আফ্রিকা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) প্রশ্ন উত্তর সাজেশন

আফ্রিকা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) প্রশ্ন উত্তর সাজেশন মাধ্যমিক বাংলা, Madhyamik Bengali Suggestion Africa Pdf, আফ্রিকা প্রশ্ন উত্তর সাজেশন.

আফ্রিকা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান - ৩)


“নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত।”—কে নতুন সৃষ্টিকে বারবার বিধ্বস্ত করছিলেন? তাঁর এমন আচরণের কারণ কী?

● এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, অর্থাৎ ঈশ্বর নতুন সৃষ্টিকে বারবার বিধবস্ত করছিলেন।

স্রষ্টা সৃষ্টি করেন আপন খেয়ালে। মনের মতো না হলে তিনি নিজেই নিজের সৃষ্টিকে ধ্বংস করেন এবং আবার গড়ে তোলেন। ভাঙাগড়ার খেলায় তাঁর সৃষ্টিলীলা চলতে থাকে| ‘উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে’ আফ্রিকা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও স্রষ্টা যেন সেই খেলায় মত্ত ছিলেন| যদিও কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্‌ট্ তত্ত্বের ব্যাখ্যায় একটি মহাদেশ থেকে টেক্‌টনিক প্লেসমূহের কম্পনে আফ্রিকাসহ বিভিন্ন মহাদেশের আলাদা হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত এখানে আছে |


“তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে”— এই ‘ঘনঘন মাথা নাড়া’ কথাটির দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

● রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য বিশ্বসৃষ্টির ভৌগোলিক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। মহাদেশগুলোয় তটরেখার নানারকম সাদৃশ্যের নিরিখে এবং অন্যান্য প্রমাণের সাহায্যে আলফ্রেড ওয়েগেনার ১৯১৫ সালে বলেন যে, বহুকাল আগে সবগুলো মহাদেশ একত্রে

একটিই মহাদেশ ছিল, কালের আবর্তে যা টেকটনিক প্লেটসমূহের নড়াচড়ায় আলাদা হয়ে যায়। এই তত্ত্বের নাম কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্ট তত্ত্ব। এভাবেই আফ্রিকান প্লেটেরও উদ্ভব হয় | রবীন্দ্রনাথ কাব্যিক ভঙ্গিতে এই ভৌগোলিক সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।


“বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়”‘বনস্পতির নিবিড় পাহারা' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

● প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে আফ্রিকার কথা বলা হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বিশেষত, মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায় নিরক্ষীয় অঞ্চল হওয়ার জন্য ঘন অরণ্য রয়েছে। সেই নিবিড় অরণ্য ভেদ করে সূর্যের আলোও প্রবেশ করতে পারে না। প্রকৃতি যেন নিবিড়, নিশ্ছিদ্র পাহারায় বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে আফ্রিকাকে। এই ভৌগোলিক সত্যকেই রবীন্দ্রনাথ কাব্যিকভাবে তুলে ধরেছেন।


“কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে”—কৃপণ আলো’ বলার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

● রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ‘আফ্রিকা’ কবিতায় আফ্রিকা ভূখণ্ডের সৃষ্টিলগ্নের ইতিহাসটি বর্ণিত হয়েছে। রুদ্র সমুদ্রের বাহু প্রাচীন ধরিত্রীর বুক থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে স্থাপন করেছিল অরণ্যসংকুল স্থানে। এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে আফ্রিকার জন্ম, যেখানে বেশিরভাগ স্থানই অরণ্যপরিবেষ্টিত। সূর্যের আলো সেই নিবিড় অরণ্য ভেদ করে সেখানে পৌঁছোতে পারে না| এই কারণেই আফ্রিকার অবস্থানের জায়গাটিকে কবি ‘কৃপণ আলোর অন্তঃপুর’ বলেছেন।


“প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু/মন্ত্র জাগাচ্ছিল, তোমার চেতনাতীত মনে।”—মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।

● সৃষ্টির সূচনাপর্বে প্রকৃতির কোলে লালিত ছিল আফ্রিকা | বাইরের পৃথিবীর চোখের আড়ালে প্রকৃতি নিজের মতো গড়ে নিয়েছিল তাকে। একদিকে নিবিড় বনাঞ্চল, অন্যদিকে সাহারা, কালাহারির মতো মরুভূমি যেন আফ্রিকাকে লালন করেছে| ভয়ংকর বন্যজন্তু আর দুর্গম প্রকৃতিই যেন সেই উন্মেষপর্বে আফ্রিকাকে গড়ে তুলেছিল। সদ্য গড়ে-ওঠা এই মহাদেশ কবির ভাষায়, তখনও ছিল ‘চেতনাতীত', অর্থাৎ তার নিজস্ব সংস্কৃতি বা জীবনধারা তখনও গড়ে ওঠেনি।


‘বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে।”—এখানে কার কথা বলা হয়েছে? কেন সে ভীষণকে বিদ্রূপ করছিল?

● এখানে সৃষ্টিলগ্নের আদিম আফ্রিকার কথা বলা হয়েছে। ● এক দুর্গম রহস্যময় স্থানে আফ্রিকার জন্ম হয়েছিল। অরণ্যবেষ্টিত এই আফ্রিকার চারিপাশের প্রকৃতি ছিল আরও দুর্বোধ্য এবং সংকেতপূর্ণ | প্রকৃতির এই দুর্বোধ্য ঐন্দ্রজালিক রহস্য আফ্রিকার চেতনাতীত মনে মন্ত্র জুগিয়ে চলেছিল। আর আফ্রিকা বিরূপের ছদ্মবেশে প্রকৃতির সেই ভীষণতাকে বিদ্রূপ করছিল। নিজের শঙ্কাকে হার মানাতেই ভীষণের বিরুদ্ধে সেও ভীষণ হয়ে উঠেছিল। প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতেই আফ্রিকা এই পথ বেছে নিয়েছিল।


“আপনাকে উগ্র করে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায়”প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যা করো।

● সভ্যতাসৃষ্টির প্রথম পর্বে আফ্রিকা বাইরের পৃথিবীর কাছে নিজেকে পরিচিত করেছিল তার ভয়ংকর স্বরূপের মধ্য দিয়ে। আফ্রিকার প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাই একসময় তাকে রক্ষা করেছিল বহিঃশক্তির হাত থেকে | তার দুর্ভেদ্য অরণ্য ভেদ করে প্রবেশ করার অধিকার সূর্যরশ্মিরও ছিল না। বিরূপের ছদ্মবেশে আফ্রিকা যেন ভীষণ বহিঃপ্রকৃতিকে বিদ্রুপ করেছিল। নিজের ভয়কে সে জয় করেছিল বিভীষিকাকে আশ্রয় করে।


“অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ/উপেক্ষার আবিল | দৃষ্টিতে”—মন্তব্যটির তাৎপর্য লেখো।

● আদিম অরণ্য আর মরুভূমি অধ্যুষিত আফ্রিকা এক দীর্ঘ সময় ছিল বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগহীন | উন্নত পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে থেকেছে আফ্রিকার থেকে | রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেছেন 'ছায়াবৃতা', আর সাংবাদিক হেনরি স্ট্যানলি আফ্রিকা সম্পর্কে দিয়েছিলেন সেই বহুশ্রুত বিশেষণ ‘dark continent’ | ইতিহাস প্রমাণ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে কোনো ইউরোপীয় শক্তি আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপনের কথা ভাবেনি | আফ্রিকার সম্পদ এবং সংস্কৃতি এভাবেই উপেক্ষিত হয়েছিল সভ্য সমাজের দ্বারা।


“এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে/নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে।”—মন্তব্যটির দ্বারা কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে?

● সাধারণভাবে মনে হয়, আফ্রিকায় যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ঘটেছিল তার অত্যাচারী স্বরূপকে তুলে ধরাই ছিল কবির লক্ষ্য| কিন্তু শুধু এটুকুই নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ইতিহাসের এক ধারাক্রমকে তুলে ধরেছেন, যা থেকে মনে হয় এখানে কবি পঞ্চম শতক থেকে প্রায় আধুনিক কাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল যে দাসব্যবস্থা সেদিকেও ইঙ্গিত করেছেন | ‘এল মানুষ-ধরার দল’— এতে দাসব্যবস্থা ও দাস-মালিকদের অত্যাচারী স্বরূপের দিকেই ইঙ্গিত আছে।


“গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।” কারা গর্বে অন্ধ? অরণ্য সূর্যহারা কেন?

● সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক প্রভুদের কথাই এখানে বলা হয়েছে। তারা বর্ণকৌলীন্যে এবং ক্ষমতার গর্বে অন্ধ।

আদিম আফ্রিকার ভৌগোলিক অবস্থান ছিল দুর্গম, রহস্যময় | চারিদিকে ঘন বনস্পতি যেন আফ্রিকাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এতই ঘন অরণ্যসংকুল স্থানে আফ্রিকার অবস্থান ছিল যে, সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছোতে পারত না। চিরছায়ায় আফ্রিকা যেন কালো ঘোমটার নীচে তার মানবরূপকে ঢেকে রেখেছিল | এইজন্যই অরণ্যকে সূর্যহারা বলা হয়েছে।


“সভ্যের বর্বর লোভ/নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।”—মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

● অরণ্য আর আদিমতার অন্ধকারে থাকা আফ্রিকায় উনিশ শতক থেকে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন শুরু হয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ব্রিটেন, জার্মানি, ইটালি—ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশই আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে এবং উনিশ শতকের শেষে প্রায় গোটা আফ্রিকা ইউরোপের উপনিবেশে পরিণত হয়। আফ্রিকাকে লুণ্ঠন করে সেখানকার আদিম জনজাতিদের শোষণের যে ইতিহাস রচিত হয়, এখানে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।


“পঙ্কিল হলো ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে।”— সম্প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা লেখো।

● আফ্রিকার জনগণের ওপর ইউরোপের ঔপনিবেশিক প্রভুদের অমানুষিক অত্যাচারের কথা বলতে গিয়ে কবি আলোচ্য মন্তব্যটি করেছেন।

● সৃষ্টিলগ্ন থেকেই আফ্রিকা ছিল উপেক্ষিত। দুর্গম প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলে অবস্থিত আফ্রিকার কালোমানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে উদ্যোগী হয় ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি | তারা সেখানে উপনিবেশ গড়ে তোলে। আফ্রিকার আদিম অধিবাসীরা ক্রীতদাসে পরিণত হয়। শোষণ, অত্যাচার আর অবহেলা হয়ে ওঠে আফ্রিকাবাসীদের ভাগ্যলিপি | কবি মনে করেছেন, অত্যাচারিত আফ্রিকার চোখের জলেই সেখানকার মাটি পঙ্কিল হয়ে উঠেছে।


“চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।” কার | ইতিহাসকে অপমানিত বলা হয়েছে? কোন্ ঘটনাকে কবি ‘চিরচিহ্ন’ বলেছেন’?

● আদিম আফ্রিকার ইতিহাসকে অপমানিত বলা হয়েছে ।

● সাম্রাজবাদী ঔপনিবেশিক প্রভুরা আফ্রিকার মানুষকে ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল। ক্ষমতামদমত্ত সেই সাম্রাজ্যবাদীর দল নির্মম অত্যাচার চালাত আফ্রিকার আদিম মানুষদের ওপর। সেইসব তথাকথিত সভ্য মানুষদের বর্বরতা আর অমানুষিক অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত হল আফ্রিকার মানুষ | তাদের রক্ত আর অশ্রুতে কর্দমাক্ত হল আফ্রিকার মাটি | সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের কাঁটামারা জুতোর নীচে সেই বীভৎস কাদার পিণ্ড চিরচিহ্ন রূপে কালোছাপ ফেলে রাখল আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাসে ।


“সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই...” সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তে কী ঘটেছিল লেখো।

● রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালচেতনার অনবদ্য প্রকাশ ‘আফ্রিকা’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত | কবির বর্ণনা অনুসারে আফ্রিকায় যখন ঔপনিবেশিক শোষণ চলছে। সমুদ্রপারে ইউরোপীয়দের নিজেদের জায়গায় সেই মুহূর্তে পাড়ায় পাড়ায় দয়াময় দেবতার নামে মন্দিরে বাজছিল পুজোর ঘণ্টা। শিশুরা খেলায় রত ছিল মায়ের কোলে। আর সেখানে কবিরা মনের বীণায় সংগীতের সুর তুলে সুন্দরের আরাধনা করছিলেন | সমুদ্রপারের এই দৃশ্যে সভ্যতার বৈপরীত্যই প্রতীয়মান হয় রবীন্দ্রনাথের চোখে।


“কবির সংগীতে বেজে উঠেছিল/সুন্দরের আরাধনা” বেজে ওঠার তাৎপর্য কী?

● আধুনিক সভ্যতার বৈপরীত্যকে রবীন্দ্রনাথ এখানে তুলে ধরেছেন। তথাকথিত সভ্য ইউরোপীয় শক্তিরা আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে তীব্র শোষণ চালাত। আফ্রিকানদের পাঠানো হত যুদ্ধক্ষেত্রে, পশুর মতো তাদের নিয়ে কেনাবেচা চলত। একদিকে যখন মনুষ্যত্বের এরকম লাঞ্ছনা, সেই একই সময়ে সভ্য দুনিয়ায় ঈশ্বরের প্রার্থনা চলত, শিশুরা খেলত মায়ের কোলে, কবির সংগীতে বেজে উঠত সুন্দরের আরাধনা। অর্থাৎ জীবন সেখানে থাকত শান্ত ও সুন্দর।


“এসো যুগান্তের কবি”—যুগান্তের কবিকে কোথায় আসতে বলা হয়েছে? সেখানে এসে তিনি কী করবেন?

● ‘আফ্রিকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যুগান্তের কবিকে আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে অবমানিত আফ্রিকার দ্বারে এসে দাঁড়াতে বলেছেন। ● আফ্রিকার জনগণের ওপর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের অত্যাচার মানবতার অপমান | শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের উচিত এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। যুগান্তের কবিও তাঁদেরই প্রতিনিধি| মানহারা আফ্রিকার দ্বারে দাঁড়িয়ে সত্য ও সুন্দরের পূজারি কবিকেও বলতে হবে ‘ক্ষমা করো'। আর সেটাই হবে ‘সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।


“দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে।” কাকে এই আহ্বান করা হয়েছে? তাঁর প্রতি কবির এরূপ আহ্বানের কারণ কী?

● কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় যুগান্তের কবিকে এই আহবান জানানো য়ছে।

● আফ্রিকা অত্যাচারিত হয়েছে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা| দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় ক্ষতবিক্ষত সেই ভূখণ্ডের মাটি| নিরীহ আফ্রিকাবাসী মুখবুজে সহ্য করেছে লাঞ্ছনা সভ্য মানুষ কখন ফিরেও তাকায়নি এই মানহারা আফ্রিকার দিকে। যুগান্তের কবি সভ্য মানুষের প্রতিনিধি। তাই মানহারা আফ্রিকার দ্বারে দাঁড়িয়ে সমগ্র সভ্য মানুষের হয়ে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হবে। এই কারণেই কবি তাঁকে আহবান জানিয়েছেন।


“...সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।”মন্তব্যটির প্রসঙ্গ নির্দেশ করো।

● ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতার ক্রমবর্ধিত চাহিদা— এই দুই-এ মিলে আফ্রিকায় এক পালাবদলের সম্ভাবনা কবির কাছে স্পষ্ট হয়েছিল। তাই কবি এই | ক্রান্তিমুহূর্তে যুগান্তের নবীন কবিকে আহবান করেছেন 'মানহারা মানবী’ আফ্রিকার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য; তার এই অপমানের ইতিহাসকে মনে রেখে নতি স্বীকার করে প্রায়শ্চিত্ত করতে বলেছেন | হিংস্র প্রলাপের মধ্যে এই ক্ষমাপ্রার্থনার তাৎপর্য বোঝাতেই কবি মন্তব্যটি করেছেন।


আফ্রিকা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্নমান - ৫)


‘উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে’ কবি আফ্রিকাকে যেভাবে দেখেছিলেন লেখো। এই আফ্রিকার প্রতি উন্নত পৃথিবীর দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল ?

● রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতাটিতে আফ্রিকাকে ইতিহাসের পটভূমিতে রেখে কবি তার রূপ ও রূপান্তরের ছবিকে তুলে ধরেছেন। বিশ্বসৃষ্টির প্রথম পর্বে স্রষ্টা যখন ‘নিজের প্রতি অসন্তোষে’ তাঁর নতুন সৃষ্টিকে বারবার বিধবস্ত করছিলেন সেই সময়—“রুদ্র সমুদ্রের বাহু/প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে/ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা”। আলফ্রেড ওয়েগেনার তাঁর টেকটনিক প্লেট থিওরির মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশকে একত্র থেকে খণ্ডবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তা-ই যেন রবীন্দ্রনাথের লেখায় রূপ পেয়েছে। সৃষ্টির সেই প্রথম লগ্ন থেকে আফ্রিকা ছিল আদিম অরণ্য পরিবৃত। ‘দুর্গমের রহস্য’ আর ‘দুর্বোধ সংকেত’ ছিল সেই আফ্রিকার গড়ে ওঠার বিশেষত্ব। সেই সূচনামুহূর্তে প্রকৃতি তাকে দিয়েছিল জাদুমন্ত্র। কবির কথায়, বিভীষিকাই যেন হয়ে উঠেছিল এই আফ্রিকার মহিমা, যা দিয়ে সে আসলে নিজের যাবতীয় শঙ্কাকে পরাজিত করতে চাইছিল। ● সৃষ্টির সেই প্রথম যুগে আফ্রিকা ছিল বাকি পৃথিবীর কাছে উপেক্ষার পাত্র—“কালো ঘোমটার নীচে / অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ” | আফ্রিকার নিজস্ব যে সংস্কৃতি, সমাজভাবনা—এসবকে স্বীকার না করে উন্নত-বিশ্ব আফ্রিকাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল অগম্য এবং ভয়াবহতার এক অন্ধকার মহাদেশ—‘কালো ঘোমটা’ হিসেবে। উপেক্ষা আর অবমাননাই ছিল আফ্রিকার একমাত্র পাওনা।


“মন্ত্র জাগাচ্ছিল তোমার চেতনাতীত মনে।”—কে, কার মনে ‘মন্ত্ৰ’ জাগাচ্ছিল? এই ‘মন্ত্র’-এর তাৎপর্য কী?

● রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় সৃষ্টির প্রথম পর্বেপ্রকৃতি তার ‘দৃষ্টি-অতীত জাদু’ দিয়ে আফ্রিকায় মধ্যে মন্ত্র জাগাচ্ছিল।
● ‘দৃষ্টি-অতীত জাদু’ অর্থাৎ সভ্যসমাজের জ্ঞানসীমার বাইরে প্রকৃতির যে নিজস্ব বিস্তার, প্রকৃতিই সেখানে বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকার পথ দেখায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নৃতাত্ত্বিকদের একাংশের মতে আদিম যুগ থেকে বিবর্তনের পথে মানবজাতির যে গড়ে ওঠা, তা ঘটেছিল আফ্রিকাতেই। সেখান থেকেই মানুষ বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই অর্থে বললে, আফ্রিকা সভ্যতার ধাত্রীভূমিও | প্রকৃতিই সেখানে বেঁচে থাকার মন্ত্র উচ্চারণ করেছে দুর্গম অরণ্যে কিংবা দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমিতে। সৃষ্টির সূচনা থেকেই প্রকৃতি যেন আফ্রিকার মানুষদের জন্য তৈরি করে দিয়েছে নিজস্ব জীবনছন্দ, জনজাতির সংস্কৃতি। আফ্রিকার কাছে দুর্গমের রহস্যই তার সম্পদ। ‘বিরূপের ছদ্মবেশে’ অর্থাৎ প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েই আফ্রিকা যেন উচ্চারণ করেছে প্রতিরোধের মন্ত্র। ‘বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমা' তৈরি করে আফ্রিকা চেয়েছিল নিজের ভয়কে জয় করতে, অস্তিত্ব রক্ষা করতে। আর এই কাজে প্রকৃতিই হয়েছে তার সহায়| প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত অগম্যতার কারণেই আফ্রিকায় ইউরোপীয় দুর্গমকে আশ্রয় করে আফ্রিকা যেন নিজেকে রক্ষা করেছিল। দেশগুলি উপনিবেশ তৈরি করতে পারেনি। প্রকৃতির সাহায্যেই


“হায় ছায়াবৃতা”—এই ‘ছায়াবৃতা’ কথাটি ব্যাখ্যা করো। তার সম্পর্কে কবি কী বলেছেন বিশ্লেষণ করো।

● রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আফ্রিকা’ কবিতায় আফ্রিকাকে ‘ছায়াবৃতা’ বলেছেন | সৃষ্টির সূচনা থেকেই আফ্রিকা ছিল আদিম অরণ্যে পরিপূর্ণ | আফ্রিকার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, বিশেষত মধ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকায় সূর্যের আলো অনেক জায়গার অরণ্য ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে না। অনেক অরণ্য ধ্বংসের পরেও এখনও আফ্রিকার মোট আয়তনের ২১.৮ শতাংশই অরণ্য | মাথাপিছু অরণ্যের হিসেবে আফ্রিকা পৃথিবীর মধ্যে প্রথম। রবীন্দ্রনাথ যখন ‘ছায়াবৃতা’ কথাটি বলেন তখন অসূর্যম্পশ্যা সেই আরণ্যক আফ্রিকার দিকেই ইঙ্গিত করেন।

● উন্নত বিশ্বের কাছে আফ্রিকা শুধু দুর্গম বা বিপদসংকুলই ছিল না; সেখানকার জনজীবন, তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকেও উপেক্ষার চোখে দেখা হত| বিখ্যাত সাংবাদিক হেনরি স্ট্যানলি আফ্রিকাকে বলেছিলেন ‘dark continent’ | এই মহাদেশের নিজস্ব জীবনধারা, প্রাকৃতিক সম্পদ, ঐতিহ্যকে পাশ্চাত্য সভ্যতা কোনোভাবেই স্বীকার করত না। কবি যখন লেখেন—“কালো ঘোমটার নীচে/ অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ”—তখন এই ‘কালো ঘোমটা’ আসলে সেই রহস্যময়তার আড়াল, যা আফ্রিকার সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর সংযোগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার এই ‘কালো | ঘোমটা’ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদেরও বোঝাতে পারে—বর্ণবিদ্বেষ যাদের স্বীকৃতি দেয়নি | মূল বিষয় হল, উপেক্ষা আর অবমাননাই দীর্ঘ সময় ধরে বাকি পৃথিবীর কাছ থেকে পাওনা হয়েছে ‘ছায়াবৃতা’ আফ্রিকার।


“সভ্যের বর্বর লোভ/নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।”—‘সভ্যের বর্বর লোভ’ বলতে কীসের কথা বলা হয়েছে? কীভাবে তা ‘নির্লজ্জ অমানুষতা'কে প্রকাশ করেছিল ?

● রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘আফ্রিকা’ কবিতায় আফ্রিকার ওপরে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের অত্যাচার ও শোষণ-বঞ্চনার কাহিনিকে রূপ দিয়েছেন। প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম আফ্রিকা দীর্ঘ সময় জুড়ে ইউরোপীয় শক্তিসমূহের নজরের বাইরে ছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয়রা আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে এবং এই শতকের শেষে প্রায় পুরো আফ্রিকা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। মনে রাখতে হবে, গোটা পৃথিবীর খনিজ উৎপাদনের ৩০ শতাংশ আফ্রিকায় পাওয়া যায়। সোনার ৪০ শতাংশ এবং প্ল্যাটিনামের ৯০ শতাংশের আধার এই আফ্রিকা | তাই প্রায় প্রতিটি শক্তিশালী ইউরোপীয় দেশই সেখানে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে। নির্লজ্জভাবে আফ্রিকাকে শোষণ করাই শুধু নয়, তাদের অধিকার-হরণের কাহিনিও রচিত হয়।

→ ‘নির্লজ্জ অমানুষতা’র অর্থ মানবতার প্রবল লাঞ্ছনা | ইউরোপীয় শক্তিসমূহ শুধু আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করেই ক্ষান্ত হয়নি, ঘটিয়েছিল মানবিক লাঞ্ছনাও। ‘আফ্রিকা' কবিতাটি রচনার অনুরোধ কবিকে করেছিলেন যিনি, সেই কবি অমিয় চক্রবর্তী লিখেছেন—“বিষম অত্যাচার করেছে বর্বর সাম্রাজ্যলোভী, অর্থলুব্ধ য়ুরোপীয় দল,... অধিকাংশ আফ্রিকানদের হাড় য়ুরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়ানো, প্রায় কেউই বাড়ি ফেরেনি।” মুসোলিনির ইটালি আবিসিনিয়া আক্রমণ করে দেশকে নিঃস্ব আর রক্তাক্ত করে দেয়। আফ্রিকা হয়ে ওঠে উন্নত সভ্যতার ‘নির্লজ্জ অমানুষতা’র লীলাক্ষেত্র।


“দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে/বলো ‘ক্ষমা করো”‘মানহারা মানবী’ কথাটি ব্যাখ্যা করো। কাকে, কেন তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলা হয়েছে?

● রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় কবি আফ্রিকাকেই ‘মানহারা মানবী’ বলেছেন। কারণ উন্নত ইউরোপীয় সভ্যতা আফ্রিকাকে শোষণ করলেও, তার বুকে উপনিবেশ স্থাপন করলেও আফ্রিকার জীবনধারা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দেয়নি| ‘উপেক্ষার আবিল অন্ধকার’-এ আফ্রিকাকে ডুবে থাকতে হয়েছে। দাসব্যবস্থা থেকে ঔপনিবেশিকতা—বঞ্চনার ইতিহাস আফ্রিকাকে বেষ্টন করে আছে | ‘মানহারা মানবী' কথাটির দ্বারা এই বঞ্চনার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে |

→ যুগান্তের কবিকে এখানে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলা হয়েছে | কারণ সৃষ্টিশীল কবিমাত্রেই সত্য এবং সুন্দরের কথা বলেন। তাই যে শোষণ-লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে আফ্রিকাকে—একজন কবিই তাঁর সংবেদনশীলতা দিয়ে তা উপলব্ধি করতে পারেন| ‘আফ্রিকা’ কবিতা রচনার সমকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শাসনক্ষমতার পরিবর্তন হতে থাকে। আফ্রিকা এবং তার অধিবাসীদের ওপরে যে অত্যাচার হয়েছে তার ‘ক্ষমা ভিক্ষা’ প্রার্থনা করাটাই সভ্যতার সবথেকে বড়ো কর্তব্য হওয়া উচিত বলে কবি মনে করেছেন। চারপাশে হিংস্র প্রলাপের মধ্যে একেই কবি ‘সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী’ বলে মনে করেছেন | অর্থাৎ কবি চেয়েছেন, যে নতুন আফ্রিকা তৈরি হবে, মানবিক প্রশান্তিই যেন তার পাথেয় হয়।


“এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে”—কারা এল? তারা কীভাবে অত্যাচার করেছিল ‘আফ্রিকা’ কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো।

● রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘আফ্রিকা’ কবিতার প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে আফ্রিকার বুকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের আগমনের কথা বলা হয়েছে |

→ রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ইতিহাসের এক ধারক্রমকে তুলে ধরেছেন, যা থেকে মনে হয় কবি পঞ্চম শতক থেকে প্রায় আধুনিক কাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল যে দাসব্যবস্থা, সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন।

→ সভ্যতার সূচনাপর্বে আফ্রিকা ছিল আদিম অরণ্যাবৃত দুর্গম এক ভূখণ্ড | পরবর্তীতে দীর্ঘকালজুড়ে আফ্রিকার প্রতি উদাসীন ছিল সভ্য দুনিয়া। “কালো ঘোমটার নীচে/অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ/উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।” কিন্তু যখন এই আফ্রিকার দিকে উন্নত বিশ্বের চোখ পড়ল তখন তাদের অত্যাচারে দীর্ণ হল এই মহাদেশ। নেকড়ের থেকেও তীক্ষ্ণ নখের হিংস্র এই ইউরোপীয় শক্তিরা আফ্রিকাকে ব্যবহার করল ক্রীতদাস সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে| সভ্য জাতির বর্বর লোভ নিজেদের অমানবিকতাকে প্রকাশ্য করে তুলল | অসহায় আফ্রিকা ভাষাহীন ক্রন্দনে পঙ্কিল হল ধূলি-রক্ত-অশ্রুতে মিশে। দস্যুবৃত্তির নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত রেখে গেল সভ্য দুনিয়া, তাদের অত্যাচার যেন ‘চিরচিহ্ন’ দিয়ে গেল অপমানিত আফ্রিকার ইতিহাসে | শুধু মানবসম্পদ নয়, প্রাকৃতিক সম্পদও সভ্য ইউরোপীয় শক্তিগুলির লোভের লক্ষ হল। উদ্ধত এইসব রাষ্ট্রদের অত্যাচার আর অমানবিকতায় এভাবেই বারেবারে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে আফ্রিকাকে।


“চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে” কারা, কীভাবে কিসের ‘চিরচিহ্ন’ দিয়ে গেল? সমুদ্রপারে সেই সময় কী ঘটেছিল ?

● ‘আফ্রিকা’ কবিতায় সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয় শক্তিসমূহ আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাস ‘চিরচিহ্ন’ দিয়ে গিয়েছিল।

→ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘আফ্রিকা’ কবিতায় আফ্রিকার ওপর সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের অত্যাচার ও শোষণ-বঞ্চনার কাহিনিকে রূপ দিয়েছেন। প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম আফ্রিকা দীর্ঘ সময়জুড়ে ইউরোপীয় শক্তিসমূহের নজরের বাইরে ছিল। কিন্তু উনিশ শতকে ইউরোপীয়রা আফ্রিকায় উপনিবেশস্থাপন শুরু করে এবং এই শতকের শেষে প্রায় পুরো আফ্রিকা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। এইসব তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্রশক্তি আফ্রিকার মানুষদের উপরে নির্মম অত্যাচার চালাত | তাদের নির্লজ্জ লোভ যেন বর্বরতার রূপ ধরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল আফ্রিকার মানুষ। তাদের রক্ত আর অশ্রুতে কর্দমাক্ত হয়েছিল আফ্রিকার মাটি | সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রনায়কদের কাঁটামারা জুতোর নীচে বীভৎস কাদার পিন্ড যেন চিরকালের মতো অত্যাচারের চিহ্ন রেখে গিয়েছিল আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাসে|

আফ্রিকায় যখন মানবতার এই লাঞ্ছনা ঘটছে সেই সময় তথাকথিত সভ্য দুনিয়ায় যথানিয়মে জীবনধারা বহমান ছিল। সেখানে সমুদ্রপারে পাড়ায় পাড়ায় দয়াময় দেবতার নামে মন্দিরে বাজছিল পুজোর ঘণ্টা। শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে। আর কবির বীণায় সংগীতের সুরে বেজে উঠছিল সুন্দরের আরাধনা। অর্থাৎ আফ্রিকার রক্তাক্ততার, লাঞ্ছনার বিপরীতে সমুদ্রপারে এভাবেই স্পষ্ট হয়েছিল এক শান্ত এবং নিশ্চিন্ত জীবনের ছবি |

 


‘আফ্রিকা’ কবিতা অবলম্বনে আফ্রিকার মানুষদের উপরে ঔপনিবেশিক প্রভুদের অত্যাচারের বর্ণনা দাও। সেই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কবির প্রতিবাদ কীভাবে উচ্চারিত হয়েছে লেখো।

● রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি আফ্রিকার উপরে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের অত্যাচারের এক মানবিক দলিল | আদিমতার অন্ধকারে ঢাকা আফ্রিকা একসময় ছিল সভ্য সমাজের কাছে বিভীষিকাস্বরূপ | কিন্তু কালক্রমে আফ্রিকার প্রতি এই ঔদাসীন্য দূর হয়ে গিয়ে তার মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয় সভ্যদুনিয়া | আর তখনই নখদাঁত বিস্তার করা হিংস্রতার শিকার হতে হয় আফ্রিকাকে। প্রথম পর্বে গর্বিত ইউরোপীয় দেশগুলি আফ্রিকাকে বেছে নিয়েছিল ক্রীতদাস সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে –“এল মানুষ-ধরার দল/ গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।” তারপরে আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ আকৃষ্ট করল তাদের –“সভ্যের বর্বর লোভ/ নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।” আর এভাবেই লাঞ্ছিত হল মানবতা | আফ্রিকার মাটি পঙ্কিল হল মানুষের রক্ত আর অশ্রুতে মিশে। অত্যাচার চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন তৈরি করে দিল আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাসে |

→ কবি রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকার উপরে অত্যাচারের কাহিনিকে তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে অপমানিত আফ্রিকার প্রতি নিজের সহানুভূতি জানিয়েছেন। ‘মানহারা মানবী’ আফ্রিকার উপর অবিচারকে স্পষ্টতর করে তুলতেই কবি বৈপরীত্যে তুলে ধরেছেন সমুদ্রপারের দেশগুলির নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব দিন কাটানোর কথা এবং এখানেই না থেমে কবি ‘দিনের অন্তিমকাল’ ঘোষণার মুহূর্তে সভ্যতার সংকটের মুখোমুখি হয়ে যুগান্তের কবিকে বলেছেন ক্ষমাপ্রার্থনা করার জন্য। হিংস্র প্রলাপের মধ্যে এই ক্ষমাপ্রার্থনাকেই রবীন্দ্রনাথ ‘সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী’ বলেছেন |


‘আফ্রিকা’ কবিতার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে আলোচনা করো।

● রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি উপেক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা এক মহাদেশের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য | সৃষ্টির সূচনা থেকেই আফ্রিকা নিবিড় অরণ্যে পূর্ণ অসূর্যম্পশ্যা এক দেশ | কিন্তু সেই ভয়ংকরতাই হয়েছে আফ্রিকার রক্ষাকবচ।‘বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায়’ আফ্রিকা নিজেকে রক্ষা করার উপায় খুঁজে নিয়েছে | অন্যদিকে, দুর্গম এবং দুর্বোধ্য আফ্রিকাকে উপেক্ষা করেছে উন্নত বিশ্ব। তার পরিচয় থেকে গিয়েছে অন্ধকার মহাদেশ হিসেবেই | ধীরে ধীরে আফ্রিকার সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। এসেছে ‘মানুষ-ধরার দল’। তৈরি হয়েছে দাসব্যবস্থা, যা কিনা অরণ্যের আদিমতার থেকেও আদিম এক অধ্যায়। তারপরে উন্নত ইউরোপ উপনিবেশ স্থাপন করেছে আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে। ‘সভ্যের বর্বর লোভ’ আফ্রিকায় তৈরি করেছে নির্লজ্জ অমানবিকতার আর-এক ইতিহাস | রক্ত আর চোখের জলে ভিজে গেছে আফ্রিকার মাটি। অথচ অন্য প্রান্তে উন্নত দেশগুলিতে একইভাবে তখন অব্যাহত ঈশ্বরের আরাধনা কিংবা কবির সংগীত ।

দিনের অন্তিমকাল ঘোষণার সময় যখন সমাগত, তখন কবি ‘যুগান্তের কবি’কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন ‘মানহারা মানবী’ আফ্রিকার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে। মানুষের যাবতীয় শুভবোধকে এই ক্ষমার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন কবি। ‘হিংস্র প্রলাপ’-এর মধ্যে এই হবে ‘সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী’ | এভাবেই বিশ্বমানব-মৈত্রীর মধ্য দিয়ে আফ্রিকার এক নব উত্থানকে কল্পনা করেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ।


‘আফ্রিকা’ কবিতা অবলম্বনে উপেক্ষিত ও অত্যাচারিত আফ্রিকার বর্ণনা দাও। রবীন্দ্রনাথ কীভাবে মানহারা আফ্রিকার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন লেখো।

● ১৯৩৭ সালে রচিত ‘আফ্রিকা’ কবিতায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের বর্বরতা এবং পাশবিক লোভ-লালসাকে কবি তুলে ধরেছেন।

প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেও আদিম আফ্রিকা ছিল নিজের মহিমায় সমুজ্জ্বল, কিন্তু একসময় সে-দেশে এল ক্ষমতামত্ত ঔপনিবেশিক শক্তি | কবির ভাষায়—

“এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে,

নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে।”

এই হিংস্র দানবশক্তির কাছে পর্যুদস্ত হল আফ্রিকার কালোমানুষ। নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে পড়ল তারা। বর্ণগরিমায়, সভ্যের মুখোশ পরে ঔপনিবেশিক প্রভুরা তামাম আফ্রিকাবাসীকে পরিণত করল ক্রীতদাসে | মাটিতে ঝরে পড়ল তাদের রক্ত ও অশ্রু । সেই রক্তঅশ্রুতে মিশে আফ্রিকার ধুলো হল পঙ্কিল | দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় সেই বীভৎস কাদার পিণ্ড চিরচিহ্ন দিয়ে গেল মানহারা আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাসে।

● উপেক্ষিত, লাঞ্ছিত আফ্রিকার পাশে দাঁড়াতে কবির জাগ্রত বিবেক গর্জে উঠেছে কবিতার অন্তিম স্তবকে| যুগান্তের কবিকে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন—

“দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে,

বলো ‘ক্ষমা করো’—”

আসলে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছে কবির বিবেক। বিশ্বের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের হয়ে সংবেদনশীল কবি নতজানু মানহারা আফ্রিকার কাছে। ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্যে দিয়ে সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণীকে প্রতিষ্ঠা দিতে চান তিনি।


‘আফ্রিকা’ কবিতাটির নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে লেখো।

● রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যের নামকরণের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি মনে করতেন, নামের মধ্যে দিয়ে বিষয়ের ব্যঞ্জনা দ্যোতিত হলেই তার সার্থকতা।

‘‘আফ্রিকা’ তাঁর পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের স্মরণীয় এক কবিতা| ১৯৩৫ সালে মুসোলিনি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ইথিওপিয়ায় অনুপ্রবেশ করেন। এই ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ ১৯৩৭ সালে আফ্রিকা কবিতাটি রচিত হয়। কবিতার প্রথম অংশে আফ্রিকার জন্মলগ্নের ইতিহাসটি বর্ণিত হয়েছে। প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে প্রকৃতির দুর্বোধ্য সংকেত চিনে নিয়ে আফ্রিকা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিল স্বতন্ত্র মহিমায় | বিরূপের ছদ্মবেশে ভীষণকে হার মানিয়ে আফ্রিকা নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখল | সভ্য মানুষের কাছে চিরকাল তাঁর মানবরূপ অপরিচিত ছিল | তারপর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের থাবা পড়ল স্বাধীন আফ্রিকার ওপর | ক্রীতদাসে পরিণত হল হাজার হাজার আফ্রিকাবাসী | লোহার হাতকড়ি পরিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হল দেশান্তরে ঔপনিবেশিক প্রভুদের সেবাদাস রূপে | সভ্যতার মুখোশ পরে সেইসব মানুষ-পশুর দল ‘আপন নির্লজ্জ অমানুষতা’-কে নগ্ন করল নিষ্ঠুরভাবে। মানবতার এই চরম অবমাননায় শেষপর্যন্ত কবি মানহারা আফ্রিকার পাশে দাঁড়িয়ে সভ্যতার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন | সমগ্র কবিতায় সমকালীন বিশ্বরাজনৈতিক পটভূমিকায় আফ্রিকার লাঞ্ছিত, রক্তাক্ত রূপটিই প্রকট হয়ে উঠেছে | এই বিচারে কবিতাটির নামকরণ বিষয়কেন্দ্রিক হয়েও ব্যঞ্জনাধমী।


‘আফ্রিকা’ কবিতাটির পটভূমি আলোচনা করো। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কবিমানসের পরিচয় দাও।

• রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মনোভাবের অন্যতম সৃষ্টি ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি। ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি কবিতাটি রচনা করেন। বিশ্ব ইতিহাসে এই সালটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৩৭ সাল বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনির ইথিওপিয়ায় অনুপ্রবেশকে রবীন্দ্রনাথ ভালো চোখে দেখেননি | স্বাধীন-স্বতন্ত্র আফ্রিকার কালোমানুষদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকদের দানবীয় অত্যাচার রবীন্দ্রনাথ মেনে নিতে পারেননি। নিরপরাধ, নিরীহ আফ্রিকার আদিম মানুষদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের বর্বর অত্যাচার কবিচিত্তে যে বিচলন সৃষ্টি করে, তারই অনুভূতি-ঋদ্ধ প্রকাশ ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি|

‘আফ্রিকা’ রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদের প্রোজ্জ্বল প্রকাশ। ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে জয় করে আফ্রিকা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে স্বাধীন এক ভূখণ্ড ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ এই অরণ্যঘেরা ভূখণ্ডের দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠল। আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা আফ্রিকার কালোমানুষদের পরিণত করল ক্রীতদাসে। তাদের ‘নির্লজ্জ অমানুষতা’ আর ‘বর্বর লোভ’ আফ্রিকাকে ক্ষতবিক্ষত করল। কবির সংবেদনশীলতায় আফ্রিকার মানুষের সেই আর্তনাদ ‘ভাষাহীন ক্রন্দন’ রূপে প্রতীয়মান হল। উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে লাঞ্ছিত আফ্রিকাকে কবি দেখলেন ‘মানহারা মানবী’ রূপে। যুগান্তের কবিকে জানালেন আহবান, নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইতে বললেন আফ্রিকার দ্বারে। আফ্রিকার প্রতি কবির দরদ এবং ভালোবাসা তাঁর বিশ্বমানবতাবাদের বাঙ্ময় প্রকাশ।


We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.