিচয়', আশুতোষ ভট্টাচার্যের ‘বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস', সেলিম আল দীনের লেখা ‘মধ্যযুগের বাংলা নাট্য', সাইমন জাকারিয়ার লেখা ‘বাংলাদেশের লোকনাটক : বিষয় ও আঙ্গিক-বৈচিত্র্য’, বালদুন ধিংরার ন্যাশনাল থিয়েটার ফর ইন্ডিয়া' প্রভৃতি নাটকের ইতিহাসচর্চা বিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

জেনে রাখো এ পাশ্চাত্যে ডেভিড ক্লাসনারএর ‘এ হিস্ট্রি অব মডার্ন ড্রামা', পিটার জিয়নডি-র ‘থিওরি অব দ্য মডার্ন ড্রামা', রিচার্ড ড্রেইনের ‘টোয়েন্টিয়েথ-সেঞ্চুরি থিয়েটার : সোর্সবুক’, মড্রিস একস্টেইন-এর ‘রাইট অব স্প্রিং : দ্য গ্রেট ওয়ার অ্যান্ড দ্য বার্থ অব দ্য মডার্ন এজ’, মার্টিন ব্যানহাম সম্পাদিত ‘দি কেমব্রিজ গাইড টু থিয়েটার’ প্রভৃতি নাটকের ইতিহাসচর্চা বিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।


সাম্প্রতিককালে শিল্পের ইতিহাসচর্চায় চলচ্চিত্র কীরূপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

চলচ্চিত্রের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা : আধুনিক যুগে সিনেমা বা চলচ্চিত্রকে অনেকেই বিনোদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে মনে করে থাকেন। অগাস্ট লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের নামে দুই ভাই ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে (২৮ ডিসেম্বর) প্যারিসে প্রথম বায়োস্কোপের সফল বাণিজ্যিক প্রদর্শনী করেন।

[1] চলচ্চিত্রের কেন্দ্র : বিংশ শতকের প্রথমার্ধে আমেরিকার হলিউড এবং ভারতের বোম্বাই, চলচ্চিত্র নির্মাণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দাদাসাহেব ফালকের পরিচালনায় ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নির্বাক ছবি ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ মুক্তি পায়। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে কলকাতা (টালিগঞ্জ)।

[2] কাহিনি : চলচ্চিত্রের কাহিনির বিষয়বস্তু বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক ঘটনা, সমকালীন সমাজের ঘটনাবলি ও পরিস্থিতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ঔপনিবেশিক শাসন, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ফলে চলচ্চিত্র থেকে সমকালীন সমাজের ঐতিহাসিক তথ্য জানা যায়। উদাহরণ হিসেবে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণরেখা’ প্রভৃতি সিনেমার কথা বলা যায়। যেগুলিতে দেশভাগের বলি হয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জীবন-যন্ত্রণা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

[3] ইউরোপের চলচ্চিত্রের ইতিহাসচর্চা : চলচ্চিত্রের দীর্ঘ যাত্রাপথের বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে আজকাল যথেষ্ট চর্চা হচ্ছে। এই কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ইংরেজি গ্রন্থ হল পাম কুক-এর ‘দি সিনেমা বুক’, ফ্রান্সেসকো ক্যাসেটি-র ‘থিওরিস অব সিনেমা', জিওফ্রে নাওয়েল স্মিথ-এর ‘দ্য অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ওয়ার্ল্ড সিনেমা' প্রভৃতি।

[4] বাংলায় চলচ্চিত্রের ইতিহাসচর্চা : চলচ্চিত্রের ইতিহাসচর্চায় বাংলাও পিছিয়ে নেই। এই বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বাংলা গ্রন্থ হল—ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘চলচ্চিত্র, মানুষ এবং আরও কিছু’, সত্যজিৎ রায়ের ‘একেই বলে শুটিং’ ও ‘বিষয় চলচ্চিত্র’, তপন সিংহের ‘চলচ্চিত্র আজীবন’, অপূর্ব কুমার কুন্ডুর ‘ইউরোপের চলচ্চিত্র’, ভিনদেশী চলচ্চিত্র’, নির্মাল্য আচার্যর ‘শতবর্ষে চলচ্চিত্র’, জাকির হোসেন রাজুর ‘চলচ্চিত্রের চালচিত্র’, ফারহানা মিলির ‘সিনেমা এলো কেমন করে', সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ‘দেখার রকমফের : ঋত্বিক ও সত্যজিৎ’ প্রভৃতি।


Anonymous

Previous Post Next Post