অভিষেক (মাইকেল মধুসূদন দত্ত) রচনাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

অভিষেক (মাইকেল মধুসূদন দত্ত) রচনাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (প্রশ্নমান -৫), অভিষেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, অভিষেক রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর.

অভিষেক (মাইকেল মধুসূদন দত্ত) রচনাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (প্রশ্নমান -৫)


“কি হেতু, মাতঃ, গতি তব আজি এ ভবনে?”—কে, কাকে | উদ্দেশ্য করে কখন মন্তব্যটি করেছিলেন? এর কোন্ উত্তর তিনি পেয়েছিলেন?

● মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক' শীর্ষক কবিতায় রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশে আসা ‘লোকমাতা’ রমা, অর্থাৎ লক্ষ্মীকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্যটি করেছেন।

বীরবাহুর মৃত্যুর পরে লঙ্কার যে বিপর্যয় ঘনিয়ে এসেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে স্বর্ণলঙ্কায় ইন্দ্ৰজিৎকে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে লক্ষ্মী প্রমোদ-উদ্যানে যান। তখনই প্রমীলার সঙ্গে বিহারে রত ইন্দ্রজিৎ ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে আসা লক্ষ্মীকে দেখে মন্তব্যটি করেন। তিনি জানতে চান, এমন কী ঘটনা ঘটল, যার ফলে ইন্দ্রজিতের কাছেই তাঁকে স্বয়ং আসতে হল!

→ ছদ্মবেশী লক্ষ্মী ইন্দ্রজিৎকে জানান যে, স্বর্ণলঙ্কার দশা বর্ণনার অতীত। ঘোর যুদ্ধে তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন এবং এই মৃত্যুতে রাক্ষসাধিপতি রাবণ গভীরভাবে শোকগ্রস্ত | রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তিনি সৈন্য-সহ প্রস্তুতি নিচ্ছেন | তাঁর কাছে পরাজিত ও নিহত রামচন্দ্র কীভাবে পুনর্জীবন লাভ করে বীরবাহুকে নিহত করল—এ কথা ভেবে ইন্দ্রজিৎ যখন বিস্মিত তখন লক্ষ্মী তাঁকে বলেন যে, রামচন্দ্র ‘মায়াবী মানব’। রাক্ষসকুলের মর্যাদা রক্ষার জন্যই তাঁর শীঘ্র লঙ্কায় যাওয়া উচিত। বস্তুত, এখানে এই লক্ষ্মী স্বয়ং স্বর্ণলঙ্কার প্রতিষ্ঠাতা দেবী, রাজলক্ষ্মী | তাই লঙ্কার ঘোর দুর্দিনে তিনি লঙ্কার বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিতের কাছে এসেছেন, ইন্দ্ৰজিৎকে যুদ্ধে পাঠানোর অভিপ্রায়ে।


“...এ অদ্ভুত বারতা, জাননী, কোথায় পাইলে তুমি”—কোন্ | বার্তাকে কেন অদ্ভুত বলা হয়েছে? এই বার্তার পিছনে উদ্দেশ্য কী ছিল?

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশে প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশ ধারণ করে লক্ষ্মী প্রমোদকাননে ইন্দ্রজিতের কাছে এসে তাকে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ জানান | এই বার্তাকেই ইন্দ্ৰজিৎ ‘অদ্ভুত’ বলে অভিহিত করেছেন।

ইন্দ্রজিতের কাছে রামচন্দ্রের হাতে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা | কারণ, এর আগে দু-বার রামচন্দ্র তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছেন। নিশারণে তিনি রামচন্দ্রকে বধ করেছেন। শত্রুসৈন্যে শরনিক্ষেপ করে রামচন্দ্রকে হত্যার পরেও কীভাবে সেই রামচন্দ্রই বীরবাহুকে হত্যা করেছিলেন, তা ইন্দ্রজিতের কাছে চরম বিস্ময়ের মনে হয়েছে। তাই এই ঘটনাকে তিনি ‘অদ্ভুত’ বলেছেন।

→ “নিজদোষে মজে রাজা লঙ্কা-অধিপতি”—এই যুক্তিতে লক্ষ্মী লঙ্কা ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠধামে ফিরে যেতে চান। তার আগে তিনি ইন্দ্ৰজিৎকে লঙ্কায় ফেরত নিয়ে আসতে চান। ‘প্রাক্তনের ফল’ অর্থাৎ নিয়তির বিধান কার্যকর করার জন্যই এই উদ্যোগ। এই উদ্দেশ্য নিয়েই মেঘনাদধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে লক্ষ্মী প্রমোদ উদ্যানে মেঘনাদের কাছে যান এবং তাঁকে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দেন। তাঁর লক্ষ ছিল লঙ্কার দুর্দশা এবং পিতা রাবণের শোকে ইন্দ্রজিৎকে অস্থির করে তাঁকে লঙ্কায় আসতে বাধ্য করা।


“ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।”—এখানে কোন্ অপবাদের কথা বলা হয়েছে? এই অপবাদ ঘোচানোর জন্য বক্তা কী প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?

● মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’-এ ইন্দ্ৰজিৎ যখন প্রমোদকাননে বিলাসে মত্ত তখনই লক্ষ্মী সেখানে আসেন এবং তাঁকে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দেন। ইন্দ্রজিতের মনে হয়, রাক্ষসবংশের গৌরবকে বিনষ্ট করে রামচন্দ্রের সৈন্যরা যখন লঙ্কাকে বেষ্টন করে রয়েছে, তখন নারীসান্নিধ্যে সময় কাটানোর ঘটনা গ্লানিকর। উপরন্তু, তিনি লক্ষ্মীর মুখ থেকে এ-ও জানতে পারেন যে, তিনি প্রমোদকাননে মত্ত থাকায় তাঁর পিতা স্বয়ং যুদ্ধসজ্জা করছেন | তাঁর মতো উপযুক্ত এবং বীর পুত্র বেঁচে থাকতেও রাজা রাবণকেই যদি যুদ্ধযাত্রা করতে হয়, তবে তা অত্যন্ত মানহানিকর। রাবণের পুত্র হিসেবে তাঁর নিজের এই আচরণ ইন্দ্রজিৎ মেনে নিতে পারেননি। তাই একেই তিনি ‘অপবাদ’ বলেছেন|

→ শত্রুসৈন্যদের বধ করে ইন্দ্রজিৎ এই অপবাদ দূর করতে উদ্যোগী হন। বীরের সজ্জায় তিনি সজ্জিত হয়ে ওঠেন। মেঘবর্ণ রথ, চক্রে বিজলির দীপ্তি, ইন্দ্রধনুর ন্যায় উজ্জ্বল রথের পতাকা, দ্রুতগতির অশ্ববাহিনী—এইসব নিয়েই সেজে উঠেছিলেন ইন্দ্ৰজিৎ। তীব্র রোষে যখন ধনুকে টংকার দিয়েছিলেন, মনে হয়েছিল যেন মেঘের মধ্যে গড়ুর পাখি চিৎকার করে উঠছে | বীরভাবের এই আদর্শ তুলে ধরার মধ্যেই ইন্দ্রজিতের অপবাদ ঘোচানোর প্রয়াস লক্ষ করা যায়।


“সাজিলা রথীন্দ্রষভ বীর আভরণে”—এই সজ্জার বর্ণনায় কবি যে দুটি পৌরাণিক প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন সেগুলির বর্ণনা দাও।

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশে বীরবাহুর মৃত্যুর পরে লঙ্কার মর্যাদা পুনরুদ্ধারে ইন্দ্রজিৎ বীরসজ্জায় সজ্জিত হয়ে ওঠেন।

ইন্দ্রজিতের যুদ্ধসজ্জার বর্ণনা দিতে গিয়ে দুটি পৌরাণিক প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন কবি—

প্রসঙ্গ ১ : কার্তিকেয় কর্তৃক তারকাসুর বধের প্রসঙ্গ। তারকাসুরের অত্যাচারে বিপন্ন দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে ব্রহ্মা বিধান দেন যে, শিবের ঔরসজাত সন্তানই তাকে বধ করতে পারবে| ছ–জন কৃত্তিকার গর্ভে শিবের ছয় সন্তানের জন্ম হলেও তাঁদের মিলিত করে এক পুত্র সৃজিত হয়, নাম হয় কার্তিকেয় | দেবী বসুন্ধরা তাঁকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তিনি দেবসেনাপতি পদে নিযুক্ত হন ও তারকাসুরকে নিহত করেন।

প্রসঙ্গ ২ : অর্জুনের গোধন উদ্ধারের প্রসঙ্গ। পান্ডবেরা যখন বিরাটের গৃহে অজ্ঞাতবাসে ছিলেন, সেই সময় কৌরবরা বিরাটের গোধন হরণের জন্য তাঁর রাজ্য আক্রমণ করেন। বিরাট যুদ্ধে পরাজিত এবং বন্দি হলে বৃহন্নলারূপী অর্জুন বিরাটপুত্র উত্তরের রথের সারথি হয়ে গোধন রক্ষা করতে যান। কুরুসৈন্যের সংখ্যা দেখে ভীত উত্তর পালাতে চাইলে অর্জুন তাকে ছদ্মবেশ নেওয়ার সময়ে যে শমীবৃক্ষে অস্ত্রাদি গোপনে রেখেছিলেন সেখানে নিয়ে যান এবং সেগুলি গ্রহণ করে ক্লীববেশ ত্যাগ করে বীরবেশে সজ্জিত হয়ে কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যান।


“তবে কেন তুমি, গুণনিধি,/ত্যাজ কিঙ্করীরে আজি?” কে কখন কথাটি বলেছেন? তাঁকে কী সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছিল?

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশে ছদ্মবেশী লক্ষ্মীর কাছে রামচন্দ্রের দ্বারা বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ শুনে ইন্দ্রজিৎ ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে লঙ্কার রাজসভার উদ্দেশে যাত্রা করেন। ইন্দ্রজিৎ যখন রথে আরোহণ করছেন তখনই সেখানে তাঁর স্ত্রী প্রমীলার আবির্ভাব ঘটে। তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য তিনি ইন্দ্রজিতের প্রতি অনুযোগ করেন। ইন্দ্রজিৎ-বিহনে তাঁর পক্ষে বেঁচে থাকাই যে সম্ভব নয়, তাও বলেন। গহন অরণ্যে হাতির পায়ে লতা বাঁধলে মাহুত তাতে মন না দিলেও হাতি তাকে ত্যাগ করে না | অথচ, লতা অতি ক্ষুদ্র, পরজীবী, নেহাৎ তুচ্ছ | তবু হাতি তাকে পা থেকে সরিয়ে ফেলে না। তার পায়ে সেই লতার বন্ধন জড়িয়ে থাকে। এভাবেই ইন্দ্রজিতের তাঁকে ছেড়ে যাওয়াকে অনুচিত কর্ম বলে বোঝাতে চান প্রমীলা |

● প্রমীলাকে সান্ত্বনা দিতে ইন্দ্ৰজিৎ বলেন যে, প্রমীলা যে দৃঢ় বন্ধনে তাঁকে বেঁধেছেন তা খোলার ক্ষমতা কারোরই নেই | একই সঙ্গে ইন্দ্ৰজিৎ বলেন যে প্রমীলার কল্যাণের জন্যই রাঘবকে নাশ করে তিনি শীঘ্র প্রমীলার কাছে ফিরে আসবেন। এই বলে ইন্দ্রজিৎ প্রমীলার কাছে বিদায় প্রার্থনা করেন।


“হায়, বিধি বাম মম প্রতি।”—কখন বক্তা এ কথা বলেছেন? বক্তার এ কথা বলার কারণ কী?

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’ থেকে সংকলিত কাব্যাংশে রাক্ষসরাজ রাবণ মন্তব্যটি করেছেন। বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ শুনে শোকে কাতর রাবণ রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধপ্রস্তুতি নেন। সেজে ওঠে তার চতুরঙ্গ বাহিনী। এই সময় সেখানে এসে উপস্থিত হন পুত্র ইন্দ্রজিৎ। রামচন্দ্রকে ‘সমূলে নির্মূল’ করার জন্য তিনি পিতা রাবণের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন—“ঘোর শরানলে/করি ভস্ম, বায়ু-অস্ত্রে উড়াইব তারে; /নতুবা বাঁধিয়া আনি দিব রাজপদে।”

তখনই পুত্রকে আলিঙ্গন করে এবং তাকে ‘রাক্ষস-কুলশেখর’ ও ‘রাক্ষস-কুল-ভরসা’ বলে উল্লেখ করে রাবণ জানান যে, সেই ‘কাল-সমরে’ ইন্দ্ৰজিৎকে পাঠাতে তাঁর মন সায় দেয় না। তখনই রাক্ষসরাজ তাঁর প্রতি নিয়তির নিষ্ঠুরতায় প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন।

• নিয়তির নিষ্ঠুরতাকে রাবণ তাঁর জীবনে বারংবার উপলব্ধি করেছেন। কুম্ভকর্ণের মৃত্যু ছিল একটি আঘাত। একইভাবে বীরবাহুর মৃত্যুতে নিয়তির বিরূপতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেঘনাদের হাতে যুদ্ধে নিহত হওয়ার পরেও যেভাবে পুনর্জীবন লাভ করে রামচন্দ্র বীরবাহুকে যুদ্ধে নিহত করেছেন তা রাবণকে বিস্মিত ও হতাশ করেছে।—“কে কবে শুনেছে, পুত্র, ভাসে শিলা জলে,/কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?” বীর রাবণকে এ কথা বলার সময়ে হতমান মনে হয়েছে।


“তারে ডরাও আপনি।”—কে, কাকে ভয় পান? উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ভয় পাওয়ার কারণ কী? বক্তা কীভাবে সেই ভয় দূর করতে সচেষ্ট হয়েছেন?

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘অভিষেক’ পদ্যাংশ থেকে গৃহীত আলোচ্য পঙ্ক্তিটিতে লঙ্কেশ্বর রাবণের রঘুপতি রামচন্দ্রকে ভয় পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

● রামচন্দ্র মায়াবী। দেবতারা তাঁকে নানাভাবে সাহায্য করে চলেছেন। তাই নিশারণে মারা গিয়েও রামচন্দ্র পুনরায় বেঁচে উঠেছেন| স্বয়ং বিধাতা রাবণের প্রতি বিরূপ | সামান্য মানুষ হলেও তাই তিনি রামচন্দ্রকে ভয় পান। রাক্ষসকুলের ভরসা প্রিয় পুত্র ইন্দ্ৰজিৎকে তাই যুদ্ধে পাঠাতে তাঁর মন শঙ্কিত হয়ে থাকে—‘এ কাল সমরে, /নাহি চাহে প্রাণ মম পাঠাইতে তোমা/বারংবার |’

→ পিতা রাবণের মনে উদ্ভূত শঙ্কা দূর করতে ইন্দ্রজিৎ সচেষ্ট হয়েছেন | প্রথমেই তিনি বলেছেন রামচন্দ্র কী এমন মানুষ যে, রাবণ তাঁকে ভয় করেন। তা ছাড়া বীরপুত্রকে রেখে পিতার যুদ্ধযাত্রা সমীচীন নয়। তাতে ইন্দ্রজিতের কলঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে জগতে। ইতিমধ্যেই দু-বার ইন্দ্রজিৎ রামচন্দ্রকে পরাজিত করেছেন| ‘প্রচণ্ড শর’ নিক্ষেপ করে খণ্ড খণ্ড করে শত্রুকে নাশ করেছেন। নিশারণে সংহার করেছেন রঘুপতিকে| ইন্দ্রজিৎ নিজের এইসব সাফল্যের কথা বলে পিতার মনে উদ্ভূত শঙ্কা দূর করতে সচেষ্ট হয়েছেন। অর্থাৎ একদিকে রামচন্দ্র সম্পর্কে তাচ্ছিল্য, অন্যদিকে গভীর আত্মপ্রত্যয় দিয়ে ইন্দ্রজিৎ রাবণের মনের যাবতীয় শঙ্কা ও দ্বিধাকে দূর করতে চেয়েছেন।


“আর একবার পিতঃ, দেহ আজ্ঞা মোরে” –বক্তা কার কাছে, কোন্ আজ্ঞা প্রার্থনা করেছেন? এমন প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে বক্তার চরিত্রের কোন্ দিক ধরা পড়েছে লেখো।

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ নামক কাব্যংশের প্রশ্নোদ্ভূত অংশে ‘রাক্ষসকুল ভরসা’ ইন্দ্রজিৎ পিতা রাবণের কাছে যুদ্ধযাত্রার | অনুমতি প্রার্থনা করেছেন।

→ অন্যায় সমরে বীরবাহুর মৃত্যু হয়েছে। রঘুপতি রামচন্দ্র তাকে হত্যা করেছে | ইন্দ্রজিৎ এই সময় প্রমোদকাননে ছিলেন| ধাত্রীরূপী লক্ষ্মীর কাছে ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে প্রথমে তিনি নিজের প্রতি ঘৃণা ও ধিক্কার জানান। কেননা, তুমুল যুদ্ধ করে বীরবাহু মৃত্যু বরণ করেছে, অথচ তিনি আনন্দ-বিলাসে মত্ত! এরপরই তাঁর মধ্যে বীরসত্তার জাগরণ ঘটে। পিতা রাবণের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন এই বলে—“সমূলে নির্মূল করিব পামরে আজি।” এর জন্য ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতিও নিয়েছেন। পিতার যাবতীয় শঙ্কা দূর করে তিনি বলেছেন—“আর একবার পিতঃ, দেহ আজ্ঞা মোরে।” এই আদেশপ্রার্থনার মধ্যে দিয়ে ইন্দ্রজিতের বীরসত্তার সম্যক প্রকাশ লক্ষ করা যায় | স্বদেশ ও স্বজনের গৌরব রক্ষার্থে তিনি শত্রুকে নিধন করবেনই। তা না হলে ভূ-লণ্ঠিত হবে তাঁর বীরমহিমা। উক্তিটি আবেদনমূলক হলেও আসলে তা ইন্দ্রজিতের প্রতিশোধস্পৃহারই প্রকাশ। নিজের সমরদক্ষতার ওপর ইন্দ্রজিতের অগাধ বিশ্বাস | সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনই এখানে দেখতে পাওয়া যায়।


“আর একবার পিতঃ, দেহ আজ্ঞা মোরে;”—কোন্ আদেশের কথা বলা হয়েছে? ‘আর একবার’ কথাটির তাৎপর্য কী? কোন্ আদেশ সে লাভ করেছিল?

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশে পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর পরে রাক্ষসরাজ রাবণ নিয়তির বিরূপতায় হতাশ হয়ে পড়েন। তখন ইন্দ্রজিৎ রাবণকে তুচ্ছ মানব রামচন্দ্রকে ভয় না পাওয়ার জন্য বলেন। একই সঙ্গে নিজে লঙ্কার সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে চান| ইন্দ্রজিতের কথায়, তিনি থাকতে রাবণ যদি যুদ্ধক্ষেত্রে যান তাহলে তা লঙ্কার কলঙ্ক বলে সমগ্র জগতে বিবেচিত হবে। এই সূত্র ধরেই ইন্দ্রজিৎ পিতার কাছে আরও একবার রামচন্দ্রকে পরাজিত করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন।

● ‘আর একবার' কথাটির দ্বারা ইন্দ্ৰজিৎ বোঝাতে চেয়েছেন যে এর আগেও তিনি রামচন্দ্রকে পরাজিত করেছেন। কাব্যেই উল্লেখ আছে যে ইন্দ্ৰজিৎ ইতঃপূর্বে দুবার রামচন্দ্রকে পরাজিত করেছেন, একবার রাত্রিকালীন যুদ্ধে তিনি রামলক্ষণকে নাগপাশে আবদ্ধ করেন (যদিও কাব্যাংশে শরবিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে), দ্বিতীয়বারে মেঘনাদ অন্তরীক্ষ থেকে লড়াই করে রাম-লক্ষণকে এতটাই বিপর্যস্ত করেন যে মৃতের ন্যায় পড়ে থেকে তাঁরা নিজেদের রক্ষা করেন।

● রাবণ বলেছিলেন যে, যদি ইন্দ্রজিতের যুদ্ধযাত্রার একান্তই বাসনা হয়, তাহলে আগে যেন তিনি ইষ্টদেবতা অগ্নিকে পুজো করে, নিকুম্ভিলা যজ্ঞগৃহে যজ্ঞ সমাপ্ত করেন এবং প্রভাতে যুদ্ধক্ষেত্রে যান |


“ছিঁড়িলা কুসুমদাম রোষে মহাবলী”—‘মহাবলী’ কাকে বলা হয়েছে? সে কী কারণে রুষ্ট হয়েছিল? রোষে সে কী কী করল?

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘অভিষেক’ কাব্যাংশের প্রশ্নোদ্ভূত অংশে ‘মহাবলী’ বলতে ইন্দ্ৰজিৎ-কে বোঝানো হয়েছে।

• প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশ ধারণ করে এসে লক্ষ্মী ইন্দ্রজিৎকে সহোদর বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছিলেন। একইসঙ্গে বলেছিলেন যে, লঙ্কার এই সর্বনাশের সময় মহাশোকগ্রস্ত রাজা রাবণ সৈন্য-সহ যুদ্ধসজ্জার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রমোদকাননে বিলাসমত্ত ইন্দ্রজিতের পক্ষে এ কথা সহ্য করা সম্ভব ছিল না। নিজের বংশের এই দুর্দশা তাকে যতটা ক্ষুব্ধ করেছিল তার থেকে তার ক্ষোভ বেশি হয়েছিল নিজের প্রতি| লঙ্কার বিপদের দিনে নিজের দায়িত্ব পালন না করতে পারাই ইন্দ্রজিতকে হতাশ করে তোলে।

● মহাবলশালী মেঘনাদ ক্রোধে তার ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেলে। হাতের কনক-বলয় দূরে নিক্ষেপ করে। কুণ্ডল পায়ের কাছে শোভা পায়, নিজেকে ধিক্কার দিয়ে ইন্দ্রজিৎ বলে যে, শত্রুসৈন্য যখন স্বর্ণলঙ্কা বেষ্টন করেছে তখন সে রমণীসান্নিধ্যে রয়েছে—এ দৃশ্য তাকে মানায় না | সে দশাননাত্মজ অর্থাৎ রাবণের পুত্র | তাই নিজের সহযোদ্ধাদের শীঘ্র রথ আনার জন্য আহবান করে ইন্দ্রজিৎ বলে— “ঘুচাব এ অপবাদ বধি রিপুকুলে।” অর্থাৎ শত্রুকে বধ করেই ইন্দ্রজিৎ লঙ্কার কলঙ্ক ঘোচানোর কথা ঘোষণা করে।


“বিদায় এবে দেহ, বিধুমুখী।”—‘বিধুমুখী’ কাকে বলা হয়েছে? তিনি বক্তাকে কী বলেছিলেন? প্রত্যুত্তরে বক্তা কী বলেছিলেন? বক্তা কেনা বিদায় চেয়েছেন ?

● মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘অভিষেক’ কাব্যাংশের উল্লিখিত অংশে ‘বিধুমুখী’ বলতে ইন্দ্রজিতের পত্নী প্রমীলার কথা বলা হয়েছে।

● ইন্দ্রজিৎ রথারোহণ করার মুহূর্তে প্রমীলা তাঁর কাছে আসেন এবং ইন্দ্রজিতের হাত ধরে তাঁকে ফেলে রেখে না যাওয়ার জন্য অনুনয় করেন। ইন্দ্রজিৎকে ছাড়া তাঁর পক্ষে প্রাণ ধারণ করা যে সম্ভব নয় সে কথাও তিনি বুঝিয়ে দেন | দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রমীলা বলেন যে, গভীর অরণ্যে লতা যদি হাতির পা-কে বেষ্টন করে তাহলে হাতি তার প্রতি মনোযোগ না দিলেও তাকে ফেলেও দেয় না। ইন্দ্ৰজিৎ তাহলে তাঁকে কীভাবে ত্যাগ করবেন এই প্রশ্ন তুলে প্রমীলা বিস্ময় প্রকাশ করেন।

প্রমীলার কথা শুনে ইন্দ্রজিৎ হেসে উত্তর দেন যে প্রমীলা তাঁকে ভালোবাসার যে দৃঢ় বন্ধনে বেঁধেছেন তাকে কারোর পক্ষেই খোলা সম্ভব নয় | এরপরে ইন্দ্রজিৎ প্রমীলাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে রামচন্দ্রকে বধ করে লঙ্কার মঙ্গলসাধনের মাধ্যমে প্রমীলারও কল্যাণ সাধন করে তিনি অত্যন্ত দ্রুত ফিরে আসবেন। এই কথা বলে ইন্দ্ৰজিৎ প্রমীলার কাছে বিদায় প্রার্থনা করেন।


“নমি পুত্র পিতার চরণে, করজোড়ে কহিলা”—পুত্র কে? তিনি পিতার চরণে প্রণাম করে কী বলেছিলেন? পিতা কী প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন?

● ‘অভিষেক’ কাব্যাংশের প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে ‘পুত্র’ বলতে রাবণপুত্র ইন্দ্ৰজিৎকে বোঝানো হয়েছে।

→ সহোদের বীরবাহুর রামচন্দ্র কর্তৃক মৃত্যুসংবাদ শুনে উত্তেজিত ইন্দ্ৰজিৎ প্রমোদকান ত্যাগ করে পিতা রাবণের কাছে পৌঁছে যান। শোকগ্রস্ত রাবণ তখন যুদ্ধসজ্জার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পিতার চরণে প্রণাম করে ইন্দ্রজিৎ প্রথমেই মৃত রামচন্দ্রের পুনর্জীবনলাভের বিষয়টি জানতে চান। রামচন্দ্রের এই মায়া যে তাঁর বুদ্ধির অদম্য তা-ও বলেন | তারপরেই তিনি রামচন্দ্রকে সমূলে নির্মূল করার জন্য পিতার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তীব্র ক্রোধে বলেন যে শরানলে রামচন্দ্রকে ভস্ম করে বায়ু-অস্ত্রে তাঁকে উড়িয়ে দেবেন, অথবা বেঁধে এনে রাজপদে উপহার দেবেন | এইভাবে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা আর বীরভাবের উদ্‌বোধন ঘটে ইন্দ্রজিতের উচ্চারণে।

→ ইন্দ্রজিতের শিরশ্চুম্বন করে রাবণ তাঁকে ‘রাক্ষস-কুল-শেখর’ এবং ‘রাক্ষস-কুল-ভরসা’ বলে উল্লেখ করেন এবং তারপরে গভীর বিষাদের সঙ্গে জানান যে, সেই ভয়ংকর যুদ্ধে তাঁকে বারবার পাঠাতে রাবণের প্রাণ শংকাতুর হয়ে ওঠে। নিয়তি তাঁর প্রতি নির্মম | তা না হলে মৃত রামচন্দ্রের পুনর্জীবনলাভ ঘটত না । শিলা জলে ভাসার মতোই এ অসম্ভব কাজ | এইভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অসহায়তা এবং পিতার স্নেহকাতরতাই যেন লক্ষ করা যায় রাবণের উচ্চারণে


“অভিষেক করিলা কমারে”—কুমার’ কে? তাঁর অভিষেক কে করালেন? অভিষেকের কারণ কী?

● ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে ‘কুমার’ বলতে রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ-কে বোঝানো হয়েছে।

● তাঁর অভিষেক করিয়েছিলেন পিতা রাবণ |

• রামচন্দ্র কর্তৃক পুত্র বীরবাহু নিহত হওয়ার পরে রাবণ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন | সহোদরের মৃত্যুসংবাদ এবং রাবণের যুদ্ধপ্রস্তুতির কথা যখন প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশধারী লক্ষ্মীর মাধ্যমে ইন্দ্রজিতের কাছে পৌঁছোয় তখন ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি শুরু করেন, উচ্চারণ করেন—“ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।” প্রমীলার কাতর অনুনয়ও ইন্দ্রজিতের গতি রোধ করতে পারে না | রামচন্দ্রের বিনাশ ঘটিয়ে লঙ্কার কল্যাণ সাধন করাকেই নিজের একমাত্র কর্তব্য বলে স্থির করেন ইন্দ্রজিৎ। এই উদ্দেশ্যসাধনে পিতার অনুমতি প্রার্থনা করার জন্য ইন্দ্রজিৎ রাবণের রাজসভায় উপস্থিত হয়ে জানান—“অনুমতি দেহ; সমূলে নির্মূল/করিব পামরে আজি!” রাবণ বিধির বিরূপতার কথা বলে ইন্দ্রজিৎকে ধারেবারে যুদ্ধে পাঠাতে নিজের অনিচ্ছার কথা বলেন। কিন্তু যুদ্ধযাত্রার বিষয়ে ইন্দ্রজিৎ ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ | পুত্র থাকতে পিতা যুদ্ধযাত্রা করলে যে লঙ্কা কলঙ্কলিপ্ত হবে সে কথাও রাবণকে ইন্দ্রজিৎ বোঝাতে চেষ্টা করেন | রামচন্দ্রকে আরও একবার পরাজিত করার জন্য পিতার অনুমতিটুকুই ইন্দ্রজিতের প্রয়োজন ছিল| কুম্ভকর্ণের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে রাবণ নিজের হতভাগ্যের কথা বলেন, কিন্তু তারপরেও ইন্দ্রজিতের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে তিনি তাকে গঙ্গাজল সহযোগে বিধিমতো অভিষেক করান এবং প্রভাতে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞ সমাপ্ত করে যুদ্ধযাত্রার কথা বলেন।


‘অভিষেক’ কাব্যাংশে কবির রচনারীতির দক্ষতা আলোচনা করো।

● মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশে বীরবাহুর মৃত্যু এবং লঙ্কার দুর্দশার পটভূমিতে ইন্দ্রজিতের রাক্ষসবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে অভিষেকের কাহিনি উল্লেখ করতে গিয়ে কবি এক মহাকাব্যিক রচনারীতির আশ্রয় নিয়েছেন | তৎসম এবং যুক্তব্যঞ্জন সমন্বিত শব্দ ব্যবহারে ভাষায় বনিময়তা সৃষ্টি কবির প্রিয় অনুশীলন ছিল । এখানে তার যথেষ্ট নিদর্শন রয়েছে, যেমন—কুসুমদাম, কুণ্ডল, তুরঙ্গম, কর্পূরদল ইত্যাদি | দুই বা ততোধিক শব্দকে যুক্ত করে ভাবপ্রকাশক শব্দগুচ্ছ তৈরি করাও মধুসূদনের আর একটি প্রিয় কৌশল, যেমন— কনক-আসন, রত্নাকর-রত্নোত্তমা, গতি-কর-যুগ ইত্যাদি | সন্ধিবদ্ধ এবং সমাসবদ্ধ পদের অনায়াস ব্যবহার করেছেন কবি| অনুপ্রাস, উপমা, রূপক ইত্যাদি অলংকারের ব্যবহারও কবির সহজাত দক্ষতা।—‘শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে, টঙ্কারিলা ধনুঃ/বীরেন্দ্র, পক্ষীন্দ্র যথা নাদে মেঘ মাঝে/ভৈরবে।” অলংকারসৃষ্টির এই দক্ষতা কাব্যসৌন্দর্যের বৃদ্ধি ঘটিয়েছে | অমিত্রাক্ষর ছন্দের অন্ত্যমিলহীনতা ভাষাকে করে তুলেছে বীরভাবের সার্থক প্রকাশক| সব মিলিয়ে ভাষা-ছন্দ-অলংকার এবং রসসৃষ্টির দক্ষতায় ‘অভিষেক’ কাব্যাংশটি মধুসূদনের কবি প্রতিভার সার্থক প্রকাশ |


‘অভিষেক' কাব্যাংশ অবলম্বনে রাবণ চরিত্রটির পরিচয় দাও।

● ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশের ক্ষুদ্র পরিসরে মেঘনাদের অভিষেক ক্রিয়ার পটভূমি প্রাধান্য পেলেও রাবণের ভূমিকাও কম নয়।

রাবণ চরিত্রের দুটি সত্তা — সম্রাটসত্তা ও পিতৃসত্তা। সম্রাট রাবণ তেজস্বী, মহাক্ষত্রিয়। বীরত্বের উচ্চ শিখরে তাঁর স্থান। অন্যদিকে পিতা রাবণ সন্তানস্নেহে কোমল মনের অধিকারী। প্রিয় পুত্র বীরবাহুর মৃত্যু পিতা রাবণকে শোকবিহ্বল করেছে। কিন্তু দুর্জয় সম্রাট রাবণ শোকের অশ্রুস্রোতে ভেসে না গিয়ে

প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলে উঠেছেন। মধুকবির বর্ণনায়—“সাজিছে রাবণ রাজা,/বীরমদে মাতি।” আবার, ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধে যেতে চাইলে তিনি বলেছেন, “নাহি চাহে প্রাণ মম পাঠাইতে তোমা বারংবার।” রাবণের পিতৃসত্তা এখানে সক্রিয় | ইন্দ্ৰজিৎকে যুদ্ধ থেকে বিরত করা যাবে না জেনে তিনি বলেছেন, “তবে যদি একান্তসমরে/ইচ্ছা তর, বৎস,/পূজ ইষ্টদেবে|” এই উপদেশ পুত্রের কল্যাণ কামনায় পিতার আত্মতুষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয় |

রাবণ নিয়তিলাঞ্ছিত, ভাগ্যবিপর্যস্ত এক নায়ক। তাঁর উক্তিতেও তা ধরা পড়েছে—“হায়, বিধি বাম মম প্রতি।” কখনোকখনো তাঁর শূন্যহৃদয়ের হাহাকারও ধ্বনিত হয়েছে | ‘মায়ার মায়া’ রাবণও বুঝতে অক্ষম | তাই তাঁকে বলতে শুনি—“কে কবে শুনেছে পুত্র, ভাসে শিলা জলে,/কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?”

সম্রাট ও পিতৃসত্তার টানাপোড়েনে রাবণ ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশে অতিশয় সমুজ্জ্বল চরিত্র হয়ে উঠেছে।


‘অভিষেক’ কাব্যাংশটির নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে লেখো।

● মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের প্রথম সর্গের নাম ‘অভিষেক’ | পঠিত কাব্যাংশটি প্রথম সর্গের অংশবিশেষ। সর্গের নামটিকেই কাব্যাংশের নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে |

লঙ্কার প্রমোদকাননে ইন্দ্রজিৎ ‘বামাদল মাঝে’ বিলাসমত্ত | এমন সময় ছদ্মবেশী লক্ষ্মী তাঁকে দিলেন বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ | ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদের আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে যান ইন্দ্রজিৎ। ক্রোধে, আত্মধিক্কারে নিজ অঙ্গের কুসুমদাম, কনক বলয়, কুণ্ডল ছুড়ে ফেলেন। তারপর মহাতেজে জ্বলে ওঠেন বীরেন্দ্রবলী। যুদ্ধসাজে সজ্জিত হন তিনি, প্রতিজ্ঞা—“ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।” দৃশ্যমান হল মেঘবর্গ রথ, তার স্বর্ণাভ চক্রে বিজলির ছটা। আকাশে উড্ডীন ইন্দ্রধনুর মতো রাক্ষস-ধবজ। অন্যদিকে, পুত্রশোকে বিহ্বল লঙ্কেশ্বর রাবণ যুদ্ধোন্মত্ত | মেঘনাদ উপস্থিত হলেন সেখানে | বিহ্বল রাবণ একমাত্র জীবিত পুত্রকে যুদ্ধে পাঠাতে দ্বিধাগ্রস্ত | মায়াবী রামের ছলনা তিনি জানেন। মরেও যে বেঁচে উঠতে পারে তার সঙ্গে ইন্দ্রজিতের আসন্ন যুদ্ধ কতদূর ফলপ্রসূ হবে—এই চিন্তায় বিচলিত লঙ্কেশ্বর | কিন্তু ইন্দ্রজিৎ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ—“দেখিব এবার বীর বাঁচে কি ঔষধে।” অবশেষে রাবণ পবিত্র গঙ্গাজল দিয়ে “অভিষেক করিলা কুমারে।” অর্থাৎ কাব্যের বিষয়বস্তু যে অভিমুখে পরিচালিত হয়েছে বা যে পরিণতি লাভ করেছে তা হল ইন্দ্রজিতের সেনাপতি-পদে অভিষেক | সুতরাং কাব্যাংশের বিষয়বস্তুর নিরিখে নামকরণটি সার্থক|

We are very glad that you want to share.
Thanks for sharing this.