বহুরূপী (সুবোধ ঘোষ) গল্পের প্রশ্ন উত্তর সাজেশন

বহুরূপী (সুবোধ ঘোষ) গল্পের প্রশ্ন উত্তর সাজেশন, Bahurupi Descriptive Questions Answers Suggestions, বহুরূপী (সুবোধ ঘোষ) গল্পের সাজেশন Pdf.

বহুরূপী (সুবোধ ঘোষ) গল্পের প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান - ৩)


“গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা।”—কোন্ গল্প শুনে হরিদা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল?

● গল্পের লেখক ও অন্যরা হরিদাকে জানিয়েছিল যে, জগদীশবাবুর বাড়িতে এক সন্ন্যাসী সাত দিন ধরে ছিলেন। সেই সন্ন্যাসী সারাবছরে একটি হরীতকী খান | বয়স হাজার বছরেরও বেশি | সন্ন্যাসী কাউকেই তাঁর পায়ের ধুলো দেন না। শুধুমাত্র জগদীশবাবুকে দিয়েছিলেন, কারণ জগদীশবাবু তাঁর জন্য কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে তার পায়ের কাছে ধরেছিলেন আর সন্ন্যাসী যখন সেই খড়ম পড়তে গেলেন তখন জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন | সন্ন্যাসীর এই গল্প শুনে হরিদা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।


“খুবই গরিব মানুষ হরিদা” — হরিদার দারিদ্র্যের পরিচয় দাও।

● শহরে একটা গলির ভিতরে হরিদার ঘর। সে কোনো কাজ করে না। সময় ধরে কোনো অফিসে বা দোকানে কাজ করা তার স্বভাববিরুদ্ধ| তাই তার রোজগারহীন সংসার | তার উনুনে অনেক সময় শুধু জলই ফোটে, ভাত ফোটে না। এই অভাব সে সহ্য করতে পারে, কিন্তু একঘেয়ে কাজ করতে তার ভয়ানাক আপত্তি | শুধু জীবনটাকে বাঁচাতে মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে সামান্য কিছু রোজগার করে | তাতেই কোনোদিন একবেলা-আধবেলা খেয়ে দিন চলে যায়।


কেন হরিদা কোনোদিন চাকরি করেনি?

● একঘেঁয়ে সময়বেঁধে কাজ হরিদার কোনোদিনই ভালো লাগত না|ইচ্ছে করলেই হরিদা যে-কোনো অফিসের কাজ অথবা কোনো দোকানের বিক্রিওয়ালার কাজ পেয়ে যেত। কিন্তু ঘড়ির কাটায় | সময় বেঁধে নিয়ম করে রোজই এক চাকরি করতে যাওয়া হরিদার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যথেষ্ট অভাব ছিল তার, কোনোদিন হাঁড়িতে ভাত চড়ত, কোনোদিন চড়ত না | এই অভাবটা সহ্য করতে হরিদার আপত্তি না থাকলেও একঘেঁয়ে কাজ করতে ভীষণ আপত্তি ছিল। তাই হরিদা কোনোদিন চাকরি করেনি।


“ঠিক দুপুরবেলাতে একটা আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল।”—আতঙ্কের হল্লাটি বর্ণনা করো।

● এক দুপুরবেলা বাস স্ট্যান্ডের কাছে এক পাগলকে দেখা গিয়েছিল। কটকটে লাল চোখের সেই পাগলের মুখ থেকে লালা ঝরছিল। তার কোমরে ছেঁড়া কম্বল আর গলায় টিনের কৌটোর মালা জড়ানো পাগলটা থান ইট হাতে নিয়ে বাসে বসা যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখে যাত্রীরা চেঁচিয়ে উঠছিল। কেউ কেউ দু-এক পয়সা তার সামনে ফেলে দিচ্ছিল| কেউ চিনতে না পারলেও বাস ড্রাইভার বুঝতে পেরেছিল হরিদাই বহুরূপী যে পাগল সেজে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে।


“কিন্তু দোকানদার হেসে ফেলে—হরির কাণ্ড”—হরি কী কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন?

● বহুরূপী হরিদা বিভিন্ন বেশ ধারণ করত। একদিন সারাবেলার ব্যস্ততা যখন কমে এসেছে, সন্ধ্যার আলো সবেমাত্র জ্বলেছে, হঠাৎই সবাই মিষ্টি রুমঝুম শব্দ শুনতে পায় | সবাই দেখে এক রূপসি বাইজি নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। সবাই তার দিকে তাকিয়ে থাকে আর সে ফুলসাজি এগিয়ে দিলে দোকানিরা তাতে পয়সা ফেলে দেয়| হরিদাই বাইজি সেজে এই কাণ্ড ঘটিয়েছিল আর বাইজি যে আসলে বহুরূপী সেটা জানতে পারলে অনেক মুগ্ধ দৃষ্টিরই মোহভঙ্গ হয়।


দয়ালবাবুর লিচুবাগানে কী ঘটনা ঘটেছিল?

● দয়ালবাবুর লিচুবাগানে স্কুলের চারটি ছেলে এসেছিল লিচু নেওয়ার আশায় | সেখানে হরিদা পুলিশ সেজে দাঁড়িয়েছিল আর সেই চারজন ছেলেকে সে ধরেছিল | সব ছেলেরা তাকে সত্যি পুলিশ বলেই মনে করেছিল এবং ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল। তারপর সেই ছেলেগুলির স্কুলের মাস্টার সেখানে এসে নকল পুলিশের কাছে ক্ষমা চেয়ে, তাকে আট আনা ঘুষ দিয়েছিলেন। সেই আট আনা ঘুষ পাওয়ার পর নকল পুলিশ হরিদা সেই চারজন ছেলেকে ছেড়েছিল।


“ঠিকই, আমাদের সন্দেহ মিথ্যে নয়।”—কারা, কী সন্দেহ করেছিল? সেই সন্দেহ যে ঠিক, তা কীভাবে বোঝা গেল?

● গল্পের কথক ও তাঁর বন্ধুরা ভেবেছিলেন হরিদা সন্ন্যাসীর কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেছে | হয়তো মনে মনে কোনো মতলব ফাঁদছে। * হরিদা একদিন কথক ও তাঁর বন্ধুদের বলে যে, সে তাঁদের একটা জবর খেলা দেখাবে| আর সেটা হবে জগদীশবাবুর বাড়িতে। জগদীশবাবু ধনী লোক। সন্ন্যাসীর গল্প শুনে হরিদা তাই তাঁকেই বেছে নিয়েছে। হরিদার কথা শুনেই কথক তাঁর বন্ধুদের সন্দেহ ঠিক বলে প্রমাণিত হল।


জগদীশবাবুর বাড়িতে যে সন্ন্যাসী এসেছিলেন তাঁর বর্ণনা দাও।

● জগদীশবাবুর বাড়িতে সাত দিন ধরে এক সন্ন্যাসী ছিলেন| খুবই উঁচুদরের এই সন্ন্যাসী থাকতেন হিমালয়ের গুহাতে। তিনি সারা বছরে শুধুমাত্র একটি হরীতকী খেয়ে থাকতেন | এছাড়া তিনি আর কিছুই খেতেন না | অনেকেই মনে করত, সন্ন্যাসীর বয়স ছিল হাজার বছরেরও বেশি। তাঁর পায়ের ধুলো ছিল অত্যন্ত দুর্লভ জিনিস; সবাই সন্ন্যাসীর এই পায়ের ধুলো পেত না। একমাত্র জগদীশবাবুই সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পেয়েছিলেন।


“সেতো ভয়ানক দুর্লভ জিনিস।”—দুর্লভ জিনিসটা কী? কে, কীভাবে তা লাভ করেছিল?

● দুর্লভ জিনিসটি হল সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো।

* জগদীশবাবুর বাড়িতে এক সন্ন্যাসী এসে সাত দিন ছিলেন। সেই সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো ছিল অত্যন্ত দুর্লভ। জগদীশবাবু যে-কোনো মূল্যে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিতে চেয়েছিলেন। তাই জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেছিলেন। তখন বাধ্য হয়ে সন্ন্যাসী তাঁর পা এগিয়ে দিয়েছিলেন আর সেই ফাঁকে জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন।


“হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।”হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যটি কী ছিল?

● গরিব হরিদা নিজের ছোট্ট ঘরে দিন কাটাত। কোনোদিন খাবার জুটত, কোনোদিন জুটত না। কিন্তু এই রোজকার একঘেঁয়ে জীবনে হরিদার একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য ছিল| হরিদা মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে রোজগার করত। কোনো কোনো দিন সকালে অথবা সন্ধ্যায় বিচিত্র সব ছদ্মবেশে সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ত। যারা চিনতে পারত তাদের মধ্যে কেউ কিছুই দিত না অথবা কেউ বিরক্ত হয়ে দু-একটা পয়সা বাড়িয়ে দিত। তবু প্রতিদিন বহুরূপী বেশে রাস্তায় বেরোনাটাই ছিল হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য।

“বড়ো চমৎকার আজকে এই সন্ধ্যার চেহারা” -সন্ধ্যার যে সৌন্দর্যের বর্ণনা এখানে আছে তা লেখ।

● ‘বহুরূপী' গল্পে উল্লেখিত সন্ধ্যেবেলায় আমরা দেখতে পাই অনেকদিন পর চাঁদের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল আলোর সৌন্দর্যে ভরে গেছে চারিদিক। ঠান্ডা ফুরফুরে বাতাস বইছে। গাছের পাতা হাওয়ায় দুলছে আর তারা যেন ঝিরঝির শব্দ দিয়ে কিছু বলতে চাইছে। চারদিক শান্ত, স্নিগ্ধ| জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দাতে মস্ত বড়ো একটা আলো জ্বলছে। আর সেই আলোর কাছে একটা চেয়ারের ওপর জগদীশবাবু বসে আছেন। সাদা মাথা, সাদা দাড়ি, সৌম্য, শান্ত, ও জ্ঞানী মানুষ জগদীশবাবু।

বিরাগীবেশে হরিদার বর্ণনা দাও।

● হরিদা বিরাগীর রূপ ধারণ করে জগদীশবাবুর বাড়িতে গেছিল| তার অনাবৃত গায়ে ছিল ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছিল একটি ছোটো থান, মাথায় শুকনো সাদা চুল, হাত, পায়ে ধুলোমাখা | তার হাতের ঝোলায় রাখা ছিল গীতা। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন জগতের সীমার ওপর থেকে সে হেঁটে হেঁটেই চলে এসেছে। শীর্ণ শরীরটাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন অশরীরী আর তার চোখ থেকে অদ্ভুত উদাত্ত, শান্ত ও উজ্জ্বল একটা দৃষ্টি যেন ঝরে পড়ছিল।


“আমি এই সৃষ্টির মধ্যে এক কণা ধূলি”—প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ব্যাখ্যা লেখো।

● জগদীশ বাবু বিরাগীরূপী হরিদাকে ‘মহারাজ’ বলে সম্বোধন করেন। তাঁর কথার উত্তর দিতেই বিরাগী হরিদা এ কথা বলেছে। জগদীশবাবু হরিদাকে ‘মহারাজ’ বলে সম্বোধন করেছেন। বিরাগী হরিদার মতে, আসল মহারাজ হলেন ঈশ্বর। মানুষ কখনও মহারাজ হতে পারে না। পৃথিবীর সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর। মানুষ সেই সৃষ্টির একটি অংশ মাত্র। সামান্য ধূলিকণার সঙ্গে মানুষকে তুলনা করে বিরাগী হরিদা সংসারবৈরাগ্যের পরিচয় দিয়েছেন। উক্তিটি আসলে হরিদার সন্ন্যাসীসুলভ দার্শনিক প্রবচন।


“ওসব হল সুন্দর সুন্দর এক একটি বঞ্চনা।” ‘ওসব’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? সেগুলোকে বঞ্চনা বলা হয়েছে কেন?

● ও সব বলতে ধন, জন ও যৌবনকেই বোঝানে হয়েছে।

● হরিদা বিরাগী সেজেছে। বিরাগী হলেন সংসারত্যাগী সর্বমোহমুক্ত। তাঁরা সিদ্ধপুরুষ। তাঁদের কাছে এই জাগতিক সুখসমৃদ্ধির কোনো মূল্য নেই। ধন, জন, যৌবন—এগুলিই মানুষের চিত্তকে চঞ্চল করে। আর সেসব পাওয়ার নেশায় মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে।প্রাপ্তির পরও লোভ প্রশমিত হয় না । আরও পাবার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় | তাই ওগুলোকে বিরাগী হরিদা বঞ্চনা বলেছে।


জগদীশবাবুকে বিরাগী কী উপদেশ শুনিয়েছিলেন?

● জগদীশবাবু বিরাগীর কাছে কিছু উপদেশ শুনতে চেয়েছিলেন। বিরাগী তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন—এই ধন, যৌবন সবকিছুই অস্থায়ী, কোনো কিছুই স্থায়ী নয়| এই সমস্ত কিছুই এক-একটি বঞ্চনা| মনপ্রাণের সব আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুধুমাত্র একজনের আপন হওয়ার চেষ্টা করতে হবে, যাঁকে পেলে এই সৃষ্টির সব ঐশ্বর্য | পাওয়া যায়। অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।


জগদীশবাবু বিরাগীকে এক মিনিট দাঁড়াতে বলে কী করেছিলেন?

● জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীবেশে হরিদার আবির্ভাব ঘটেছিল | জগদীশবাবুর অনুরোধ সত্ত্বেও বিরাগী তাঁর বাড়িতে থাকতে রাজি হননি | বিরাগীর থেকে উপদেশ শোনার পর জগদীশবাবু বিরাগীকে এক মিনিট দাঁড়াতে বলে ভেতর থেকে একটি থলি নিয়ে আসেন। সেই থলির ভেতর ছিল নোটের তাড়া। থলিটা বিরাগীর পায়ের কাছে রেখে, জগদীশবাবু ব্যাকুল স্বরে প্রার্থনা করেন তাঁর দান গ্রহণ করার জন্য | জগদীশবাবু বিরাগীর তীর্থভ্রমণ উপলক্ষে সেই অর্থ দান করতে চেয়েছিলেন।


“সেদিকে ভুলেও একবার তাকালেন না বিরাগী” কোন্‌দিকে, কেন তাকালেন না?

● জগদীশবাবু বিরাগীকে তীর্থভ্রমণ উপলক্ষে দানস্বরূপ একশো এক টাকা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিরাগী সেই দান গ্রহণ করেননি | তিনি জগদীশবাবুকে বলেছিলেন, তাঁর বুকের ভেতরই সব তীর্থ আছে | তাই তাঁর ভ্রমণ করে দেখবার কোনো দরকার নেই। অনায়াসেই তিনি ধুলো মাড়িয়েও যেমন যেতে পারেন, তেমনই সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে তিনি সক্ষম | ধনের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ নেই। এই কথা বলে বিরাগী সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে যান আর একশো এক টাকার থলিটা সিঁড়ির উপরই পরে থাকে।


কীভাবে বোঝা গেল যে বিরাগী আসলে হরিদাই ?

● লেখক তাঁর বন্ধুদের নিয়ে হরিদার বাড়ি এসে দেখলেন ঘরের উনুনে হাঁড়িতে চাল ফুটছে আর হরিদা বিড়ি ধরিয়ে চুপ করে বসে আছে। সবাই অবাক হয়ে গেলেন। কেউ-ই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বিরাগী আর হরিদা দুজনে একই লোক| কারণ হরিদার বিরাগী সাজের সঙ্গে তাঁরা আসল হরিদার কোনো মিল খুঁজে পাননি। কিন্তু বিরাগীর ব্যবহৃত সাদা উত্তরীয়, সেই ঝোলা এবং সেই গীতা হরিদার ঘরের মাদুরের ওপর রাখা আছে দেখে তাঁরা বুঝতে পারলেন বিরাগী আসলে হরিদাই |


“আমাদের দেখতে পেয়েই লজ্জিতভাবে হাসলেন”—কে, কাদের দেখতে পেয়ে হেসেছিল? লজ্জিতভাবে হাসির কারণ কী?

● গল্পের কথক এবং তাঁর বন্ধুদের দেখে হরিদা হেসেছিল।

● হরিদা জগদীশবাবুর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করবে বলে বিরাগী সেজেছিল| কথক ও তাঁর বন্ধুদের কাছে সেকথা সে আগেই জানিয়েছিল। হরিদার বিরাগীমূর্তি দেখে জগদীশবাবু মোহিত হয়ে যান। তিনি হরিদাকে একশো এক টাকা ভরে একটি থলিও দেন। কিন্তু হরিদা সেই টাকার থলি স্পর্শ করেনি। পূর্বপ্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি বলে সে লজ্জিত হয়েছিল।


“অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।”—হরিদা কী ভুল করেছিল? কেন সেই ভুল অদৃষ্ট ক্ষমা করবে না বলা হয়েছে?

● হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর কাছ থেকে একশো এক টাকা পেয়েও গ্রহণ করেনি। এটাকেই ‘ভুল’ বলা হয়েছে।

● হরিদা অতি দরিদ্র। কোনো নির্দিষ্ট পেশা তার নেই। বহুরূপী সেজে যা রোজগার হয় তাতে সংসার চলে না। বিরাগী সেজে হরিদা একশো এক টাকা পেয়েছিল। এতগুলো টাকা হয়তো তাকে অদৃষ্টই দিয়েছে। তা না নিয়ে হরিদা অদৃষ্টের বিরাগভাজন হয়েছে। এই কারণেই বলা হয়েছে। অদৃষ্ট তার ভুল ক্ষমা করবে না।


“খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো সব তুচ্ছ করে সরে পড়লেন?”প্রশ্নের উত্তরে হরিদা কী বলেছিল?

● হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়ি গেলেও তীর্থভ্রমণ উপলক্ষ্যে জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকা কিন্তু সে নেয়নি। লেখকরা তার এই টাকা না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে হরিদা বলে টাকাটা নিলে তার ঢং নষ্ট হয়ে যেত। সেহেতু সে বিরাগী সেজেছিল তাই বিরাগীর ধর্ম পালন করেছে। বিরাগী সন্ন্যাসীরা কোনোদিন টাকা স্পর্শ করেন না, তাই অভাব থাকা সত্ত্বেও হরিদা সেই টাকা গ্রহণ করতে চায়নি।


‘একজন বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা-পয়সা কী করে স্পর্শ করি বল?”—হতদরিদ্র হরিদার এই আচরণের নেপথ্যে কোন্ সত্য লুকিয়ে আছে?

● হরিদা পাগল, বাইজি, বাউল ইত্যাদি সেজে পয়সা নিয়েছে। কিন্তু বিরাগী সেজে পয়সা নিতে পারেনি। বিরাগী হলেন সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী | জাগতিক মোহ থেকে তাঁরা মুক্ত| হরিদা যখন বিরাগী সেজেছিল, তখন সে ওই চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়েছিল। একবারও ভাবেনি, সে বহুরূপী আবার এটাও সে ভেবেছিল, বিরাগী সেজে পয়সা নিলে একটি আদর্শকে কলুষিত করা হবে। বিরাগী চরিত্রের মহিমা তাতে ক্ষুণ্ন হবে। তাই হতদরিদ্র হরিদা জগদীশবাবুর যাবতীয় প্রলোভন ত্যাগ করতে পেরেছিল।


বহুরূপী (সুবোধ ঘোষ) গল্পের প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান - ৫)


‘বহুরূপী' গল্প অবলম্বনে হরিদার জীবনযাত্রার পরিচয় দাও।

● হরিদা ছিল গরিব মানুষ। ছোট্ট একটা গলির মধ্যে তার একটা ছোটো ঘর ছিল। এই ঘরে বসত লেখকদের চায়ের আড্ডা। যদিও চা, চিনি, দুধ লেখকরা নিজেরাই আনতেন | হরিদা শুধু তার উনুনের আগুনের আঁচে জল ফুটিয়ে দিত। কোনো ধরাবাঁধা কাজ করার ক্ষেত্রে হরিদার প্রাণের মধ্যেই যেন বাধা আছে | ঘড়ির কাঁটা ধরে একঘেয়ে কাজ করা হরিদার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব ছিল না। অভাবটা সহ্য করতে আপত্তি না থাকলেও একঘেয়ে কাজ করতে তার ভীষণ আপত্তি ছিল।

হরিদার জীবনের একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য ছিল। হরিদা মাঝে মাঝেই বহুরূপী সেজে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ত | কখনও পাগল, কখনও পুলিশ, কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি সাহেব, আবার কখনও বাইজি সেজে তাকে দেখা যেত বিভিন্ন জায়গায়। তার এই বহুরূপী সাজ দেখে অনেকে আনন্দ পেত| কেউ খুব অবাক হয়ে যেত তার এই অপূর্ব সাজ দেখে। যারা তাকে চিনতে পারত তার কিছুই দিত না, কিন্তু যারা চিনতে পারত না তারা এক-আনা, দু-আনা পয়সা দিত। কোনোদিন বা বেশিই রোজগার হত। এই বহুরূপী সাজই একরকম তার জীবনের পেশা হয়ে গিয়েছিল। এইভাবে শহরের জীবনে মাঝে মাঝেই চমৎকার সব ঘটনা ঘটিয়ে, ছদ্মবেশ ধরে বহুরূপী বেশে কিছু রোজগার করে হরিদার জীবন চলত |


“হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।” ‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

● সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা ছিল অত্যন্ত গরিব মানুষ | কিন্তু ধারাবাঁধা ছকে জীবন কাটানো হরিদার পছন্দ ছিল না | তাই অভাবকে সঙ্গী করেই তিনি জীবনের বৈচিত্র্য খুঁজতেন | বৈচিত্র্যের পেশাকে সঙ্গী করতে গিয়েই তিনি বহুরূপী সেজে গ্রাসাচ্ছাদনের চেষ্টা চালাতেন | হঠাৎ হঠাৎ সকাল কিংবা সন্ধ্যায় বিচিত্র ছদ্মবেশে পথে বের হতেন| কখনও বাস স্ট্যান্ডের কাছে উন্মাদের বেশে তাকে দেখা যেত, আবার কখনও শহরের রাজপথ ধরে বাইজির বেশে ঘুঙুর বাজিয়ে চলে যেতেন। শহরে নবাগত যারা হরিদাকে চিনত না, তারা মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকত, আর পরিচিতরা তার কাণ্ড দেখে হেসে চলত। কখনও বোঁচকা কাঁধে বুড়ো কাবুলিওয়ালা, কখনও হ্যাট, কোট, প্যান্টলুন পরা ফিরিঙ্গি সাহেব—এরকম অজস্র রূপেই হরিদাকে পাওয়া যেত। এমনকি পুলিশ সেজে স্কুলের মাস্টারমশাইকেও তিনি বোকা বানিয়েছিলেন। তার বিচিত্র এইসব সাজ আর তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আচরণে মানুষ কখনও হাসত, কখনও তারিফ করত, কখনও বা বিরক্ত হত। আর হরিদার যা সামান্য বকশিশ জুটত তাতেই তিনি “তাঁর ভাতের হাঁড়ির দাবি মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করেন”। কিন্তু এই দারিদ্র্যের মধ্যেও হরিদা যেন মুক্ত প্রাণের আনন্দ খুঁজে নিতেন। |


“এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝেই অদ্ভুত ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা।”— যে অদ্ভুত ঘটনাগুলি হরিদা ঘটিয়েছিল তার উল্লেখ করো।

● হরিদা বহুরূপীর বেশে শহরের জীবনে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ঘটনা সৃষ্টি করত। একদিন হরিদা পাগল সেজে বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তাকে কেউ চিনতে পারেনি | হরিদা তখন যেন এক উন্মাদ, যার মুখ থেকে লালা ঝরে পড়ছিল, চোখ কটকটে লাল | কোমরে তার ছেঁড়া কম্বল জড়ানো, গলায় টিনের কৌটার মালা ঝুলছে | বাসযাত্রীদের দিকে সে মাঝে মাঝে তেড়ে যাচ্ছিল থান ইঁট নিয়ে।

এইরকমই একদিন পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচুবাগানে হরিদা দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে চারজন স্কুল ছাত্রকে সে ধরে তারপর স্কুলমাস্টার এসে নকল পুলিশের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন| তারপরেও আট আনা ঘুষ দিয়ে স্কুলমাস্টার, তাঁর ছাত্রদের ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

আর-একদিন সন্ধ্যায় দোকানের লোকজনের ব্যস্ততা আর মুখরতা যখন জমে উঠেছে তখন হঠাৎ করেই সবাই ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পায়। তারা দেখে এক রূপসি বাইজি প্রায় নাচতে নাচতে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে। শহরে যারা নতুন এসেছিল তারা বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে থাকে। রূপসি বাইজি তার সাজি দোকানদারদের দিকে এগিয়ে দেয় আর দোকানদাররাও হাসিমুখে তাতে এক-দু সিকি ফেলে | কেবল দোকানদার তাকে চিনতে পারে যে সে হরিদা।


বহুরূপী সেজে হরিদা এইসব অদ্ভুত ঘটনাগুলি ঘটিয়েছিল।


“বাঃ এ তো বেশ মজার ব্যাপার।” মজার ব্যাপারটি কী? তা বক্তার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিল? ২+৩

● ‘বহুরূপী’ গল্পে জগদীশবাবুর বাড়ি এক সন্ন্যাসী এসেছিলেন। তিনি খুব উঁচু দরের সন্ন্যাসী। হিমালয়ের গুহাতে থাকতেন। সারাবছর একটা হরীতকী ছাড়া তিনি নাকি আর কিছুই খেতেন না। তাঁর বয়স হাজার বছরের বেশি। জগদীশবাবু ছাড়া আর কাউকে তিনি পায়ের ধুলো নিতে দেননি | জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বেলি লাগিয়ে দিয়েছিলেন | সন্ন্যাসীকে বিদায় দেওয়ার সময় জগদীশবাবু একশো টাকার একটা নোট জোর করে সন্ন্যাসীর । ঝোলার মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন। এটাই ছিল মজার গল্প |

→ সন্ন্যাসীর গল্প শুনে হরিদা প্রথমে গম্ভীর হয়ে যায়। সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। হরিদা হতদরিদ্র | নির্দিষ্ট কোনো পেশায় সে নিযুক্ত ছিল না। আসলে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সময় মিলিয়ে কাজ করা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ। তাই মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে সে পয়সা রোজগার করত। কিন্তু তাতে তার দিন চলত না। জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসীর কথা শুনে হরিদা চিন্তা করে জগদীশবাবু সন্ন্যাসীকে উদারহস্তে অনেককিছু দান করছেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন সাধুভক্ত ব্যক্তি। তাই সে-ও যদি কোনো সাধুসন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করে জগদীশবাবুর বাড়ি যায়, তবে নিশ্চয় তাঁর দাক্ষিণ্য থেকে বঞ্চিত হবে না। এই অভিপ্রায়ে হরিদা একদিন সত্যি সত্যি বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিল |


“গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা”— গল্পটি কী ছিল? হরিদার গম্ভীর হয়ে যওয়ার কারণ কী ছিল।

● অবস্থাপন্ন জগদীশবাবুর বাড়িতে এসে সাতদিন ধরে ছিলেন এক সন্ন্যাসী, যিনি হিমালয়ের গুহায় থাকতেন। তাঁর বয়স হাজার বছরের বেশি এবং সারা বছরে একটি হরিতকী ছাড়া তিনি আর কিছুই খেতেন না| জগদীশবাবু ছাড়া আর কাউকে তিনি পদধুলি দেননি | জগদীশবাবুও তা পেয়েছিলেন কৌশল করে। একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেন আর সন্ন্যাসী বাধ্য হয়ে তাতে পা গলতে গেলে সেই সুযোগে জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে নেন। জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর ঝোলার ভিতরে একশো টাকার একটি নোট জোর করে ফেলে দেন | সন্ন্যাসী হেসে সেখান থেকে চলে যান। এই গল্পই হরিদাকে শোনানো হয়েছিল।

→ হরিদা সন্ন্যাসী এবং জগদীশবাবুর এই গল্প শুনে গম্ভীর হয়ে যান। কথকরা এই গাম্ভীর্যের কারণ বুঝতে পারেন না। এই সময়েই হরিদা তাঁদের জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখাতে যাওয়ার কথা বলেন | জগদীশবাবুর কাছ থেকে সারা বছরের প্রয়োজনীয় অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। জগদীশবাবুর ধর্ম বিষয়ে দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই হরিদা নিজের উদ্দেশ্য সফল করতে চেয়েছিলেন।


“এবার মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার”— কে কোন্ প্রসঙ্গে মন্তব্যটি করেছে? তার এই উদ্দেশ্য কী শেষ অবধি সফল হয়েছিল—গল্প অবলম্বনে আলোচনা করো।

● মন্তব্যটি করেছেন বহুরূপী হরিদা | কথকদের কাছ থেকে হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা হিমালয়ের সাধুর কথা জানতে পারেন এবং জগদীশবাবু তাঁর পায়ের অতি দুর্লভ ধুলো পাওয়ার জন্য কীভাবে তাঁর খাতির-যত্ন করেছেন তা-ও শোনেন। এইসব শুনতে শুনতেই হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে এক ‘জবর খেলা’ দেখানোর পরিকল্পনা করেন | উদ্দেশ্য ‘মোটা মতন কিছু’ আদায় করে নেওয়া। তাই কাঙালের মতো হাত পেতে বকশিশ নেওয়ার বদলে হরিদা চান জগদীশবাবুর ধর্মবিশ্বাস আর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সারা বছরের রোজগার একদিনে করে নিতে। এই প্রসঙ্গেই তিনি মন্তব্যটি করেছেন।

→» জগদীশবাবুকে বোকা বানানোর জন্য সাদা থান পরে, গায়ে সাদা উত্তরীয় দিয়ে বিরাগীর বেশে হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে হাজির হন। সাদা মাথা, সাদা দাড়ি, মৌন শান্ত ও জ্ঞানী চেহারায় হরিদাকে দেখে সেখানে উপস্থিত কথকরাও চিনতে পারেননি | বিরাগীর বেশে হরিদার আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক কথাবার্তায় জগদীশবাবু অভিভূত হয়ে যান। তিনি বিরাগীকে তীর্থভ্রমণের জন্য একশো টাকা প্রণামি দিতে চান। কিন্তু হরিদাকে এখানে পাওয়া যায় সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর ভূমিকায়। সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে তিনি চলে

যান। পরে কথকদের তিনি বলেন যে বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর বহুরূপীর ‘ঢং’ নষ্ট হয়ে যেত। নিজের পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি অর্থ উপার্জনের অসাধু ইচ্ছাকে ত্যাগ করেন।


“আজ তোমাদের একটা জবর খেলা দেখাব। কাদের উদ্দেশ্যে এ কথা বলেছে? সে কোন্ জবর খেলা দেখিয়েছিল ?

● ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা কথক ও তাঁর বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে উদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন।

● বহুরূপী সেজে অর্থোপার্জন ছিল হরিদার নেশা এবং পেশা। ধর্মভীরু জগদীশবাবুকে বোকা বানিয়ে নিজের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে হরিদা তাই সাদা থান পড়ে, সাদা উত্তরীয় গায়ে দিয়ে হাজির হয় তাঁর বাড়িতে। জগদীশবাবু হরিদার নিখুঁত ছদ্মবেশের কারণে তাকে চিনতে না পেরে বিনয় ও ভক্তিতে গদগদ হয়ে যান। নিজেকে ‘সৃষ্টির মধ্যে এককণা ধূলি’ বলে উল্লেখ করে জগদীশবাবুকে নীচে নেমে আসতে বাধ্য করে কণ্ঠস্বরে গাম্ভীর্য, মুখমণ্ডলে প্রশান্তির ছবি ফুটিয়ে তুলে হরিদা নিজের সাজকে পূর্ণাঙ্গতা দান করে। বিরাগীবেশী হরিদা জানায় যে তার কোনো রাগ নেই, সে বিষয়ীর ঘরে থাকতে চায় না এবং সে সদ্য তীর্থভ্রমণে যাবে।

তীর্থযাত্রার জন্য জগদীশবাবু হরিদাকে একশো এক টাকার থলি দিতে চাইলে সে তা স্পর্শ না করে বেরিয়ে আসে | কিন্তু হরিদা অর্থগ্রহণ না করায় লেখক ও তাঁর বন্ধুদের সন্দেহ হয়। যদিও হরিদার বাড়ি এসে তাঁরা বুঝতে পারেন সে-ই বিরাগীর বেশ ধারণ করেছিল। হরিদার এইরূপ ছদ্মবেশ ধারণ করে জগদীশবাবুকে ধোঁকা দেওয়ার কৌশলটিকে আলোচ্য প্রসঙ্গে ‘জবর খেলা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদা বিরাগী সেজে যাওয়ার পর কী ঘটনা ঘটেছিল তা বর্ণনা করো।

● জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদা বিরাগী সেজে গিয়েছিল | হরিদার অনাবৃত গায়ে ছিল সাদা উত্তরীয় আর পরনে ছিল সাদা ছোটো থান, পা ছিল ধুলোমাখা আর সঙ্গে একটা ঝোলা এবং তার মধ্যে গীতা রাখা। তার শীর্ণ শরীর দেখে মনে হচ্ছিল যেন অশরীরী। | জগদীশবাবুকে বিরাগী বলেন যে তিনি নিজের সম্পত্তি আর অর্থের অহংকারে নিজেকে ভগবানের থেকেও বড়ো বলে মনে করেন। জগদীশবাবু বিরাগীকে রাগ করতে বারণ করায় বিরাগী জবাব দেন যে তিনি বিরাগী, তাঁর কোনো রিপুই নেই। বিরাগীকে জগদীশবাবু তাঁর বাড়িতে থাকার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু বিরাগী তাঁকে বলেন ধরিত্রীর মাটিতেই তাঁর স্থান, তিনি এই দালানবাড়িতে থাকবেন না। খাওয়ার কথা বলা হলে তিনি কোনো কিছু স্পর্শ না করে শুধুমাত্র এক গ্লাস ঠান্ডা জল খান। বিরাগী জগদীশবাবুকে মোহমুক্ত হওয়ার কথা বলেন | ধন, যৌবন সবকিছুই বঞ্চনা স্বরূপ| যাকে পেলে সৃষ্টির সব ঐশ্বর্য পাওয়া যাবে তাঁর কাছাকাছি যাওয়ার উপদেশ দিয়ে বিরাগী চলে যান। তীর্থভ্রমণের জন্য জগদীশবাবু বিরাগীকে একশো এক টাকা দিতে চাইলে বিরাগী সেই টাকা নেননি | সন্ন্যাসীর মতে, তিনি যেমন ধুলো মাড়িয়ে যেতে পারেন তেমনই অনায়াসে সোনা, টাকা এইসব মাড়িয়েও চলে যেতে পারেন। এই বলে সন্ন্যাসী সেখান থেকে চলে যান।


'আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি।'— ছদ্মবেশ ধারণ করেও হরিদা কীভাবে এই কথার সত্যতা প্রমাণ করেছেন লেখো।

● বড়ো চমকপ্রদ এবং নাটকীয় হরিদার জীবন | বাঁধাধরা আর পাঁচটা পেশায় সে নিযুক্ত হতে চায়নি | কারণ একঘেয়ে কাজ করতে তার ভয়ানক আপত্তি | বহুরূপী সেজে সে যা উপার্জন করত তাতে ঠিকমতো দিনাতিপাত হত না। এই সময় সে শোনে জগদীশবাবুর বাড়িতে এক সন্ন্যাসীর আগমনের কথা। ধনী জগদীশবাবু সন্ন্যাসীকে অর্থ-সহ নানা কিছু দান করেছিলেন। সন্ন্যাসীর গল্প হরিদাকে উজ্জীবিত করে। সে সিদ্ধান্ত নেয় বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়ি থেকে বেশ কিছু আদায় করবে, যা দিয়ে তার সারাবছর চলে যাবে। হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়ি উপস্থিত হয় | জগদীশবাবু তাকে দেখে অভিভূত এবং ভক্তিতে গদগদ হয়ে প্রথমে তাঁর বাড়িতে থাকার কথা বলেন। তারপর টাকার থলি এনে হরিদার পায়ের কাছে রাখেন | কিন্তু হরিদা প্রকৃত বিরাগীর মতো সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে। লোভ রূপান্তরিত হয়ে যায় ত্যাগে| বিরাগীর আদর্শভূমিতে দাঁড়িয়ে হরিদা ঘোষণা করে যে, তার কাছে ধুলোর মতো সোনাও তুচ্ছ। চরিত্রের সঙ্গে একাত্মতা পেশাদারিত্বকে পরাজিত করে ত্যাগের জীবনাদর্শকে তুলে ধরেছে।


“সেদিকে ভুলেও একবার তাকালেন না বিরাগী।”— বিরাগী কোন্ দিকে তাকাল না? তার না তাকানোর কারণ বিশ্লেষণ করো।

● কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা ‘বহুরূপী’ ছোটোগল্পে বিরাগী হরিদা পায়ের কাছে রাখা জগদীশবাবুর একশো টাকাভরতি থলির দিকে তাকায়নি।

● হতদরিদ্র হরিদার টাকার বড়োই প্রয়োজন ছিল| আর টাকার জন্যই সে জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে গিয়েছিল। অথচ বিনা আয়াসে প্রণামি হিসেবে একশো এক টাকার একটা থলি পেয়েও সে সেদিকে তাকায়নি। গল্পের এই ঘটনা গভীর তাৎপর্যবাহী| হরিদা বহুরূপী। এটাই তার পেশা। পুলিশ, পাগল, বাইজি প্রভৃতি সেজে সে পয়সা নিয়েছে। উক্ত পেশাগুলির সঙ্গে পয়সা নেওয়ার ব্যাপারটা খুব একটা অসংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু বিরাগী তো এক ধরনের আদর্শবাদের ধারক ও বাহক। সংসারত্যাগী বিরাগীর কাছে টাকা-পয়সা, ধনদৌলত অতি তুচ্ছ বস্তু। তা গ্রহণ করলে বিরাগীর আদর্শ নষ্ট হয়। পুলিশ বা পাগল সেজে মশকরা করা যায়, বিরাগী সেজে নয় | আসলে বহুরূপী হরিদা বাদবাকি যেসব চরিত্রের ভেক ধারণ করেছিল সেসমস্ত ক্ষেত্রেও তদনুরূপ আচরণ করেছিল। সেখানে চরিত্রগুলির গুরুত্ব বা গাম্ভীর্য কিংবা তাৎপর্য—কোনো কিছুই বিরাগীর চরিত্রের সমতুল্য নয়। এই বোধে উদ্বুদ্ধ হয়েই হরিদা টাকার থলির দিকে তাকায়নি।


“তাতে যে আমার ঢঙ নষ্ট হয়ে যায়।”— এই উক্তির মাধ্যমে | হরিদা কোন্ সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, তা নিজের ভাষায় লেখো।

● হরিদার জীবনে একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য ছিল। সকাল, সন্ধ্যায় বিচিত্র সব ছদ্মবেশে অপরূপ হয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে পরত |

হরিদা যখন যে রূপ ধারণ করত, সেই চরিত্রটির সঙ্গে সে যেন একাত্ম হয়ে যেত | উন্মাদ, নকল পুলিশ থেকে বাইজি—হরিদা যখন যা সাজত সেই চরিত্রটিই যেন হয়ে উঠত। জগদীশবাবুর বাড়ি সে বিরাগী সেজে গিয়েছিল। তাকে দেখে কেউ বোঝেনি সে হরিদা। জগদীশবাবু হরিদাকে বিরাগী ভেবে ভুল করেছিলেন এবং পুণ্যার্জনের জন্য বিরাগীর তীর্থভ্রমণ উপলক্ষে তিনি তাঁকে অর্থদান করতে চেয়েছিলেন। বিরাগী সেই টাকা স্পর্শমাত্র না করে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। হরিদা যথেষ্ট অভাবের মধ্যে দিন কাটাত; চাইলেই সে টাকাটা নিতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। এখানে বিরাগী চরিত্রটির সঙ্গে হরিদা একাত্ম হয়ে গেছে | একজন বিরাগী, যে সংসারধর্ম ত্যাগ করেছে সে কোনোদিনই বিষয়ী হয় না বা টাকা, সোনা কিছুই স্পর্শ করে না | এখানে হরিদাও তাই করেছে| বহুরূপী হরিদার পেশা হলেও সে সমস্ত রূপের সঙ্গেই যেন একাত্ম হয়ে গেছিল। তাই বিরাগী হয়ে টাকা কেন নেয়নি জানতে চাওয়া হলে তার জবাব ছিল যে, তার ঢং নষ্ট হয়ে যেত টাকা নিলে । কারণ হরিদা বিরাগীর বেশে সত্যিই বিরাগী হয়ে উঠেছিল। তাই জগদীশবাবুর থেকে তীর্থভ্রমণের অর্থ নিলে তা ধর্মবিরোধী হত।


“তোমরা যদি দেখতে চাও, তবে আজ ঠিক সন্ধ্যাতে জগদীশবাবুর বাড়িতে থেকো।”—বক্তা কে? তিনি সেই সন্ধ্যায় কী দেখিয়েছিলেন? সেই ঘটনার মধ্যে দিয়ে বক্তার কোন্ পরিচয় পাও?

● ‘বহুরূপী’ গল্পে উদ্দিষ্ট মন্তব্যটি করেছিলেন বহুরূপী হরিদা। | |

→ সেই সন্ধ্যায় বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন হরিদা | আদুড় গা, তার উপরে ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছোটো বছরের একটি সাদা থান৷ তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল জগতের সীমার ওপার থেকে যেন হেঁটে হেঁটে চলে এসেছেন | চোখে উদাত্ত, শান্ত ও উজ্জ্বল দৃষ্টি | জগদীশবাবু নীচে নেমে তাঁকে অভ্যর্থনা না করায় তিনি একে তাঁর সম্পত্তির অহংকার বলে উল্লেখ করেন। ‘পরম সুখ বলতে তিনি বোঝান “সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া”। জগদীশবাবু তাঁকে কয়েকদিন থাকতে বললে তিনি জানিয়ে দেন যে, খোলা আকাশ আর ধরিত্রীর মাটি থাকতে বিষয়ীর দালান বাড়িতে তিনি থাকবেন না। জগদীশবাবু প্রণামি হিসেবে একশো টাকা দিতে গেলে বিরাগী হরিদা তা নেন না, বরং বলে যান— “আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি।”

→ হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন সারা বছরের রোজগার করে আনার জন্য। কিন্তু চরিত্রটার সঙ্গে তিনি এতটাই একাত্ম হয়ে যান যে তাঁর আর উপার্জনের লক্ষ থাকে না। নিজের সৃষ্টিতে তিনি মগ্ন হয়ে যান। তাই খাঁটি সন্ধ্যাসীর মতো সবকিছুকে তুচ্ছ করে হরিদা চলে যান। নইলে তাঁর ‘ঢং নষ্ট’ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।


“হরিদার জীবনের ভাতের হাঁড়ি মাঝে মাঝে শুধু ফুটিয়েই সারা হবে”—এ কথার মধ্যে দিয়ে লেখক যে ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তুলেছেন তা লেখো।

● ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন অর্থ উপার্জনের আশায় | তাঁর বেশভূষা, কথা বলা জগদীশবাবুকে তো বটেই কথকদেরও চমৎকৃত করে দিয়েছিল। জগদীশবাবু এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি বিরাগীকে আতিথ্যগ্রহণের অনুরোধ জানান, তাঁর বিদায়ের সময়ে তীর্থভ্রমণের জন্য প্রণামি হিসেবে একশো টাকা দিতে চান। কিন্তু বিরাগীবেশী হরিদা অনায়াস উদাসীনতায় সেই টাকা প্রত্যাখ্যান করে চলে যান। তিনি যাওয়ার সময় বলে যান—“আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি।”—তাঁর এই আচরণ কথকদের বিস্মিত করে। তার কারণ, বিপুল টাকা অগ্রাহ্য করার মধ্যে দারিদ্র্যকে শিরোধার্য করে নেওয়ার ইঙ্গিতই থাকে। সন্ন্যাসীর চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ফলে সেই চরিত্রের সহনীয়তা ক্ষুণ্ন হবে বলে হরিদা টাকা গ্রহণ করেন নি। আর এই ঘটনা নিশ্চিত করে দেয় যে অভাব কখনও হরিদাকে ছেড়ে যাবে না। ভাতের হাঁড়িতে মাঝেমধ্যে শুধু জলই ফুটবে, তাতে চালের জোগান থাকবে না। কথকের মনে হয় অদৃষ্ট হরিদার এই ভুল কোনোদিন ক্ষমা করবে না।


‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে জগদীশবাবুর চরিত্র বিশ্লেষণ করো।

● ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা হলেও গল্পের মূল ভাবসত্যকে প্রতিষ্ঠা দিতে জগদীশবাবুর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি জগদীশবাবু : ব্যক্তি জগদীশবাবু ধনী, ঐশ্বর্যশালী। কৃপণ হলেও তিনি সৌম্য, শান্ত এবং জ্ঞানী।

ভক্তি বিহ্বলতা : জগদীশবাবু ঈশ্বরবিশ্বাসী, তাই সাধুসন্ন্যাসীর | সেবা তাঁর কাছে ঈশ্বরসেবার সমতুল্য | বাড়িতে আগত সন্ন্যাসীকে তিনি কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে দিয়েছেন। বিরাগী হরিদার কাছেও শুধু একটু আশীর্বাদের জন্য তিনি নতজানু হয়েছেন। তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকার একটি থলি বিরাগীর পায়ের কাছে নিবেদন করেছেন। আন্তরিক বিনয়ের সঙ্গে জগদীশবাবু বিরাগীর কাছে উপদেশ প্রার্থনা করেছেন।

কাহিনির ভাবসত্য প্রতিষ্ঠায় অবদান : ‘বহুরূপী’ গল্পের ভাবসত্যে এক নিগূঢ় দার্শনিক তত্ত্ব নিহিত আছে| বহুরূপী হরিদা বিরাগী সেজে সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করেছে। সংসারে সবই ‘সং'; ‘সার’ বলতে কিছুই নেই। বিরাগী চরিত্রের মধ্যে দিয়ে হরিদা এ কথাই প্রমাণ করেছে। জগদীশবাবুর প্রলোভন বিরাগীর চরিত্রাদর্শকে কষ্টিপাথরে যাচাই করে সত্যভূমিতে স্থাপন করেছে। জগদীশবাবু এখানে উপলক্ষ্যের ভূমিকা পালন করেছেন। এককথায় বলা যায় জগদীশবাবু ‘বহুরূপী’ গল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র, যাঁর দ্বারা কাহিনির গতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।


বহুরূপী গল্পের নামকরণ কতদূর সার্থক বিচার করো।

● ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা | লেখক জানিয়েছেন— “শহরের সবচেয়ে সরু এই গলিটার ভিতরে এই ছোট্ট ঘরটাই হরিদার জীবনের ঘর।” কোনো ছকে বাঁধা কাজে নিযুক্ত থাকতে তার ভালো লাগে না। তবে তার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য হল সে মাঝে মাঝে বহুরূপী সাজে | এতে সামান্য কিছু রোজগারও হয় বটে। কখনও বাসস্ট্যান্ড, কখনও বাজারে, কখনও আবার গেরস্থের বাড়ি বাড়ি সে বহুরূপী সেজে পয়সা রোজগার করে। বহুরূপী সাজাটাই তার পেশা | এই পেশাগত বিচারে গল্পের নামকরণ যথাযথ। কিন্তু সুবোধ ঘোষ গল্প কাহিনিতে একটু বাঁক ফেরালেন জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদাকে এনে | হরিদা চেয়েছিল কৃপণ, ধনী জগদীশবাবুর কাছ থেকে বেশি করে টাকা আদায় করবে। সেইমতো সে বিরাগীর বেশে সেজেওছিল ভালো | জগদীশবাবু তাকে দেখে মোহিত হয়ে পড়েন। এবং বুঝতেই পারেনি যে, সে একজন বহুরূপী। কিন্তু তিনি বিরাগী হরিদাকে একশো এক টাকার একটি থলি দিতে গেলে হরিদা তা প্রত্যাখ্যান করে। সে জানায়, বিরাগীর কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই | ত্যাগই এই জীবনের ধর্ম। অর্থাৎ বহুরূপী সাজলেও হরিদা অনুকরণীয় চরিত্রের অবমাননা করেনি। এখানেই হরিদার বহুরূপী পেশা গৌরবান্বিত হয়েছে। তাই বলা যায় গল্পের নামকরণ কিছুটা বিষয়কেন্দ্রিক হলেও ব্যঞ্জনাধর্মী।


‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার চরিত্রটি আলোচনা করো।

● সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পটির কাহিনিই বিকাশ লাভ করেছে হরিদার চরিত্রকে কেন্দ্র করে। অত্যন্ত গরিব মানুষ হরিদা। কোনো ধরাবাঁধা কাজ হরিদার পছন্দ নয়। কাজের মধ্যে মুক্তি এবং স্বাধীনতার আনন্দ খুঁজে নিতে চান বলেই বহুরূপীর পেশা গ্রহণ করেছিলেন হরিদা

হরিদার চরিত্রের মধ্যে সামাজিকতার দিকটি লক্ষণীয়। শহরের সবথেকে সরু গলিটার ভিতরে তার ছোট্ট ঘরটিই কথকদের চারবন্ধুর সকাল-সন্ধ্যার আড্ডার ঘর। চা চিনি দুধ কথকরা নিয়ে আসেন আর হরিদা উনানের আঁচে জল ফুটিয়ে দেন।

কখনও বাস স্ট্যান্ডের পাগল, কখনও রাজপথে হেঁটে যাওয়া বাইজি, বাউল, কাপালিক, বুড়ো কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি সাহেব—এরকম অজস্র রূপে তাঁকে দেখা গেছে। শুধু সাজ নয়, চরিত্রের সঙ্গে মানানসই ছিল তাঁর আচরণ। কিন্তু দিনশেষে দারিদ্র্যই হয়েছে তাঁর সঙ্গী।

হরিদার চরিত্রটি সমুন্নতির শীর্ষ ছুঁয়েছে কাহিনির শেষে। বিরাগীর বেশে জগদীশবাবুকে মুগ্ধ করে দিলেও তাঁর আতিথ্যগ্রহণের অনুরোধ কিংবা প্রাণামি হরিদা প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবেই পেশাগত সততায় অর্থলোভকে তিনি ত্যাগ করেন| বকশিশ ছাড়া বহুরূপীর জীবন আর কিছু আশা করতে পারে না—হরিদার এ কথা দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনালেও তা আসলে তাকে সততার ঔজ্জ্বল্যে আলোচিত করে।


ছোটোগল্প হিসেবে ‘বহুরূপী’ কতদূর সার্থক বিচার করো।

● ছোটোগল্প হল একটি একমুখী নিটোল গদ্যকাহিনি, যার বক্তব্য একটিই সংকটের মধ্যে দ্রুত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। সূচনায় থাকে আকস্মিকতা এবং উপসংহারে থাকে কৌতূহলবোধ। এই বৈশিষ্ট্যের আলোকে সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পটি বিচার্য।

‘বহুরূপী’ আসলে হরিদা নামে এক হতদরিদ্র মানুষের বাস্তব জীবনালেখ্য | ঘড়ির কাঁটার সামনে সময় বেঁধে দিয়ে আর নিয়ম করে একই ধরনের কাজ করা হরিদার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সে মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে যেটুকু রোজগার করে, তাতেই তার দিনাতিপাত হয় কোনোরকমে| পেশা হিসেবে বহুরূপী সাজাকে বেছে নেওয়ার জন্য গল্পের নাম ‘বহুরূপী’। কিন্তু তার মধ্যে জীবনের ব্যঞ্জনাপ্রকাশক বিশেষ ভাবসত্যও পাওয়া যায়। হরিদা যখন বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর যাবতীয় প্রলোভন এবং অর্থ, হেলায় তুচ্ছ জ্ঞান করেছে, তখনই কাহিনিটি ছোটোগল্পের মর্যাদা পেয়ে যায়। বিভিন্ন চরিত্রের বেশ ধারণ করে পয়সা উপার্জন করাই হরিদার পেশা। তবু সে জগদীশবাবুর টাকার থলি স্পর্শ করেনি। করলে ছোটোগল্পের ব্যঞ্জনা নষ্ট হত। করেনি বলেই পাঠকমন গল্পের উপসংহারে এসে অতৃপ্তি আর কৌতূহলে ঘুরপাক খেতে থাকে | এই ধরনের পরিণতিই আধুনিক ছোটোগল্পের বিশেষত্ব। কতিপয় চরিত্রের ক্রিয়াশীলতা কাহিনির ভাবসত্যকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে | তাই বলা যায়, ছোটোগল্পের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে ‘বহুরূপী’ সার্থক।


We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.