অদল বদল (পান্নালাল প্যাটেল) রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর সাজেশন

অদল বদল (পান্নালাল প্যাটেল) রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর সাজেশন, অদল বদল রচনাধর্মী প্রশ্ন, অদল বদল সাজেশন pdf, অদল বদল রচনাধর্মী প্রশ্ন সাজেশন.

অদল বদল (পান্নালাল প্যাটেল) রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর সাজেশন (প্রশ্ন মান-৫)


‘অদল বদল’ গল্পটিতে অমৃত-ইসাবের মধ্যে যে ভালোবাসা ও প্রকৃত বন্ধুত্ব প্রকাশিত হয়েছে তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

● পান্নালাল প্যাটেল রচিত ‘অদল বদল’ গল্পটিতে অমৃত আর ইসাব বেশিরভাগ সময় একইসঙ্গেই থাকত। তাদের বাড়িও ছিল মুখোমুখি। ইসাবের নতুন জামা হলে অমৃতেরও নতুন জামার দরকার দেখা দিত, জামা না ছেঁড়া সত্ত্বেও সে নতুন জামার জন্য বায়না শুরু করত। আমরা দেখি অমৃতর অনিচ্ছা সত্ত্বেও যখন কালিয়া তাকে কুস্তি লড়তে বাধ্য করে এবং তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তখন ইসাব রেগে গিয়ে কালিয়ার সঙ্গে কুস্তি লড়ে তাকে হারিয়েও দেয় | কারণ কালিয়া অমৃতকে আঘাত করায় ইসাব সেটা সহ্য করতে পারেনি । এরপর আবার যখন কুস্তি লড়তে গিয়ে ইসাবের নতুন জামা ছিঁড়ে গেছে আর সে ভয় পেয়েছে এই ভেবে যে বাবার কাছে তাকে মার খেতে হবে, তখন অমৃত ইসাবকে জামা অদলবদলের বুদ্ধি দিয়েছে। ইসাব আপত্তি জানালে অমৃত তাকে বলেছে, সে মার খেলেও তাকে বাঁচানোর জন্য মা আছে। কিন্তু ইসাবের শুধু বাবা আছেন তাই সে মার খেলেও তাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না | এইসব ঘটনা থেকেই বোঝা যায় তারা দুজনেই দুজনকে কতটা ভালোবাসত।


গ্রামপ্রধানের অমৃত ও ইসাবের নাম 'অদল বদল’ ঘোষণা করার পেছনে যে কারণ ছিল তা বর্ণনা করো।

● ‘অদল বদল’ গল্পে কুস্তিতে যখন কালিয়া অমৃতকে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও হারিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তখন ইসাব প্রতিবাদ করার জন্য কালিয়ার সঙ্গে আবার কুস্তি লড়ে তাকে হারিয়ে দেয়। আর এই কুস্তি লড়তে গিয়ে ইসাবের নতুন জামা ছিঁড়ে যায় | বাবার মারের হাত থেকে ইসাবকে বাঁচাতে অমৃত জামা অদলবদলের বুদ্ধি দেয় | সে নিজের জামা ইসাবকে দিয়ে ইসাবের জামা নিজে পরে নেয় আর তাদের এই জামা অদলবদলের দৃশ্য একটি ছেলে ছাড়াও ইসাবের বাবাও দেখেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি অমৃতের উদারতা এবং দুইবন্ধুর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হন। তিনি অমৃতের বাড়ি এসে এই কাহিনি অমৃতর মাকে বলেন এবং পাড়াপড়শিরাও সেই কাহিনি শুনে মুগ্ধ হয়। এমনকি এরপর চারিদিকে সব ছেলেরা তাদের ‘অদল বদল' বলেই ডাকতে শুরু করে। এই অদলবদলের কাহিনি যখন গ্রামপ্রধানের কানে পৌঁছোয় এবং তাদের জামা অদলবদলের কাহিনি গ্রামপ্রধানের পছন্দ হয় তিনি ঘোষণা করেন, অমৃতকে অদল আর ইসাবকে বদল বলে ডাকার কথা। আর এরপর থেকে সারা গ্রামে তাদের এই ‘অদল বদল' নামটি প্রচলিত হয়ে যায়।


‘অদল বদল' গল্পে হোলির পড়ন্ত বিকেলে কী ঘটনা ঘটেছিল তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

● পান্নালাল প্যাটেল রচিত ‘অদল বদল' গল্পে হোলির পড়ন্ত বিকেলে দুই বন্ধু অমৃত আর ইসাব একইরকম জামা পরে ফুটপাথের শান বাঁধানো রাস্তায় বসে ছেলেদের ধুলো ছোঁড়াছুঁড়ি খেলা দেখছিল আর ঠিক সেই সময়ই, তাদের দুজনের একইরকম পোশাক দেখে ছেলেদের দঙ্গল থেকে একটি ছেলে বেরিয়ে এসে অমৃতকে কুস্তি লড়তে বলেছিল, অমৃত চায়নি কুস্তি লড়তে, কারণ সে নতুন জামা পরেছিল আর এই জামা সে অনেক কষ্টে, অনেক জেদ করে বাড়ি থেকে আদায় করেছিল। কিন্তু অমৃতের অমত সত্ত্বেও কালিয়া তাকে বাধ্য করে কুস্তি লড়তে, লড়তে গিয়ে ছুঁড়েও ফেলে দেয় | এই ঘটনা দেখে ইসাব রেগে গিয়ে কালিয়ার সঙ্গে কুস্তি লড়ে তাকে হারিয়ে দেয়। এই কুস্তি লড়তে গিয়ে ইসাবের নতুন জামা ছিঁড়ে যায় | ইসাব বাবার কাছে জামা ছেঁড়ার জন্য মার খেতে হবে ভেবে যখন ভয় পায় তখন অমৃত তাকে জামা অদলবদলের বুদ্ধি দেয়। এই জামা অদলবদলের ঘটনার পর থেকে সারা গ্রামে তাদের ‘অদল বদল' নাম প্রচলিত হয়ে যায়।


“অমৃত সত্যি তার বাবা-মাকে খুব জ্বালিয়েছিল।”—অমৃত কীভাবে তার মা-বাবাকে জ্বালিয়েছিল ও তার পরিণাম কী হয়েছিল তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

● অমৃত ও ইসাব দুই বন্ধু ছিল | খেতে কাজ করতে গিয়ে ইসাবের জামা ছিঁড়ে যাওয়ায় তার বাবা তাকে নতুন জামা কিনে দিয়েছিলেন আর সেটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন জামা থাকা সত্ত্বেও অমৃত জেদ করেছিল নতুন জামা কেনার। নিজের জামার একটা ছোটো ছেঁড়া জায়গা আবিষ্কার করে তাতে আঙুল ঢুকিয়ে সেই জায়গাটাকে আরও ছিঁড়ে দিয়েছিল। অমৃতের মা তাকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এটাও বলেছিলেন যে, ইসাবকে জামা কিনে দেওয়ার আগে তার বাবা তাকে খুব মেরেছিলেন | এই কথা শুনে অমৃত মার খেতেও রাজি ছিল। তাই এই সমস্ত ঝামেলা থেকে বাঁচবার জন্য অমৃতের মা অমৃতকে তার বাবার কাছে যেতে বলেছিলেন। অমৃত জানত, তার মা যদি না বলেন তাহলে তার বাবার রাজি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম | কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র সে ছিল না। সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল, রাতে বাড়ি ফিরতেও চাইত না। এমনকি সে একদিন ইসাবদের গোয়ালঘরে গিয়েও লুকিয়েছিল। অবশেষে অমৃতর মা হাল ছেড়ে দিয়ে তার বাবাকে রাজি করিয়েছিলেন তাকে জামা কিনে দেওয়ার জন্য |


“অমৃতর জবাব আমাকে বদলে দিয়েছে।”— অমৃতের কোন্ জবাব বক্তাকে বদলে দিয়েছিল ? কীভাবে বদলে দিয়েছিল তার বর্ণনা দাও।

● সামাজিক দায়পালনের অঙ্গীকারকে সামনে রেখেই সচেতন Mayar শিল্পী ছবি আঁকেন। কবিতা লেখেন, গল্প রচনা করেন। পান্নালাল প্যাটেলও তার ব্যতিক্রম নন ৷ তাঁর ‘অদল বদল’ গল্পে জামা বদলের কারণে ইসাব অমৃতকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “তোর বাবা যদি তোকে মারে কী হবে?” এর উত্তরে অমৃত বলেছিল, “কিন্তু আমার তো মা আছে ।” অমৃতের এই জবাব বক্তাকে বদলে দিয়েছিল |

→ পাঠান বাহালি তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন অমৃত আর ইসাবের বন্ধুত্বের গভীরতা এবং পবিত্রতা দেখে| অমৃত জানে, তাকে তার বাবা মারলে তার মা রক্ষা করবে। কিন্তু ইসাবের তো মা নেই, অমৃতের অনুভবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বন্ধুত্বের প্রকৃত সংজ্ঞা। ধর্ম, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র—এসব ভেদ কখনও বন্ধুত্বের পথে বাধা হতে পারে না।ইসাবের বাবা নিজের চোখে সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখেছিলেন। এক অল্পবয়স্ক কিশোরের এই নিষ্কলুষ হৃদয়বৃত্তি তাঁকে বিস্মিত করেছে | নিজের প্রতিবেশীদেরও তিনি সেই অবাক করা ঘটনার কথা জানিয়েছেন। হয়তো তাঁর মনেও সাম্প্রদায়িকতার আভাস কোথাও কখনও উঁকি দিত পরিস্থিতি অনুসারে। কিন্তু অমৃতের জবাবে তাঁর উপলব্ধি সম্পূর্ণ রূপে বদলে গেল।


“ওরা ভয়ে কাঠ হয়ে গেল।”—কারা কেন ভয়ে কাঠ হয়ে | গিয়েছিল? কীভাবে এই ভয় থেকে তাদের মুক্তি ঘটেছিল?

● পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল’ গল্পে অমৃত আর ইসাব ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল| নতুন জামা পরে যাওয়া অমৃতকে কালিয়া কুম্ভি লড়ার জন্য জোর করে খোলা মাঠে নিয়ে যায় এবং তাকে ছুড়ে মাটিতে ফেলে দেয় | ইসাব বন্ধুর এই অপমান সহ্য করতে না পেরে কালিয়ার হাত ধরে তাকে লড়তে আহবান করে এবং হারিয়ে দেয়। কিন্তু এ সবের মধ্যেই ইসাবের জামার পকেট অনেকটা ছিঁড়ে যায় | বাবার কাছে ইসাবকে ভয়ানক মার খেতে হবে এ কথা ভেবেই তারা দুই বন্ধু ভয়ে কাঠ হয়ে যায় |

» এই ভয় থেকে মুক্তির জন্য অমৃত নিজের জামাটা খুলে ইসাবকে পরতে দেয়, নিজে ইসাবেরটা পরে। এভাবে তারা তখনকার মতো দুশ্চিন্তা ও ভয় থেকে মুক্তি পায় | বাড়িতে ফেরার পরে অমৃতের মা ছেঁড়া জামা দেখে বিব্রত হলেও সেভাবে কিছু বললেন না, সুঁচসুতো দিয়ে জামাটা রিপু করে দিলেন। এতে দুজনের ভয় আরও কেটে গেল। আর গল্পের শেষে যখন ইসাবের বাবা জামা বদলের কাহিনিটি অমৃতের মাকে জানালেন, আর, অমৃতের কাজে এবং মনোভাবে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন, তখন যাবতীয় ভয় অনাবিল আনন্দে রূপান্তরিত হল।


“পাড়া-পড়শি মায়ের দল পাঠানের গল্প শোনার জন্য ঘিরে দাঁড়াল।”—গল্পটি নিজের ভাষায় লেখো। এই গল্পে সকলের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

● পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল' গল্পে ইসাবের বাবা বলেছিলেন দুই অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু ইসাব আর অমৃতর জামা বদলের গল্প | নতুন জামা পরে যাওয়া অমৃতকে কালিয়া কুম্ভি লড়ার জন্য জোর করে মাঠে নিয়ে যায়, আর তাকে ছুঁড়ে মাটিতে ফেলে দেয়। তখন বন্ধুর অপমানের শোধ নিতে গিয়ে ইসাব কালিয়াকে ল্যাং মেরে মাটিতে ফেলে দেয় | কিন্তু এই ধবস্তাধবস্তিতে ইসাবের জামার পকেট এবং কিছুটা কাপড় ছিঁড়ে যায় | এই ছেঁড়া শার্ট দেখে ইসাবের বাবা যে তাকে প্রচণ্ড মারবে, তা ভেবে ইসাব যখন ভীত, তখনই অমৃত তার নতুন জামাটি ইসাবকে পরিয়ে তার জামাটি নিজে নিয়ে নেয়। সে জানায় যে, বাবা তাকে মারলেও ঠেকানোর জন্য তার মা আছে।

» আড়াল থেকে এই দৃশ্যটি দেখে, বন্ধুত্বের এই অনাবিল প্রকাশে ইসাবের বাবা উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। তাঁর মুখে এই কথা শুনে উপস্থিত সকলেরও বুক ভরে যায় | গ্রামের প্রধান ঘোষণা করেন যে, অমৃতকে অদল আর ইসাবকে বদল বলে এখন থেকে ডাকা হবে। তাদের বন্ধুরাও এতে খুব খুশি হয়। ক্রমশ গ্রাম পেরিয়ে আকাশ বাতাস যেন এই ‘অমৃত-ইসাব-অদল-বদল’ আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে।


“আজ থেকে আপনার ছেলে আমার -বক্তা কে? কাকে কেন এ কথা বলেছেন? +8

● ‘অদল বদল’ গল্পে প্রশ্নোদ্ভূত অংশটির বক্তা ইসাবের বাবা পাঠান| কালিয়া নামের একটি ছেলে অমৃতকে জোর করে কুস্তি লড়তে বাধ্য করে এবং মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উল্লাস করতে থাকে বন্ধুদের সঙ্গে। এতে ইসাব রেগে যায়। সে কালিয়াকে লড়তে ডাকে, আর তাকে হারিয়েও দেয়। কিন্তু বন্ধুর ভালোবাসার মাশুল দিতে গিয়ে ইসাবের নতুন জামা ছিঁড়ে যায়। ইসাব যখন বাবার কাছে মার খাওয়ার ভয়ে শঙ্কিত, সেইসময় অমৃত তার জামাটা ইসাবকে দিয়ে জামা অদলবদলের বুদ্ধি দেয়। ইসাবকে আশ্বস্ত করে সে জানায় যে, তার বাবা তাকে মারতে এলেও বাঁচানোর জন্য তার মা আছে | ইসাবের বাবা আড়াল থেকে ঘটনাটি দেখেছিলেন | তাই যখন বন্ধুরা ইসাবদের জামা অদলবদলে কথা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখায়, তিনি তখন দুজনকে কাছে ডেকে নেন। এবং দশ বছরের অমৃতকে জড়িয়ে ধরে মন্তব্যটি করেন। এক বালকের মধ্যে বন্ধুপ্রীতির যে অসামান্য প্রকাশ তিনি লক্ষ করেছিলেন তা-ই তাঁকে অভিভূত করে দেয়। তাঁর কাছে ইসাব আর অমৃতের মধ্যেকার ব্যবধান ঘুচে যায়।


“আজ থেকে আমরা অমৃতকে অদল আর ইসাবকে বদল বলে ডাকব।”—কে কখন এ কথা ঘোষণা করেন? এর আড়ালে কোন্ সত্য লুকিয়ে আছে?

● ‘অদল বদল’ গল্পে ইসাব আর অমৃতর জামা অদলবদলের গল্প যখন গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গ্রামপ্রধানের কানে গেল তখন সব শুনে চনি খুশি হয়ে ঘোষণাটি করেছিলেন।

● বন্ধু অমৃতর অপমানের শোধ নেওয়ার জন্য ইসাব কালিয়ার সঙ্গে কুস্তি লড়েছিল, আর তাতে ইসাবের জামা ছিঁড়ে যাওয়ায় তাকে তার বাবার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের জামাটা খুলে পরতে দিয়েছিল অমৃত। অমৃত যুক্তি দিল যে, তার বাবা তাকে মারতে এলেও ঠেকানোর জন্য তার মা আছে। কিন্তু ইসাব ছিল মাতৃহীন| ইসাব আর অমৃত ছিল দুই পৃথক ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু শৈশব-কৈশোরের সবুজ বন্ধুত্বে ধর্ম কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং চারপাশ থেকে এই বন্ধুত্ব সাদর অভ্যর্থনাই পেয়েছিল। যে বাবাকে ইসাব ভয় পেয়েছিল, তিনি তাদের কাছে টেনে নেন | ছেলেদের জন্য গর্বিত হন ইসাবের বাবা আর অমৃতর মা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে তাদের জামা অদলবদলের গল্প | আর সে কাহিনি স্বীকৃতি পায় গ্রামপ্রধানের ঘোষণাতে| মানবতার কাছে ধর্মের বেড়া কোনো বাধা হতে পারে না। বন্ধুত্বের টানে, ভালোবাসার শক্তিতে মানুষ আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠতে পারে| অমৃত-ইসাবের কাহিনিকে সরকারি সিলমোহর লাগিয়ে গ্রামপ্রধান হয়তো এই চিরকালীন মানবতার সত্যকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন।


‘অদল বদল’ গল্পে হিন্দু-মুসলিম পারস্পরিক সম্প্রীতির যে পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

● পান্নালাল প্যাটেল রচিত ‘অদল বদল’ গল্পটিতে আমরা দুই বন্ধুর কাহিনি পাই | দুই বন্ধু, যাদের প্রায় সবকিছুই ছিল একরকম | অমৃত ও ইসাব—এদের ধর্ম ছিল আলাদা। অমৃত ছিল হিন্দু পরিবারের ছেলে আর ইসাব মুসলিম পরিবারের। কিন্তু এই ধর্মগত পার্থক্য তাদের বন্ধুত্বের মাঝখানে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করতে পারেনি। এদের পরিবারের মধ্যেও ছিল সুসম্পর্ক | অমৃত আর ইসাব কোনো বিপদের দিনে একে অন্যের পাশে সবসময় থাকত | অমৃতকে যখন কালিয়া জোর করে কুস্তি লড়তে বাধ্য করে এবং তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তখন ইসাব তার প্রতিবাদ করেছে। ইসাব কালিয়াকে তার সঙ্গে কুস্তি লড়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং তাকে হারিয়েও দিয়েছে | আবার অন্যদিকে, কুস্তি লড়তে গিয়ে যখন ইসাবের জামা ছিঁড়ে গেছে আর বাবার কাছে মার খেতে হবে ভেবে ইসাব ভয় পেয়েছে, তখন অমৃত সেই ছেঁড়া জামাটি পরে নিয়ে ইসাবকে নিজের নতুন জামাটি দিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে তাদের ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব সমস্ত সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদকে অতিক্রম করে গিয়েছে।


‘অদল বদল’ গল্পের নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে তা বিচার করো।

● সাহিত্য ব্যক্তিমানুষের সৃষ্টি হলেও তার প্রকৃত বিচারক সহৃদয় পাঠক। আর পাঠকের দিকে লক্ষ রেখেই সাহিত্যিক তাঁর রচনাকে নানা উপকরণে সজ্জিত করেন। নামকরণ হল সাহিত্যসৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান | ‘অদল বদল’ গল্পে অমৃত আর তার বন্ধু ইসাবের জামা অদলবদল-এর কাহিনিই মুখ্য। প্রাথমিক বিচারে তাই নামকরণটি বিষয়কেন্দ্রিক | কিন্তু গল্পকাহিনির মর্মসত্য উদ্ঘাটিত হলে ‘অদল বদল’ বিষয় ছাড়িয়ে অন্য ব্যঞ্জনার আভাস দেয়।

বন্ধুর সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে ইসাব কালিয়ার সঙ্গে কুস্তি লড়তে বাধ্য হয় | কুস্তিতে জিতলেও তার জামাটা কিন্তু ছিঁড়ে যায়। অমৃত ভাবে এর জন্য ইসাবকে তার বাবার হাতে মার খেতে হবে। তাই সে নিজের অক্ষত জামাটা ইসাবকে দিয়ে দেয়, আর ইসাবের ছেঁড়া জামাটা নিজে পরে নেয় | এখানেই গল্পের ‘অদল বদল’ নামের প্রাথমিক সার্থকতা তৈরি হল।

কিন্তু এরপর পাড়ার ছেলেরা ওদের ‘অদল বদল’ বলে খ্যাপাতে শুরু করল। কথাটা গ্রামের প্রধানের কানে গেল | বিচক্ষণ প্রধান বুঝলেন এই ঘটনা তো শুধু জামা অদল বদলের ব্যাপার নয়। এখানে প্রগাঢ় বন্ধুপ্রীতিকেও ছাপিয়ে উঠেছে পরিশুদ্ধ মানবিক বোধ| জামা অদলবদলকে নাম অদলবদলে পরিণত করে গ্রামপ্রধান গল্পের নামকরণকে ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ করে তুলেছেন।


‘অদল বদল' গল্প অবলম্বনে ইসাবের বাবা হাসানের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

● পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল’ গল্পের পাঠান হাসান চরিত্রটি মনুষ্যত্বের মহিমাকে উপলব্ধি করা এক মহান চরিত্র |

১. আর্থিক অবস্থা : হাসানের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তিনি বিপত্নীকও বটে। ইসাব তাঁর ছেলে। তাকে লেখাপড়া শেখাতেও হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। সাময়িক বিপদ-আপদে সুদে টাকা ধার নিতে হয়। সামান্য জমির আয়ে কায়ক্লেশে দিন চলে। দাবিমতো একমাত্র ছেলের সব আশা পূরণ করতে পারেন না তিনি।

2. পিতৃসত্তার উত্তরণ : কুস্তির সময় ইসাবের জামা ছিঁড়ে যায়। সহপাঠী অমৃত তার ছেঁড়া জামাটা নিয়ে তাকে তার ভালো জামাটা দেয়। কারণ, তাতে ইসাব বাবার হাতে মার খাওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এ কথা আড়াল থেকে শুনে হাসানের চোখের সামনে থেকে সংকীর্ণ ধর্মের কালো মেঘ সরে যায়। তাঁর মনে হয় অমৃত যেন তাঁরও ছেলে | মুসলমান হাসান একমুহূর্তেই হয়ে ওঠেন শাশ্বত পিতা, ধর্ম যাঁর মনুষ্যত্ব |

৩. মানবতা : সমগ্র গল্পে পাঠান হাসান দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন শাশ্বত পিতা| ধর্ম বা জামা অদলবদল নয়, হৃদয়ের নিখাদ ভালোবাসার অদলবদল ঘটলে আমাদের সামাজিক পঙ্কিলতার ঊর্ধ্বে ফুটবে মনুষ্যত্বের শতদল। এই চিরকালীন সত্যটি গল্পে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাসান চরিত্রটির মাধ্যমে।


‘অদল বদল’ গল্প অবলম্বনে অমৃতের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

● ‘অদল বদল’ গল্পে দেশকাল ধর্মের সীমানা অতিক্রম করা বন্ধুত্বের অনবদ্য রূপায়ণ ঘটেছে। সেই চিরায়ত বন্ধুত্ব আসলে মানবতাকে প্রসারিত করে। আর সেখানে সর্বাধিক সক্রিয় চরিত্র হল অমৃত।

১. নিবিড় বন্ধুত্ব : অমৃত দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে। ইসাব তার বন্ধু। একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ে তারা | দুজনের জামার মাপ, কাপড়, রং একই ধরনের। অন্তরেও তারা দুজনে এক| এই অকৃত্রিম অক্ষয় বন্ধুপ্রীতির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে অমৃত যখন তার ভালোজামাটা দিয়ে ইসাবের ছেঁড়া জামাটা গায়ে পরে নিয়েছে।

২ বাস্তব বুদ্ধি : অমৃত ইসাবকে বলেছে, ‘তোকে তোর বাবা পিটোবে।... কিন্তু আমাকে বাঁচানোর জন্য তো আমার মা আছে।' অমৃতের এই উক্তি তার বুদ্ধিমত্তা এবং বাস্তব জ্ঞানের পরিচয় বহন করে। পাশাপাশি মা-হারা ইসাবের প্রতি তার এই অতিরিক্ত ভালোবাসা পাঠককে মুগ্ধ করে।

৩. বন্ধুত্বের উদার আকাশ: বন্ধুত্ব যে কখনও ধর্ম-বর্ণঅর্থকৌলীন্যের প্রাচীর মানে না তার যথার্থ প্রমাণ অমৃত | ইসাবের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় তা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

অমৃত নিতান্তই বালক। তবু তার আচার-আচরণে এবং মানসিকতায় পরিশুদ্ধ সহৃদয়তার প্রকাশ। সেটাই গল্পটিকে চিরকালীন মানবিক আবেদনে ভূষিত করেছে।


‘অদল বদল' গল্প অবলম্বনে ইসাবের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

● লেখক পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল' গল্পটি অখন্ড বন্ধুপ্রীতির জীবন্ত আলেখ্য। অমৃত আর ইসাব—এই দুজনের আন্তরিক সম্পর্কের স্বরূপই হল গল্পের মুখ্য উপজীব্য বিষয় | বাবা হাসানকে সুদে টাকা ধার নিতে হয়। তবে তার মা নেই | বাবাই তাদের সংসারের একমাত্র কর্তা।

২. নিবিড় বন্ধুত্ব: অমৃতের সঙ্গে ইসাবের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। তাদের সব কিছুই একই রকমের | একই স্কুলে একই শ্রেণিতে পড়ে তারা। হোলির দিন কালিয়া বলে একটা ছেলে কুস্তি লড়ার সময় অমৃতকে ছুড়ে মাটিতে ফেলে দিলে ইসাব স্থির থাকতে পারেনি | সে কালিয়াকে ল্যাং মেরে মাটিতে ফেলে কালিয়ার ঔদ্ধত্যকে চূর্ণ করে দিয়েছে।

৩. সহমর্মিতা: লড়ালড়ির সময় ইসাবের জামাটার পকেট এবং কিছুটা অংশ ছিঁড়ে গিয়েছিল | অমৃত তার ভালো জামাটা ইসাবকে পরে নিতে বললে ইসাব স্বার্থপরের মতো তা করতে চায়নি। সে বলেছে—‘তোর কী হবে, তুই কী পরবি?’ কোনোভাবেই ইসাব অমৃতের থেকে আলাদা হয়ে যায়নি।

বন্ধুত্বের যে অমলিন প্রকাশ এই গল্পে মানবতাকে সঞ্জীবিত করেছে তারই এক প্রান্তে ইসাবের অবস্থান |


‘অদল বদল’ গল্প অবলম্বনে অমৃতের মায়ের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

● পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল’ গল্পটি মূলত অমৃত-ইসাবের অখণ্ড বন্ধুপ্রীতির কাহিনি। এর মধ্যেও অমৃতের মায়ের ভূমিকা বিশেষভাবে মনে রাখার মতো | খুব স্বল্প পরিসরেও তাঁর সক্রিয়তা লক্ষ করা যায় |

১. স্নেহময়ী: খুব সাধারণ পরিবারের গৃহবধূ অমৃতের মা। অমৃতের দুরন্তপনা তাঁকেই সামলাতে হয়। ইসাবের মতো নতুন জামা নেবে বলে অমৃত বায়না ধরেছে। নাছোড়বান্দা ছেলেকে বুঝিয়ে কাজ না হলেও অমৃতের মা কিন্তু তার এই একগুঁয়ে স্বভাব দেখে রেগে যাননি। তাঁর স্বামীকে বুঝিয়ে ইসাবকে একটা নতুন জামা কিনে দিতে রাজি করিয়েছেন। মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন তিনি।

১. পরিচয়: ইসাব দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। তাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। সাময়িক বিপদ-আপদেও তার

২. সর্বংসহা: অমৃতের মা সর্বংসহা গৃহবধূ | সন্তানের দুরন্তপনায় যেমন তাঁকে বিচলিত হতে দেখা যায় না তেমনই বাবার পিটুনির হাত থেকে অমৃতকে বাঁচানোর দায়িত্ব তিনিই নেন | ইসাবের ছেঁড়া জামাটা নিজের গায়ে পরে নিয়ে অমৃত বাড়ি ফেরার সাহস দেখিয়েছে শুধু তার মা আছে বলে।

৩. উদারমনা: অন্যধর্মের হলেও তিনি কখনও অমৃতকে ইসাবের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেননি। বরং ইসাবের বাবাকে ‘হাসান ভাই’ সম্বোধন করে তিনি সামাজিক সহাবস্থানের বিষয়টিকে দৃঢ় করে দেখিয়েছেন।

এই গল্পে মাতৃমূর্তিতেই ভাস্বর হয়ে উঠেছেন অমৃতের মা।


ছোটোগল্প হিসেবে ‘অদল বদল’ কতদূর সার্থক বিচার করো।

● পান্নালাল প্যাটেল-এর ‘অদল বদল’ ধর্ম এবং জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে দুই কিশোরের নির্মল বন্ধুত্বের গল্প। আয়তনের সংক্ষিপ্ততা যদি ছোটোগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয় তাহলে ‘অদল বদল’-এ অবশ্যই সেই শর্ত পূরণ করা হয়েছে। কাহিনির সূচনাও হয়েছে আকস্মিকতা দিয়ে—“হোলির দিনের পড়ন্ত বিকেল।” ছোটোগল্পের কাহিনিতে শাখাপ্রশাখার বিস্তার ঘটে না। একটি মাত্র ঘটনা তার আশ্রয় হয়| এই গল্পেরও দুই বন্ধুর জামাবদল এবং তাদের বাড়িতে ও চারপাশে তার প্রতিক্রিয়াই কাহিনির বিষয়। চরিত্রও স্বাভাবিকভাবেই খুব কম| প্রধান দুই চরিত্র অমৃত ও ইসাব ছাড়া অমৃতের মা বাহালি, আর ইসাবের বাবা পাঠানকে পাওয়া যায়। এভাবে প্রথাগতভাবে ‘অদল বদল’ ছোটোগল্পের আঙ্গিক বজায় রেখেছে | কিন্তু তার মধ্যেও গল্পটির কিছু বিশিষ্টতা আছে|

কুস্তির মাঠে ইসাবের জামা ছিঁড়ে গেলে এই অমৃতই নিজের নতুন জামাটা ইসাবকে দিয়ে দেয়| সব মিলিয়ে এই যে বন্ধুত্বের বাতাবরণ তৈরি হয় সেখানে ধর্ম থাকে না, যাকে সহমর্মিতা আর ভালোবাসায় অভিষিক্ত এক নির্মল বন্ধুত্ব। এভাবে বিষয়গত আবেদনে ‘অদল বদল’ অসামান্য হয়ে ওঠে। ছোটোগল্প হিসেবে এভাবেই ‘অদল বদল’ বিশিষ্টতা পায়।


We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.