অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সাজেশন

অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সাজেশন, অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান Pdf, অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান সাজেশন, প্রশ্ন উত্তর সাজেশন.

অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান-৩)


“আমি এখন হাজার হাতে পায়ে/এগিয়ে আসি, উঠে দাঁড়াই”—কথাটির মধ্যে দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

→ অস্ত্রের থেকে অনেক শক্তিশালী মানুষের প্রতিবাদের ভাষা। মানুষের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ যে-কোনো অস্ত্রকে প্রতিহত করতে পারে| কবিও অস্ত্রশক্তির বিরুদ্ধে জাগ্রত জনশক্তিরই জয় ঘোষণা করেছেন। যে মানুষেরা অস্ত্রের প্রতি নির্ভর তাদের কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, অস্ত্র আসলে মানবতার বিরোধী, মনুষ্যত্বের পক্ষে অবমাননাকর। তাই অস্ত্র নয়, মানুষই এই পৃথিবীর শেষ সত্য। সেই জীবনীশক্তিতেই, অজস্র মানুষের শক্তিতেই তিনি শক্তিশালী। সংঘবদ্ধ জনশক্তিই কবির উঠে দাঁড়ানো এবং এগিয়ে চলার প্রেরণা।


“হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়াই।” হাত নাড়িয়ে কবি কীভাবে বুলেট তাড়ান?

» জয় গোস্বামীর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতার অংশ এটি। যুদ্ধবাজ মানুষ অস্ত্র হাতে মনুষ্যত্বের বৈপরীত্যে গিয়ে দাঁড়ায় | তার নেশা মানুষকে হত্যা করা, মনুষ্যত্বকে পদদলিত করে ক্ষমতা দখল করা। কবি গানকে সম্বল করে সেই অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চান| গান মানুষের শুভচেতনার বিকাশ ঘটায়, সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে, বিভেদ ভুলিয়ে একতার মন্ত্রে দীক্ষিত করে ঐক্যবদ্ধ শুভচেতনার কখনও পরাজয় নেই | তাই কবি গানকে হাতিয়ার করে সহজেই হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়ান।


“গানের বর্ম আজ পরেছি গায়ে”—কবির এই মন্তব্যের তাৎপর্য আলোচনা করো।

পাতার পোশাক কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটি থেকে উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি নেওয়া হয়েছে। এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে, অস্ত্রের আতঙ্ক আর পেশিশক্তির আস্ফালনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বর্ম হয়ে উঠতে পারে মানুষের শুভবোধ এবং চৈতন্য| এই কাজে সংগীত একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার গানের মধ্য দিয়ে যেমন আনন্দ আর সুন্দরের বিকাশ হয়, মন শুদ্ধ হয়ে ওঠে, ঠিক সেরকমই গান হয়ে উঠতে পারে প্রতিবাদের বাহন। তাই বুলেটকে প্রতিহত করতে কবি গানকে বর্মের মতো ব্যবহার করেন।


“আঁকড়ে ধরে সে-খড়কুটো”—কবি কাকে ‘খড়কুটো’ বলেছেন? তাকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন কেন?

● অস্ত্রের বদলে অস্ত্র বাঁচার উপায় নয়। অস্ত্র ফেলে গানকে কবি ধরতে চেয়েছেন। এই গানকেই তিনি ‘খড়কুটো’ বলেছেন।

→ ডুবন্ত মানুষ কিছু আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। যদি সেটা খড়কুটোও হয়, তবে তাকেই সে অবলম্বন ভেবে আঁকড়ে ধরে। কবিও মনে করেছেন, গানই হল মানুষের চেতনা পরিবর্তনের মাধ্যম। এই গান জীবনের গান। কবির কাছে একটা-দুটো এমন যে গান আছে, আগ্রাসী পৃথিবীতে তিনি তাদের আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান ।


“রক্ত মুছি শুধু গানের গায়ে -একথার মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

→ উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি কবি জয় গোস্বামীর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতা থেকে গৃহীত। গানের মধ্যে দিয়ে অস্ত্রের আতঙ্ককে অতিক্রম করে যেতে চেয়েছেন কবি | যাবতীয় সন্ত্রাস, নৈরাজ্য এবং মানবিক অপচয় যে রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করে, তৈরি করে দেয় যে বিপন্নতা তা থেকে কবি মুক্তি খুঁজেছেন শুধু গানকে অবলম্বন করেই | তাই কবি যখন ‘গানের গায়ে’ রক্ত মোছার কথা বলেন, তখন আসলে সংগীতকে অবলম্বন করে বাস্তব জীবনের সব হিংসা এবং রক্তাক্ততাকে ভুলে যেতে চান।


“মাথায় কত শকুন বা চিল।” উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

● জয় গোস্বামীর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত। যুদ্ধবাজ আগ্রাসী মানুষদের কথা বলতে গিয়েই কবি মন্তব্যটি করেছেন। কবি দেখেছেন, স্বার্থপর মানুষেরা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছে। মনুষ্যত্বের অবমাননা করে তারা কায়েমি স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা দিতে সদা তৎপর। লুব্ধ চিল-শকুনের মতো তারা সমাজের মাথার ওপরে ঘুরে বেড়ায় সর্বস্ব করায়ত্ত করার নেশায়। এই শকুন বা চিলরূপী মানুষদের বিরুদ্ধেই কবি গানের অস্ত্র ধারণ করেছেন।


“আমার শুধু একটা কোকিল”—একথার মধ্যে দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

● কবি তাঁর মাথার ওপরে শুধুই চিল শকুনের উড়ে চলা অর্থাৎ হিংসা এবং অরাজকতার বিস্তার লক্ষ করেছেন। এরই মধ্যে ‘একটা কোকিল’, যা কবির নিজস্ব, তা কবিকে আশাবাদী করে রাখে। কারণ সহস্র উপায়ে এই কোকিল গান বাঁধে। এখানে কোকিলটি হতে পারে কবির ভেতরের সত্তা কিংবা ধ্বংসের পৃথিবীতে সৃষ্টির কারিগর। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হল ‘সহস্ৰ উপায়ে’ তার গান, প্রেম বা প্রতিবাদ বা যে ধারাতেই তৈরি হোক না কেন, তা আসলে সুন্দরেরই প্রতিষ্ঠা ঘটায়।


“গান বাঁধবে সহস্ৰ উপায়ে।” -কে গান বাঁধবে? সহস্র উপায়ে গান বাঁধার তাৎপর্য কী?

→ কবি বলেছেন, তাঁর শুধু একটা কোকিল আছে। এই কোকিল গান বাঁধবে বলে জানিয়েছেন।

→ চিল, শকুন লুব্ধ পাখি। এদের আমরা হিংস্র রূপেই দেখি| কিন্তু মধুর কন্ঠের কোকিল সৌন্দর্যের প্রতীক| কোকিলের রূপক ব্যবহার করে কবি নিজের ভিতরের সৃজনশীল সত্তাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। যে গানকে তিনি জীবনযুদ্ধের বর্ম করতে চেয়েছেন, বিবিধ উপায়ে সেই গান বাঁধবে এই কোকিল| তা হতে পারে প্রেম অথবা প্রতিবাদ—যেকোনো ধারাতেই | যাবতীয় অস্ত্রের আস্ফালনকে স্তব্ধ করে তা পৃথিবীতে শান্তির বার্তা নিয়ে আসবে।


“অস্ত্র রাখো, অস্ত্র ফ্যালো পায়ে।” কবি পায়ে অস্ত্র ফেলতে বলেছেন কেন, বুঝিয়ে লেখো।

→ জয় গোস্বামী তাঁর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান” কবিতায় যুদ্ধবাজ মানুষদের উদ্দেশে এই আহবান জানিয়েছেন | ক্ষমতা-মদমত্ত মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। অস্ত্র হিংস্রতার প্রতীক | মানুষের পৃথিবীতে অস্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই | কারণ অস্ত্রই সভ্যতার শেষ কথা নয়। তার বদলে চাই গান যা সাম্যের আর সুন্দরের কথা বলে। তাই কবি অস্ত্র বর্জন করে গানকেই জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার করতে বলেছেন। এখানে কবির মানবতাবাদী মনোভাবটিই প্রকাশিত।


“গান দাঁড়াল ঋষিবালক”—গানের সঙ্গে ঋষিবালকের উপমাটি ব্যাখ্যা করো।

● উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি কবি জয় গোস্বামীর, ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতা থেকে গৃহীত। গানের মধ্যে কবি অসীম ক্ষমতা লক্ষ করেছেন। এই গান বুলেটকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু গানের কোনো নির্দিষ্ট বিষয় কিংবা নির্দিষ্ট আঙ্গিক নেই | ‘সহস্র উপায়ে’ গান বাঁধা হয়। সেখানে গান কখনও হয়ে যায় ঋষিবালকের মতো| স্নিগ্ধ, সতেজ, স্বতঃস্ফূর্ত এবং আন্তরিক। গানের মধ্য দিয়ে হৃদয়ের যে উচ্ছ্বাস, নিবিড়তা ইত্যাদির প্রকাশ ঘটে সে-কারণেই গানকে ঋষিবালকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।


“মাথায় গোঁজা ময়ূরপালক।”— কার মাথায় ময়ূরপালক গোঁজা? এখানে ময়ূরপালক গোঁজা চিত্রকল্পের তাৎপর্য কী?

→ গানরূপী ঋষিবালকের মাথায় ময়ূরপালক গোঁজা |

→ অস্ত্রের বিরুদ্ধে গানকে প্রতিরোধের হাতিয়ার করে কবি এগিয়ে যেতে চেয়েছেন! গানকে কবি ঋষিবালকের চিত্রকল্প হিসেবে ব্যবহার করে অন্য বার্তা দিয়েছেন। মানসিক পবিত্রতাই হিংসা দূরীকরণের একমাত্র পথ | ঋষিবালক যাবতীয় হিংস্রতা বর্জিত পবিত্রতার প্রতীক। তার মাথায় ময়ূরপালক গোঁজার মধ্যে শাশ্বত মানবপ্রেমই দ্যোতিত হয়েছে | হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা নয়, হিংসাকে জয় করতে হবে হৃদয়ের পরিশুদ্ধত। দিয়ে। উক্তিটির মধ্যে এই সত্যই প্রকাশিত।


‘তোমায় নিয়ে বেড়াবে গান'—এই কথার তাৎপর্য কী?

● গানের কথা এবং সুরের সঙ্গে রসিক মানুষের অন্তরে বিশ্বভ্রমণ সম্ভব হয়। গানের মধ্যে যেমন রয়েছে প্রসারতা তেমনই গানেই রয়েছে মাটির ছোঁয়া। গান বস্তুত হৃদয়ের এক আশ্চর্য বিস্তৃতি ঘটায়, তুচ্ছ জাগতিক বিষয় থেকে উত্তীর্ণ করে মনকে এক অপার্থিব, অতীন্দ্রিয় জগতে নিয়ে যায়। গানের মাধ্যমেই সম্ভব হয় প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, মানুষের কাছাকাছি পৌঁছোনো। তাই কবি যখন বলেন—“তোমায় নিয়ে বেড়াবে গান/নদীতে, দেশগাঁয়ে”—তখন আসলে গানের এই শক্তি এবং সীমাহীন বিস্তারের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়।

অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্ন মান-৫)


“আমি এখন হাজার হাতে পায়ে / এগিয়ে আসি, উঠে | দাঁড়াই”— হাজার হাতে পায়ে' এই এগিয়ে আসার তাৎপর্য কী? এখানে কবির যে মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে, তা আলোচনা করো।

→ ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় কবি জয় গোস্বামী অস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সংগীতের ক্ষমতার কথা বলেছেন। রাষ্ট্র হোক কিংবা কোনো সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী শক্তি—মানুষের বিক্ষোভে, প্রতিবাদেই গান হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন | কবির কথায় গান হয় শুধু আনন্দের উৎস নয়, লড়াই-সংগ্রামেও গান হয়ে উঠতে পারে ‘বর্ম’। এই ‘গানের বর্ম’ পরেই কবি বন্দুকের বিরুদ্ধে লড়াই-এ নেমেছেন। বুলেটকে প্রতিহত করেছেন। আর সেই সংগ্রামেও কবি দেখেছেন তিনি একা নন, সহস্র মানুষ তাঁর সহযাত্রী হয়েছে | ভারতের : স্বাধীনতা সংগ্রাম কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন গণমুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, যুগে যুগে মানুষের প্রতিবাদের অস্ত্র হয়েছে গান। মিলিত কণ্ঠে গান হয়ে উঠেছে ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ | গান-এর এই শক্তি এবং মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতার দিকেই কবি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

● কবি জয় গোস্বামীর কাছে কবিতা হল নানাভাবে বেঁচে থাকার স্ত্ৰ যে অন্তহীন লড়াই, তার অবলম্বন | ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান' কবিতায় কবি উদ্যত বন্দুকের সামনে গানকে প্রতিবাদের অস্ত্র এবং বর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন | গান হয়ে উঠেছে মানব-সংহতির অন্যতম ভিত্তি। শিল্প-সাহিত্যকে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এখানে নান্দনিক প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন কবি।


“আমার শুধু একটা কোকিল/গান বাঁধবে সহস্র উপায়ে ‘শুধু একটা কোকিল’ আসলে কী? এই গান বাঁধার প্রয়োজনীয়তা কী?

● জয় গোস্বামী তাঁর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় দেখেছেন সন্ত্রাসের নগ্নরূপ, কিন্তু তাকে মেনে নেননি | মাথার ওপরে ‘শকুন’ এবং ‘চিল’ অর্থাৎ নেতিবাচক শক্তিকে প্রত্যক্ষ করেও ভরসা রেখেছেন নিজের শুভবোধে, যা সামাজিক নৈরাজ্য এবং ধ্বংস ও মারণ-উন্মত্ততাকে প্রতিহত করতে পারে। এই শুভবোধ এবং সৃজনশীল সত্তাকেই কবি ‘একটা কোকিল' বলে অভিহিত করেছেন।


→ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবি সৃষ্টিকেই প্রতিরোধের একমাত্র উপায় করে তুলতে চেয়েছেন। সৃষ্টিশীল সত্তারই আনন্দময় প্রকাশ হল সংগীত। এই সংগীতই তার অপূর্ব আবেশের মাধ্যমে মানুষকে পৃথিবীর যাবতীয় জ্বালা, যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়, ভুলিয়ে দেয় সভ্যতার ওপরে নেমে আসা অস্ত্রের অভিশাপ | যেসব যুদ্ধপ্রিয় বন্দুকবাজরা অস্ত্রাঘাতে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে চায় পৃথিবীকে, তাদের আগ্রাসী হিংসার ওপরে মায়াময় এক প্রলেপ দিয়ে যায় সংগীত। তাই, গানকে কবি ব্যবহার করেছেন অস্ত্রের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে| ‘গানের বর্ম’ পরে কবি অনায়াসে বুলেটকে প্রতিহত করতে পারেন| এই গানই তাকে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে। তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। যাবতীয় রক্তাক্ততাকে ভুলে যেতে সাহায্য করে এই গান। এই কারণেই সহস্র উপায়ে গান বাঁধা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।


“তোমায় নিয়ে বেড়াবে গান/নদীতে, দেশ গাঁয়ে”—কবির এই মন্তব্যে গান-এর যে স্বভাবধর্মের প্রকাশ ঘটেছে আলোচনা করো।

● গানের হাত ধরে জয় গোস্বামীর পরিক্রমা যখন-তখন এবং অনায়াস। ধ্রুপদী সংগীতের দরিয়ায় নিজের অবগাহনের কথা বারেবারে স্বীকার করেছেন কবি। (গোঁসাইবাগান, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৮)। ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান' কবিতায় গানকে শুধু আনন্দ বা সুন্দরের প্রকাশ বলেই ভাবেননি কবি, তাঁর মনে হয়েছে গান হয়ে উঠতে পারে প্রতিবাদের ভাষা| অস্ত্রের সঙ্গে লড়াইয়ে, মানুষের সঙ্গে সংযোগে এই গান থেকেই কবি সংগ্রহ করেছেন শক্তি এবং সাহস | দেশে দেশে, যুগে যুগে বাস্তবিকই গান হয়েছে প্রতিবাদের বিকল্প ভাষ্য। গানের ইতিহাসে ‘প্রতিবাদের গান' নামে একটি আলাদা এবং সর্বাংশে স্বতন্ত্র সংরূপই তৈরি হয়ে গেছে | পৃথিবী জুড়ে যে-কোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে, অথবা, প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়ে গান জুগিয়েছে অসীম শক্তি, জোট বাঁধার সাহস, মনের জোর | গানের শক্তিকে আবিষ্কার করাই শুধু নয়, তার মধ্যে প্রবল বৈচিত্র্যও কবি খুঁজে পেয়েছেন। গান তাই কখনো কবির কাছে হয়েছে ঋষিবালক—যার ‘মাথায় গোঁজা ময়ূরপালক’, গান তখন সহজ, নিবিড়, ধ্যানমগ্ন। আবার এই গানের সূত্রেই বিস্তার ঘটে আমাদের অভিজ্ঞতার, চেনা জগতের। শহরজীবন ছাড়িয়ে গানে তখন প্রান্তবর্তী লোকজীবনের সুর | গানের এই বিস্তারের কথাই প্রশ্নোদ্ভূত অংশে প্রকাশিত হয়েছে।


“গানের বর্ম আজ পরেছি গায়ে”—গানের বর্ম পরার প্রয়োজনীয়তা কী তা ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটি অবলম্বনে আলোচনা করো।

→ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সৃষ্টিকেই প্রতিরোধের একমাত্র উপায় করে তুলতে চেয়েছেন কবি জয় গোস্বামী তাঁর ‘অস্ত্রের বিরুদেদ্ধ গান’ কবিতায় | সংগীতের সুরেই মিলে যায় সহস্র কণ্ঠ। কখনও তা হৃদয়কে শুদ্ধ করার অবলম্বন, কখনও-বা প্রতিবাদের অমোঘ অস্ত্র। প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই-এ গানই জোগায় অসীম শক্তি, জোট বাঁধার সাহস। অস্ত্রের বিরুদ্ধে এই গানকে আঁকড়ে ধরেই কবি অনায়াসে হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়াতে পারেন। গানই সেই আশ্রয়, যা হিংসার অবসান ঘটাতে পারে। অজস্র হিংসার বিপরীতে একটা গানই হতে পারে কবির বা সৃষ্টিশীল মানুষের শৈল্পিক জবাব | গান তাই কবির কাছে বর্ম, যা পরে বিরুদ্ধ শক্তির আক্রমণকে প্রতিহত করার শক্তি অর্জন করেন কবি। রক্তাক্ততার পথ ধরে অশুভ অকল্যাণকারী শক্তিকে প্রতিরোধ নয়, পরিবর্তে কবি তৈরি করতে চেয়েছেন এক নান্দনিক প্রতিরোধ। রক্তস্নাত পৃথিবীতে গানের অমোঘ শক্তি মানুষকে একত্রিত করে, আত্মশক্তিতে উদ্দীপ্ত করে। এই শক্তিই কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে গানের দ্বারস্থ হতে। তাই কবি গানের বর্ম পরেই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে চেয়েছেন।


‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান' কবিতাটির মূল বক্তব্য সংক্ষেপে আলোচনা করো।

→ জয় গোস্বামী তাঁর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় অস্ত্রশক্তি এবং পেশিশক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সুস্থ রুচি ও নান্দনিকতার প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেছেন।‘তরবারির থেকে কলম শক্তিশালী'— এই ধারণাটিই যেন তাঁর লেখায় কাব্যিক ভিত্তি পেয়েছে। গানকে অবলম্বন করে কবি সেই অমিত শক্তির অধিকারী হয়েছেন যা তাঁকে হাত বাড়িয়ে বুলেট প্রতিহত করার ক্ষমতা দিয়েছে। গান তাঁকে এক আশ্চর্য ঐক্যবোধে বেঁধেছে। তাই তাঁর হাতে হাত মিলিয়েছে আরও হাজার মানুষ, পায়ে পা মিলিয়েছে সহস্ৰ পা | দৃপ্ত ভঙ্গিতে কবি বলতে পেরেছেন—‘অস্ত্র ফ্যালো, অস্ত্র রাখো পায়ে।' পৃথিবীর ইতিহাসে অস্ত্র কখনও শেষকথা বলেনি। জয়ী হয়েছে মানুষের শুভবুদ্ধি, একতা ও সৃজনধর্মিতা। গান এই কবিতায় এসবেরই প্রতীক | গানই কবিকে মানুষের সঙ্গে মিলিয়েছে, রক্ত মুছিয়ে সুন্দরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। গানের নানা রূপ, নানা বিষয়, তার সুরের নানা বৈচিত্র্য | কখনও সে হয়ে ওঠে ঋষিবালকের মতো নিষ্পাপ, সমাহিত, কখনও বা তার স্পর্শে লেগে থাকে কোকিলের মোহময় সুরেলা সৃষ্টি| যুদ্ধবাজ মানুষ অস্ত্রহাতে মনুষ্যত্বের বিপক্ষে গিয়ে যখন দাঁড়ায়, তখন গানের বর্ম পরে কবি অস্ত্রকে প্রতিহত করেন অবহেলায় |


‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটিতে কবির রচনারীতির দক্ষতা আলোচনা করো।

» জয় গোস্বামীর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটিতে একদিকে গানকে আশ্রয় করে কবির প্রতিবাদের নিজস্ব ধরন খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে গানের মধ্যে কবির নিজস্ব অনুভূতির আবেগময় প্রকাশ—এক অনন্য আস্বাদ তৈরি করেছে। তিনটি স্তবকের প্রথমটিতে গানকে আশ্রয় করে কবির প্রতিবাদ, দ্বিতীয়টিতে কন্ঠস্বর কিছুটা নরম করে গানের সঙ্গে কবির সংযোগ এবং শেষ স্তবকটিতে নিজস্ব অনুভবে গানের বিস্তারকে বোঝার চেষ্টা, বিষয়ের সূক্ষ্ম পার্থক্যে কন্ঠস্বরের তীব্রতার তারতম্য ঘটিয়েছেন কবি| এবং লক্ষণীয় ১৮ পক্তির কবিতাটি তিনটি স্তবকে বিন্যস্ত হলেও পঙ্ক্তিসজ্জা সমান নয় | প্রথম স্তবকে ৫টি পঙ্ক্তি, দ্বিতীয় স্তবকে ৬টি পঙ্ক্তি, তৃতীয় স্তবকে ৭টি পঙ্ক্তি স্থান পেয়েছে। কবিতায় অন্ত্যমিল থাকলেও তার রীতিও একরকম নয় | অন্ত্যমিল নেই এমন পঙ্ক্তিও শেষ স্তবকে আছে | গানের মধ্যে যেমন তৈরি হয় এক স্বচ্ছন্দ বহমানতা, এই কবিতাও তেমনই সাবলীলভাবে এগিয়ে চলেছে | অত্যন্ত সহজ ভাষায় বিষয়ের বিস্তার ঘটিয়েছেন কবি— “গান তো জানি একটা দুটো/আঁকড়ে ধরে সে খড়কুটো/রক্ত মুছি শুধু গানের গায়ে”। সহজ ভাষায় এই কবিতায় গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছেন কবি।


‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

● ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান' শিরোনামটি ব্যঞ্জনাধমী | কেন-না, ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র’ এই স্বাভাবিক স্লোগানকে কবি বদলে দিয়ে এক বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছেন। কবিতার বিষয়বস্তু অবশ্যই যুদ্ধবিরোধী; কিন্তু এই বিরোধিতার কৌশল আলাদা| কবিতার সূচনাতেই কবি বলেছেন, “অস্ত্র ফ্যালো, অস্ত্র রাখো পায়ে।” অস্ত্র ফেলার মধ্যে দিয়ে আর পাঁচজন শান্তিকামী মানুষের মতোই কবি শান্তির জন্য আহবান জানিয়েছেন; কিন্তু পায়ে অস্ত্র রাখার আহবান যুদ্ধবাজদের আত্মসমর্পণের দিকটিকেই বড়ো করে তোলে। গানকে বর্ম হিসেবে পরে কবি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চান। তাই অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান গাইতে গাইতেই কবি হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়াতে পারেন। সমাজে যখন লুব্ধ চিল-শকুনের আনাগোনা, কবির তখন সম্বল শুধু একটা কোকিল যা আসলে অন্তর্গত সৃজনশীল সত্তা| এই কোকিলই কবিকে সহস্র উপায়ে গান বেঁধে দেবে| গানই ঋষিবালকের মতো পবিত্রতার প্রতীক হয়ে কবিকে তথা সমাজকে মনুষ্যত্বের পথ দেখাবে| তাই হিংসার | বিরুদ্ধে হিংসা বা অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র নয়—যাবতীয় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে গানকে বর্ম করে কবি সত্যভূমিতে পৌঁছোতে চান। এই মর্মসত্যকে সামনে রেখে কবিতাটির নামকরণ গভীর ব্যঞ্জনার ইঙ্গিত দেয়।


অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান কীভাবে কবি জয় গোস্বামীকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কবিতা অবলম্বনে লেখো।

“যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা

যুদ্ধ মানে আমার প্রতি তোমার অবহেলা।”

এ হল আধুনিক সভ্য পৃথিবীর বিবেকের ধ্বনি। যুদ্ধ মানবতার শত্রু। যুদ্ধই মানুষের যূথচারী জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে হিংসার আবহে বিষাক্ত করে তোলে সমাজসভ্যতাকে| এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন এক পন্থা আবিষ্কার করে কবি জয় গোস্বামী মানুষের পৃথিবী থেকে হিংসার অবলুপ্তি চেয়েছেন।

‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় অস্ত্রের বিরুদ্ধে কবি জয় গোস্বামী গানকে দাঁড় করিয়েছেন। যুদ্ধ বিরোধিতার এ এক নতুন প্রকরণ। গান হল জীবনের বীণায় বেজে ওঠা পবিত্র হৃদয়ের স্বগতকথন | সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ একসময় অস্ত্র দিয়েই অস্ত্রকে প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এই পথও রক্তাক্ত, ক্লেদপঙ্কিল | পক্ষান্তরে যুদ্ধের বিরুদ্ধে গান শান্তির বার্তা বয়ে আনে। জয় গোস্বামী তাই গানের বর্ম পরেই অস্ত্রবিরোধী হতে চান। সৃষ্টিশীলতাকে অবলম্বন করে মানবতাকে সুরক্ষিত করতে পারে সৃষ্টিশীলতাকে অবলম্বন করে মানবতাকে সুরক্ষিত করতে পারে গান | প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে শুভবুদ্ধির কোকিল ডেকে উঠলে এই রণরক্তভরা পৃথিবী জীবনের বলয়ে ফিরে যাবে। আমাদের রক্তস্নাত সমাজে যদি গান এসে ঋষিবালক হয়ে দাঁড়ায়, তবে পৃথিবীর সব যুদ্ধবাজরা স্তব্ধ হয়ে যাবে। এভাবেই কবি গানকে হাতিয়ার করে উত্তরণের পথে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন।


We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.